হৃদপিন্ড ২ পর্ব ৯+১০

#হৃদপিন্ড_২
#জান্নাতুল_নাঈমা
#পার্ট_৯

বেশ অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পরও মুসকান থামলো না। ইমনের এবার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। কোনোরকমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো সে। মিলি নিঃশব্দে কেটে পড়লো বাড়ি থেকে। সে বেশ বুঝতে পারছে মুসকানের আগের স্বভাব বদলায়নি। মেয়েটা এখনো এতো বেশী বেশী করে কেনো বুঝে পায় না সে। চোখে,মুখে বিরক্তি ফুটিয়েই চলে গেলো সে।
.
নিলুফা বেগম পুরো রুম গোছাচ্ছে। ইমনের দিকে কেমন চোখেও যেনো তাকাচ্ছে বারবার। হুটহাট বাড়িতে ইমনের আসা,যাওয়াটা ভালো চোখে দেখেনা সে। বাড়িতে দুটা মেয়ে রয়েছে। বিশেষ করে তাঁর যুবতী মেয়ে ঘরে। মুসকানেরও বাড়ন্ত বয়স।
দিহান আসে সে নয় কাজের খাতিরে আসে। তাছাড়া দিহান বিবাহিত তাঁকে নিয়ে তাঁর সমস্যা নেই। কিন্তু ইমনকে নিয়ে সে বেশ বিরক্তই হচ্ছে। মুরাদের মা আসলে এ বিষয়ে কথা বলবে এও ভাবলো। ভাঙা কাচের টুকরো গুলো পরিষ্কার করে নিয়ে ময়লা ফেলতে বাইরে চলে গেলেন নিলুফা বেগম। যাওয়ার আগে রিমিকে বলে গেলেন ‘ওকে নিয়ে আমাদের ঘরে আয়’।

মায়ের কথা মেনে রিমি মুসকানকে ওঠানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু মুসকান ওঠছে না৷ তাঁর মধ্যে কি পরিমাণ জেদ যে চেপেছে কেউ না দেখলে বিশ্বাসই করবেনা যে এই মেয়ে কতোটা জেদখোর। ইমনও সিদ্ধান্ত নিলো আজ এর শেষ দেখে ছাড়বে। আসল সমস্যা টা ঠিক কোথায় সেটাই বের করবে আজ সে। রাগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে বারবার । আর যাইহোক মুসকানের কান্না টা কেনো জানি সহ্যই করতে পারেনা সে। অথচ এই মেয়ে তাঁর সামনেই শুধু কাঁদবে।
—- রিমি একটু বাইরে যা। আমি ওর সাথে কিছু কথা বলতে চাই। দরজার পাশেই দাঁড়া। কাকি এদিকটায় বোধ হয় আসবে না আর যদি আসে তুই দ্রুত ঢুকে পড়বি রুমে।

ইমনের কথা শুনে রিমি বিস্ময় চোখে তাকালো। ইমন ইশারা করলো বাইরে যেতে। রিমি মুসকানের দিকে একবার চেয়ে ভাবলো ‘তাঁর মানে কি দুজনই সামথিং সামথিং’
—- কি হলো?
—- হ্যাঁ হ্যাঁ যাচ্ছি।
রিমি চলে যাওয়ার সাথে সাথে মুসকান ও দাঁড়িয়ে পড়লো। রুম ত্যাগ করতে নিতেই ইমন খুব শক্ত করে তাঁর হাত চেপে ধরলো। তবুও মুসকান তাঁর দিকে ফিরে তাকালো না৷ ইমন চোখে মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে কঠিন গলায় বললো,
—- একদম জেদ খাটাবিনা মুসু। কি হয়েছে বল এমন কেনো করছিস? আমাকে কেনো এড়িয়ে চলছিস? আমাকে কেনো একটা বার কথা বলার সুযোগ দিচ্ছিস না?
মুসকান হাত মোচড়াতে শুরু করলো। যা দেখে ইমন রাগান্বিত গলায় বললো,
—- দেখ এক মোচড়ে এই হাত আমি দুখন্ড করে দিতে পারবো৷ একদম গায়ের জোর দেখাবিনা৷ এতো ত্যাজ কিসের তোর? এই বয়সে এতো ত্যাজ কে শেখালো তোকে? বেয়াদবি করবি না বলে দিলাম। কথার উত্তর দে?
ইমনের ধমকে কেঁপে ওঠলো মুসকান৷ তবুও হাত মোচড়ানো থামালো না।
—- তোর মতো ঘাড়ত্যাড়া মেয়ের জন্য আমার মতো ইমন এক পিসই যথেষ্ট বলেই একটানে নিজের সামনে নিয়ে এলো।
—- ছাড়ো আমাকে আমি দাদাভাই কে ডাকবো কিন্তু। আমাকে ধরেছো কেনো? যাও তোমার মিলির কাছে যাও মিলির আদর নাও গিয়ে যাও।
তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো ইমন একহাতে হাত শক্ত করে চেপে ধরে আরেকহাতে ঘাড়ে চেপে ধরলো। কান্নামিশ্রিত চোখে তাকালো মুসকান। ইমন তীক্ষ্ণভাবে চেয়েই প্রশ্ন করলো,
—- তোর কি সমস্যা হয়?
