একটি নির্জন প্রহর চাই পর্ব -০৫

#একটি_নির্জন_প্রহর_চাই
৫.
#writer_Mousumi_Akter

রোশান স্যার কে দেখেই জানালার নিচে বসে পড়লাম আমি।উনি জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বললেন,

‘শেষ পর্যন্ত এখানেও অত্যাচার শুরু করলে?’

বলেই ওটা আমার গায়ের উপর ছুড়ে ফেলে চলে গেলেন।কি সাংঘাতিক লজ্জা দিয়ে গেলেন আমাকে।বার বার কি হচ্ছে এসব আমার সাথে।আমাকে কি জ্বী”নে ধরছে নাকি।বাইরে থেকে তরী ডাকছে,

‘ভাবী কাজ হয়েছে আসুন।’

‘হ্যাঁ আসছি।’

ঘর থেকে বেরিয়ে তরীর সাথে রান্নাঘরের দিকে গেলাম।আমাকে দেখেই রোশান স্যারের মা এগিয়ে এসে বললেন,

‘কি ব্যাপার মা তোমার ঘুম ভাঙল।এসো তোমাকে দেখতে সকাল থেকে মানুষ এসে বসে আছে।’

আমি স্বভাবসুলভ হাসলাম। এরই মাঝে আরেকজন ভদ্রমহিলা বয়স ৫০+ হবে সেও আমাকে দেখে এগিয়ে এলো।উনি রোশান স্যারের ফুফু হন।আমার গালে হাত বুলিয়ে বলল,

‘তরীর মতো মিষ্টি হয়েছে আমাদের বড় বৌমা।’

শ্বাশুড়ি মা কথাটা শোনার সাথে সাথে বলল,

‘আপা কিসের সাথে কিসের তুলনা করেন আপনি।তরী নতুন বউ এর বা’পায়ের ধোয়া পানি খাওয়ার যোগ্য ও না।কোথায় তরী আর কোথায় সারাহ।’

ফুফু শ্বাশুড়ি চট করে রেগে গেলেন।তরীর মুখের দিকে তাকালেন।আমিও তরীর মুখের দিকে তাকালাম।তরীর মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। তরী মাথা নিচু করে চলে গেলো।শ্বাশুড়ি তরীর সাথে এমন ব্যবহার করল কেনো?এই ভাবে কারো সাথে কারো তুলনা করে কেউ।

ফুফু শ্বাশুড়ি রাগান্বিত হয়ে বলল, ‘ তরী তরীর জায়গায় সুন্দর আর সারাহ তার জায়গায় সুন্দর। বাড়িতে নতুন বউ নতুন আত্মীয় তোমার সাথে ঝ’গ’ড়া করতে চাইছি না।’

আমাকে নিয়ে একটা চেয়ারে বসানো হলো।মানুষ জন আসছে আর রিতীমত জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছে তোমার নাম,কয়ভাই বোন,কোন ক্লাসে পড়ো,একটু উঠে দাঁড়াও,চুল গুলো দেখি।এক ঘন্টা ধরে অন্তত ৪০ জনের কাছে ইন্টারভিউ দিলাম।ভীষণ বিরক্ত লাগছে আমার।রোহান ছুটে এসে আমার কোলে উঠল।আমি রোহান কে কানে কানে বললাম, ‘তোমার আম্মুকে একটু ডেকে আনবে। ‘
রোহান কোল থেকে নেমে দ্রুত ছুটে গেলো।এক মিনিটের মাঝে তরী ছাই মাখা দু ‘হাত নিয়ে এসে আমার কাছে ঝুঁকে প্রশ্ন করল, ‘কি হয়েছে ভাবি?’
তরীর কানে কানে ফিসফিস করে বললাম,
‘আমায় একটা উপকার করবে বোন প্লিজ।’
‘কি উপকার।’
‘আমার একটা ছবিসহ আমার রুপ-চেহারার যাবতীয় বিবরণ দিয়ে এ বাড়ির মেইন গেটে সুপার গ্লু দিয়ে লাগিয়ে রাখবা।প্রথমে লিখবা এই অ-সুন্দ্রী মহিলা এ বাড়ির বড় ছেলের নব্য বউ।তার গায়ের রং ফর্সা হলেও ফেস খুব একটা ভালো নয়।হাইট ৫ ফিট সাড়ে ৩”। মাথার চুল বড় ও না ছোট ও না,সামনে লেয়ার কাটিং, পেছনে ইউ।ভ্রু প্লাগ করা আছে,বাম হাতের নখ ও রাখা আছে।আর নতুন বউকে হেসে দেখাতে বলবেন না।কারণ হাসলে তাকে ভাকো দেখায় না।আরো একটা সমস্যা আছে শীতকালে মোটেও হাসতে বলবেন না, হাসলে ঠোঁট ফেঁটে যায় তাই ঠোঁট চেপে ধরে হাসতে হয়।’

