সায়াহ্নের প্রণয় পর্ব -০৬

#সায়াহ্নের_প্রণয় 🦋🦋
#লেখনীতে: ইনায়াত আহসান (ছদ্মনাম)
#ষষ্ঠ_পর্ব

১৬.
বহুদিন পর চেনা পরিচিত ভার্সিটি প্রাঙ্গণে ফিরতেই ক্যাম্পাসের সামনে ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাইকে দেখতে পায় প্রাচী। সবাই গোল হয়ে বসে কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। মুখে এক টুকরো প্রাণোচ্ছ্বল হাসি ঝুলিয়ে সেদিকেই পা বাড়ায় প্রাচী। কথাবার্তার একপর্যায়ে প্রাচীর দিকে চোখ পড়তেই কথা বন্ধ করে খুশিতে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় হৃদিতা।
– “আয়াত, মেরি জান! ইউ আর ব্যাক!”
অবাক হয়ে বলে উঠে হৃদিতা। প্রাচীও মুচকি হেসে এগিয়ে এসে হৃদিতাকে জড়িয়ে ধরে।

– “ইয়েস ডিয়ার হৃদু, আয়াত ইজ ব্যাক। তোকে প্রচুর মিস করেছি রে।”
দুজনের কথাবার্তার মাঝেই মিনিট পাঁচেক কেটে যায়। বাকি সবার সাথে প্রাচীও বসে পড়ে আলোচনার জন্য। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর প্রাচীর বুঝতে আর সমস্যা হয়না যে আলোচনাটা মূলত সামনে থাকা নবীন বরণ উৎসব আর ভার্সিটির উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের নতুন লেকচারারকে‌ ঘিরে।

– “কি ব্যাপার আয়াত, কোথায় হারিয়ে গেলি? আয় এবার ওঠ! কিছুক্ষণ পরেই ক্লাস শুরু হবে আর নতুন লেকচারারের প্রথম ক্লাসটা আমাদেরই।
হৃদিতা তাড়া দিতেই প্রাচী উঠে দাঁড়ায়। পা বাড়ায় উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের দিকে।

– “So, my dear students I hope you are all well. Today I am here to introduce our new lecturer Mr. Raiyan. From now he is your new lecturer. Mr. Raiyan I think you should start your classes. Excuse me guys.”
ভার্সিটির ভিপি ওরফে ইব্রাহিম স্যারের কথায় ক্লাসে উপস্থিত সবাই সহ রাইয়্যান ও সহমত প্রকাশ করতেই তিনি ক্লাস প্রস্থান করেন।

রাইয়্যান‌, পুরো নাম রাইয়্যান‌ আহমেদ। দেখতে সুদর্শন এবং সুউচ্চ দেহের অধিকারী পুরুষ। মুখে যথেষ্ট গম্ভীর ভাব। লেকচরার রূপে থাকায় সবার দৃষ্টি আপাতত তার দিকেই।

– “দেখ আয়াত, এই নিউ লেকচারার মিস্টার রাইয়্যান‌ দেখতে কত ড্যাশিং আর হ্যান্ডসাম! গুড লুকিং ও বটে। ইশ্ প্রথম দেখাইয়ই ক্রাশ খেয়ে বসেছি।”
রাইয়্যানের‌ দিকে একমনে তাকিয়ে বলে উঠে হৃদিতা। আর হৃদিতার বলা কথায় একবার বিরক্তি মাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবারো বইয়ের পাতায় মনোযোগ দেয় প্রাচী। সে খুব ভালো করেই হৃদিতার স্বভাব সম্পর্কে জানে আর এটাও যে তার মনের সীমিত সময়ের ভ্রান্তি তা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে।

রাইয়্যান ও নিয়মানুযায়ী প্রত্যেক স্টুডেন্টদের কাছ থেকে পরিচয় পর্ব জেনে নিচ্ছে। এদিকে প্রাচীর দৃষ্টি বইয়ের‌ পাতায় থাকলেও মস্তিষ্ক জুড়ে রয়েছে অন্য কিছুর বিচরণ।
গভীর নীল চোখের কড়া দৃষ্টি, সেই অ্যাটিটিউড, কথা বলার ভাবমূর্তি সবকিছুই আপাতত মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে প্রাচীর। আর সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি আর কেউ নয় বরং সমুদ্র নিজেই। প্রাচী তার ভাবনার জগতে এতটাই ডুবে ছিল কখন যে রাইয়্যান‌ তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তা টেরই পাইনি সে।