মুসকান উত্তর না দিয়ে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো৷ ইমন আরো শক্ত করে ঘাড়ে চেপে বেশ অনেকটা ঝুঁকে রইলো তাঁর দিকে। দুজনের মাঝে এক ইঞ্চি দূরত্বও নেই৷ দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ পুরো রুমে অন্যরকম এক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। যে শব্দ দুজনের বুকের ভিতরই তোলপাড় করে চলেছে।
হাতে ব্যাথায় আবারো কেঁদে ফেললো মুসকান। ইমন ধমকে বললো,
—- আবার কাঁদছিস তুই তোকে মেরে বস্তায় বেঁধে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে আসবো এবার দাঁড়া। অনেক জ্বালিয়েছিস আর না৷ দেখি ওড়না দে এটা দিয়েই বাঁধবো৷
হাত ছেড়ে ওড়না নিতে যেতেই মুসকান চমকে সড়ে যেতে নেয়৷ ইমন ঘাড় থেকে হাত সড়িয়ে একহাতে দুহাত ধরে রাখে। আরেকহাতে ওড়না খুলে নেয়৷ লজ্জায় কুঁকড়ে যায় মুসকান। কান্না থেমে বুকের ভিতর কেমন অস্থিরতা শুরু হয়ে গেলো তাঁর। ইমন ওড়না দিয়ে হাত বাঁধায় ব্যাস্ত৷ হাত বেঁধে বিছানায় বসিয়ে দিলো। যখন মুসকানের দিকে তাকালো তখন বুকের ভিতর ধক করে ওঠলো তাঁর। মুসকানের চোখে, মুখে অস্বাভাবিক লজ্জার চিন্হ। নিজেকে লুকানোর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করছে সে। যতো যাই হোক মেয়েটা তো আর সেই ছোটটি নেই৷ চৌদ্দ বছরের কিশোরী সে। এ বয়সে তাদের লজ্জার পরিমাণ অনেকটাই বেশী থাকে। এভাবে ওড়না বিহীন ভাইয়ের বন্ধুর সামনে বসে থাকার মতো বেহায়া সে নয়।

থতমত খেয়ে গেলো ইমন৷ ইশ কি বিশ্রি পরিস্থিতিই না তৈরী করলো সে। মাথা নিচু করে হাত খুলে ওড়নাটা অন্যদিক চেয়ে গায়ে পড়িয়ে দিলো।মুসকান মাথা নিচু করে ওঠে যেতে নিবে তখনি ইমন আবারো তাঁর হাত চেপে ধরে। শীতল দৃষ্টিতে তাকায় তাঁর মুখপানে। নরম কন্ঠে বলে,
—- এতো কেনো কাঁদিস? এমন ভাঙচুর কেনো করলি সত্যিটা বল?
—- আমাকে তুমি ছাড়ো এভাবে কেনো ধরো ব্যাথা লাগে আমার।
হাত নরম করে দিলো ইমন। মৃদু হেসে বললো,
—- আচ্ছা হালকা করে ধরেছি এবার বল কেনো আমার সাথে কথা বলছিস না? আর কেনো এমন করলি? এখনো এতো জেলাস কেনো হোস? এখন তো ছোট না তুই আমাকে নিয়ে তোর মনে কি আছে বল প্লিজ?
—- দেখো নানাভাই তুমি শুধু আমার নানাভাই আর কারো না৷ ঐ মিলি আপু তোমাকে কেনো আদর করলো? ঐ মিলির জন্য তুমি আমায় সেদিন বকেছিলে। ওর জন্য কেনো আমাকে বকবে? কেনো তুমি ওর হাত ধরবে? আমি এসব সহ্য করতে পারিনা।
তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে দাঁত কিড়মিড় করে ইমন বললো,
—- তোর এই নানাভাই ডাক টা বদলা মুসু মাথা গরম হয়ে যায়৷
ইমন কথাটা বলে কি মহাপাপ করলো কে জানে? মুসকান আবারো হাত মোচড়াতে শুরু করলো। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলতে থাকলো,
—- ওওও এখন নানাভাইও বলতে দেবেনা? ঐ মিলিকে দেখে আবারো আমাকে তুমি অবহেলা করছো। বিবাহিত মহিলা এক বাচ্চার মা তাঁর প্রতি এখনো এতো টান তোমার?
বড় বড় করে তাকালো ইমন এই মেয়ে তাঁর মান ইজ্জত একদম ধূলোয় মিশিয়ে দিলো ছিঃ। এগুলা কোন কথা? সারাজীবন সিঙ্গেল থেকে এখন তাঁকে এসব শুনতে হচ্ছে? শেষমেশ এক বাচ্চাওয়ালার সাথে তাঁকে জরিয়ে কথা বলছে? তাঁর পিছনে যেসব মেয়েরা ঘুরে বেড়ায় তাঁরা এসব শুনলে নিশ্চিত গলায় দরি দিতো।
—- ছাড়ো আমাকে আমি তোমার সামনেই আসবোনা থাকো তুমি তোমার মিলিকে নিয়ে।
—- চুপপপ৷ আর একটা কথা বললে থাপড়িয়ে কান গরম করে ফেলবো। বলেই মুসকানকে পাশে বসিয়ে দিলো। হাতটা তখনো ইমনের হাতের মুঠোয়।
—- দাদাভাই দেখো নানাভাই আমাকে বকছে। চেঁচিয়ে বললো মুসকান।
ইমন চোখ গরম করে হাত ছেড়ে মুখ চেপে ধরলো।
—- দেখ বাড়াবাড়ি করিস না। তুই জাষ্ট শান্ত হয়ে আমাকে বল তুই কি চাস আই প্রমিস ইউ যা বলবি তাই হবে। একটু চুপ করে বসে থাক বাবা প্লিজ।
মুসকান শান্ত হলো। তাঁর শান্ত হওয়া দেখে ইমন বললো,
—- চুপ থাকবিতো?
