লুকানো অনুরক্তি পর্ব -০২

#লুকানো_অনুরক্তি (০২)
রূপন্তি রাহমান (ছদ্মনাম)

উদাস ভঙ্গিতে আকাশ পানে তাকিয়ে আছে অবনি। আকাশে মিটিমিটি করে তারকা জ্বলজ্বল করলেও মনের আকাশে মেঘ জমেছে। যেকোনো সময় হবে ভারী বর্ষণ।

রুমের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বলল,

‘তোকে আমি এইজন্য অফার করেছি ভাইয়াকে বিয়ে করার জন্য। তুই ভাইয়াকে বিয়ে করলে তোকে দিয়ে আমি আমার প্রতি*শোধ নিতে পারবো।আমায় কোথাও যেতে দেয় না।’

নাদিয়ার বকবকানিতে বিরক্ত হয় অবনি। এমনিতেই মনটা ভার । রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে তাকায় নাদিয়ার দিকে।

‘আহা! রেগে যাচ্ছিস কেন? আমার কথা মন দিয়ে শুন, ছেলেরা বিয়ের পর বউকে ভয় পায়। বউয়ের ভয়ে চুপ থাকে। সবার সাথে উঁচু গলায় কথা বললেও বউয়ের কাছে এলে বিড়াল হয়ে যায়। মিনমিন করে। একবার যদি তুই আমার ভাবি হয়ে যাস তো কেল্লাফতে। আমি সব শোধ তুলতে পারবো।’

সরু হয় অবনির চাহনি। নাদিয়ার দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে রগড় গলায় বলে,

‘রবার্ট ক্লাইভ যেমন মীর জাফরকে সিংহাসনে বসিয়ে নিজে বাংলাকে শাসন করেছে সেরকম? তুই তো মীর জাফরের মতো ঘরের শ*ত্রু বিভীষণ।’

ফুস করে নিঃশ্বাস হচ্ছে ফেলে নাদিয়া।

‘তুই আবার ইংরেজ শাসনের দিকে যাচ্ছিস কেন? আমি তো শুধু তোকে বুঝালাম। তোকে যেতে নিষেধ করেছে বলে তোর মন খারাপ। ভাব সেই ছোট থেকে ভাইয়া আমার সাথে এমন করছে।’

অবনির হাত মুঠোবন্দি করে অনুনয় করে পুনরায় বলে,

‘আরে ইয়ার রাজি হয়ে যা না। আমি ড্যাম সিউর ভাইয়া তোকে ভালোবাসে। আমার সামনে বাঘ অথচ তোর সামনে গেলে মেঁউ মেঁউ করে। ভাইয়াকে নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরানোর জন্য এর থেকে সুবর্ণ সুযোগ আর হবে না।’

‘আমার সামনে এলে তোর ভাই মেঁউ মেঁউ করে? তাহলে খাবার টেবিলে ওটা কি ছিলো?’

‘ওটা ছিলো কিছু একটা। এবার তুই রাজি হয়ে যা। শুধু একবার হ্যা বল।’

‘তোর ওই খাড়োস, রসকষহীন, কাঠখোট্টা ভাইকে যদি বিয়ে করিই তাহলে তোর কথা শুনে নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরাবো কেন? আমি আমার মতো করে তোর ভাইয়ের মাথায় রেখে কাঁঠাল ভেঙে খাবো।’

খুশিতে চকচক করে উঠে নাদিয়ার চোখ।

‘তার মানে ভাইয়াকে বিয়ে করতে তুই রাজি?’

অবনি নাক ফুলিয়ে জবাব দেয়,

‘না, রসকষহীন মানুষকে বিয়ে করে নিজের জীবনের সমস্ত রস উগলে দিতো পারবো না। আর যাইহোক এমন নিরামিষ মানুষের থাকা সম্ভব না। নিমপাতারও রস থাকে। তিতা কিন্তু রস তো থাকে। কিন্তু তোর ভাইয়ের তাও নেই।’

নিমিষেই মুখটা চুপসে গেল নাদিয়ার।

‘তোর একটা বড় ভাই থাকলে তোকে আমি জিজ্ঞেসও করতাম না। ধরে বেঁধে কাজী অফিস নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলতাম।’

