লতাকরঞ্চ পর্ব ৫

#লতাকরঞ্চ (৫)

” শোনো আমার না কিশোর ছেলেটাকে দারুণ লাগে। ছেলেটা খুবই ভালো; আর আমার লতাটার সাথেও ওকে খুব ভালো মানায়। তুমি কি বলো লিমার আব্বা? ”
আম্মা, আব্বাকে উদ্দেশ্য করে এ কথাটি বলার পর আব্বা বললো,
– তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু শুধু তোমার পছন্দ হলেই তো চলবে না। লতার ও তো পছন্দ হতে হবে। মেয়ে কি এ ব্যাপারে কিছু বলেছে তোমাকে?
আম্মা উত্তর দিলেন, “না।”

আব্বা পেপারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন,
– এজন্যই আমি ওদের বাধা দেইনা। কারণ আমার কিশোরকে খুব পছন্দ হয়। যেহেতু ওদের মধ্যে মিল আছে অনেক; তাছাড়া ইদানিং মেশামেশি ও করছে সেহেতু আমাদের আগে আগেই প্রস্তুতি নিয়ে নিতে হবে। বুঝলে শানু? আগে আগেই হালকা বন্দোবস্ত করে রাখার জন্য তৈরী হয়ে নেওয়া উচিত আমাদের। বড় মেয়েতো নাক-চুল কাটলোই এবার একে নিয়েই শেষ ভরসা। ছোট মেয়েটাকে ভালোভাবে বিদায় করতে পারলেই হয়।

আম্মা বললেন,
– কিন্তু লিমার কি হবে.. বড় মেয়ের বিয়ে না দিয়েই ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিবে?
আব্বা গম্ভীরভাবে বললো,
– শোনো লতার মা, লিমার ব্যাপারে আমি কোনো কথা বলতে চাইনা। বেয়াদব তৈরী হয়েছে একটা। আমার লজ্জা করে ওকে মেয়ে বলে মেনে নিতে।
আম্মা চুপ হয়ে গেলেন ।
___________

লিমা আপুর সাথে মঞ্জু ভাইয়ের মেলামেশা খুব গভীরে চলে যাওয়ায় পাড়া-প্রতিবেশীরা এসে নানান বাজে মন্তব্য করে গিয়েছিলো আব্বা-আম্মাকে। তাই আব্বা নিজেই চুপিচুপি, সবার অজান্তে মঞ্জু ভাইয়ের বাড়িতে প্রস্তাব পাঠায়, প্রস্তাব ও গৃহিত হয়। বিয়ের দিন-ক্ষণ ও ঠিক হয়ে যায় চুপিচুপি। এসব অনেক আগের কথা, নিরিবিলিই ঘটেছে সব।

বিয়ের আলোচনাটা আমার সামনে হয়নি তাই এই ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা। তাছাড়া, বাড়ির সবচেয়ে ছোট বলে এসব বিষয়ে কেউ আমাকে কিছু বলার প্রয়োজন ও মনে করেনা..
অথচ আমি ভাবতাম আপু করে না… শুধু মঞ্জু ভাই_ই পছন্দ করে। কিন্তু আসলে যে এতদূর… তা জানা ছিলো না।

সেদিন শপিং করে আসার পরের দিন থেকে লিমা আপু লাপাত্তা। দুদিন পর ফিরে এসে বললো,
– আব্বা আমি মঞ্জুকে বিয়ে করতে পারবোনা। তুমি ওদের মানা করে দাও।
রক্তচক্ষু নিয়ে রমিজ সাহেব(আব্বা) বললেন,
– কি! তোর এত বড় সাহস! হঠাৎ কি এমন হলো যে বিয়ে করতে পারবিনা? এই, তুই আমার মেয়ে? এই শানু(আম্মা) এইটা কে? এটা আমাদের লিমা তো?

এ দুদিন নাকি আপু উনার বন্ধুর বাসায় ছিলো।
বিশ্বাস করা যায়? কসম করেও বলছে কিন্তু এগুলো কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

আব্বা বললেন,
– বন্ধু? তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে আর তুই কিনা বন্ধুর বাসায় রাত কাটাস? ছি:! ছি:! লিমা, আমাদের ফ্যামিলিতে এসবের রেকর্ড নেই। দোহাই তোর তুই এমন করিস না। আর এই কথা কাউকে বলিস না আর। আমি মঞ্জুর সাথেই তোর বিয়ে দিবো। এটাই শেষ কথা।
লিমা আপু আর কিছু বলেনি।
কে জানে তার মনে মনে এখন কি চলে….