– “হেই ইউ মিস প্রাচী!”
পুরো ক্লাসে নিজের নাম কারো পুরুষালি কন্ঠে উচ্চারিত হতেই ভাবনার জগত ছেড়ে বেরিয়ে আসে প্রাচী। সাথে খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা ও খেয়ে যায় কি সব ভাবছিল এতক্ষণ ধরে তা নিয়ে।
মাথা নিচু করে ধীরে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় সে।
– “আ’ম সরি স্যার!”
নিচু কন্ঠে বলে উঠে প্রাচী। প্রাচীর দিকে একদৃষ্টে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে প্রাচীকে উপেক্ষা করে পেছনের সারির দিকে পা বাড়ায় রাইয়্যান‌। এতে করে প্রাচী সহ পাশে বসে থাকা হৃদিতাও ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

১৭.
অফিসের চার দেয়ালে ঘেরা নির্দিষ্ট কেবিনে চেয়ারের উপর বসে রয়েছে সমুদ্র। দৃষ্টি তার সামনে থাকা কাঁচের দেয়ালের দিকে; যা ভেদ করে ব্যস্ত ঢাকা নগরীর সড়কের দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে। কপালে সূক্ষ্ম চিন্তার রেখা।
– “মে আই কাম ইন, স্যার?”
কেবিনের অপর পাশ থেকে ফাহাদ সাহেবের কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে হালকা নড়েচড়ে উঠে সমুদ্র।
– “আঙ্কেল আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভেতরে আসুন। আর কেবিনে আসার জন্য আপনাকে পারমিশন‌ চাইতে হবে না। এটা তো আপনাদেরই অফিস!”
সৌজন্যমূলক হেসে বলে উঠে সমুদ্র। ফাহাদ সাহেবও মুচকি হেসে ভেতরে প্রবেশ করে।
– “এইযে বাবা ফাইল গুলো রিচেক করে নিয়ে এসেছি। এখানে সময় করে ফাইল গুলো সাইন করে নিও।”
– “ঠিক আছে আঙ্কেল।”
ফাহাদ সাহেব চলে যেতেই সমুদ্র কিছু একটা চিন্তা করে ফাইল গুলোর দিকে হাত বাড়াবে এমন সময় ফোনের ভাইব্রেশন বেজে ওঠে। ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই খেয়াল করে ফোনের স্ক্রিনে পিহু নামটা জ্বলজ্বল করছে। রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে একটা মেয়েলি মিষ্টি কন্ঠ ভেসে আসতেই ঠোঁটের কোণে আলতো হাসি ফুটে উঠে সমুদ্রের।

আজকে একটা অফ পিরিয়ড থাকায় বেশ তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরে আসে প্রাচী। বাসার সামনে এসে কলিং বেলে চাপ দিতেই মিনিট দুয়েক পর দরজা খুলে দেয় জেবা বেগম। ক্লান্ত শরীর নিয়ে গিয়ে সোফার উপর বসতেই পুনরায় কলিং বেলের আওয়াজ কানে আসে জেবা বেগমের।
– “কি ব্যাপার, এই ভর দুপুরে কে এলো? এই প্রাচী দেখ তো কে এসেছে!”
মায়ের কথায় অগত্যা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয় প্রাচী। কিন্তু দরজার অপর পাশে থাকা ব্যক্তিটিকে দেখে পরমুহূর্তেই ভ্রু কুঁচকে নেয় সে।
– “এ বাড়িতে মেহরিশ আয়াত প্রাচী নামে কেউ আছে?”
মাথায় টুপি, সাইডে ব্যাগ ঝোলানো ব্যক্তিটিকে ভালো করে একবার পরিদর্শন করে সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বলে উঠে,
– “জি আমিই প্রাচী। কিন্তু আপনি? আপনি কে?”
– “আপনার নামে একটা কুরিয়ার পার্সেল এসেছিল ম্যাম। প্লিজ এখানে সাইন করে দিন।”
বলেই প্রাচীর দিকে একটা কাগজের শিট এগিয়ে দেয় লোকটি। একরাশ কৌতূহল নিয়ে সাইন করতেই লোকটি মাঝারি আকারের একটি বাক্স এগিয়ে দেয় প্রাচীর দিকে।