মাথা নাড়ালো মুসকান ছেড়ে দিলো ইমন৷ কিন্তু একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে রইলো। কেনো জানি এই মেয়ে কে বিশ্বাস পাচ্ছে না।
—- এবার বল তুই কি চাস?
মুসকান ইতস্ততবোধ করলো। ইমন পরপর তিনবার জিগ্যেস করারপরও মুসকান মুখটা কাচুমাচু করেই বসে রইলো বাধ্য হয়ে ইমন বললো,
—- তুই যদি আমার শান্ত আচরণ দেখে সাপের পাঁচ পা দেখে থাকিস তাহলে শুনে রাখ আমার শান্ত আচরণ অশান্ত করলে এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ভয় যদি কেউ পায় তাহলে সেটা পাবি তুই। তাই আমাকে শান্ত থাকতে দে। আমি যেভাবে থাকতে চাইছি সেভাবেই থাকতে দে। আমার আমি কে বেশী ঘাটিস না তাহলে দেখবি আমার অস্তিত্ব ছাড়া তোর চারপাশে আর কিছুই নেই।
এক ঢোক গিললো মুসকান। মুখ ফুটে কিছু বলতে যাবে কিন্তু বলতে পারলোনা৷ গলার আওয়াজ বের হলোনা তাঁর। ইমন শান্তভাবে যে হুমকি দিলো তাতেই তাঁর অবস্থা মরি মরি। কাঁপতে থাকলো সে। ইমন তাঁর হাত ছেড়ে দিলো। মেঝেতে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো,
—- বল মনের কথা বলে দে জানতে চাই আমি।
—- তুমি মিলি আপুর সাথে কথা বলবেনা। কাঁপা গলায় বললো মুসকান৷
—- কেনো বললে তোর কি হয়?
—- হিংসে হয় আমার।
—- কেনো হিংসে হয় মুসু? আচমকাই দুহাতে দুগাল স্পর্শ করে ঘোর লাগা গলায় বললো ইমন।
এক ঢোক গিললো মুসকান৷ চোখের দৃষ্টি তাঁর এলোমেলো।
—- বল?
ইমনের মুখের গরম শ্বাস মুসকানের মুখে পড়তেই কেমন মিইয়ে গেলো সে। চোখ নামিয়ে ঘনঘন শ্বাস নিতে থাকলো। ইমন দুগালে আলতো চাপ দিলো। মুসকানের ভেজা নরম ঠোঁট গুলোও যেনো জড়সড় হয়ে গেলো। কি সাংঘাতিক দৃশ্য। এক ঢোক গিললো ইমন চোখ ফিরিয়ে হাত সড়িয়ে নিয়ে কয়েকদফা শ্বাস নিলো আর ছাড়লো। মুসকান জড়সড় হয়েই বসে আছে। ইমন অন্যদিক তাকিয়েই বললো,
—- উত্তর দিলিনা?
—- আমি জানিনা মিলি আপুর ধারেকাছে যেনো তোমাকে না দেখি। বলেই চট করে ওঠে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো মুসকান।
.
মুসকান রিমিদের ঘরে থম মেরে বসে আছে। নিলুফা বেগম মনে করলো হয়তো রাগ কমেনি এখনো তাই কোন প্রশ্ন করলো না৷ তিনি রান্নাঘরে চলে গেলেন। মুরাদ আর মুসকানের জন্যও রাঁধতে হবে। মুরাদের মা ফোনে জানিয়েছে তাঁর আসতে বিকাল হবে। রিমি মুসকানের পাশে বসে ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে ইমন তাঁকে কি বললো? তাঁদের কি কথা হলো? কিন্তু মুসকান মুখ দিয়ে টু শব্দটিও করলো না। বিরক্তির চরম পর্যায়ে গিয়ে রিমি রাগে গটগট করতে করতে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
______________________
কোর্ট থেকে দুপুর তিনটায় বেরিয়ে পড়লো ইমন। তাঁর বাবার এক বন্ধুর সাথে মিট করতে হবে তাঁকে। তাই রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে গাড়ি ঘোরালো। রেস্টুরেন্টে পৌঁছেই দেখতে পেলো শুধু বাবার বন্ধু নয় সাথে বেশ রংঢং মেখে বসে আছে এক যুবতী। তাঁর আর বুঝতে বাকি নেই ঘটনাটা আসলে কি? চাপা এক শ্বাস ছেড়ে এগিয়ে গেলো সে। বললো,
—- আসসালামু আলাইকুম আংকেল।
—- ওয়ালাইকুমুস সালাম।
—- ভালো আছেন?