_________

” কিরে, শুনলাম আজকাল নাকি খুব ঘুরাঘুরি, কথা বলাবলি হচ্ছে? তো মনে এত আনন্দ কেন বলতো? কি মজা তোর, তাইনা? ”
প্রান্ত ভাইয়ের কণ্ঠস্বর শুনে আমার হাত থেকে কপালকুণ্ডলা নামের বইটা পড়ে গেলো। হঠাৎ করে এসে এভাবে বলার কি কারণ থাকতে পারে!
না তাকিয়েই বললাম,
– হুঁ।

প্রান্তিক ভাই বললো,
– হুঁ মানে? শুনলাম কিশোরের সাথে আজকাল একটু বেশিই মিশামিশি করিস?
ডিরেক্ট বলে দিলাম,
– হ্যাঁ করি। আপনার কোনো সমস্যা আছে এতে?
প্রান্তিক ভাই হেসে বললো,
– ধুর! আমার আবার সমস্যা! এত ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে ভাবার এত সময় আছে নাকি আমার! ছুটি কাটাতে আসছিলাম আর সেই সুবাদে কতজনের যে কত কি দেখে ফেলতে হচ্ছে…
আচ্ছা কিশোর কি প্রতি সপ্তাহেই দৌঁড় দিয়ে চলে আসে নাকিভএ বাড়িতে? আচ্ছা, ওর কি আর কোনো কাজকর্ম নেই?

আমার ইচ্ছা করছেনা প্রান্ত ভাইয়ের সাথে কথা বলতে।
পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় প্রান্ত ভাই বললো,
– ন্যাকামি। এসব বয়সের দোষ। আর মামাও যে কেন শাসন করে না এই মেয়েটাকে.. আমি বুঝিনা। একদমই গেছে পুরোদমে।

লতা বললো,
– আপনার পার্সোনাল কোনো ব্যাপার নিয়ে আমি আপনার দিকে আঙুল তুলি? আপনার আম্মাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেছি কোনোদিন? তাহলে আপনার এত বড় সাহস হয় কি করে! আপনি আমার পার্সোনাল ইস্যু নিয়ে সমালোচনা করছেন তাও আবার আমার সামনেই?

প্রান্ত ভাই এরপর আর কিছুই বললো না।
সোজা রুম ছেড়ে চলে গেলো।
উনি চলে যাওয়ায় স্বস্তি পেলাম।
সারাক্ষন শুধু রাগারাগি আর গায়ে আগুন ধরানোর মত কথাবার্তা!
ফ্লোর থেকে বইটা তুলে নিয়ে আবার পড়া শুরু করলাম। বইটা কিশোর ভাই দিয়েছে । দারুণ লাগতেছে পড়তে…
____________

কিশোর ভাই আর আমার বিয়ের কথা আব্বা-আম্মার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে এটা কিশোর ভাই বা আমি কেউই জানতাম না।
তাছাড়া ভাই এ সপ্তাহে আসেনি তাই আমার ও এক সপ্তাহের জমানো সব কথাগুলো বলা হয়ে উঠেনি।

একদিন সকালে উঠে ছাদে যেতে খুব মন চাইলো।
এক কাপ গরম,কড়া কফি বানিয়ে নিয়ে গেলাম সাথে করে।

গিয়ে কিছুক্ষন প্রকৃতি দেখতেছিলাম। সুন্দর দৃশ্য। খুব ভালো লাগতেছে…
– কিরে লতা? অত:পর বিয়েটাই করে ফেলছিস? এত তাড়াতাড়ি? আমার আগেই? এত তাড়াতাড়ি পর হয়ে যাবি?
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রান্ত ভাইয়ের মুখে এসব আজগুবি কথা শুনে হেসেই দিলাম।
হাসির ছলেই বললাম,
– বিয়ে! আমি! হাহ্ হা হা…
•°•
প্রান্ত ভাই বললো,
– শোন লতা। আমার উপরে তোর অনেক রাগ, তাইনারে?
শুনে রইলাম অন্য দিকে তাকিয়ে…

আবার প্রান্ত ভাই বললো,
– শোন না… বাইরের চাকচিক্যময়তা দেখে, প্রকাশভঙ্গী দেখে নিজেকে বিলিয়ে দিসনা। একটু আবেগকে সরিয়ে বিবেককে ঠাঁই দে।

আমি এই কথাটার মানে কিছুই বুঝলাম না।
হঠাৎ এতদিন পর এসে কি বলছে এসব!
আমি জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম,
– বুঝলাম না। একটু কি বুঝিয়ে বলবেন?

উনি আমাকে বলার সুযোগ না দিয়ে বললো,
– খুব কফি খেতে ইচ্ছা করছে। একটু কফি দিবি?

আমি বললাম,
– অবশ্যই ভাইয়া। কিন্তু আমি চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলেছি। আপনি দাঁড়ান। এক্ষুনি আরেক কাপ নিয়ে আসতেছি।
উনি বললো,
– না। না। এত কষ্ট করতে হবেনা থাক।
আমি যেতে যেতে বললাম,
– গরমই আছে, ফ্লাক্সে রাখছিলাম তো,তাই। ৩ মিনিট! যাবো আর আসবো।
•°•
কফি বানিয়ে নিয়ে আসলাম।
এসে দেখি ছাদের কোথাও কেউ নেই।
আমি আর কি করবো..
কফির মগটা হাতে নিলাম… খেতে নিলাম…
চুমুক দিতেই অবিষ্কার করলাম এক হাস্যকর, অদ্ভুত জিনিস।
আমার মগে কোনো কফিই নেই।
কেউ খেয়ে নিয়েছে পুরোটা…

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here