অবনি ঠাট্টার সুরে বলে,

‘আছে তো একটা। বিয়ে করে ফেল।’

‘যাহ্, তোর এই দুধের শিশু ভাইকে বিয়ে করলে রোমান্স করার জায়গায় ওর হাগু মুতু পরিষ্কার করা লাগবে।’

‘তাইলে চুপ থাক। আর কোনো কথা বলবি না। ভালো লাগছে না আমার।’

অবনি চুপ করার কথা বললেও নাদিয়া চুপ হলো না। নিজের মতো করে বকবক করতেই থাকল।

‘তোর রাগ হচ্ছে না? ভাইয়া যে তোকে যেতে নিষেধ করলো।’

অবনি রাগে গজগজ করতে লাগে।

‘হচ্ছে তো। তবে তোর ওই বিরস ভাইয়ের উপর না তোর উপর। তোর জন্য সাফাই গাইতে গিয়ে আজ এই হাল হলো।’

দুষ্টু হাসে নাদিয়া।

‘আমার কিন্তু বেশ লাগছে। আমি যেতে পারবো না দেখে যতটা কষ্ট হচ্ছিল এর থেকে বেশি শান্তি লাগছে তুই যেতে পারবি না বলে।’

‘তুই আর তোর ভাই ইচ্ছে করছে দু’টো কে গ*লা চেপে মে’রে ফেলি।’

________________________

‘মেয়েটাকে যেতে নিষেধ করা তোর মোটেও উচিৎ হয়নি। এই সময় লাইফটাকে এনজয় করতে না পারলে আর পারা যায় না। এরপরই দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। আমরাও তো ভার্সিটি লাইফে এমন এনজয় করেছি। কি করিনি?’

নিজের ডেস্কে মাথা গুঁজে রেখেছিল মাহ্‌ফুজ। সাইফুলের কথায় মাথা উঁচিয়ে তাকায় সে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে গলার টাই টা ঢিলে করে।

‘দুস্ত আমি না দিন দিন কেমন হিংসুটে হয়ে যাচ্ছি। শুধু ওর ক্ষেত্রেই। কেউ ওর দিকে তাকালেও কেমন অন্তর্দাহ হয়। অশান্তি অশান্তি লাগে। বুকের ভেতরটায় কেমন হারিয়ে ফেলার ভয়। এই বুঝি ওকে আমার কাছ থেকে কেউ নিয়ে গেল।’

‘তাহলে বলে দে মনের কথা। দেখ মেয়েটার এখন বিয়ের বয়স। যেকোনো সময় দেখবি ওর বাবা ওর বিয়ের কথা বলে বাড়িতে নিয়ে চলে গেছে। তখন? তখন কি করবি? এজন্যই বলছি সময়টা অনুকূলে থাকতেই নিজের মুঠোয় করে নে। নয়তো সারাজীবন আফসোস করবি।’

যদি আমায় প্রত্যাখান করে?’

____________________

রাত সাড়ে দশটা বাজতেই নাদিয়া আর অবনি ড্রয়িং রুমে পপকর্ন নিয়ে বসে হরর ফিল্ম দেখার জন্য।

আলো নিভিয়ে টিভি অন করতেই শুনতে পেল,

‘না ঘুমিয়ে এখানে কি করছিস তোরা?’

অবনির হাত খাঁমচে ধরে নাদিয়া। অবনিকে খোঁচাতে লাগল কিছু বলার জন্য। কিন্তু অবনি কঠিন মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। নাদিয়া ফিসফিস করে বলে,

‘কিছু একটা বল। তুই বললে ভাইয়া কিছু বলবে না।’

অগ্নি চোখে নাদিয়ার দিকে তাকায় সে। আবছা আলোয় অবনির রণমুর্তি দেখে একেবারে চুপ হয়ে গেল নাদিয়া। অবনি ঠেঁটা গলায় বলে,

‘মুভি দেখবো।’

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজের রুমে চলে গেলো মাহ্‌ফুজ। রুমের আলো জ্বেলে দরজা হালকা চাপিয়ে অফিসের টুকটাক বাড়তি কাজ করতে লাগল। কান খাঁড়া রাখে ড্রয়িংরুমের দিকে।

