রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণী পর্ব -৪৮+৪৯

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৪৮
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“আশু তুই তোর দেবর কে বলে আমার পেছনে যেন এভাবে সব সময় লেগে না থাকে।”

আরশিকে স্টেশনের একটা বেঞ্চিতে বসিয়ে রৌদ্র ফোনে কথা বলতে গেছে কিছুক্ষণ হলো। আরশি বসে বসে নীলদের জন্য অপেক্ষা করছিল তখনই নীলা এসে নাক মুখ কুচকে আরশিকে কথাটা বলল। আরশি ভ্রু কুচকে নীলার দিকে তাকালো। নীলার চোখে মুখে এক রাশ বিরক্তি। নীলা কথাটা বলার পরেই নির্বান নীলার পেছন থেকে অমায়িক একটা হাসি দিয়ে আরশির দিকে এগিয়ে আসে। খুব সুন্দর করেই শালীন কন্ঠে আরশিকে বলল-

“পাশের বারান্দা কেমন আছো তুমি?”

আরশি মুচকি হাসি বলল-

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি কেমন আছেন নীড়?”

নির্বান আড় চোখে নীলার দিকে তাকিয়ে বলল-

“ভালো তো থাকতে চাই কিন্তু কেউ আমাকে ভালো থাকতে দেয় না গো ক্রাশ ভাবি।”

আরশি নির্বানের কথায় ঠোঁট চেপে হাসে। নীলা গাল ফুলিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল-

“আশু তুই কি ওনাকে কিছু বলবি!”

আরশি হাত দুটো আড়াআড়ি ভাবে ভাজ করে সিরিয়াস হয়ে জিজ্ঞেস করল-

“কেন কি হয়েছে নিলু?”

“কি হয়েছে তুই জানিস না! উনি সব সময় আমাকে এতো ক্ষেপায় কেন? মাত্রই দেখা হলো আর উনি সাথে সাথেই শুরু করে দিয়েছে আজে বাজে কথা বলা।”

নীলা নাক ফুলিয়ে কথা গুলো বলল। নির্বান নীলাকে ক্ষেপানোর জন্য আরশিকে বলল-

“দেখলে ভাবি এতো বড় মেয়ে কতো ন্যাকামি করে কথা বলে!! আমি ওকে কিছুই বলিনি ও সব বানিয়ে বানিয়ে বলছে তোমাকে।”

“তোরা কেউ কারও থেকে কম না নির্বান।”

রৌদ্র পকেটে দুহাত গুজে দিয়ে নীলের সাথে আসতে আসতে কথাটা বলল। নীল হাসি মুখে আরশির পাশে এসে দাঁড়ায়। আরশির মাথায় আস্তে করে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল-

“কিরে বিবাহিত বেবি কেমন আছিস?”

আরশি নীলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। নীলের পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল-

“তুই জীবনেও ভালো হবি না হারামি। তোকে না বলেছি আমাকে এই নামে ডাকতে না!!”

রৌদ্র তাদের ঝগড়া দেখে বিরক্ত হয়ে বলল-

“এই দুজন চুপ হতে না হতেই তোমরা দুজন শুরু করে দিলে! তোমরা এক এক জন এতোটা বিচ্ছু টাইপের হলে কি করে? মাঝ দিয়ে আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে তোমরা সবাই।”

রৌদ্রর কথা আরশির তার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকায়। আরশি কিছু বলার আগেই রৌদ্র কথা পাল্টিয়ে বলল-

“এখন তো নীল ওরা সবাই এসে পরেছে। চল এখন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

কথাটা বলেই রৌদ্র ল্যাগেজ নিয়ে ট্রেনের দিকে এগিয়ে যায়। নির্বান হাসি দিয়ে বলল-

“ক্রাশ ভাবি দেখলে তো ভাইয়া তোমাকে ভয় পেয়েছে।”

