শাহজাহান তন্ময় পর্ব -১৩

শাহজাহান তন্ময় – ১৩

হোয়াটসঅ্যাপে একটা গ্রুপ-চ্যাট খোলা আছে তন্ময়দের। নাম ‘উই আর রকস’। এখানে সবগুলো বন্ধু অ্যাড। দিনরাত টুকটাক টাইপিং চলতে থাকে। আজও তাই। তন্ময় দুবার গিয়েছে। রিপ্লাই দিয়ে এসেছে। তাও হচ্ছে না ওদের। একের পর এক কল করছে। কলে জয়েন করেছে মাহিন আর রিহান। তন্ময় বাধ্যতামূলক রিসিভ করে। স্পিকারে দিয়ে ফোন টেবিলে রাখে। হাতের ফাইলে মনোযোগ দেয়। মাহিন আর রিহান কিছু একটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছে। একসময় তর্ক থামিয়ে মাহিন উচ্চস্বরে বলে,

‘অ্যাই তন্ময়!’
‘হু।’
‘শুনলাম তোর ভবিষ্যৎ পিচ্চি বউ এসেছে।’
‘…..’
‘কই তোর বাচ্চা প্রেয়সী? আশেপাশে? কান্না করেছে? বেচারি! নিশ্চয়ই কান্নাকাটি করছে। কান্না করতে মানা কর। আমি আছি ওর জন্য। অনেক যত্ন করে বড়ো করব। তোর থেকে ভালো রাখব।’
‘……….’

তন্ময়ের জবাব না পেয়ে মুখ টিপে হাসে মাহিন। রিহান হেসে হেসে বলে,

‘বাচ্চা প্রেয়সী কই আর থাকবে? তন্ময়ের কোলে বসে ফিডার খায়।’
‘এরজন্য ডিরেক্ট কোলে বসে?’

তন্ময় ধীরেসুস্থে স্পিকার সরিয়ে ফেলে। অরু একটু পরপর উঁকিঝুঁকি দিতেই থাকে। এসব শুনে ফেলতে পারে। সে কানে ফোন গুঁজে গলা নামিয়ে বলে,

‘কোলে বসিয়ে ফিডার খাওয়াব নাকি চুমু সেটা তো তোদের বলব না।’

মুহুর্তে হৈচৈ শুরু করে মাহিন। রিহান চিৎকার চেঁচামেচি করছে। কান থেকে ফোন সরাতে হলো তন্ময়ের। এতো শব্দ করে ছেলেগুলো!
_____

অরু অনেকক্ষণ যাবত বিড়বিড় করছিল, বৃষ্টি কেন আসছে না! তন্ময় আড়চোখে তাকিয়ে শুনছে শুধু। ক্ষনে ক্ষনে মেয়েটা জানালার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বাইরেটা দেখছে। বৃষ্টি শুরু হলে তারপরই নাকি, সে খেতে বসবে গরম-গরম খিচুড়ি। এটাই তার বাহানা। বাহানা খানা জবেদা বেগম মেনে নিলেও, তন্ময় মানেনি। ধমক দিয়েছে। সেই ধমকে কাজ হয়নি। উল্টো মুখ গোমড়া করে চুপসে আছে।

কিছুক্ষনের মধ্যেই আকস্মিক একঝাঁক বৃষ্টি নামল। প্রবল বৃষ্টির শব্দ ভেসে আসছে। বাতাসের প্রলয়ের সঙ্গে লেপটেছে সেই বৃষ্টির জল। ছুটে আসছে জানালা দিয়ে। অরু সেদিকে ছুটে গিয়ে দাঁড়াতেই ফোঁটা ফোঁটা জল স্পর্শ করছে তাকে। মুখশ্রীতে এসে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। বাইরে তখন আঁধার। গুমোট আবহাওয়া আঁধারের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলেছে।
রাস্তার হলদেটে বাতির আলো বৃষ্টির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলল কয়েক গুণে! তন্ময় বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। দৃষ্টি এদিক-ওদিক দুলিয়ে সেই অরু-তে গিয়ে ঠেকাল। অরুর ওড়নাটা দুলছে। কেন? এতো সিনেম্যাটিক হওয়ার কারণ কী? আবার.. আবার চুলগুলোও তো হেলেদুলে চলেছে। অবাধ্য চুল।
তন্ময়ের ইচ্ছে করল, অবাধ্য চুলগুলো হাত বাড়িয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিতে। সে হিপনোটিজ হয়েছে যেন, এমন ভঙ্গিতে এক-পা, দু-পা এগিয়ে গেল। অরুর পেছনে দাঁড়ালো। কিন্তু হাত বাড়ানোর সাহস করল না। লম্বাটে সে দৃষ্টি নিচু করে অরুর মুগ্ধ দৃষ্টি দেখতে পারছে। আচমকা পেছনে ফিরে অরু। আঙুল তুলে বাইরেটা দেখিয়ে বলে,

