শরতের শুভ্র মেঘের ভেলায় পর্ব- ১৭

#শরতের_শুভ্র_মেঘের_ভেলায়(১৭)
Sadia afrin nishi
_____________________________

অনেক মানুষ একসাথে জড় হয়ে আছে।এগিয়ে গিয়ে ভীড় ঠেলে ঢুকে দেখি আরও একটা লাশ।ঠিক আগের লাশগুলোর মতোই।এবার তো সাক্ষর জেলে তাহলে কে করল এই খুন।আশেপাশের মানুষেরা বলাবলি করছে কে বা কারা যেন লাশটাকে বড় গাড়ির মধ্যে থেকে ছুড়ে হাইওয়েতে ফেলে দিয়ে চলে গেছে।আমার কাছে সবকিছু কেমন অগোছালো ধাঁধার মতো লাগছে। যতই অগোছালো হোক না কেন আমাকে এর উত্তর খুঁজে বের করতেই হবে।

লাশগুলো যে মর্গ থেকে সাক্ষরই সরিয়ে আনত এটা তো আমি সিওর কিন্তু খুনগুলো কে করছে এটাই আসল রহস্য। এই মুহুর্তে আমার দরকার একজন ল-ইয়ারের খোঁজ। তারজন্য আগে আমাকে অফিসার মাইনুল হাসানের সাথে কথা বলতে হবে। উনি নিশ্চয়ই আমাকে সাহায্য করবেন।

থানা থেকে অফিসার মাইনুল হাসানের পার্সোনাল নম্বর কালেক্ট করলাম। তারপর তাকে ফোন করে থানার পাশেই একটা কফি শপে মিট করার অফার দিলাম। উনিও রাজি হয়ে গেলেন।হয়তো আমার অসহায়তা ধরতে পেরেছিলেন।

সবকিছু অফিসারকে খুলে বললাম। অফিসার আমার কথাগুলো বিশ্বাস করে নিলেন।সাক্ষরের অভ্যাস সম্পর্কে অবগত থাকার জন্যই এতটা কোমল ব্যবহার করছেন হয়তো।অফিসার আমাকে সাথে করে সনামধন্য ল-ইয়ার ব্যারিস্টার কামরুল ইসলামের সাথে মিট করিয়ে দিলেন। ব্যারিস্টার কামরুল ইসলাম একজন সৎ ব্যারিস্টার।সাক্ষরের এমন অবস্থার কথা শুনে উনি নিজেও গভীর ভাবে শোকাহত হয়েছেন। সাক্ষরের পেশা সম্পর্কে উনিও আগে থেকেই অবগত ছিলেন। সাক্ষর আর ওনার মধ্যে বন্ধুক্তপূর্ণ সম্পর্ক।

ব্যারিস্টার সাহেব আমাকে বললেন সাক্ষরের কাছ থেকে সব ক্রিমিনালদের ডিটেইলস এনে ওনার হাতে তুলে দিতে।কিন্তু আজকে আর সাক্ষরের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয় তাই আমাকে আগামীকালের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ব্যারিস্টার সাহেব আর অফিসারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির দিকে অগ্রসর হলাম।পনের মিনিটের মাথায় বাড়িতে পৌঁছে গেলাম।

————————————————————-

বাসায় ফেরার পথে মিতালীকে ফোন করে আমাদের বাড়িতে আসতে বলেছিলাম।এখন দুজনে মিলে সেই গুপ্ত কক্ষে সাক্ষরের সব গোপনীয় কাজগপত্র তল্লাশি করছি। সাক্ষরের যে যময ভাই আছে এটা শুনে মিতালীও চরম অবাক হয়েছে।এক ঘন্টা ধরে খোঁজার পরেও যখন কোনো কিছুই না পেয়ে ফিরে আসছিলাম ঠিক তখনই আমার চোখ যায় আলমারির মধ্যে ছোট্ট একটি কৌটোকে।কৌটো টা হাতে নিয়ে দেখলাম এটা একটি লক করা টিনের কৌটো। আলমারির ভেতরে আশেপাশে চোখ বুলতেই পেয়ে গেলাম কৌটোর চাবিটা। কৌটোর মুখ খুলে ভেতরে পেলাম একটা মেমোরি কার্ড।মিতালী আমার দিকে খুব উদগ্রীব হয়ে চেয়ে আছে ভেতরে কী আছে জানার জন্য। আমি ওকে মেমোরি কার্ডটি বের করে দেখালাম।মিতালী আমাকে মেমোরি কার্ডটা ওপেন করতে তাড়া দিতে লাগল। আর কিছু না খুঁজে মেমোরি কার্ডটা নিয়ে আমরা ওপরের ঘরে চলে গেলাম।
পেনড্রাইভে মেমোরি কার্ডটা চালু করে দুজনেই অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে পড়লাম ভেতরে কী আছে দেখতে।