মুভি অর্ধেকও শেষ হয়নি এর আগেই সোফায় গুটি মে’রে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল নাদিয়া। অবনি একটা একটা করে পপকর্ন মুখে দিচ্ছে আর মনোযোগ দিয়ে মুভি দেখছে। মুভিতে টান টান উত্তেজনা। মোমবাতি হাতে নায়িকা কাঁপছে। চারিদিকে অদ্ভুত আওয়াজ। বাড়িতে কেউ নেই। আচমকা নায়িকার কাঁধে হাত রাখতেই কেউ শান্ত গলায় “অবনি” বলে ডেকে উঠলো। এমন একটা সিচুয়েশনে নিজের নাম শুনে ভয়ে হাত থেকে পপকর্নের বাটিটা ফেলে দিলো অবনি। থরথর করে কাঁপতে লাগল। চিৎকার করতে গিয়ে তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের করতে পারল না।

বাটি পড়ে যাওয়ার শব্দে নিদ্রা হালকা হয়ে যায় নাদিয়ার। চোখ মেলে একবার তাকিয়ে আবারও গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেল সে।

মাহ্‌ফুজ তাড়াতাড়ি করে ড্রয়িংরুমের আলো জ্বালালো। অবনিকে স্বাভাবিক করার জন্য বলে,

‘রিল্যাক্স, রিল্যাক্স আমি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

অবনি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাহ্‌ফুজের দিকে তাকায়। মাহ্ফুজ কে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বুকে থুথু দেয়। কিন্তু ভয় কমলো না। আচমকা ডাকে তার গা হাত পা কেমন অসাড় হয়ে গিয়েছিল।

‘ভয় পেলে এসব মুভি দেখতে যাস কেন?’

জবাব দেয় না অবনি। নিচের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল। অবনি যে রেগে তার সাথে কথা বলতে চায় না বেশ বুঝতে পারলো মাহ্ফুজ।

এভাবেই কয়েক মুহূর্ত কে’টে গেল। অবনির ভয় আর গায়ের কাঁপুনি কমতেই মাহ্‌ফুজ আবারও বলে,

‘বলছি কি একটানা ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথাটা ভীষণ ধরেছে। একটু চা বানিয়ে দিত পারবি?’

কোনো দ্বিরুক্তি করল না অবনি। টিভি অফ করে রান্নাঘরের দিকে গেল।

___________________

চায়ের কাপটা মাহ্‌ফুজের সামনে রেখে দ্রুত কদম ফেলে দরজার কাছে আসতেই মাহ্‌ফুজ বলল,

‘রেগে আছিস আমার উপর? ট্যুরে যেতে দেইনি বলে?’

দাঁড়িয়ে পড়ে সে। দুইদিকে মাথা নেড়ে চলে যেতে নিলেই মাহ্‌ফুজ পুনরায় বলল,

‘একটু বসবি? তোর সাথে আমার কিছু কথা ছিলো।’

ধক করে উঠে অবনির বুকের ভেতরে। সমস্ত কায়া জমে গেল অজানা আতঙ্কে। মন বলল শুনিস না কথা। এই যে কথা না, তোর সর্বনাশ।তোকে মানসিক ভাবে ঘায়েল করার এক অভিনব কৌশল। তোকে এলোমেলো করে দেওয়ার পায়তারা।

‘বেশি না দশ মিনিট। শুনবি একটু?’

গুটি গুটি পায়ে বিছানায় বসল অবনি। ওড়না শরীরে জড়িয়ে নিলো ভালো করে। দৃষ্টি মেঝেতে স্থির। নখ খুঁটতে লাগে বিরামহীন।

অবনির এলোমেলো চুল। অনুভূতি আর নিদ্রাহীন, নিষ্প্রাণ দুই চোখ। অস্বস্তিতে হাত কঁচলাচ্ছে। মাহ্‌ফুজ নিমেষহীন তাকিয়ে রইলো। মাথা তুলে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ে দু’জনার। বিব্রত হয় অবনি।

‘পুরুষ মানুষ প্রেমে পড়লে হিংসুটে হয়। জানিস?’