– “কে এসেছিল প্রাচী? আর তোর হাতে ওটা কি?”
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বলে উঠেন জেবা বেগম। মায়ের কথার প্রত্যুত্তরে কি বলবে খুঁজে পায়না প্রাচী।
– “তেমন কিছু না মা। কিছুদিন আগে অনলাইনে একটা জিনিস অর্ডার করেছিলাম সেটাই হয়তো।”
কথা কাটানোর জন্যে বলে উঠে প্রাচী।
– “আমি তাহলে ফ্রেশ হয়ে আসি।”
বলেই দ্রুত পায়ে টেবিল থেকে ব্যাগ আর বক্স তুলে উপরের দিকে ছুটে চলে প্রাচী।

১৯.
“ঐ চোখজোড়ায় কি এমন নেশা মিশিয়েছ মেহু পাখি? কি নেশা মেশাও যে অন্যসব নেশার উপর থেকে আসক্তিই ছুটে গিয়েছে আমার?
কি ভেবেছিলে এত সহজেই খুঁজে পাবে আমায়? চিনে ফেলবে এই আমি নামক অদৃশ্য মানুষকে? উহু, তা তো হচ্ছে না। ঐ যে বলেছিলাম আমার ইচ্ছে ছাড়া তুমি আমার ছায়ার নাগাল ও পাবে না।
আর আমাকে নিয়ে এত গবেষণা করে কোনো লাভ নেই। শুধু শুধু ঐ ছোট্ট মাথায় অযথা প্রেশার পড়বে। তাই আমাকে খুঁজে বের করার ব্যর্থ চেষ্টা না করে আগামীর জন্য প্রস্তুত হও। আমাকে দুচোখ ভরে দেখার বিতৃষ্ণা খুব শীঘ্রই সমাপ্তি ঘটবে। আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে তোমার এই অজানা আগন্তুক!

ইতি-
অজানা আগন্তুক।”

বক্স খুলতেই ভেতরে থাকা চিরকুট চোখে পড়ে প্রাচীর। হাতে তুলে নিতেই লেখাগুলো তোর চোখে পড়ে। প্রতিদিনকার মত এসব চিরকুট, গিফট পাঠানোর মত কাজে রীতিমতো বিরক্তি এসে পড়েছে তার‌। তার বাকিটুকু না দেখে রাগে ক্ষোভে বক্সটা পাশে ছুঁড়ে মারতেই তা থেকে ছোট একটা পেনড্রাইভ বের হয়ে আসে।
ভ্রু কুঁচকে পেন ড্রাইভ টা হাতে তুলে নেয় প্রাচী।
– “পেনড্রাইভ? কিন্তু এটা কিসের?”
কৌতুহল বশত টেবিল থেকে ল্যাপটপ টা নিয়ে তড়িঘড়ি করে বিছানায় বসে পড়ে প্রাচী। পেনড্রাইভ টি ল্যাপটপের নির্দিষ্ট স্থানে কানেক্ট করতেই একটা ফাইল চলে আসে।
কাঁপা কাঁপা হাতে ফাইল ওপেন করতেই চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে আসে প্রাচীর।

অন্ধকার রুমের মাঝে মৃদু আলোতে চেয়ারে কাউকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় দেখতে পায় প্রাচী। মুখেও কাপড় বাঁধা। মাথার কোণ থেকে রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। অবয়বটা অস্পষ্ট থাকায় প্রাচীর কৌতুহল যেন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। মিনিট পাঁচেক পর একজন মাস্ক পরিহিত লোক এগিয়ে গিয়ে পানির ছিটা দিতেই চেয়ারে থাকা লোকটা মাথা উঁচু করে তাকায়। এতেই যেন প্রাচীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মাস্ক পরিহিত লোকটি তার কোর্টের ভেতর থেকে পিস্তল বের করতেই আতকে উঠে প্রাচী‌। কিছু বলতে যাবে তার পূর্বেই মাস্ক পরিহিত লোকটি হাত প্রসারিত করে গুলি চালাতেই ভিডিও ক্লিপ বন্ধ হয়ে যায়। আকস্মিক ঘটনায় প্রাচী সজোরে চিৎকার দিয়ে বসে,,
– “আ,আক্,আকাশশশশশ!”…………

#চলবে 🍂

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here