মেমোরি কার্ডে কিছু ফটো আর ত্রিশ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ রয়েছে। ফটোগুলো আমি ঠিক চিনতে পারলাম না তবে ভিডিও টা দেখার পর বুঝতে পারলাম ফটো আর ভিডিওতে যারা রয়েছে তারা সবাই একই মানুষ। ভিডিওটিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নয়জন লোক বসে মাদকদ্রব্য আর কিছু ঔষধ প্যাকেটিং করছে। নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথাও বলছে এগুলো সাপ্লাই সম্পর্কে। আমি এই মেমোরিকার্ড টা যত্ন করে তুলে রাখলাম। পরবর্তী দিন এটাই হবে আমার প্রথম ক্লু ব্যারিস্টারকে দেওয়ার জন্য।

রাতে মিতালী রান্না করল।আমাকে কিছুটা খাবার জোর করে খাইয়ে দিয়ে নিজের দিকে খেয়াল রাখতে বলে মিতালি চলে গেল তার নিজের বাসায়। এখন এই বাড়িতে আবার আমি একা।

————————————————————-

সকাল সকাল ব্যারিস্টারের অফিসে এসে হাজির আমি।ব্যারিস্টার আমাকে দেখে সৌজন্যমূলক হাসি প্রদান করলেন।প্রতিত্তোরে আমিও কিঞ্চিৎ হাসলাম।তারপর বসে পড়লাম দুজন আসল আলোচনায়।ব্যারিস্টার সাহেবকে মেমোরি কার্ডটি দেখাতেই তিনি সেটা ওপেন করে ভিডিওটি দেখলেন। ভিডিও ক্লিপটিতে যারা আছে তারা প্রত্যেকে এমপির লোক এবং তারা সকলেই এখন মৃত। সাক্ষরের কথাই হয়তো সত্যি এরা সকলে খারাপ কাজের সঙ্গে লিপ্ত। এরা সকলে এমপির লোক হওয়া সত্বেও কে এদের মার্ডার করল আর কেনই বা করল?তার নেক্সট টার্গেট এবার এমপি নয়তো? এমনো হাজার প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ব্যারিস্টার জানালেন আমাদের প্রথমে হসপিটালে যেতে হবে যেখানে ওই লাশগুলোকে পোস্ট মর্টেম করানো হয়েছে। সেখান থেকে তথ্য কালেক্ট করে তারপর অনুসন্ধান চালাতে হবে।

সময় নষ্ট দু’জন না করে দু’জনে বেড়িয়ে পরলাম হসপিটালের উদ্দেশ্যে। হসপিটালে গিয়ে লাশগুলোর পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দেখে বোঝা গেল এই খুন একজনই একই প্রক্রিয়ায় করেছে। ডক্টরের কাছে আমি জানতে চাইলাম এটা কোনো সাইকো কিলারের কাজ কী না? ডক্টর বলল,,

_”হয়তেও পারে আবার নাও হতে পারে ”

হসপিটাল থেকে বেড়িয়ে ব্যারিস্টার সাহেব বললেন আমাকে বাড়িতে ফিরে যেতে। আগামীকাল সকাল সকাল এমপির সঙ্গে দেখা করতে হবে। এমপি নিজেই হয়তো এই রসহ্যের চাবিকাঠি।