—- অফকোর্স ভালো আছি। এবার তোমাদের ভালো রাখার দায়িত্ব পড়েছে ঘাড়ে। দাঁড়িয়ে আছো কেনো বসো।
মৃদু হেসে বসলো ইমন৷ সামনে বাবার বন্ধু ইলিয়াস খান। খুব যদি ভুল না করে পাশের মেয়েটাই তাঁর মেয়ে। এক পলক চেয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলো সে। ইলিয়াস খান পরিচয় করিয়ে দিলো তাঁর মেয়ে আতিয়া খান ইতুর সাথে৷ দুজনই দুজনকে হ্যালো জানালো। এক পর্যায়ে ইলিয়াস খান তাঁর জরুরি কল এসেছে বলেই ওঠে গেলো। সে যে গেলো আর আসার নাম নেই৷ বিরক্তি তে কপাল ঘামতে শুরু করলো ইমনের। পকেট থেকে টিস্যু বের করে ঘাম মুছে ফোন বের করলো। ইতু ড্যাব ড্যাব করে যে তাকিয়ে আছে চোখ সড়ানোর নাম নেই। তাঁর দেখার পালা শেষ করে বললো,
—- আপনার কথা অনেক শুনেছি। শুনে আপনাকে যেমন আইডিয়া করেছিলাম তাঁর থেকেও অনেক বেশী সুদর্শন আপনি।
ইমন জোর পূর্বক হাসি দিলো ফোন থেকে চোখ সড়িয়ে কফির মগে এক চুমুক দিলো। তাঁর দেখাদেখি ইতুও নিজের কফির মগে চুমুক দিলো।
—- আপনি বোধ হয় জানতেন না পাপার সাথে আমিও আসবো তাইনা?
—- হ্যাঁ জানলে আমার মূল্যবান সময় আমি নষ্ট করতামনা৷ কফির মগে চুমুক দিয়ে ফোনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললো ইমন।
ইতুর মুখটা ছোট হয়ে গেলো। ভ্রু কুঁচকে বললো,
—- আপনি বোধহয় একটু বেশীই এটিটিওট দেখাচ্ছেন। আমার পাপা আপনার পাপার বন্ধু আমাদের বিষয় সবটাই জানে আকরাম আংকেল। তাছাড়া আমি লন্ডনে পড়াশোনা করেছি। আপনার থেকে কোন অংশে কম নই আমি। প্রেজেন্ট পাপার বিজনেসও সামলাচ্ছি।
—- সো হোয়াট? আপনার ব্যাপারে আমি একটুও ইন্টারেস্টেড নই। আপনার পাপাকে বলে দিয়েন বিলটা আমি পেমেন্ট করে দিয়েছি। বলেই ওঠে চলে গেলো ইমন৷
ইতু অবাক হয়ে চেয়ে রইলো ইমনের যাওয়ার দিকে। এ প্রথম কেউ তাঁকে এভাবে ইগনোর করলো। একটাবার তাকালো না অবদি। তাঁর মতো এতো রূপবতী, বড়লোক বাবার মেয়েকে এভাবে কোন ছেলে ইগনোর করতে পারে বিলিভই করতে পারছে না সে। হাউ দিজ পসিবল? কফির মগটা বেশ শব্দ করে টেবিলে রেখে রাগে গজগজ করতে করতে সেও বেরিয়ে গেলো৷
.
সেদিন ইমন বাড়ি ফিরে এমন রিয়্যাক্ট করেছে যে ইরাবতী বা আকরাম চৌধুরী কেউ আর তাঁর বিয়ের কথা তোলার সাহস পায়নি। ইলিয়াস খান কেও বলে দিয়েছে তাঁর ছেলে বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। তাই আপাতত এ বিষয় নিয়ে আগাতে চায় না।

এর মধ্যে দিহান আর সায়রীকে ইমন মুসকানের জেলাসির কথাটা জানিয়েছে। সব শুনে দিহান পজেটিভ ভাবলেও সায়রী মানতে নারাজ। সে ইমনকে সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছে মুসকানের ফিলিং ভালোবাসার হতেই পারেনা৷ ভালোবাসার কিছু বুঝেইনা মুসকান৷ ইমনও বলে দিয়েছে ভালোবাসা হোক বা না হোক মুসকান তাঁরই হবে। তা শুনে সায়রীও বলে দিয়েছে আর কিছু হোক না হোক মুরাদের সাথে তোর বন্ধুত্বের ভাঙন যে ধরবে এটা সিওর থাক। সায়রীর সাথে প্রতিবাদ করলেও মনে মনে ঠিক এ বিষয় নিয়ে অশান্তি ভুগছে ইমন।
________________
মুসকানের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। দুদিন পর ইংলিশ প্রথম পএ পরীক্ষা তাঁর। তাই রুমে বসে পড়ছে । পড়ায় একদমই মন বসে না তাঁর। চারদিন হয়ে গেলো ইমন তাঁদের বাড়ি আসেনি। তাই মন ভালো লাগছেনা। দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। আবার মনে মনে নানান কুকথাও ভাবছে ‘নানাভাই আবার অন্য কোন মেয়ের পাল্লায় পড়লো না তো? বা মিলি আপুর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেনা তো? মিলি আপু কি শশুড়বাড়ি চলে গেছে না আছে? নাহ পড়ায় মন বসাতে পারলো না। বই খাতা গুছিয়ে রেখে চলে গেলো রিমির কাছে। রিমিকে জিগ্যেস করে জানতে পারলো মিলি দুদিন আগেই শশুড়বাড়ি চলে গেছে। সে খবর শুনে একটু নিশ্চিন্ত হলো। কিন্তু ইমন কেনো তাঁদের বাড়ি আসছে না? তাঁর কি একবারো মুসুকে মনে পড়েনা? অভিমানে বুকটা ভার হয়ে গেলো।
.