‘তন্ময় ভাই। দেখুন দেখুন। ওইযে! একটা আপু আর একটা ভাইয়া। হাত ধরে হাঁটতে-হাঁটতে গোসল করছে।’

তন্ময়ের ভুরু জোড়া কুঁচকে এলো। সরু চোখে অরুকে দেখে নেয়। ঠোঁটে কিছুক্ষণ ঠোঁট চেপে বলে,

‘বৃষ্টিবিলাস।’
‘অ্যাহ?’
‘তারা বৃষ্টিবিলাস করছে। বৃষ্টি উপভোগ করছে।’
‘বৃষ্টিতে ভিজলে বৃষ্টিবিলাস বলে?’

তন্ময়ের দৃষ্টি বাহিরে। কপোত-কপোতী হাঁটছে ধীরেসুস্থে। দূর থেকে ভীষণ সিনেম্যাটিক লাগছে। কোনো মুভির ক্লিপ যেন! সে সেদিকে তাকিয়েই বলে,

‘উপভোগ করার নেশায় ভিজলে তা বৃষ্টিবিলাস।’

অরু পুনরায় মাথা ঘোরাতে চাইলে, তন্ময় দেয় না। মাথা ধরে আঁটকে রাখে। মেয়েটা পেছনে ফিরতে নিলেই মুখটা তার বুকে এসে ঠেকে। এতো নড়চড় কেন করে! শান্তমূর্তি বনে একটু দাঁড়াবে তা না! অরু সেভাবেই ছটফট মুখে বলতে থাকে,

‘বৃষ্টিবিলাস? তাহলে তো আমারও বৃষ্টিবিলাস করতে ভালো লাগে। আমিতো বৃষ্টি হলেই ভিজি। ওদের দারুণ লাগছে। চলুন তন্ময় ভাই আমরা বৃষ্টি…’

তন্ময় বাকিটা আর শোনার সাহস করে না। ওর মাথা ছেড়ে দেয়। গম্ভীর স্বরে বলে, ‘খেতে আয়।’

এবং তৎক্ষণাৎ হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে যায়। দ্বিতীয় বার ফিরে একটুখানি দেখার সাহস করে না। এই একটুখানি মেয়েটা! কিছুই বুঝে না। অথচ কথাবার্তা এমন বলে যে, তন্ময়ের মস্তিষ্ক জ্বলে ওঠে। রক্ত ঠান্ডা হয়।

হাতমুখ ধুয়ে তন্ময় ডাইনিংয়ে আসে। চেয়ার টেনে বসে। জবেদা বেগম খাবার সার্ভ করছিলেন। প্লেট এগিয়ে দিতে নিয়ে বলেন,

‘রানার দরকার কিছু। ডাইনিংটা রানার ছাড়া ভালো দেখায়?’
‘আমি নিয়ে আসব নাকি সাথে যেতে চাচ্ছ?’
‘অনেক কিছু দরকার। দরজা – জানালার পর্দা, কিছু সুন্দর বিছানার চাদর। বারান্দা দুটো খালি। সেখানটা সাজাতে বেশকিছু সরঞ্জাম ও লাগে।
তুই তো কাল ইন্টারভিউ দিতে যাবি। জব হয়ে গেলেই ব্যস্ত! আমাকে কীভাবে নিবি? সময় আছে?’
‘কীভাবে শিয়র হচ্ছ জব হয়ে যাবে? নাও হতে পারে।’