নির্বানের কথায় আরশি মুচকি হাসে। তারপর রৌদ্র পেছন পেছন আরশিরাও চলে যায়। রৌদ্র কেবিনে ল্যাগেজ রেখে কেবিনের বাহিরে চলে আসে। আরশিরা কেবিনের দরজার কাছে আসতেই আচমকা একটা দু-তিন বছরের বাচ্চা মেয়ে এসে আরশির পা জড়িয়ে ধরে। সাথে সাথেই আরশি থমকে দাঁড়িয়ে যায়। রৌদ্র আর নীল ওরা কৌতুহলী চোখে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে। আরশি বাচ্চাটার দিকে ঝুঁকে মাথায় হাত রাখতেই বাচ্চাটা অস্পষ্ট ভাবে বলল-

“মাম্মা এসেছে। মাম্মা এসেছে।”

বাচ্চাটার মুখে মা ডাক শুনে আরশির অন্তর কেঁপে উঠল। স্তম্ভিত হয়ে যায় আরশি। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে তার। হঠাৎই সামনে থেকে একটা লোক এসে বাচ্চাটাকে আরশির কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-

“সরি ম্যাম। আসলে ওর আম্মুও আপনার মতো শাড়ি পরে তো তাই আপনাকে ওর আম্মু ভেবেছে। সরি আপনাদের ডিস্টার্ব করার জন্য।”

রৌদ্র আরশির মলিন মুখের দিকে তাকাতেই বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো। আরশির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মুখে হাসি টেনে নেয়। লোকটার কাধে হাত দিয়ে বলল-

“সমস্যা নেই বাচ্চা মানুষ ভুল হতেই পারে।”

রৌদ্র কথায় লোকটা সৌজন্যমূলক হাসি দেয়। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে পাশের কেবিনে চলে যায়। আরশি এখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীল আরশিকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে। মুখে হাসি টেনে আরশিকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে বলল-

“কিরে শাকচুন্নি এখানেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবি না-কি! আমার পা ব্যথা করছে চল চল ভিতরে চল।”

নীলের ধাক্কায় আরশির স্তম্ভিত ফিরে। রৌদ্র দিকে এক পলক তাকিয়ে চুপচাপ কেবিনে ভেতর চলে আসে। নীল আর রৌদ্র একে অপরের দিকে তাকিয়ে জোরালো শ্বাস ফেলে। একে একে সবাই কেবিনে যেয়ে বসে পরে।

