কাছে দূরে পর্ব ৫০

#কাছে_দূরে 💞
#moumita_meher
#পর্ব___৫০

—-‘ তুমি লোক দুটোকে একাই হ্যান্ডেল করলে! হাউ ইজ দ্যাট পসিবল। যে মেয়েটা দিনের পর দিন শত্রুদের টর্চার সয়ে এসেছে। শত্রুদের আঘাতে দিনের পর দিন হসপিটালের বেডে কাটিয়েছে। মরেছে, বেঁচেছে! আজ তারএ-কি রূপ! সে আজ দুটো দানবকে একা হাতে সামলেছে। হাউ?’

হীর ফ্লোরের রক্ত মুছে কেবল হাত ধুয়ে এসে দাঁড়ালো। ঠিক তখনই পেছন থেকে আচমকা সাবাবের কন্ঠে অপ্রত্যাশিত কথা গুলোয় ভড়কে গেলো সে। চমকে উঠে হাত জোড়া মুষ্টিবদ্ধ করে চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেললো। সাবাব তো জ্বরের ঘোরে কাতর হয়ে ঘুমচ্ছিলো। তবে এসব সে কি করে দেখলো? তারউপর কড়া ডোজের ঘুমের ঔষধ। এসব কিছুকে সাবাব মাত দিয়ে কি করে উঠতে পারে? সে তো একশভাগ নিশ্চিত ছিলো সাবাব কাল ভোরের আগে ঘুম থেকে উঠবেনা। তবে কি করে হলো?

—-‘ কি হলো জবাব দিচ্ছো না কেন?’

সাবাব নিঃশব্দে হেঁটে এসে হীরের পেছনে দাঁড়ালো। সাবাবের অস্তিত্ব ঠিক তার পেছনে আবিষ্কার করতে পারলেও সাবাবের দিকে তাকাতে তার সাহস হলো না। কোনো এক ভয়ংকর পরিচয় সামনে আসার ভয়ে।

—-‘ তবে কি আমি আমার হীরপরিকে চিনতে ভুল করেছিলাম? সেই চুপচাপ শান্ত মেয়ের বেশ টা তবে মুখোশ ছিলো? সেই মুখোশের আড়ালে ছিলো ট্রং,সাহসী, নির্ভীক এই মেয়েটা? যে একজন ওয়েল ট্রেইনড ফাইটার! আই স্টিল কান্ট বিলিভ ইট হীর! হাউ?’

হীর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সাবাবকে দেওয়ার মতো জবাব তার কাছে হাজারটা থাকলেও সে একটা জবাবও দিতে পারবেনা। কারন একটা জবাব দিলে তার বিরুদ্ধে উঠে আসবে আরও একশটি প্রশ্ন। এক আঘাত সামলাতে না সামলাতে সাবাব আরেক আঘাতে ভেঙে গুঁড়িয়ে পরবে। এই মুহুর্তে সেটা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবেনা। সাবাব পুরো ঘটনাটা যেভাবে চাচ্ছে সেভাবেই সামনে আসুক। একটু একটু করে সামনে আসুক। সবটা একসাথে তার সম্মুখে এসে দাঁড়ালে সে সহ্য করতে পারবে না।

—-‘ আই নিড টু মাই এন্সার হীর। স্পিক আউট-(মৃদু চেঁচিয়ে)’

সাবাবের অল্পস্বল্প আওয়াজেই কেঁপে উঠলো হীর। চোখে মুখে ফুটিয়ে তুলল ঠিক আগের মতো ভয়। সে ভীত মুখ করেই ফিরে তাকালো সাবাবের দিকে। বারবার চোখের পলক ফেলে ঢোক গিলে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল,

—-‘ কককি… কি বলছো তুমি? জ্বরের ঘোরে কি আবোলতাবোল বকছো!’