জবেদা বেগম পাশেই ছিলেন। খিচুড়ি বেড়ে দিচ্ছিলেন। তন্ময়ের প্রশ্ন শুনে, চটপট ছেলের মাথার ওপর অর্থাৎ চুলের মধ্যখানে একটা চুমু দিয়ে বসেন। হেসে – হেসে বলেন,

‘আমার ছেলে সবদিক দিয়েই পারফেক্ট। জব না হয়ে উপায় আছে?’
‘মা। এসব জব পারফেক্টন্যাস দিয়ে হয়না৷ তুমি নিশ্চয়ই জানো!’
‘বললেই হলো? যেকোনো কিছু হাসিল করতে পারফেকশনিস্ট হতে হয়। আর তুই তাই!’

গরম গরম খিচুড়ি থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ঘ্রাণে ম-ম করছে চারিপাশ। তন্ময় লম্বা ঘ্রাণ নিলো। মায়ের হাতের সব রান্না অমৃত। বিশেষ করে গরুর গোস্তো। আলাদাই রসালো। দমবন্ধ অনুভূতি হয় খেলেই। তাদের বাড়ির সবথেকে খাবার প্রিয় মানুষ অরু। খাওয়া – দাওয়া খুব উপভোগ করে। আর দারুণ প্রশংসা করতে জানে। অরুর কথা মস্তিষ্কে আসতেই মাথা তুলে তাকায়। মেয়েটা এখনো জানালার সামনে দাঁড়িয়ে?

জবেদা বেগম আরেকটি প্লেটে অরুর খাবার বাড়ছিলেন। এরমধ্যে চেঁচিয়ে ডাকেন। কোনো জবাব আসেনা। খাবার বেড়ে নিজেই এগিয়ে যেতে নেন। পূর্বেই অরু এক দৌড়ে আসে। হুড়মুড়িয়ে তন্ময়ের সম্মুখীন চেয়ারে এসে বসে। পিটপিট করে বেশ কয়েকবার ইতোমধ্যে তাকিয়েছে তন্ময়ের পানে। তন্ময় দেখেও দেখল না। খেতে ব্যস্ত মনোযোগ সহ। অরু খেতে-খেতে পা দোলায়। দু-বার ওর পা গিয়ে ঠেকল তন্ময়ের লম্বা পায়ে। দুবারই বিড়বিড় করে, ‘স্যরি’ বলেছে সে। অথচ তৃতীয় বারও একই কাণ্ড ঘটাল। এবং পুনরায় বিড়বিড় করে স্যরি জানাল। তন্ময় এবার চোখ তুলে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে অরুর পা নাচানাচি থামে। সে চুপচাপ খেতে থাকে। টুকটাক কথাবার্তা বললেও পা জোড়া আর নাড়াচাড়া করে না।

সকাল নয়টা পঁয়ত্রিশে তন্ময়ের জব ইন্টারভিউ। খুব বড়ো লিমিটেড কোম্পানি। আর সে ইন্টারভিউ দিচ্ছেও খুব ভালো পদে। বিশেষ প্রস্তুতি দরকার। এবং সে নিচ্ছেও মনোযোগ সহ।
শুধু মাঝেমধ্যে অরু চলে আসে মস্তিষ্কে। আশেপাশে আছে বলে একটু বেশিই আসছে।

