হৈমন্তীকা পর্ব ১

— “আমার বয়স কত জানেন? ২৩! আপনার চেয়ে ৩বছরের বড় আমি। লজ্জা করলো না নিজের আপুর বয়সী একটা মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে?”
ছেলেটা নিজের দৃষ্টি আরো তুখোড় করলো। কণ্ঠে গম্ভীরতা এঁটে বললো, “ভালোবাসি আপনাকে হৈমন্তীকা।”
ছেলেটার বেহায়াপনা দেখে খানিক বিরক্ত হলো হৈমন্তী। রেগে গেলে তার নাক কাঁপতে শুরু করে। এখনও কাঁপছে। ঝাঁঝালো গলায় সে আওড়ালো,
— “আমার নাম হৈমন্তী। হৈমন্তীকা না! আপনাদের বিল্ডিংয়ে ভাড়া থাকি বলে ভাববেন না আপনাকে ভয় পাই আমি। আর একবার যদি আমাকে এইসব ফালতু প্রস্তাব দেন, তাহলে আপনার বাবা-মাকে বলতে দেড়ি করবো না আমি। মনে থাকে যেন!”

বলেই নিজের তীক্ষ্ণ চাউনি দ্বারা একবার দেখে নিলো ছেলেটাকে। যেন চোখ দ্বারাই ভস্ম করে দেবে তাকে। তারপর গটগট পায়ে চলে যেতে লাগল বিল্ডিংয়ের ভেতর। পেছন থেকে তুষার তখন আবেগী স্বরে বললো,
— “আপনাকে আমি আপু মানি না হৈমন্তীকা। আপনাকে ভালোবেসেও কোনো অপরাধ করিনি। আমি আপনাকে ভালোবাসি, ভালোবসব। সেটা আপনি না চাইলেও।”

হৈমন্তী শুনেও শুনলো না যেন। ছেলেটার মাথা গেছে একদম। নিজের চেয়ে তিন বছরের বড় মেয়েকে বলে কি-না ভালোবাসি! হৈমন্তী প্রথমে ভেবেছিল তুষার মজা করে করছে এমন। তবে না! দিনে দিনে এর উদ্ভট সব কান্ড বেড়েই চলেছে। এই যেমন কালকের ঘটনাই ধরা যাক। হৈমন্তীকে একটা ছেলে প্রপোজ করেছে বলে ছেলেটাকে কি মারধরই না করেছে সে! হৈমন্তী এতদিন বাচ্চা ছেলে ভেবে কিছু বলেনি। কিন্তু এবার সে ভেবে নিয়েছে। আবারো এমন কিছু হলে সে সত্যি সত্যিই নালিশ দেবে তুষারের বাবার কাছে।

_________________

বৃষ্টি বাড়ছে। সাথে কোনো ছাতা আনে নি হৈমন্তী। দোকানের ছাউনির নিচে আরেকটু ঠেসে দাঁড়ালো সে। আর কতক্ষণ যে এই বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কে জানে! আশেপাশে কোনো রিকশারও দেখা মিলছে না। নতজানু হয়ে ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলল হৈমন্তী। হঠাৎ পাশ থেকে চিরচেনা এক কণ্ঠ কানে এলো তার,
— “এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন হৈমন্তীকা? ছাতা আনেন নি?”

হৈমন্তী চমকে তাকালো। নিজের পাশে তুষারকে দেখে চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন ছুড়লো,
— “আপনি এখানে? আবারো আমার পিছু নেওয়া শুরু করেছেন?”
তুষার মুচকি হেসে বললো,
— “আপনার পিছু নেওয়ার প্রয়োজন পরে না হৈমন্তীকা। ভাগ্য নিজেই আমাকে আপনার কাছে টেনে আনে। এবার চলুন, আপনাকে পৌঁছে দেই।”
— “আপনার কি ধারণা, আমি আপনার সঙ্গে যাবো? মরে গেলেও না!”
— “আপনার ইচ্ছা। পরে কিছু হলে কিন্তু তার দায় আমি নেব না।”

নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কথাটুকু বলে হাতের লাল ছাতাটা খুলে নিলো তুষার। এরপর ধীরস্থির ভঙ্গিতে হেঁটে চলে যেতে লাগল সামনের পথে। হৈমন্তী হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত আটটা বেজে চল্লিশ মিনিট। আর কিছুক্ষণ পরই ন’টা বেজে যাবে। এ রাস্তা তেমন সুবিধার না। তারওপর রিকশাও নেই আশেপাশে। বৃষ্টিও কমছে না। হৈমন্তীর কি যাওয়া উচিত তুষারের সঙ্গে? সে একবার তুষারের যাওয়ার পথে তাকিয়ে আবার উলটো পথে তাকালো। নির্জন রাস্তাটি দেখে মুহুর্তেই ভয় এঁটে বসলো হৈমন্তীর মস্তিষ্কে। কি ভেবে উঁচানো গলায় ডাকলো তুষারকে। দু’তিনবার ডাকলো।