(সময়ের বহমান স্রোতের সাথে পালটে যায় অনেক যায় কিছু। আশেপাশের মানুষ, মানুষের অনুভূতি আর একে অপরের সাথে পুরনো সম্পর্ক সব কিছুই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন হয়। সময়ের সাথে সব কিছু পরিবর্তন হওয়াই হয়তো সময়ের নীতি। এই দু’বছরে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। খুব কাছের মানুষ গুলোর সাথেও দূরত্ব বেড়ে গেছে এই সময়ের পরিবর্তনে। ঠিক যেমনটা হয়েছে আরশিদের বন্ধুত্বে। ছোট্ট বেলার সেই কাছের ফ্রেন্ড কাসফিয়া যার সাথেই আরশির বেড়ে ওঠা। সেই মানুষটার সাথেও তৈরি হয়েছে দূরত্ব। দেখা হওয়া, কথা বলা সব কিছুই যেন এখন দুষ্কর হয়ে উঠেছে। কাসফিয়া এখন স্বামী আদ্রাফ আর তাদের অনাগত সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত। ফ্রেন্ড সার্কেলের সব থেকে হারামি, দুষ্টু ছেলে নীলও এখন মনোযোগ দিয়ে বাবার ব্যবসায় সারাদিন পাড় করে দিচ্ছে। সব থেকে আবেগী নীলা নিজের ভাঙাচোরা হৃদয়টাকে নিজ হাতেই জোড়া দিয়ে এখন পাথরের ন্যায় মজবুত করে তুলেছে। উড়নচণ্ডী নির্বানও এখন তার প্রেয়সীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য দিন রাত ছটফটিয়ে উঠে। সারাদিন হাসি মুখে মেয়েটাকে জ্বালাতন করলেও দিন শেষে অন্ধকারের মাঝে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। নির্বান জানে তার প্রেয়সী নিজের মনের দরজা বন্ধ করে রেখেছে তবুও দিনের আলো দেখা দিতেই যেন নতুন আশা নিয়ে ভালোবাসার সংগ্রামে নেমে পরে। সবার কাছে পরিচিত বীরপুরুষ যে কি-না সব পরিস্থিতিতেই নিজেকে স্বাভাবিক রাখে সেই বীরপুরুষটা-ও ভয়ে রাতের আঁধারে তার ঘুমন্ত রুদ্রাণীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ভালোবাসাকে পাওয়ার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিলেও এখন সেই মিথ্যাটাই দিন দিন রৌদ্রকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে যেন তার রুদ্রাণীকে হারিয়ে ফেলার ভয় তাকে চারদিক থেকে চোরাবালির মতো আঁকড়ে ধরছে। সবার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক হাসিখুশি রাখা আরশি এখন রাস্তাঘাটে ছোট ছোট বাচ্চা দেখলেই ভেতর ভেতর ডুকরে কেঁদে উঠে। মা ডাক শোনার জন্য ব্যকুল হয়ে যায়। এতো এতো পরিবর্তনের মাঝেও কিছু কিছু জিনিস পরিবর্তন হয়নি। রৌদ্র আর রুদ্রাণীর নিয়মিত চিঠি আদান-প্রদান কথা সেই আগেই মতোই রঙিন হয়ে আছে। রৌদ্র মুখে ভালোবাসার কথা শুনে আরশি এখনো লজ্জায় নুয়ে পরে, অস্বস্তিতে হাত কচলাতে থাকে। আর রৌদ্র!! সে তো এখনও তার রুদ্রাণীর লাজুকলতায় প্রতিবার ঘায়েল হয়। বদলায়নি নীলের দায়িত্ববোধ-ও। আরশি আর নীলার প্রতি তার দায়িত্বটা সে সব কিছুর উর্ধ্বে রেখেছে। হাজারো ব্যস্ততার মাঝে নীলাকে আগলে রাখতে ভোলেনি। প্রতিদিন এক বার হলে-ও আরশিকে ফোন দিয়ে ঝগড়া করা তার নিয়মমাফিক কাজের মধ্যেই পরে। প্রতি সপ্তাহে একবার নীলা আর আরশিকে নিয়ে ভার্সিটির পরিচিত দোকানে ফুচকা খাওয়া কখনো নীলের মিস হয়না। তিনজনের বন্ধুত্ব অটুট থাকলেও তার মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে আদ্রাফ আর কাসফিয়া।)

আরশি মলিন মুখে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে। বাচ্চাটার মুখে মা ডাক শোনার পর থেকেই কোথাও যেন হারিয়ে গেছে আরশির ধ্যান। আরশিকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে নীল পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রৌদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল-

“ভাইয়া আপনি আমাদেরকে আপনার বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন এটা মনে হয় আশুর পছন্দ হয়নি।”

নীলের কথায় আরশি আর রৌদ্র দু’জনেই ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকালো। সবার ঈদের ছুটি থাকায় রৌদ্র আর আরশি দুজন মিলেই প্ল্যান করেছিল এবারের ঈদ রৌদ্রদের বাসায় কাটাবে। আর সাথে করে নীল, নীলা আর নির্বানকেও নিয়ে যাবে। রৌদ্র নীলের দিকে তাকিয়ে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

“এই কথা কেন বলছো নীল? আশু নিজেই তো খুব খুশি তোমাদের সাথে ছুটি কাটাবে বলে।”

নীল গোমড়া মুখ করে দু হাত ভাজ করে বলল-

“আশুকে দেখে তো মনে হচ্ছে না ও খুশি হয়েছে। আমরা আপনাদের দুজনের মাঝে এসে পরেছি বলেই হয়তো গাল ফুলিয়ে বসে আছে।”

