হারিয়েছি নামপরিচয় পর্ব -২১

#হারিয়েছি_নামপরিচয়
#পর্বঃ২১
#লেখিকাঃদিশা_মনি

সন্ত্রা’সীরা রিফাতকে এগোতে মানা করে কিন্তু রিফাত কোন কথা না শুনে এগিয়ে যায়। একজন হঠাৎ রিফাতকে গু’লি করে দেয়। মুহুর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রিফাত। মেঘলা রিফাত বলে চিৎকার দেয়। রিফাত নিভুনিভু চোখে একবার মেঘলার দিকে তাকায়। মেঘলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। নিঃশ্বাস নিতেও খুব কষ্ট হচ্ছিল রিফাতের।

এমন সময় পুলিশের আগমন ঘটে। কিছু মানুষ খবর দিতেই পুলিশ ফোর্স চলে আসে। অনেকক্ষণ গো’লাগুলি চলে। পুলিশের থেকে বাচার জন্য জিম্মি করা লোকদের টা’র্গেট করে স’ন্ত্রাসীরা। যার কারণে পুলিশদের বেশ বেগ পেতে হয়। কয়েকজনকে জিম্মি থাকা অবস্থাতেই মে’রে ফেলে। একজন তো মেঘলাকেও গু’লি করতে যাবে তার আগেই পুলিশ লোকটার হাতে গু’লি করে। মেঘলাকে ছুটে আসার চেষ্টা করে। এমন সময় একজন স’ন্ত্রাসী পেছন থেকে মেঘলাকে গু’লি করে। গু’লি এসে মেঘলার পিঠে লাগে। মেঘলাও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। রিফাতের থেকে একটু সামনেই লুটিয়ে পড়ে মেঘলা। রিফাতের দিকে তাকিয়ে নিরবে অশ্রু বিসর্জন করে।

‘আমাদের কি তাহলে এই পরিণতি হওয়ার ছিল। ভুল বোঝাবুঝির মধ্যেই সবকিছু শে’ষ হয়ে যাবে। আমার আফসোস থেকে যাবে আপনাকে এত কষ্ট দেওয়ার জন্য। যদি এটা আমার শে’ষ কথা হয় তাহলে আমি শে’ষবারের মতো বলতে চাই, খুব ভালোবাসি আপনাকে রিফাত। যদি আবার সুযোগ পাই আবার ভালোবেসে আপনাকে কাছে টেনে নিব।’

আর কিছু বলতে পারে না মেঘলা৷ আচমকা গড়িয়ে পড়তে থাকে। গড়িয়ে পড়তে পড়তে একটি পাথরে গিয়ে মেঘলার মাথায় আঘাত লাগে। পুলিশ কিছু সন্ত্রা’সীদের গ্রেফতার করে আবার কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপর শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। পুলিশ সকল আহত মানুষদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। রিফাত, মেঘলাও ছিল তাদের মধ্যে।

আরিয়ান, আখি ও মুন্নি পুলিশদের সাথে বলে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। আখি বলে,
‘আমার বান্ধবী মেঘলাকে ওরা জিম্মি করে রেখেছিল। আমি এখনো ওর খোজ পাইনি।’

মুন্নিও বলে,
‘আমার ভাইয়া এদিকে এসেছিল। ওকেও খুজে পাচ্ছি না।’

এছাড়াও আরো অনেক মানুষ তাদের আত্মীয়-স্বজনের খোজ করছে। একজন পুলিশ সদস্য তাদের উদ্দ্যেশ্যে বলে,
‘আপনারা সবাই শান্ত হন। এখানে কিছু পা’হাড়ি সন্ত্রা’সীগোষ্ঠী হামলা করেছিল। আমরা অনেক কষ্টে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি। অনেক মানুষকেই ওরা জিম্মি করেছিল। যাদের মধ্যে কাউকে তো গু’লি করে মে’রে ফেলেছে কেউ বা আহত হয়েছে। কয়েকজন মানুষকে আমরা অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছি। তারা ইতিমধ্যেই তাদের আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ করেছে। আপনারা যারা আছেন তারা আর দেরি না করে চট্টগ্রাম মেডিকেলে চলে যান। সকল আহত এবং নি’হত ব্যক্তিদের সেখানেই পাবেন। ‘

পুলিশ অফিসারের কথা শুনে মুহুর্তেই সেখানকার পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যায়। সবাই নিজের আপনজনের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে যায়৷ কেউবা আহাজারি শুরু করে দেয়।

৪১.
মুন্নি, আখি ও আরিয়ান চট্টগ্রাম মেডিকেলে এসেছে। এখানে অনেক খুজে রিফাত ও মেঘলার সন্ধান পেয়েছে। দুজনেই গু’লিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। রিফাতের গু’লি বের করা হয়েছে। তার অবস্থা স্থিতিশীল। কিন্তু মেঘলার অবস্থা বেশি ভালো না। তার শরীর থেকে গু’লি বের করা গেলেও তার মাথায় আঘাতের কারণে সমস্যা হতে পারে বলে ডাক্তার জানিয়েছে। আখি কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। আরিয়ান আখিকে সামলানোর চেষ্টা করছে। তার নিজেরও খারাপ লাগছে মেঘলার এই অবস্থার জন্য।

মুন্নি ইতিমধ্যে বাড়িতে যোগাযোগ করে সবাইকে রিফাতের ব্যাপারে জানিয়েছে। রিফাতের মা রোজিয়া, রিফাতের বাবা আমিনুল হক সবাই রওনা দিয়েছে ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের উদ্দ্যেশ্যে। মুন্নির নিজের কাছে নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে,
‘আজ যদি আমি রিফাত ভাইয়াকে এখানে নিয়ে না আসতাম তাহলে এমন কিছুই হতো না। আমার জন্য হয়েছে।’

আখিও ভাবে মেঘলার ব্যাপারে তার পরিবারকে জানানো উচিৎ। আরিয়ানকে এই বিষয়ে বললে আরিয়ান বলে,
‘তুই কি মেঘলার পরিবারের ব্যাপারে কিছু জানিস? কারো নাম্বার আছে তোর কাছে?’