তরী আমার কথা শুনে ভীষণ জোরে হেসে দিলো।যে হাসিকে বলে প্রাণখোলা হাসি।তরী হাসলে এত সুন্দর লাগে আগে তো বুঝতে পারিনি।শ্বাশুড়ি আমাকে পাম দিলেন কেনো বুঝলাম না।তরীর চেহারা এতটায় সুন্দর যার কাছে আমি কিছুই না।অথচ শ্বাশুড়ি প্রশংসা টা আমার ই করে গেলেন। কি আশ্চর্য!তরী হাসতে হাসতে আবার চলে গেলো।মেয়েটাকে এভাবেই হাসি খুশিতে রাখার চেষ্টা করতে হবে।আর কতক্ষণ বসে থাকতে এভাবে কে জানে।আমার আবার ধৈর্য খুব কম।এক জায়গা অনেক্ষণ বসে থাকতে পারিনা,অস্হির টাইপের মেয়ে আমি।আর জনে জনে একই কথা বলতেও ভাল লাগেনা।আমি যার আলসেমির জন্য মেসেজের রিপ্লাই তাই করিনা ঠিকভাবে।ফ্রেন্ডরা আমার পোস্টে গিয়ে কমেন্ট করে ইনবক্স চেক কর,পব্লিক প্লেসে গা’লি খাওয়ার আগে।বন্ধু জাতির পক্ষে অসম্ভব কিছুই নেই।পাব্লিক প্লেসে ইজ্জত যাবার আগে ছুটে যায় ইনবক্সে।আর সেখানে রিপ্লাই করি।আমার জীবনে আলসেমির শেষ নেই।পড়তে বসি পরীক্ষার আগের দিন রাতে।দু এক লাইন এর ধারণা নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে পৃষ্টার পর পৃষ্টা লিখে ফেলি।ভাজ্ঞিস যা লিখি সব স্যার রা তা আমাকে পড়ে শোনান না।তবে একবার রোশান স্যার ই আমাকে এই লজ্জা দিয়েছিলেন। অন্য স্যার রা বানিয়ে লিখলেও মার্ক দেন কিন্তু রোশান স্যার তা দেন না।এইতো কিছুদিন আগে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের টেস্ট পরীক্ষায় রেজাল্ট এর দিন আমি একটা সাব্জেক্ট এ বারো পেয়েছিলাম।রোশান স্যার সবার মাঝে আমার খাতা পড়ে শোনাতে বলেছিলেন।প্রশ্নটা ছিলো ব্যবসায়ের নীতি আলোচনা করো।আমি লিখেছিলাম ব্যবসায়ে নিতী অনেক গুরুত্বপূর্ণ।এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতেই হবে।এর গুরুত্ব বলে শেষ করা সম্ভব নয়।এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে পারলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব সাথে উন্নতি ও সম্ভব।তাই ব্যবসায়ের নিতী অত্যান্ত জরুরী।ক্লাসের সবাই হাসছিলো আর রোশান স্যার অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে।এইভাবে অনেকের সাথেই স্যার এমন করেছিলো।
লুকা প্যাসিওলির জন্ম কত সালে এটা ভুল করে ১৯৭১ সাল দিয়ে ফেলছিলাম।রোশান স্যার বলেছিলেন, ‘কি ভেবে তুমি ১৯৭১ সাল দিলে।’
আমিও মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে স্যার কে সত্য কথাটা বলেই দিলাম স্যার আমার ১৯৭১ সাল ছাড়া আর কোনো সাল ই মনে থাকেনা।সকাল দশ টা বেজে গিয়েছে মানুষের দেখাদেখি শেষ হতে।এরপর আমাকে ডায়নিং নিয়ে যাওয়া হলো।
ডায়নিং এ সবাই সকালের নাস্তা খাচ্ছি।ওশান নাকি এখনো ঘুম থেকে ওঠে নি আর রোশান স্যার কি কাজে গিয়েছে।আমার দাদু, রোশান স্যারের দাদু,শ্বশুর,শ্বাশুড়ি,ফুফু শ্বাশুড়ি সবাই একসাথেই বসেছি।রোশান স্যারের দাদু আর আমার দাদুর খোশ গল্প শেষ হচ্ছেনা।দুই বুড়োর যেনো ইদ লেগেছে।এই বিয়ে দিতে পেরে তারা ভীষণ আনন্দিত।রোশান স্যারের দাদু আমাকে বললেন, ‘সারাহ তোমার সে লোক কোথায়?’
মিহি কন্ঠে বললাম, ‘জানিনা দাদু।’
‘ফোন করো,নতুন নতুন এক সাথেই খেতে হয়।’
এরই মাঝে আমার দাদু বলল, ‘সারাহ পরে খাবে রোশান আসুক আগে।’
এই আমার দাদু কি অশান্তিতে ফেলল।এমনি খুদা লেগেছে আমার।
রোহান বলল, ‘আমি নতুন বউ এর হাতে খাবো।’
ওর প্রস্তাব টা শুনে আমার খুব ভাল লাগল।বাচ্চা আমার খুব ভাল লাগে।আমি রোহান কে আদর করছি আর খাইয়ে দিচ্ছি।মনে মনে তরী কে খুজছি।শ্বাশুড়ি কে জিজ্ঞেস করলাম,