রাত দশটা বাজে মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে আসতেই দেখতে পেলো রিমি ফোন কানে দিয়ে বসে আছে। তাঁকে দেখেই ফোনে থাকা ব্যাক্তিকে বললো,
—- এই তো ভাইয়া মুসু এসেছে।
মুসকানের বুকটা ধক করে ওঠলো। হাত,পায়ে মৃদু কম্পন অনুভব করলো সে৷ চোখের পলক ফেলতে ফেলতে আগাতে থাকলো রিমিও এক পা এগিয়ে তাঁর হাতে ফোন দিয়ে বললো,
—- কথা শেষ করে ফোন দিয়ে আসবি। যাই আমার অনেক পড়া আছে।
রিমি চলে যাওয়ার পর ফোন কানে দিলো মুসকান। তাঁর নিঃশ্বাসের শব্দ পেতেই ইমন বললো,
—- এই পাগলী তুই নাকি পড়াশোনা করছিস না? আর কিসব আবল তাবল চিন্তা করে বেড়াচ্ছিস? শোন পাগলী এই ইমন চৌধুরী, তোর ভাষায় তোর নানাভাই শুধুই তোর।
#হৃদপিন্ড_২
#জান্নাতুল_নাঈমা
#পার্ট_১০
.
সেদিন ইমনের সাথে মুসকানের প্রায় পঁচিশ মিনিট কথা হয়। এই পঁচিশ মিনিটে ইমন মুসকান কে নতুন ভাবে আবিষ্কার করেছে৷ তাঁর ছোট্ট, কোমল হৃদয়ের অনেকখানি জায়গা জুরে রয়েছে শুধুই ইমন। এটুকু বুঝতে তাঁর খুব একটা সময় লাগেনি। নিজেকে ভীষণ সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। বালিকার প্রথম প্রেম হওয়া,প্রথম অনুভূতি তে থাকাটা প্রত্যেকটা পুরুষের জন্যই ভাগ্যের ব্যাপার। সে যথেষ্ট ম্যাচিওর, এডিউকেটেড এবং ভীষণ সিরিয়াস টাইপ ছেলে। আর মুসকানের বয়স খুবই কম ১৪ রানিং। মেয়েটার বয়স যেমন কম তেমনি প্রচন্ড আল্হাদী টাইপের৷ ভাইসহ ভাইয়ের সকল বন্ধু-বান্ধবদেরও কলিজা সে৷ সেও কখনো মুসকানকে আলাদা চোখে দেখেনি। কে জানতো এমন দিন তাঁর আসবে? যে দিনে তাঁর প্রিয় বন্ধুর একমাএ আদরের ছোট বোনকে অন্য নজরে দেখতে হবে তাঁকে। তাঁর এই নজরকে কি সবাই শোভনীয় চোখে দেখবে? নাকি সকলের চোখে স্পেশালি বন্ধু দের চোখে ইমন নামটাই হয়ে যাবে অশোভনীয়? যদি অনুভূতি টা এক তরফা হতো নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতো সে। কিন্তু যেখানে ঐ বাচ্চা মেয়েটা তাঁর প্রতি এতো দূর্বল সেখানে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা৷ মুসকান তাঁর কাছে খুবই নিষ্পাপ, পবিএ, এবং স্বচ্ছ। তাঁর কিশোরী মনের স্বচ্ছ আবদারকে ফেলে দেওয়ার শক্তি ইমনের নেই। প্রেম কি? ভালোবাসা কি? এগুলোর মানে সত্যি মেয়েটা বুঝেনা মেয়েটা শুধু বুঝে তাঁর এই মানুষ টা শুধুই তাঁর। অবুঝ মনের অবুঝ ভাবনায় শুধুই ইমনের বিচরণ রয়েছে। ভবিষ্যতবানী করতে গেলে ফলাফল এই দাঁড়ায় যে, অবুঝ মনের এই অনুভূতি যদি স্থায়ী হয় তাহলে সে ভালোবাসাময় এক নারীকে পাবে নিজের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে। বউয়ের নিঃস্বার্থ,গভীর ভালোবাসা পাওয়ার লোভ কার না আছে? কিন্তু বয়স নিতান্তই কম মেয়েটার সময়ের সাথে যদি তাঁর অনুভূতিরও পরিবর্তন ঘটে যায় ? সহ্য করতে পারবে তো? কম বয়সী মেয়েদের প্রতি ছেলেদের আলাদা একটা আকর্ষণ থাকেই। এটা যেনো চন্দ্র, সূর্যের মতোনই চিরন্তন সত্য৷ কিন্তু তাঁর কি শুধুই আকর্ষণ? শুধু আকর্ষণের ওপর নির্ভর করে এতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া কি ঠিক হবে? তাঁর সিদ্ধান্ত কতোটা গ্রহণযোগ্য হবে? তাঁর পরিবার, মুরাদের পরিবার বিষয়টা কতোটা সহজ বা কতোটা কঠিনভাবে হজম করবে?