————————————————————-

এমপির বাড়িতে ঢোকার জন্য অনুমতি পেতে বেশ সময় লেগে গেল। এমপির সঙ্গে ব্যারিস্টার সাহেব নিজেই আলোচনা করছেন আমি শুধু পাশে বসে দেখছি।এমপি জানালেন,,”তিনি এমপি মানুষ। তার শত্রুর অভাব নেই। তাকে ফাঁসাতে চায় সবাই।”

এমপির মুখ থেকে কোনো কথাই বের করা গেল না। আজকের মতো ব্যারিস্টার বাবু তার অফিসে চলে গেল।আর আমিও বাড়ি যেতেই চেয়েছিলাম কিন্তু সাক্ষরের সঙ্গে দেখা করাটা জরুরি মনে করলাম তাই রিকশা ধরে থানায় চলে গেলাম।

রিকশা ওয়ালার ভাড়া থানায় প্রবেশ করলাম। এখনও দেখা করার সময় আছে। তাড়াতাড়ি অনুমতি নিয়ে সাক্ষরের কাছে চলে গেলাম।সে আমাকে দেখে অনেকসময় যাবত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।তারপর শুরু করে দিল একগাদা ভাষণ। আমি ঠিক বুঝতে পারি না, এই লোক জেলে বসেও আমার প্রতি এতটা এগ্রেসিভ কেন? আমার চেহারার হাল নিয়ে কথা বলছে অথচ নিজের চেহারার কী অবস্থা সে খেয়াল কী আছে তার। বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে বললাম আমি,,

_”আপনার সমস্যা টা কী বলুন তো? এলাম একটা দুটো কথা বলতে আর আপনি কীনা ধমকাধমকি শুরু করে দিলেন।আমার চেহারার হাল না হয় নাজেহাল কিন্তু আপনার চেহারার এ কী দশা। আচ্ছা শুনুন, কিছু না জেনে শুনে বিপদে যখন আমিই আপনাকে ফেলেছি তখন এই বিপদ থেকে আমিই আপনাকে মুক্ত করব।কিন্তু তারজন্য তো আপনার সাহায্যের দরকার। আপনার কাছে ক্রিমিনালকে ধরার জন্য কী কী প্রমাণ আছে এবং কোথায় আছে প্লিজ বলুন। আমি শুধু আপনার গুপ্ত কক্ষ থেকে একটা মেমোরি কার্ড ব্যতিত আর কিছুই পাইনি।”

সাক্ষর–আমার কাছে আপাতত ওই মেমোরি কার্ড টাই আছে। আর কোনো প্রমাণ নেই। তবে এতটুকু বলতে পারি ওই কিলারের নেক্সট টার্গেট এমপি। ওই কিলার অনেকটা আমার পক্ষেই কাজ করছে।সকল দুষ্কৃতিকারীদের সে নিজের হাতে শাস্তি দিচ্ছে। কিন্তু আমার আর তার মধ্যে একটাই তফাত সে যা করছে তা অন্যায়ভাবে আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে করছে আর আমি অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি দিতে চেয়েছি।আমাদের দু’জনের লক্ষ এক হলেও রাস্তা ভিন্ন। এখন শুধু এতটুকুই বলতে পারি তোমরা এমপির বাড়ির দিকে নজরদারি কর তাহলে সেই কিলারের খোঁজ পেলেও পেতে পারো।

আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম তবে এবার পুরোপুরি সিওর হলাম।এবার সবকিছু ঠিকঠাক প্ল্যানমাফিক এগোতে পারলে আমাদের জয় নিশ্চিত।

দু’জনে টুকটাক কথা বলতে বলতে ভিজিটিং আওয়ার শেষ হয়ে গেল। সাক্ষরকে বিদায় জানিয়ে চলে এলাম বাড়ির পথে। সাক্ষর আমাকে নানাভাবে সতর্ক করে দিল এবং সকল কাজে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলল।আমি যে বোকামি করে ফেলেছি তাতে করে এই কীসের একটা সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত সাক্ষর আর জেল থেকে রেহাই পাবে না। তাই সাক্ষরকে বাঁচাতে যে করেই হোক আমাকে এই কেস সল্ভ করতেই হবে।

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here