‘আচ্ছা আম্মা তরী কোথায় ও খাবেনা?’

‘সে কি আর তোমার মতো শিক্ষিত মেয়ে যে ভদ্রতা শিখবে।মানুষ কে ডেকে যে একসাথে খেতে হয় সেই ভদ্রতা টুকু ও তার নেই।শুধু শুধু কি আর আমার ছেলে ওকে দেখতে পারেনা।রান্না এক পাশ দিয়ে হয় আর আরেক পাশ দিয়ে ভাল ভাল টা নিয়ে আগে খেয়ে নেয়।’

‘ওহ তরী তাহলে খেয়েছে আমাকে ছাড়াই।’

‘ হ্যাঁ, খেয়েছে সে।’

সবার খাওয়া শেষ আমাকে বসিয়ে রেখে গিয়েছে রোশান স্যারের জন্য।সে না আসলে নাকি খাওয়া যাবেনা।দাদুর কথা মহব্বত বাড়ার ব্যাপার স্যাপার আছে এখানে।ডায়নিং ছেড়ে উঠে রান্নাঘরের দিকে উঁকি দিতে গেলাম।গিয়ে দেখি ঘরের পেছনে তরী মাছ কুটছে।মাবুদ এত মাছ একা একা কখনো কোটা যায়।তরীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্বাশুড়ি মা।তরী অনুনয় করে বলছে,

‘আম্মা আমার না কোমর লেগে গিয়েছে।এত ছোট মাছ একা হাতে কুটতে পারছিনা আর।কিছু মাছ ফ্রিজে রেখে দেই পরে কুটে নিবো।’

‘নবাবের বেটি।ফ্রিজ কি বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছো।একটু সুতো ও তো আনোনি সাথে করে।এত নবাবী চাল কিভাবে আসে।’

‘আমি কি সে কথা বলেছি।আমার কি কেউ আছে দেওয়ার মতো।বাবা গরিব তার দেওয়ার সামর্থ নেই আপনারা তো জানেন ই।সে কি বেঁচে আছে যে দিবে।’

‘তাহলে চুপচাপ মাছ কোটো,সবার খাওয়া হয়ে গিয়েছে থালা বাটি সব ধুয়ে যা আছে খেয়ে নিও।আর নতুন বউ এর কাছে যেনো কিছু বলতে যেওনা।’

তরীর জন্য তো অবশিষ্ট কোনো ভালো খাবার নেই।শ্বাশুড়ি মিথ্যা বলল কেনো যে তরী আগে খেয়ে নিয়েছে।তরীর অবস্থাটা বুঝতে পারছি আমি।আমি তরীকে এইভাবে নির্যাতিত হতে দিতে পারিনা।

এরই মাঝে পেছন থেকে কেউ আমাকে ডেকে বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম ভাবি।আসলে ব্যস্ততার জন্য ভাইয়ার বিয়েতে উপস্হিত হতে পারিনি।’

আমি পেছন ফিরে তাকিয়েই ওশানের মুখোমুখি হলাম।আমাকে দেখেই চমকে গেলো ওশান।ওর মুখটা চুপসে এতটুকু হয়ে গিয়েছে।কখনো কি ভেবেছিলো এইভাবে ধরাটা খাবে।ওশান দেখে মনে হচ্ছে ভয়ানক কোনো বজ্রপাত ওর মাথায় হয়েছে।ভীষণ অবাক হয়ে বলল,

‘সারাহ তুমি!’

এরই মাঝে পেছন থেকে রোশান স্যার বললেন,

‘ও ভাবি হয় তোর। ভুলেও নাম ধরে ডাকবি না।লাস্ট বারের মত বলে রাখলাম।’

ওশানের থেকে চোখ সরিয়ে রোশান স্যারের দিকে তাকালাম।কথাটার মাঝে কত সিরিয়াসনেস ছিলো।হঠাত এক অদ্ভুত ভাল লাগা কাজ করল মনের মাঝে।

রোশান স্যার আমার দিকে তাকাতে তাকাতে ঘরে প্রবেশ করলেন।

চলবে?..

(অবশ্যই সবাই মন্তব্য করবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here