সাবাব ফট করে কপাল কুঁচকে ফেললো। সে বোঝার চেষ্টা করলো হীরের ধূর্ততা। তার মস্তিষ্ক বলছে হীর অভিনয় করছে কিন্তু মন বলছে, ‘না। হীর অভিনয় করছে না। এই তো তার হীর। তার হীরপাখি।’
সাবাব সুক্ষ্ম মস্তিষ্কে ভাবলো। তবে জবাবে কিছু বলতে পারলো না হীরকে। ফ্যালফ্যাল করে সে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে হীরের চোখে,মুখে,ঠোঁটে দেখছে। হীর করুন চাহনিতে সাবাবে মস্তিষ্ক পড়ার চেষ্টা করলো। নেহাত সে এখন অসু্স্থ বলে, অন্যথা আজ তার সব রহস্য ফাঁস হতো। সাবাব হঠাৎ কেঁপে উঠলো। হীর উদ্বিগ্ন চোখে তাকালো। সাবাবের জ্বরটা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। হীর ব্যস্ত হয়ে ঝাপটে ধরলো সাবাবকে। ধরে ধরে বিছানা অব্দি নিয়ে গিয়ে বসিয়ে গ্লাস ভর্তি জল দিলো খেতে। সাবাব ঠিকঠাক ভাবে জলটা ধরে খেতে পারলোনা। হীর নিজের হাতে ধরে জলটা খাইয়ে দিলো তাকে। সাবাব তৃপ্তি নিয়ে জলটা খেয়ে নিলো। হীর জলের গ্লাস পাশে রেখে গলার স্বর মোটা করে বলল,

—-‘ দেখছো যে ঠিক ভাবে জলটুকুও খেতে পারছোনা। তাহলে ওঠার কি দরকার ছিলো? কিছু দরকার হলে তো আমাকে বলতে পারতে! তা না। সবসময় বেশি বোঝা।’

—-‘ তুমি আমার থেকে কিছু লুকোচ্ছো হীরপাখি?’

হীরের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। ধরা পড়া চোরের ন্যায় বারবার দৃষ্টি লুকিয়ে আমতাআমতা করে বলল,

—-‘ হ..হহ্যাঁ লুকোচ্ছি তো। আমি আরেকটা প্রেম করি সেটা লুকোচ্ছি। তুমি যে আমায় জোর করে বিয়ে করে ফেললে এখন আমার প্রেমিকের কি হবে বলো তো? সে তো আমাকে না পাওয়ার শোকে কাতর হয়ে যাচ্ছে। তার দুঃখ-

হীর কথাটা সম্পুর্ন শেষ করার আগেই সাবাব তার শক্ত হাতে হীরের চুলের মুঠি চেপে ধরলো। হীর চমকে উঠে ভয়ার্ত চোখে সাবাবের দিকে তাকাতেই সাবাব অন্যহাত তুলে হীরের গাল চেপে ধরলো। হীর ব্যাথায় কুকিয়ে উঠে চোখ বন্ধ করে নিলো। সাবাবের চোখ থেকে আগুনের লাভা গলে গলে পড়ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন স্বরে বলল,

—-‘ এই মুখে আমার নাম ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ছেলের নাম শুনলে জানে মেরে ফেলবো একদম। তুই শুধু আমার। শুধু আমার। আমি তোকে হারাতে চাই না বলেই জোর করে বিয়ে করেছি। তুই বুঝতে পারিসনা আমার মনের দহন? পড়তে পারিস না আমার মনের যন্ত্রণা? চোখে পড়েনা তোর? আমি বাদে সবার কষ্ট, সবার যন্ত্রণা তোর চোখে পড়ে। কেবল আমার কষ্টই তোকে ছুঁতে পারে না তাই না?’

—-‘ আ…ম আমার লাগছেহ্-

হীর ব্যাথায় আবারও কুকিয়ে উঠতে সাবাব যেন হুঁশে ফিরলো। আঁতকে উঠে হীরকে ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে পড়লো খানিকটা। হীর ছাড়া পেয়ে বড়বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিজের মুখে হাত বুলালো। আঁড়চোখে সাবাবের দিকে তাকাতে দেখলো সাবাব কেমন ছটফট করছে। হীর নিজের ব্যাথা ভুলে সাবাবের কাছে এগিয়ে গেলো। হীরকে কাছে আসতে দেখে সাবাব অপরাধী দৃষ্টিতে তাকালো। হীর ঠোঁটের কোনে হাসি জুড়ে বলল,

—-‘ তোমার শরীরটা একদম ভালো নেই। তারউপর মনের অবস্থাও শোচনীয়। তোমার এখন রেস্টের প্রয়োজন। এসব কথা ভুলে গিয়ে এসো শুবে এসো।’

—-‘ তোমার খুব লেগেছে তাই না?”