নীলের কথায় আরশি ক্ষেপে ওঠে। রাগান্বিত চোখে নীলের দিকে তাকায়। সিট থেকে উঠে দাড়িয়ে নীলের চুলে টান দিয়ে আবারও নিজের সিটে বসে পরে। নীল মৃদুস্বরে চেচিয়ে ওঠে ব্যথায়। চুলে হাত বুলিয়ে মিনমিনিয়ে বলল-

“দেখলেন ভাইয়া সত্যি কথা বললেই দোষ।”

রোদ্র, নির্বান আর নীলা মিটমিটিয়ে হেসে যাচ্ছে আরশির নীলের ঝগড়া দেখে। আরশি রাগে গজগজ করে বলল-

“নীল একদম ফালতু কথা বলবি না বলে দিলাম। সব সময় দশ লাইন বেশি বোঝা বন্ধ কর।”

“তোর সাথে থেকেই তো দশ লাইন বেশি বোঝা শিখেছি তাই না রে নিলু?”

নীলের কথায় নীলা হকচকিয়ে উঠে। অপ্রস্তুত হয়ে বলল-

“দেখ নীল সব সময় তোরা নিজেদের ঝগড়ার মাঝে আমাকে ফাসিয়ে দিবি না বলে দিচ্ছি। তোরা দুজন তো ঠিকই থাকিস শেষে দেখা যায় আমাকেই বোকা বানিয়ে দিস তোরা।”

নীলার কথায় কেবিনের সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। নির্বান হাসতে হাসতে নীলাকে বলল-

“বোকা মানুষকে আর কিভাবে বোকা বানাবে!!”

নির্বানের কথায় সবার হাসির পরিমান আরও বেরে যায়। নীলা সরু চোখে নির্বানের দিকে তাকালো। আরশিকে উদ্দেশ্য করে রাগী কন্ঠে বলল-

“আশু তুই কি তোর দেবরকে কিছু বলবি!!”

আরশি কোনো রকম নিজের হাসি চেপে রাখে। বড় বড় চোখ করে নির্বানের দিকে তাকিয়ে শাসনের সুরে বলল-

“নীড় আপনাকে কত বার বলবো সব সময় সবার সামনে সত্যি কথা বলতে হয়না।”

আরশি কথাটা বলেই ফিক করে হেসে দেয়। রৌদ্র মুগ্ধ হয়ে তার রুদ্রাণীর হাসি মুখ খানা দেখে যাচ্ছে। তোমার মলিন মুখটা আমাকে বড্ড কষ্ট দেয় রুদ্রাণী। বার বার মনে হয় আমি হয়তো তোমার ইচ্ছে পূরণে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি আরু। আমি তোমার মুখে সব সময় হাসি দেখতে চাই। তোমার হাসির জন্য এই রৌদ্র সব কিছু করতে রাজি। রৌদ্র মনে মনে কথা গুলো ভেবেই একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে।
#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৪৯
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“নিলু তুই কি ইচ্ছে করেই নীড় ভাইয়াকে কষ্ট দিচ্ছিস? তুই কেন ওনাকে মেনে নিচ্ছিস না নিলু!”

আরশির কথায় নীলার মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না। সে আগের মতোই বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। নীলার এমন নির্লিপ্ততা দেখে আরশির কপাল কুচকে এলো। ট্রেনের জানালা দিয়ে দূরের দোকানে বসে চা খেতে থাকা রৌদ্র, নির্বান আর নীলের দিকে তাকালো। একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে নীলার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল-

“নিলু যা চলে গেছে সেটা নিয়ে শুধু শুধু নিজেকে কষ্ট দিস না। এভাবে আর কতদিন একা একা থাকবি? আদ্রাফকে ভালোবেসে তো কষ্ট ছাড়া কিছুই পাসনি। এবার না হয় অন্য কাওকে সুযোগ দে তোকে ভালোবেসে আগলে রাখার জন্য। আর কেউ না বুঝুক তুই তো বুঝিস ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ার কষ্ট কেমন হয়! তুই কি করে সেই একই কষ্ট আরেকজনকে দিতে চাচ্ছিস? মনে রাখিস একটা মানুষ সব সময় হাসিখুশি থাকে তার মানে এই না যে মানুষটার মধ্যে কষ্ট নেই। যাইহোক জীবনটা খুব সুন্দর যদি তুই সেটা সুন্দর করে গুছিয়ে নিতে পারিস। যে তোকে সত্যিই ভালোবেসে আগলে রাখতে চায় তার কাছেই নিজেকে আত্মসমর্পণ করবি অন্য কারও কাছে না।”