_____________________
মুরাদের মামা ফোন করে জানালো তাঁর মা আর নেই৷ এটুকু বলেই সে ফোন কেটে দিয়েছে৷ মরিয়ম আক্তার কথাটা শোনামাএই জ্ঞান হারিয়েছে। বেশ কয়েকমাস ছুটি কাটিয়েছে মুরাদ। এক্সিডেন্ট করার পর তিনমাস ছুটিতে ছিলো সে৷ ছুটি কাটানোর পর আজই প্রথম স্কুলে গিয়েছে। মুসকান রুমে বসে ইংরেজি দ্বিতীয় পএ পড়ছিলো। হঠাৎ মায়ের চিৎকার শুনে ছুটে যায় বসার ঘরে৷ মাকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে সেও আম্মু বলে দেয় এক চিৎকার। তাঁর চাচি নিলুফা বেগম আর রিমি ছুটে এসে দেখে মুসকান মাকে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। নিলুফা বেগম রিমিকে পানি আনতে বলতেই সে ছোট বালতি আর মগে করে পানি নিয়ে আসে। মাথা উঁচু করে ধরতেই রিমি নিচে বালতি রাখে আর নিলুফা বেগম পানি দিতে থাকে। জ্ঞান ফিরতেই মরিয়ম আক্তার হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। আম্মা আম্মা বলে চিৎকার করতে থাকে। “আমার আম্মা আমার আত্নাটা আর নাই গো। আমার আব্বার মতো ফাঁকি দিয়ে চলে গেলো আমার আম্মা ও ভাবি আমি কারে আম্মা ডাক দিব ভাবি। ও ভাবি আম্মা কাল রাতেই ফোন দিয়ে বললো ‘মরিয়ম রে তোর ছেলের বউয়ের মুখ দেখার ভাগ্য বুঝি আমার আর হবো না’ ও ভাবি আমার আম্মা নাই, নাই গো ভাবি নাই আমার আম্মা নাই ” মায়ের কান্না দেখে মুসকানও হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো৷ রিমি তাঁর বাবাকে ফোন করে জানিয়ে মুরাদকে ফোন করে জানালো।
.
পুরো বাড়ির মেইন দরজায় তালা ঝুলিয়ে বাড়ির গেটে বড় একটা তালা ঝুলিয়ে সবাই চলে গেলো নানাবাড়ি৷ জানাজার টাইমে মুরাদের সকল বন্ধু গিয়ে হাজির হলো৷ জানাজা পড়ে মাটি দিয়ে এক একে সবাই বিদায় নিলো। শুধু দিহান আর ইমন বাদে। সায়রী মুসকান কে জরিয়ে ধরে তাঁর মামার রুমে বসে আছে৷ রিমি মুসকানের মামাতো বোনদের সামলাচ্ছে। মরিয়ম আক্তার আর তাঁর বড় বোন মাজেদা বেগম একে অপরকে জরিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে চলেছে।

সন্ধ্যা সাতটা বাজে। বাড়ির বড় ওঠানে চেয়ার বসে আছে মুরব্বিরা। মুরাদ সহ মুরাদে মামাতো,খালাতো চারভাইও রয়েছে। মহিলারা সব ঘরের ভিতরে। সকলের মাঝে থেকে ওঠে গিয়ে ইমনকে ফোন দিলো মুরাদ। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দিহান আর ইমন চলে এলো৷ তাঁরা আশেপাশেই ছিলো। মুরাদ দিহানকে বাড়ির চাবি দিয়ে বললো,
—- মুসুকে নিয়ে তোরা ফিরে যা৷ আমাদের বাড়ি গিয়ে ওর বই আর এক সেট কাপড় নিয়ে ইমনদের বাড়ি যাবি৷ যেহেতু ইমনের বাড়িটাই আগে পড়ে।পরশু ওর পরীক্ষা। পরীক্ষা মিস দিলেই এক বছর গ্যাপ পড়ে যাবে। আর এখানে এতো কান্নাকাটির মাঝে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বে পড়া তো হবেই না পরীক্ষাও খারাপ হবে। ইংরেজিতে খুব কাঁচা মুসু।
—- মুসু কি যেতে চাইবে? মলিন গলায় প্রশ্ন দিহানের৷
—- কেনো যেতে চাইবেনা? এখানে থেকে কান্নাকাটি ছাড়া আর কি করবে? কাকি মা’কে সারাক্ষণ কান্নাকাটি করতে দেখলে মুসুও ভেঙে পড়বে এর থেকে মুরাদ যা বলছে তাই হোক। একদমে কথাগুলো বললো ইমন।
—- হ্যাঁ সায়রীকে বলে দিয়েছি বাড়ি নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে৷ কাল সকালে সায়রীর সাথে দিহানদের বাড়ি চলে যাবে। পড়ায় কোন ক্ষতি হোক চাইনা৷ বললো মুরাদ।
—- দিহানদের বাড়ি কেনো? আমার বাড়ি কি পড়তে অসুবিধা নাকি? কোথাও যেতে হবেনা আমার ওখানেই থাকবে পরীক্ষা শেষ অবদি।
—- তাহলে সায়রীকেও রেখে দিস৷ আশা করি দিহানের সমস্যা নেই?
দিহান কিছু বলার আগেই ইমন বললো,
—- ওর সমস্যা থাকুক বা না থাকুক এতে আমাদের কি? সায়রী, মুসু দুজনই থাকবে, চাইলে দিহানও থেকে যাবে।
.
