আমার আকাশে তারা নেই ২ পর্ব -০৩

#আমার_আকাশে_তারা_নেই ২
#লাবিবা_আল_তাসফি

৩.
নীল আকাশ মেঘলা হলো। ঝংকার তুলে গর্জে উঠলো বারকয়েক। কিছুক্ষণ বাদেই একরাশ জলরাশি আছড়ে পরতে শুরু করলো ধরনির বুকে। পরিবেশ হয়ে এলো শীতল। ইচ্ছে এক মগ চা হাতে চিলেকোঠার ঘরটিতে চলে গেল। বৃষ্টি হলেই চা হাতে এখানে চলে আসে সে। চা খেতে খেতে টিনের চালায় পড়া বৃষ্টির ছন্দ শুনতে অসাধারণ লাগে। ছোট্ট এই চিলেকোঠার ঘরটিতে একটা খাট, সোফা আর ছোট্ট একটা টি টেবিল আছে। রয়েছে ছোট্ট একটা বারান্দা। যেখানে রয়েছে রাশি রাশি ফুলের মেলা। টিনের তৈরি এই ছোট্ট ঘরটা ইচ্ছের খুব সখের। সে ব্যাতিত এই রুমে আসার পার্মিশন আর কারো নেই।
চিলেকোঠার ছোট্ট জানালাটার সামনে দাঁড়িয়ে খুব আয়েশ করে চায়ের মগে ঠোঁট ছোয়ালো ইচ্ছে। এ যেন এক চরম তৃপ্তি। হঠাৎ তার নজর গেল বাড়ির উঠোনে। একটা ছেলে এই বৃষ্টির মাঝে চেয়ারে ঠাঁয় বসে রয়েছে। ইচ্ছের কপাল কুঁচকে আসলো। লোকটাকি পাগল? এই বিকেলে বৃষ্টিতে কে এভাবে ভেজে? ইচ্ছে না চাইতেও বেশ কিছুসময় সেদিকে চেয়ে রইল।

বৃষ্টি থেমেছে ঘন্টা দুয়েক হবে। এখন সন্ধ্যা নেমেছে। বাইরে থেকে আজানের সুমধুর সুর ভেসে আসছে। ইচ্ছে তার রুমের জানলা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার বৃষ্টিতে ভেজা এক য়োহময় পুরুষের দিকে। নদীর কাছ থেকে শুনেছে লোকটা নাকি তাকে বিয়ে করার জন্য এমন পাগলামী করছে। ইচ্ছেকে ছাড়া সে এক পা ও নড়বে না। মোশতাক মোড়ল বারকয়েক তাকে বুঝিয়ে এসেছেন কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। ইচ্ছে হতবাক হয়ে গেল শুনে। ছুটে এসে জানালার পাশে দাঁড়ালো।

ইহান একেরপর এক হাঁচি দিয়ে চলছে। নাকটা বোধহয় আজ তার ছিঁড়েই যাবে। ভেজা শরীরে বসে থাকা কষ্টের হয়ে যাচ্ছে। আকাশি রংয়ের শার্ট টা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল। এ বাড়ির লোকগুলো বড্ড পাষাণ। নয়তো এতোকিছুর পরেও কিভাবে তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারে? চোখজোড়া বুজে আসতে চাইছে বারবার। জ্বর চলে এসেছে হয়তো। আসুক তবুও সে নড়বেনা। ঝড় বন্যা কোন কিছুই আজ তার পথে বাঁধা হতে পারবে না। কততে তারা মানবেনা সেটা সেও দেখে ছাড়বে। ইহান বাড়ির দিকে উঁকিঝুঁকি দিল। যার জন্য এত আয়োজন সে কোথায়?