ওড়নার কোণ চেপে ধরে সে। মানুষটার সান্নিধ্যে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া যেন অবাধ্য হয়ে উঠেছে তার। ছাতি কাঁপছে দুরুদুরু। ছোট্ট হৃদপিণ্ড যেন ছাতি ভেদ করে এখনই ধপাস করে মেঝেতে পড়ে যাবে।

মাহ্‌ফুজ চায়ের কাপে চুমুক দেয়। বেশ আয়েশ করে।

‘নিজে প্রেমে না পড়লে কখনো এই কথাটা বিশ্বাস করতাম না আমি। আগে ভাবতাম প্রেমিকরা এমন কেন? প্রেমিকারা কোথাও যেতে বললে নিষেধ করে কেন? কিন্তু এখন বুঝি।’

অবিন্যস্ত চুলে আঙ্গুল চালায় মাহ্ফুজ। শান্ত গলায় পুনরায় বলে,

‘কাউকে ভালোবাসলে কেমন যেন ভয়ে ভয়ে থাকে মন। এই বুঝি টুক করে কেউ এসে নিয়ে গেল ভালোবাসার মানুষটাকে। এই ভয়টা আমারও হয়। সর্বক্ষণ কেমন একটা হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক গ্রাস করে। তুই অবুঝ না। আমার চোখের ভাষা বুঝিস। তাই তো আমার থেকে আড়াল করে ফেলেছিস নিজেকে। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াস।’

পর পর কয়েকটা শ্বাস ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো মাহ্‌ফুজ।

‘অবনি আমি ভণিতা ছাড়া সোজাসাপটা ভাষায় বলছি, আমি তোকে ভালোবাসি।’

হাত পা বরফের ন্যায় ঠান্ডা হয়ে গেল অবনির। শিরদাঁড়া বেয়ে প্রবাহিত হলো তরল স্রোত। যেই ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখা। দূরে দূরে থাকা। শেষ রক্ষা আর হলো না তার। অবশেষে সেই অনুভূতির সাথে মোকা*বেলা করতেই হলো তাকে। ছোট্ট একটা কথা। কিন্তু অদৃশ্য তান্ডবের সূত্রপাত ঘটালো অন্তঃস্থলে।

‘অনুভূতি গুলোকে নিজের ভেতরে চেপে রাখতে রাখতে দম বন্ধ লাগছিল আমার। হাজার বার চেষ্টা করেছি নিজেকে দমিয়ে রাখার। কিন্তু আমি ব্যর্থ। অবাধ্য অনুভূতি আমার ছোট্ট বুকে আর ঘাপটি মে’রে থাকতে চাইছে না। ঠেলেঠুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে অন্য একজনকে আলিঙ্গন করার জন্য । তাই এবার আর আটকানোর চেষ্টা করিনি। ব্যক্ত করেই ফেললাম। যা হবার হবে।’

অবনি কাঁপা গলায় বলে, ‘আর কিছু বলবে তুমি?’

নৈঃশব্দ্যে হাসে মাহ্‌ফুজ। মেয়েটা পালিয়ে যেতে চাইছে। বুঝতে পারলো সে। আতঙ্কিত অবনিকে ভড়কে দেওয়ার জন্য বলে,

‘ভালোবাসি। একটুখানি? না না অনেকখানি।’

গলা শুকিয়ে চৌচির অবনির। মাহ্‌ফুজের দিকে তাকাতে গিয়েও তাকায় না। বুকের ভেতরে প্রলয়ঙ্কারী তান্ডব যা চোখে ভাসমান তা মাহ্‌ফুজকে দেখাতে নারাজ সে। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলো।

‘ট্যুরে যেতে দেইনি বলে স্যরি। আমি কি করবো বল,,,,’

কথার মাঝে উঠে দাঁড়ায় অবনি। মাথা ভনভন করছে তার। এখানে আর একটু থাকলে যেকোনো সময় জ্ঞান হারাবে। অবিন্যস্ত পায়ে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই বদরাগী মানুষটা ব্যাকুল কন্ঠে বলে,

‘ফিরতি ভালোবাসা দিবি না?’

#চলবে

নায়েকের নাম যে এমন হয়েছে আমার দো*ষ নেই। সব ফেসবুকের দো*ষ। আর ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমি মানুষ আমারই ভুলই হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here