আটটার দিকে সকলেই ডালভাত খেয়ে নিলো। মুসকান কিছু খেতে পারলো না৷ সারাদিন না খেয়ে পেটে গ্যাস হয়ে গেছে, মুখেও রুচি নেই তাই সে কিছুই খেলো না। মুরাদ ইমনকে বলে দিলো, যাওয়ার সময় ফার্মেসী থেকে গ্যাসট্রিকের ট্যাবলেট কিনে মুসুকে খাওয়িয়ে দিতে৷ আর বাড়ি গিয়ে কিছু খাবার খাওয়াতে।

ইমনের গাড়িতেই ওঠে পড়লো সকলে। ইমন বসলো সামনে। পিছনের ছিটে মাঝখানে বসলো সায়রী ডানপাশে মুসকান আর বামপাশে দিহান। রাস্তায়ই গ্যাসট্রিকের ট্যাবলেট কিনে খাওয়িয়ে দেওয়া হলো মুসকান কে। বাড়ি ফিরতেই ইরাবতী সাদা ভাত আর পাঁচ মিশালী সবজি দিয়ে ভাত মেখে জোর করে মুসকান কে অল্প খাওয়িয়ে দিলো। পুরোটা সময়ই ইমন সোফায় বসে এক ধ্যানে চেয়ে ছিলো মুসকানের দিকে। সারাদিন মেয়েটা তাঁর সামনে কেঁদেছে। তাঁর বিধ্বস্ত মুখপানে তাকাতেই বুকের ভিতরটা ব্যাথায় টনটন করে ওঠছিলো বারবার। ইচ্ছে করছিলো খুব একটি বার বুকের ভিতর চেপে ধরে বলতে ‘এই পাগলী এভাবে কেনো কাঁদছিস দেখ এখানটায় খুব পুড়ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে কেনো এভাবে আমার ভিতরের যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিচ্ছিস ‘?

মাথা চেপে ধরে বসে রইলো মুসকান। ইমন ঘোরে থেকে ওঠে তাঁর দিকে এগিয়ে বললো,
—- এই মাথা ব্যাথা করছে? খুব কষ্ট হচ্ছে? চল উপরে গিয়ে এখুনি ঘুমাবি দেখবি সকালেই সব ব্যাথা সেড়ে গেছে৷
টলমল চোখে তাকালো মুসকান বসা অবস্থায়ই ইমনের পেট জরিয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠলো। আচমকাই এমন কিছু হবে ভাবতে পারেনি ইমন। সেখানে উপস্থিত কারোই বোধগম্য ছিলোনা এটা। ইরাবতী ভাবলো বাচ্চা মানুষ এভাবে নিজের নানুর মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি। চোখের সামনে সেই ছোটবেলায় বাবার লাশ দেখেছে এখন নানুর লাশ। মেয়েটার মনের অবস্থা বড়ই করুন। কিন্তু সায়রী আর দিহান বিষয়টা ঠিকভাবে নিলোনা। তাঁরা একেঅপরের দিকে কেমন দৃষ্টিতে যেনো তাকালো। কিন্তু ইমন বা মুসকানের কারোরি সেদিকে খেয়াল নেই। যেখানে মুসকান এভাবে ভেঙে পড়ে তাঁকে আঁকড়ে ধরেছে সেখানে অন্যকোন বিষয় কে বেশী গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলোনা ইমন৷ মুসকানের প্রতিটা ফুঁপানি যেনো ইমনের হৃদপিন্ডে আঘাত করছিলো।
____________________
সারারাত ঘুম হয়নি ইমনের। ভোরের দিকে দিহানকে তুলে সিরিয়াস ভাবে বললো,
—- তুই সায়রীকে এখুনি ফোন করবি আর বলবি তোর শরীর খারাপ লাগছে।
—- কি বলস? আমি তো দিব্বি আছি।
—- না তুই দিব্বি নাই তুই ফোন করে যা বলতে বললাম তাই বল। আমার মুসকান কে একা চাই।
দিহান আর কিছু বললো না সে মনে মনে ইমনকে বেশ ভালোই সাপোর্ট করে। যদি মুসকান ইমন দুজন দুজনকে চায় তাহলে অন্যদের এতো বাড়াবাড়ি না করাই ভালো। কে কাকে ভালোবাসবে কে কাকে জীবনে নিয়ে আসবে তা আউটসাইট মানুষ দের ডিসাইড করার থেকে যারা সারাজীবন একসাথে থাকবে, যারা একে অপরকে মন থেকে চাইবে,ভালোবাসবে তাঁরা ডিসাইড করাই ভালো।
.
দিহানের অসুস্থতার কথা শুনে সায়রী ছুটে যায় ইমনের রুমে৷ দিহান মাথা ব্যাথায় আহ, উহ করে অভিনয় করতে থাকে। সায়রী তাঁর পাশে বসে মাথা টিপে দেয়৷ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ব্যাস্ত হয়ে পড়ে তাকে নিয়ে৷ আশেপাশের আর কোন কিছুতে তাঁর খেয়াল নেই। এদিকে ইমন সোজা মুসকান যে ঘরে আছে সে ঘরে চলে যায়৷ মুসকানের সে নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখটা দেখে তাঁর বুকের ভিতর টা যেনো শান্ত হয় অনেকটাই। অবাধ্য ইচ্ছে রা ঢেউ খেলে যায় বুকজুরে। শ্বাসপ্রশ্বাসে আসে ঘন থেকে ঘনতা। কপালে ছুঁয়িয়ে দেয় ভালোবাসার গভীর স্পর্শ। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় অনেকটা সময়। বেহায়া চোখ দুটি চলে যায় মুসকানের পাতলা মসৃন ঠোঁট জোরায়। নিচের ঠোঁটের গাঢ় তিলটা যেনো তাঁর হৃদপিন্ড চেপে ধরে। বেহায়া মন চায় একটু খানি শীতল স্পর্শ সেখানে ছুঁয়িয়ে দিতে। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সে আকর্ষণকারী ওষ্ঠদ্বয়ের দিকে। তাঁর ওষ্ঠদ্বয় যখন মুসকানের ওষ্ঠদ্বয় প্রায় ছুঁই ছুঁই তখনি বেজে ওঠে তাঁর ফোন। চমকে ওঠে ইমন বুকের ভিতরটায় ধুকপুকানি বেড়ে যায় খুব। নড়েচড়ে ওঠে মুসকানও। ইমন প্যান্টের পকেটে চেপে ধরে সড়ে যায়। বেলকনিতে গিয়ে ফোন বের করে রিসিভ করে। এলোমেলো নিঃশ্বাসে এক ঢোক গিলে বলে,
—- হ্যালো।
—- ঘুম থেকে ওঠেছিস? স্পষ্ট গলায় বললো মুরাদ।
—- হ্যাঁ এইমাএ। তুই এতো সকালে ফোন দিয়েছিস এনি প্রবলেম?