______________

ইচ্ছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নাকের ডগা লাল হয়ে এসেছে। একঘন্টা জাবত সে এভাবে কেঁদে চলছে। নাহার বিরক্ত হয়ে একবার ধমক দিয়ে গেছেন। এতে কান্না কিছুটা কমলেও পুরোপুরি ভাবে থামলো না। নদী তার পাশেই গোল হয়ে গালে হাত রেখে বসে আছে। তার বয়স সবে আট কিন্তু বুদ্ধিতে সে ইচ্ছের থেকে অনেক বড়। নদী আপাতত মোনোযোগ সহকারে ইচ্ছের কান্না করা দেখছে। কোন একসময় ঝগড়ায় না পাড়লে এভাবে কেঁদে ভেঙাবে সে ইচ্ছেকে।
ডাক্তার এসে দেখে গেছেন ইহানকে। জ্বরে জ্ঞান হারিয়েছে। আপাতত ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছেন। মোশতাক হক লোক পাঠালেন ওষুধ আনার জন্য। ইহানের বাবাকেও একটা খবর দেওয়া দরকার।

“আর অমত কইরেন না। মেয়েতো আর একদম ছোট না। বুঝে সব। ছেলেটা ভালো, শিক্ষিত। বংশ মর্যাদা ও ভালো। অমত কইরেন না।”

নাহারের কথায় ভাবনায় পড়ে গেল মোড়ল সাহেব। খুব আদরের মেয়ে তার। এত তাড়াতাড়ি দূরে পাঠানোর কোন ইচ্ছা তার নেই। কিন্তু এই ছেলেকেতো ফেরাতে পারবে মনে হয়না। পরক্ষণে তার মনে হলো বর্তমানের ছেলেগুলোর লজ্জা শরম বলতে কিচ্ছু নেই। সে তো তার শ্বশুরের দিকে চোখ তুলে তাকাতে লজ্জা পেত আর এই ছেলে? নাক কুচকালেন মোশতাক মোড়ল। চেয়ার ছেড়ে উঠে যেতে যেতে বললেন,”অসভ্য ছেলে।”

_____________

কড়িডোরের এ মাথা থেকে ও মাথা পায়চারি করছে ইচ্ছে। মাঝে মধ্যেই উঁকি দিয়ে গেস্টরুমের দিকে তাকাচ্ছে। খুব অস্থির লাগছে তার। না
মানুষটার কি অবস্থা এখন খুব জানতে ইচ্ছা করছে। সে কি চট করে একবার দেখে চলে আসবে? কিন্তু যদি বাবা দেখে ফেলে? সে ভয়ে আর আগাতে সাহস পেল না। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে আবারো নিজের রুমে এসে বসলো। আসলে তার ইহানের জন্য বড্ড মায়া কাজ করছে।

ইহানের জ্ঞান ফিরলো বেশ সময় নিয়ে। চোখ রক্তলাল হয়ে আছে। যেন এখনি চোখ গড়িয়ে রক্ত ঝড়বে। এই অসুস্থ শরীরেও তার জেদ কমলো না। ঢুলতে ঢুলতে ড্রয়িংরুমে এসে ঠান্ডা মেঝেতে বসে পড়লো। এ খবর মোশতাক মোড়লের কানে যেতেই সে ছুটে এলো একপ্রকার।

“কি শুরু করেছ তুমি?”

“বাবা আপনার মেয়েটাকে চাই শুধু।”

“এই এই কে তোমার বাবা?”
চেঁচিয়ে উঠলেন মোশতাক মোড়ল। বিরক্তি যেন তাকে চেপে ধরেছে। ছেলেটা তাকে সরাসরি বাবা বলে ডাকতে শুরু করেছে।
ইহান হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। শরীর তাকে বিছানার দিকে টানছে। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে মোশতাক মোড়লকে বলল,”ঐ রুমটা আমার পছন্দ হয়নি তাই এখানে এসে বসেছিলাম। আমাকে আপনার মেয়ের ঠিক পাশের রুমটায় থাকার ব্যাবস্থা করে দিন।”

চমকে তাকালেন মোশতাক মোড়ল। হতবাক হয়ে গেলেন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হাঁটুর বয়সি ছেলেটির কথায়। তার বাড়িতে দাঁড়িয়েই তাকে হুকুম করছে? হিম্মত আছে বলতে হয়। সে তো এমনি একজন চেয়েছিল যে তার মেয়েকে তার কাছ থেকে মাথা উঁচু করে চাইবে। সস্মানে নিজের করে নিতে পারবে তার রাজকন্যাকে। কিন্তু তবুও ছেলেটা বেশ নির্লজ্জ। লজ্জার ল টাও নেই তার মাঝে। নয়তো এমন শান্ত কন্ঠে অশান্তর মতো অসভ্য টাইপের কথা বলতে পারে কেউ? ছেলেটার এটিটিউড তাকে শুরু থেকেই চমকে দাচ্ছে। মোশতাক মোড়ল আঙ্গুল উঁচিয়ে ইহানকে শাসালেন।