—-‘ (মৃদু হেসে) লাগলেই কি! তুমিই তো ছুঁয়েছ। দোষ তো নেই।’

—-‘ আমি তোমায় হার্ট করেছি।'(করুন কন্ঠে)

হীর থেমে গেলো। দুচোখ ভরো সাবাবকে দেখতে লাগলো। কেমন যেন এক বাচ্চা বাচ্চা আচরণ করছে সাবাব। অসুস্থতা তাকে বাচ্চাকালে ট্রান্সফার করলো নাকি? কথাটা ভেবে মনেমনে হাসলো হীর। পরক্ষণেই আবার ভাবলো,

‘তার ভেতরে বাচ্চামো ফুটে উঠলেও তখনকার একটা প্রশ্নও সে ভুল করেনি৷ নির্ভুল ভাবে জেরা করে তার মনেও ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাকেও বিকল্প ভাবতে বাধ্য করেছে তার এক একটা প্রশ্ন।’

—-‘ তোমার মনে হচ্ছে তুমি আমাকে হার্ট করেছো?’

হীরের প্রশ্নে সাবাব হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। করুন চাহনি দিয়ে বলল,

—-‘ তুমি হার্ট হয়েছো না? সত্যি বলবে।’

—-‘ হুম হয়েছি তো। খুব হার্ট হয়েছি। সরি বলো?’

সাবাব আচমকা বিছানা ছেড়ে নীচে নেমে গেলো। হীর চমকে উঠে সাবাবকে ধরতে নিলেই সাবাব তার পায়ের কাছে হাঁটু ভেঙে বসল। হীরের ভয়ার্ত চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। অতঃপর হীরকে অবাক করে দিয়ে হাত জোর করে কান ধরে বলল,

—-‘ আম সরি হীর পাখি। সরি।'(ঘাড় কাত করে)

সাবাবের কান্ডে হীর হৈহৈ করে হেসে উঠলো। সাবাব হীরের হাস্যজ্বল মুখের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো। সাবাবকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হীর হাসি থামিয়ে বলল,

—-‘ হয়েছে অনেক বাচ্চামো। এবার আর কোনো কথা হবেনা। শুবে এসো। এসো?’

—-‘ ভালোবাসি হীরপরি। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।’

হীরের হৃৎস্পন্দন থেমে গেলো। সেই সাথে হাস্যোজ্জ্বল মুখ খানা হয়ে উঠলো মলিন। তার মুখের হাসি ফুরিয়ে গেলো। চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেলো। হাওয়া থমকে গেলো। নিঃশ্বাস থমকে গেলো। মুহুর্তের জন্য যেন পুরো প্রকৃতিই থমকে গেলো। হীরের থমকানো দেখে সাবাব খুব মজা পেলো। মানুষকে তার সবচেয়ে প্রত্যাশার কিছু জিনিস এভাবে অপ্রত্যাশিত ভাবে দিলে সে কতটাই না খুশি হয়। অতিরিক্ত আনন্দে মুহুর্তের জন্য থমকে তার পুরো দুনিয়া। হীরের সাথেও এই মুহুর্তে সেরকমটা হয়েছে। আর ঠিক সেভাবেই হীরের দুনিয়াটাও থমকে গিয়েছে। সাবাব তার হাত জোড়া হীরের হাতের উপর রাখতেই চমকে উঠলো হীর। মনে হলো সবকিছু আবার চলতে আরম্ভ করেছে। তার হৃৎস্পন্দন খুব দ্রুত ছুটছে। আর নিঃশ্বাসও ভারি ভারি পড়ছে। তার চোখের পলক একবার পড়তেই এখন যেন বারবার পড়তে চাচ্ছে। গলা শুঁকিয়ে আসতেই ঢোক গিলে গলা ভেজানোর চেষ্টা করলো হীর। কিন্তু হলো না। ঢোক গিলতে যেন গলা আরও শুঁকিয়ে এলো।

—-‘ ভালোবাসি বিশ্বাস হচ্ছে না নাকি? এমন অদ্ভুত আচরন করছো কেন?’