আখি বলে,
‘মেঘলার আগের ফোনে ওর বোন রোদেলার নাম্বার ছিল। কিন্তু সেই ফোন তো চুরি হয়ে গেছে। আমি ঐ মেয়েটার সাথে কথা বলে দেখি। ও তো মেঘলার পরিচিত। ওর কাছে থাকলেও থাকতে পারে।’

আখি মুন্নির কাছে যায়।
‘এক্সকিউজ মি, তোমার কাছে মেঘলার পরিবারের কারো ফোন নাম্বার আছে? মেঘলার এই পরিস্থিতির কথা তাদের জানানো দরকার।’

মুন্নি চোখের জল মুছে। আখির দিকে একপলক তাকিয়ে বলে,
‘মুবিন ভাইয়াকে বলতে হবে। মুবিন ভাইয়া রোদেলা ভাবি মানে মেঘলা ভাবির বোনের স্বামী।’

মুন্নি মুবিনকে ফোন করে সব জানায়। সব শুনে মুবিন রোদেলাকে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হয়। মুবিন রোদেলার কাছে ব্যাপারটা গোপন রাখার চেষ্টা করে যে কেন তারা চট্টগ্রাম যাচ্ছে। কিন্তু রোদেলার জোরাজুরিতে মেঘলার ব্যাপারে বলে দেয়। রোদেলা সারা রাস্তা কাদতে কাদতে চট্টগ্রাম মেডিকেলে এসে পৌছায়। এসে এদিক ওদিক মেঘলাকে খুজতে থাকে। মুন্নির সাথে দেখা হলে মুন্নি রোদেলাকে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেয়। সব শুনে রোদেলা নির্বাক হয়ে যায়। নিজের বোনের জন্য তার চিন্তা হতে থাকে।

৪২.
কয়েকদিন কে’টে গেছে। রিফাত এখন অনেকটাই সুস্থ। এই ক’দিন চট্টগ্রাম মেডিকেলেই ছিল সে। যদিও তার বাবা-মা চেয়েছিল তাকায় ঢাকা মেডিকেলে শিফট করতে কিন্তু সুস্থ হয়ে যাওয়ার আর তার প্রয়োজন হয়নি। এই কয়দিন চট্টগ্রাম মেডিকেলেই ছিল রিফাত। আজ রিফাতের রিলিজ ডেট।

রিফাত নিজেকে নিয়ে চিন্তিত নয়। তার চিন্তা মেঘলাকে নিয়ে। এখনো মেঘলার জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তার বলেছে তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। তাই রিফাত সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেঘলাকে ঢাকায় নিয়ে যাবে। সেখানে চিকিৎসা না হলে প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাবে।

রিলিজ পেতেই মেঘলাকে ঢাকায় স্থানান্তরিত করার উদ্যোগ নেয় রিফাত। আরিয়ান আজ আখিকে নিয়ে শেষবারের মতো মেঘলাকে দেখে যেতে এসেছে। মেঘলাকে দেখা হয়ে গেলে আরিয়ান রিফাতকে বলে,
‘আপনার ভালোবাসা দেখে আমি সত্যি মুগ্ধ হয়ে গেছি। কেউ কাউকে এত ভালোবাসতে পারে সেটা আমার জানা ছিল না। একটা সত্য কথা বলব আমারও মেঘলাকে ভালো লাগত। ভালোবাসা ছিল না শুধু ভালো লাগা ছিল। আপনিই মেঘলাকে সত্যি ভালোবাসেন তাই তো কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে ওকে বাচাতে ছুটে গিয়েছিলেন। মেঘলা সত্যি খুব লাকি। আমি আল্লাহর কাছে শুধু এটুকুই চাইব তিনি যেন মেঘলাকে আবার আপনার কাছে ফিরিয়ে দেয়। মেঘলা যেন আবার সুস্থ হয়ে আপনার কাছে ফিরে যায়। আপনাদের মধ্যকার সব ভুল বোঝাবুঝি যেন মিটে যায়।’

আরিয়ান সেখানে আর না দাড়িয়ে চলে যায়।


মেঘলাকে ঢাকার একটি বেসরকারি এনে ভর্তি করিয়েছে রিফাত। এখানকার ডাক্তাররা বিভিন্ন পরীক্ষা নিরিক্ষা করে জেনেছে মেঘলার মাথায় ভারী কিছুতে আঘাত লাগায় সে কোমায় চলে গেছে। চিকিৎসা চললে হয়তো একসময় সে সুস্থ হয়ে উঠবে। তবে কবে উঠবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। এমন হতে পারে এক সপ্তাহ, এক মাস লাগতে পারে। আবার কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।

রিফাত অপেক্ষায় থাকে খুব শীঘ্রই হয়তোবা মেঘলা সুস্থ হয়ে উঠবে। এখন সবার প্রতীক্ষা একটাই মেঘলা হয়তোবা খুব শীঘ্রই রিফাতের কাছে ফিরে আসবে। সব সমস্যা কা’টিয়ে আবার মেঘলা-রিফাত কি এক হতে পারবে?

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here