—- আর বলিস না। কি বাজে পরিস্থিতিটাই না ঘটলো। আমার মামার বড় মেয়ে আছেনা? ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। নাম মারিয়া ওর বড় ভাইয়ের বন্ধুর সাথে রিলেশনশিপে আছে। তুই ভাব কতো বড় সাহস কেমন দস্যি মেয়ে ভাব এ বয়সেই প্রেম, রিলেশনের কি বুঝে এই মেয়ে?
ইমন নিশ্চুপ।
মুরাদ বলতেই থাকলো,
—- আর ছেলের কতো বড় কলিজা ভাব বন্ধুর বোনের সাথে সম্পর্ক গড়ে৷ মারিয়ার বয়স কম। নিশ্চিত ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রিলেশন করেছে।
—- তুই কিভাবে জানলি? চাপা কন্ঠে প্রশ্নটি করলো ইমন।
—- আর বলিস না। মারুফ নামাজ পড়ার জন্য ওঠেছে। ওঠে দেখে পাশে বন্ধু সাজিদ নাই। ভাবলো হয়তো বাথরুম গিয়েছে। মামাদের বাথরুম তো ওঠান পরে জানিসই। মারুফ ফোনের ফ্লাশ অন করে বের হয়েছিলো। তখনি নারিকেল গাছের পিছন দিক ফিসফিস আওয়াজ শুনতে পায়৷ ভ্রু কুঁচকে গিয়ে লাইট ধরতেই দেখে মারিয়াকে জরিয়ে ধরে আছে সাজিদ৷ কুত্তার বাচ্চার কতো বড় বুকের পাটা ভাবছিস তুই?
মারুফের তো মাথায় আগুন ধরে যায়৷ গতকাল নানী মারা গেছে সকলের মনের অবস্থা এমনিতেই খারাপ তারওপর ছোট বোনের এমন কীর্তি তাও নিজের বেষ্ট ফ্রেন্ডের সাথে কার মাথা ঠিক থাকে? সাজিদকে ইচ্ছে রকম মাইর লাগাইছে৷ আমাকে ফোন দিতেই বের হয়ে এসব দেখে শালারে একদম পিটাইছি ইচ্ছে রকম। তারপর মারিয়াকে থাপড়াইছি কতোক্ষন। এই খবর আমি মারুফ আর মামি ছাড়া কেউ জানেনা। মামা জানলে মারিয়ার গলা কেটে নদীতে ভাসাই দিবো।

ইমন নিশ্চুপ হয়ে সবটা শুনছে। এতোক্ষণ যা শুনলো এতে তাঁর কোন অনুভূতি কাজ করলো না। মনে হলো সব স্বাভাবিক। আর যাইহোক সাজিদ ছেলেটার মতো অবস্থা তাঁর হবেনা৷ সে এতোটা দূর্বল নয়৷ কিন্তু এরপর মুরাদ যা বললো এতে পায়ের নিচ থেকে যেনো মাটি সড়ে গেলো তাঁর বুকের ভিতরটা যেনো দুমড়ে মুচড়ে যেতে শুরু করলো। মুরাদ বললো,
—- আমি মারুফ কেও ইচ্ছে রকম বকা দিলাম একটু আগে। কেমন ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করে যে তাঁরা বন্ধুত্বের মান রাখতে পারেনা৷ বন্ধুর বোনের দিকে কুনজর দিতে যেসব ছেলের বুক কাঁপেনা সেসব ছেলে বন্ধু কেনো শত্রু হবারও যোগ্যতা রাখেনা৷ মানুষ নামে পশু এরা। তারপর বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে বললাম,আমার বন্ধু দের দেখ সেই কোন বয়স থেকে চলাফেরা তাদের সাথে। আমার বাড়িও তিনটা বোন ছিলো এখন দুজন রয়েছে জীবনে অন্যরকম দৃষ্টি ফেলা তো দূরের কথা কল্পনাও করতে পারেনা৷ বন্ধুত্ব যদি করতেই হয় ইমন,দিহান এদের মতো ব্যাক্তিত্বের লোকদের সাথেই করা উচিত৷ যাদের চোখ বুজে বিশ্বাস করা যায়,ভরসা করা যায়। যারা মনের ভুলেও কখনো বিশ্বাসঘাতকতা বা বেঈমানি করার কথা ভাবতেও পারেনা।

চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here