“তুমি…..তুমি একটা অসভ্য ছেলে। আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবে। ওর আশপাশেও তোমায় দেখতে চাইনা।”

মনে মনে আরো কিছু বলার জন্য প্রস্তুতি নিলেও আর একটি বাক্য ও ব্যায় করলেন না তিনি। ইহানের শরীরের তাপ সে দুহাত দূরে দাঁড়িয়েও যেন উপলব্ধি করতে পারছে। এতটা জ্বর নিয়ে ছেলেটা তার সাথে সমানে যুদ্ধ করে যাচ্ছে ভেবেই অবাক হলো। ভাবলো জামাতা হিসেবে একদম পারফেক্ট আছে! জামাই শশুর বেশ জমবে!

_______________

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আজ কোন নাম না জানা কারণে ইচ্ছের ঘুম ভেঙ্গে গেল। বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গেল। মৃদু আলো ফুটেছে। কিছুসময়ের মাঝেই পুরো ধরনি আলোকিত হয়ে উঠবে। ব্যস্ত হয়ে উঠবে এই নিস্তব্দপূরী। নিরবে পা ফেলে রুমের বাইরে এলো। এখনো কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। ইচ্ছে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে এসে দাড়ালো। মুক্ত বাতাসে উড়ে যেতে মোন চাইলো। দুহাত মেলে ধরলো। আহ কি শান্তি!
হঠাৎ তার মনে হলো চিলেকোঠার ঘরটিতে কেউ একজন আছে। খুটখুট শব্দ আসছে ওদিক থেকে। কপালে ভাঁজ ফেলে এগিয়ে গেল সেদিকে। দরজাটা খোলাই আছে। ভেতরে উঁকি দিতেই সোফায় বসা সুঠাম দেহের এক পুরুষকে আবিষ্কার করলো সে। এ বাড়িতে চোর ডাকাত আসার সম্ভাবনা নেই। বাড়ির কারো সাহস হবেনা এখানে আসার। তাহল? মুহূর্তেই রাগে মুখ লাল হয়ে এলো তার। একটু মায়া দেখিয়েছে যেই অমনি সব কিছু নিজের ভাবতে শুরু করেছে দেখছি লোকটা।
টিনের দেয়াল হাতরে লাইটের সুইচ টিবলো ইচ্ছে। মুহূর্তেই আলোকিত হয়ে গেল রুমটা। হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠায় চমকে তাকালো ইহান। পড়নে তার ধুসর রংয়ের ট্রাউজার গায়ে সাদা টি-শার্ট। টি-শার্টের অধিকাংশ অংশই ঘামে ভিজে আছে। ইচ্ছে সেদিক থেকে নজর সরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। যেন চোখ দিয়েই ভষ্ম করে দিবে সামনে থাকা মানুষটিকে। বিনা পার্মিশনে এখানে আসার সাহস হলো কিভাবে লোকটার! কিন্তু তার সামনে থাকা মানুষটিকি আদেও তার পরোয়া করলো?

ইহান একদম শান্ত ভাবেই তাকিয়ে আছে ইচ্ছের দিকে। যদিও তার আকাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে স্বচক্ষে দেখে তৃপ্ত হলো খাঁ খাঁ করো মরুভূমির ন্যায় হৃদয়। কিন্তু তার মুখভঙ্গিতে তেমন কিছুই বোঝা গেল না। কিন্তু হঠাৎ করেই এই শান্ত মানুষটা অশান্ত কথা বলে টলিয়ে দিল ইচ্ছেকে।

“এভাবে চেয়ে থাকবেন না। প্রেমে পড়ে যাবেন। তখন আপনার বাবার আফসোসের শেষ থাকবে না। এর চাইতে বরং আপনি অন্য দিকে ফিরুন আমি আপনাকে দেখি। আমার বারবার এক আপনির প্রেমে পড়তে বাঁধা নেই।”

চলবে………

(ভুলত্রুটি মার্জনীয়।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here