তুষার থামলো। মুখে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে এলো হৈমন্তীর দিকে। খানিক ঝুঁকে ফিচেল হেসে বললো,
— “ভয় পাচ্ছেন হৈমন্তীকা?”
হৈমন্তী হকচকালো। থতমত গলায় বললো,
— “আ-আমি ভয় পাবো কেন? আমি তো ভেবেছি, আপনি ভয় পাবেন একা একা যেতে। তাই বড় আপু হিসেবে আমার কর্তব্য আপনার সঙ্গে যাওয়া। আমি তো শুধু আমার কর্তব্যই পালন করছি।”

‘বড় আপু’ কথাটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেল তুষারের। দৃষ্টি কঠিন হয়ে এলো। গম্ভীর স্বরে নিদারুণ অধিকার বোধ নিয়ে সে বললো,
— “আপনি আমার আপু নন হৈমন্তীকা।”
হৈমন্তী রাগলো না এবার। বরং বোঝানোর সুরে বললো,
— “আমি আপনার আপুই তুষার। সেটা আপনি মানুন বা না মানুন। আর হ্যাঁ, আমাকে হৈমন্তী বলে ডাকবেন। হৈমন্তীকা না।”

তুষার কথা বাড়ালো না। ছাতার একপাশে চেপে গিয়ে জায়গা করে দিলো হৈমন্তীকে। নিজ মনে বিড়বিড় করে উঠল,
— “আপনি আমার কে হন, সেটা সময়ই বলে দেবে হৈমন্তীকা।”

নির্জন, নিস্তব্ধ রাস্তা। চারিদিকে শুধু বৃষ্টির ধুপধাপ শব্দ শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দু’একটা সিএনজি কিংবা রিকশা হর্ণ বাজিয়ে ব্যস্ত হয়ে ছুটে চলছে নিজ গন্তব্যে। সব’কটা যাত্রীতে ভরপুর। থামানোর জো নেই। হৈমন্তী জড়োসড়ো হয়ে হাঁটছে তুষারের সঙ্গে। ছাতা ছোট হওয়ায় বারংবার নিজের হাতে তুষারের হাতের স্পর্শ পাচ্ছে সে। অস্বস্থি হচ্ছে খুব। হৈমন্তী হাতটা বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে ক্ষীণ স্বরে বললো,
— “জলদি হাঁটুন তুষার। পথটা শেষই হচ্ছে না!”
হৈমন্তীর কণ্ঠে বিরক্তি যেন চুইয়ে চুইয়ে পরছে। অপরদিকে কাঁধসহ পুরো একপাশ ভীষণ ভাবে ভিঁজে গেছে তুষারের। তবুও আনন্দপূর্ণ মেজাজে আছে সে। গলা ছেড়ে এবার গান গেয়ে উঠল তুষার,
— “এ পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো?”

হৈমন্তী একবার আড়চোখে তুষারের দিকে তাকালো। রাশভারি গলায় বললো,
— “খুবই বাজে হতো।”
— “উহু! আপনার আর আমার প্রেম হতো।” নাকচ করে বললো তুষার।
হৈমন্তী রেগে গেল,
— “আপনাকে কিন্তু থাক্কা দিয়ে ফেলে দেব তুষার!”
— “দিন! আমিও আপনার হাত টেনে ফেলে দেব।”

বিরক্তিতে মুখ দিয়ে ‘চ’ শব্দ বেড়িয়ে এলো হৈমন্তীর। বাকি পথটুকুতে তুষার নানান কথা বললেও সে টু শব্দটিও করলো না। বিল্ডিংয়ের কাছাকাছি আসতেই হৈমন্তী ছোট্ট করে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যেতে চাইল। তুষার হাত ধরে আটকালো। সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিলো হৈমন্তী। ঝাঁঝালো দৃষ্টিতে তাকাতেই নির্নিমেষ চেয়ে তুষার শুধু বললো, “সরি।”

হৈমন্তী দাঁড়ালো না আর। ছুটে চলে গেল সেখান থেকে।

___________________

চলবে…

হৈমন্তীকা
ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
সূচনা পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here