আরশির কথা গুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলো নীলা। মনে হচ্ছে কোনো এক ভাবনার জগতে নিজের মনটা’কে হারিয়ে ফেলেছে। নীলা আর কোনো কথা বলেনি। সে এখন গভীর চিন্তায় মগ্ন। তার পুরো মাথা জুরেই এখন নির্বানের ভাবনা হস্তক্ষেপ কিরে নিয়েছে।

———————

রৌদদের বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বিকেল হয়ে যায়। বাসায় এসেই সবার সাথে কুশল বিনিময় করে সাবাই নিজেদের রুমে চলে যায়। কিন্তু আরশি তার শ্বাশুড়ির সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যায় তবুও আরশি নিজেদের রুমে আসে না। সবার রাতে খাবার শেষে আবারও শ্বাশুড়ির সাথে আড্ডায় বসে যায়। রাত প্রায় দশটায় আরশি নিজের রুমে আসে। রৌদ্র সোফায় বসে ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত। আরশি রৌদ্রর দিকে একবার তাকিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে যায়। চুল গুলোতে চিরুনী দিয়ে আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল-

“আপনি এখনো ঘুমাননি কেন? ল্যাপটপ নিয়ে কি করছেন এই সময়?”

আরশির কথায় রৌদ্র কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না। সে আগের মতোই নিজের কাজে ব্যস্ত। আরশি কিছুটা ভ্রু কুচকে আবারও জিজ্ঞেস করলো-

“কি হলো কথা বলছেন না কেন আপনি?”

আরশির কথায় রৌদ্র মাথা তুলে আরশির দিকে তাকায়। আরশির নিজের চুল আঁচড়াতে ব্যস্ত এখনো। রৌদ্র নুখে গম্ভীর্যতা এনে বলল-

“এতক্ষণে আমাকে আপনার মনে পরলো মিসেস আরু? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি ভুলে গিয়েছিলেন আপনার হাসবেন্ডের কথা।”

আরশি আয়নার মধ্যেই রৌদ্রর দিকে ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালো। চুল গুলো হাত খোঁপা করে বিছানায় পা দুলিয়ে বসে জিজ্ঞেস করল-

“এসব কথা বলছেন কেন? আবার কি নিয়ে রাগ করেছেন আমার উপর যে তুমি থেকে আপনিতে চলে এসেছেন?”

রৌদ্র ল্যাপটপটা বন্ধ করে সোফায় কাছের টেবিলের উপর রাখলো। ডানহাতের আঙুল দিয়ে চুল গুলো পেছনে ঢেলে দেয়। গম্ভীর্যতার সাথে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। আরশির দিকে এগিয়ে এসে গম্ভীরমুখে বলল-

“এখানে আসার পর একবারও কি আপনি আমার কাছে এসেছেন মিসেস আরু?”

আরশি হাল্কা হাসলো। এবার সে বুঝতে সক্ষম হয়েছে তার রৌদ্র কেন গোমড়া মুখে বসে আছে। আরশি মুচকি হেসে রৌদ্র মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। শান্ত গলায় বলল-

“আমরা তো এখানেই এসেছি বিকেলে। আম্মুর সাথে গল্প করতে করতে কখন যে রাত হয়ে গেছে খেয়াল করিনি। আর আপনার সাথে তো খাবার টেবিলে দেখা হয়েছিলো।”

রৌদ্র বিরক্তি প্রকাশ করে শক্ত গলায় বলল-

“খাবার টেবিলে একবারও আমার দিকে ফিরে তাকিয়েছেন বলে তো আমার মনে হচ্ছে না।”

আরশি সরু চোখে রৌদ্রর দিকে তাকালো। নাক ফুলিয়ে রাগী কন্ঠে বলল-

“এবার কিন্তু আপনি শুধু শুধুই রাগ দেখাচ্ছেন। এখানে বেড়াতে এসে কি সারাক্ষণ আপনাকে নিয়েই বসে থাকবো না-কি! অদ্ভুত!”