______

বৃষ্টি থেমেছে গভীর রাতে। ঠান্ডা আবহাওয়া। জানালা খোলা। বাতাস আসছে। এলার্ম-ঘড়ি-টা বেজে ওঠে। ছ’টায় দেওয়া ছিল। তন্ময় বা-হাতে ঘড়িটা বন্ধ করে। বিছানার হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে উঠে বসে। কপাল ধরে মাসাজ করতে থাকে। পরপর সেলফোন বেজে ওঠে। কল করছে মোস্তফা সাহেবের ম্যানেজার। তন্ময় ধরে না। পরপর আবার সেক্রেটারি কল করে। দুজনেই একসাথে কল করছে। তন্ময় জানে কীজন্য করছে। এরজন্যই রিসিভ করেনি। করলেই প্যানপ্যান করবে। অন্য কোম্পানিতে জব করবে সে ব্যাপারটা তার বাবা-চাচারা মেনে নিতে পারছে না। শাহজাহান তন্ময় জব ইন্টারভিউ দিবে ভেবেই হয়তো তার বাবার চারশো চার ডিগ্রি জ্বর গায়ে। উঁচু নাক নিচু হয়ে যাচ্ছে যেন! নিজের বাবাকে সম্পূর্ণভাবে চেনে সে।

উঠে ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরোয়। জবেদা বেগম উঠে পড়েছে। তিনি খুব ভোরে ওঠেন। আজও তাই। তন্ময়কে দেখেই অশান্ত হলেন,

‘এতো রাত করে জেগেছিলি। আবার এতো তাড়াতাড়ি উঠে পড়লি। শরীর খারাপ করবে না?’
‘আমি ঠিকাছি মা।’
‘আব্বা! কি খাবি ব্রেকফাস্টে? পরোটা করব?’

তন্ময় পরোটা খায় না। ব্রেড খায়। জেল দিয়ে। ফ্রিজে আছেও। কিন্তু পরোটা খায় অরু। পরোটা দিয়ে আলুভাজি পছন্দ ওর! তন্ময় বলে,

‘আচ্ছা। অরু উঠেছে?’

জবেদা বেগম হাসতে লাগলেন,

‘না। উঠেনি। তবে সকাল সকাল তুলে দিতে বলেছে।’
‘উঠিও না। ঘুমাক।’

জবেদা বেগম রান্নাঘরে গিয়েছেন। তন্ময় ওয়ার্ক-আউট করে। তারপর গোসল নেয়। সাধারণত নিজেদের ছাঁদেই ওয়ার্ক-আউট করত! খোলামেলা হাওয়ায়। আসমানের নিচে। তবে এখনের বিষয়টা আলাদা। আর এখানের বারান্দা ছোটো। তাই ভাবল ছাঁদে যাবে। ছাঁদটাও দেখা হবে। এই বাড়ির ছাঁদ দেখা হয়নি এখন পর্যন্ত৷ গতকাল রাতে তীব্র বর্ষণ হয়েছে। আবহাওয়া সুন্দর। তন্ময় দরজা খুলতেই অরুর গলার স্বর শুনতে পায়। উঠে গিয়েছে মহারানী। আনমনে হেসে সে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায়। তবে তাড়াতাড়ি বেরিয়েও লাভ হয়না। অরু তাকে দেখে ফেলে। চেঁচিয়ে বলে,

‘তন্ময় ভাই! দাঁড়ান, দাঁড়ান। আমিও যাব। আমিও যাব।’

তন্ময়ের পিছু পিছু অরু ছুটছে। কোনোরকম মুখ ধুয়ে এসছে। ঘুম-ভাঙা চোখ। চুলগুলো এলোমেলো। কয়েকবার সিঁড়ি ভেঙে উঠতে গিয়ে পড়তে নেয়। রেলিঙ ধরে নিজেকে ধাতস্থ করে। তন্ময় পদচারণ স্লো করে। অরুকে আগে যেতে দেয়। সে পিছু পিছু ওঠে। তবুও ফিরে যেতে বলে না। আগেকার মতো তো আর এই ঘুমন্ত মুখ সচরাচর দেখতে পাবে না। এইযে অরু চুলগুলো দু-হাতে বাঁধার চেষ্টা করছে। দৃশ্যটি কতটা প্রিটি তা কি অরু জানে? কতটা আবেদনময়ী দেখায় বুঝে? কখনো কী জানতে পারবে, তন্ময়ের হৃদয়ে হিমশীতল বাতাস বয়ে যায়!

চলবে ~

ভীষণ ভাবে দুঃখিত। গভীর রাতে দিব বলে ভোর করিয়ে ফেলেছি। কিছুদিন লিখিনি ত। হাত চলছিল না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here