“মিসেস আরু আপনি দেখছি নিজে ভুল করে এখন উল্টো আমাকেই ধমকাচ্ছেন!”

রৌদ্রর এমন কাঠাকাঠ গলা শুনে আরশি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে। রৌদ্রর অভিমান এতো সহজে ভাঙবে সেটা আরশি খুব ভালো করেই জানে। আরশি নিরাশ হয়ে আবারও বিছানায় বসে পরে। হতাশার সুর তুলে বলল-

“আচ্ছা এখন বলুন কি করতে হবে! কি করলে আপনার রাগ কমবে?”

রৌদ্র গম্ভীর গলায় বলল-

“বারান্দায় যাও আমি কফি নিয়ে আসছি।”

“আজ আকাশে চাঁদ নেই তাই চন্দ্রবিলাস করা যাবেনা। তাই শুধু শুধু বারান্দায় যেতে হবে না।”

রৌদ্র কথার সাথে সাথেই আরশি ফটাফট করে কথা গুলো বলে উঠলো। এটা রৌদ্র নিয়মিত কাজ। দু-এক দিন পর পর বারান্দায় চন্দ্রবিলাস আর বৃষ্টিবিলাস করা মাঝে মাঝে তো কোনো কারন ছাড়াই আরশিকে নিয়ে বারান্দায় অনায়াসে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দেয়। আরশির কথায় রৌদ্রর ভ্রু জোড়া আগের থেকেও খানিকটা কুচকে গেল। জোড়ালো শ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-

“তুমি আমার পাশে থাকলে আকাশে চাঁদ তারা কিছুই থাকা লাগবে না রুদ্রাণী। তোমাকে নিয়ে শুধু অন্ধকার বিলাস করেও আমি ধন্য।”

রৌদ্র চলে গেল। আরশি এখনো রৌদ্র যাওয়ার পানে স্থির নয়নে তাকিয়ে আছে। হঠাৎই রৌদ্রর কথা ভেবে আরশি আনমনেই হেসে দেয়।

————————

অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের পানে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নীলা। ছাদের এক কোণে রেলিঙের উপর হাত রেখে গভীর ভাবনায় ডুব দিয়েছে। আরশির বলা কথা গুলো তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কোনো মতেই নির্বান বের হচ্ছে না নীলার মাথা থেকে।

“নিলু এখানে একা একা কি করছিস এই সময়?”

নীলের কন্ঠে নীলা পেছন ফিরে তার দিকে তাকায়। শান্ত গলায় বলল-

“কিছু না এমনিতেই এসেছি ঘুম আসছে না তাই।”

নীল নীলার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল-

“আমি জানি কেন তোর ঘুম হচ্ছে না। মাথায় এতো চাপ দিস না। নিজের মন যা বলে তা-ই করিস। সঠিক মানুষের কাছে একবার নিজেকে ধরা দিয়ে দেখ হয়তো সারাজীবন ভালোবাসা দিয়ে জড়িয়ে রাখবে।”

নীলা নিচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছে। হঠাৎই নীলের ফোন বেজে উঠে। নীল ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই মুচকি হাসিতে তার ঠোঁট হাল্কা প্রসারিত হয়ে গেল। নীলার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলল-

“তুই দাঁড়া অফিস থেকে কল এসেছে। আমি কথা বলে আসি।”

নীলা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানাতেই নীল ছাদের অন্য কোণায় চলে গেল। ফোন কানে দিয়ে মুচকি হেসে হেসে কথা বলছে নীল। নীলা আগের মতোই আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ নির্বান ওদেরকে খুঁজতে খুঁজতে ছাদে চলে আসে। নীলাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছাদের মাঝে এসে বলল-

“ঠকঠক.. একটু দরজাটা খুলবে নীলা?”

নির্বানের উদ্ভট কথায় নীলা ভ্রু বাঁকিয়ে নির্বাকের দিকে তাকালো। আবছায়া আলোয় নির্বানের চোখ গুলো জ্বলজ্বল করছে। চুল গুলো সব সময়ের মতোই অগোছালো। চোখের বড়বড় পাপড়ি গুলো একটু পর পর পলক ফেলছে। নীলা নিজেকে সামলিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কিছুটা সন্দেহের গলায় বলল-

“ছাদের মাঝখানে কি আপনি দরজা দেখতে পাচ্ছেন না-কি?”

নির্বান নীলার দিকে এসে ফিসফিস কিরে বলল-

“ছাদের মাঝে দরজা না থাকলেও তোমার মনের মাঝে তো দরজা আছে সেটাই না হয় একটু খুলে দাও।”

নীলা প্রতিত্তোরে কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে নীল তাদের দু’জনকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আবারও নিজের মতো করে ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পরে।

————————

রৌদ্র মা কফির মগ দুটো রৌদ্রর হাতে দিতেই রৌদ্র মগ গুলো টেবিলে উপর রেখে দেয়। পকেট থেকে ওষুধের পাতা বের করে কফির একটা মগে ওষুধ মিলিয়ে দেয়। রৌদ্র মা প্রচন্ড অবাক হয়ে তার ছেলের কর্মকাণ্ড দেখছে। অতিমাত্রায় উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন রৌদ্রকে-

“রৌদ্র এসব কি করছিস? কিসের ওষুধ মিশিয়ে দিলি কফিতে?”

রৌদ্র কফির মগে চামচ নাড়তে নাড়তে শান্ত গলায় বলল-

“ট্রেনে একটা বাচ্চা ভুলে আরুকে মা ডেকেছিল। তারপর থেকেই আরুর মুড অফ। তাই আমি বাসায় এসে আমাদের হসপিটালের ডক্টরের সাথে আরুর ব্যাপারে আবারও কথা বলেছি। উনিই বলেছেন এই ওষুধটা আরুকে খাওয়ানোর কথা। আরুকে সরাসরি তো দিতে পারবো না তাই কফিতে মিলিয়ে দিচ্ছি।”

রৌদ্র মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-

“এসব করার কি দরকার রৌদ্র? এমন তো না যে বাচ্চা না হওয়াতে আমরা আরশিকে অবহেলা করছি। তাহলে কেন তুই আরশিকে নিয়ে এতো চিন্তা করছিস?”

রৌদ্র তার মা’র দু কাধে হাত রেখে বলল-

“এসব আমি বাচ্চার জন্য বা আমাদের জন্য করছি না মা। এসব কিছু আমি আরুর ইচ্ছে-পূরণ করার জন্য করছি। আরুকে সম্পূর্ণ খুশি দিতেই এসব করছি। রাস্তাঘাটে বাচ্চা দেখলে আরুর চোখেমুখে কষ্টের ছাপ আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। আরুর এই কষ্ট আমার আর সহ্য হচ্ছে না। ওর মলিন মুখ দেখলে আমার মনে হয় আমি আরুকে ভালো রাখতে পারছি না। আমি ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি আরুকে সুখে রাখতে।”

রৌদ্রর মা রৌদ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-

“এসব নিয়ে ভাবিস না রৌদ্র। আল্লাহর উপর ভরসা রাখ সব ঠিক হয়ে যাবে।”

রৌদ্র মাথা নাড়ালো। কফির মগ হাতে নিয়ে তার মা’র উদ্দেশ্যে বলল-

“মা আমি যাচ্ছি এখন আর ওষুধের কথা কিন্তু….”

রৌদ্র পেছন ফিরে আরশিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই রৌদ্র থেমে যায়। থমকে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্র। মনের মধ্যে ভয়ংকর রকমের ভয় এসে ঝেঁকে বসেছে। আরশিকে হারিয়ে ফেলার ভয়। রৌদ্র স্থির চোখে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here