—-‘ জ..জল!’

—-‘ খাবে?’

—-‘(ঢোক গিলে) হুমম।’

সাবাব হেসে ফেলল। হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বিছানায় হীরের পাশ ঘেঁষে বসে ছোট্ট ড্রয়ারটার উপর থেকে তার খাওয়া অর্ধেক জল টুকুই তুলে আনলো। হীরের মুখের সামনে ধরতেই হীর ঢকঢক করে পুরো জলটা এক নিমিষে শেষ করলো। সাবাব খালি গ্লাসটা পাশে রেখে হীরের দিকে ঘুরে বসলো। হীরের কাঁপা কাঁপা হাত জোড়া নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

—-‘ বিশ্বাস করে নাও।’

—-‘ ক..ককি!’

—-‘ আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

—-‘ পপপ… পরে!’

—-‘ কি পরে?’

—-‘ ঘঘুম.. ঘুম!’

—-‘ কি ঘুম?’

—-‘ ঘঘুম…ঘুমাবো।’

—-‘ উঁহু। তা তো হচ্ছে না।’

—-‘ (ঢোক গিলে) ক..ককেন!’

—-‘ আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে তারপরে ঘুমটুম।।’

—-‘ ক..কি..কি জবাব?’

—-‘ ভালোবাসো আমায়?’

হীর থমকে গেলো। এখন যেন কাঁপা কাঁপা কন্ঠেও কোনো কথা বের হচ্ছে না! বারবার ঢোক গিলে চলেছে সে। কি বলবে, কি বলা উচিৎ কোনো কিছুই আপাতত মাথায় ঢুকছে না তার। সবটা মাথার উপর থেকে ধেয়ে যাচ্ছে। সাবাব তার হাত জোড়া শক্ত করে চেপে ধরলো। উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। কিন্তু হীর নির্বিকার। উত্তর দেওয়া তার দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না।

—-‘ বলো না হীরপাখি? ভালোবাসো আমায়!’

কথাটা করুন শোনালো। হীর চোখের দৃষ্টি মাটিতে বিদ্ধ করে রেখেছে। মন বলছে সাবাবকে তার মনের কথা বলে দিতে। কিন্তু কন্ঠ যেন সহায় হচ্ছে না। কন্ঠ তার সঙ্গ দিচ্ছে না। সাবাব উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে হীরের নত মুখে। হীরের জবাব কি হবে ভাবতে গিয়ে তার মনটাও বড্ড ছটফট করছে। ভয়ে জান কবচ হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।

হীর জবাব দিতে পারলোনা। সাবাবের মনের আকুলতা আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—-‘ ঘুমিয়ে পড়ো। কাল কথা হবে।’

এই বলে উঠে চলে গেলো হীর। সাবাব তার যাওয়ার পানে অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,

—-‘ হ্যাঁ বা না উত্তর টা তো দাও!’

হীর জবাব না দিয়ে বিছানার অপরপ্রান্তে গিয়ে শুইয়ে পড়লো। সাবাব অসহায় দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে আছে। সাবাব যেন আর কিছু বলতে না পারে তার জন্যই হীর ঘুমের ভান করে পড়ে রইলো। সাবাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে হীরের পাশে শুইয়ে পড়লো। ইচ্ছে করলো আরও কিছু বলতে। কিন্তু বলা হলো না। একরাশ অভিমান বুকে চেপে পাশ ফিরে সেও চোখ বুজলো।

__________________

ভোরের আলো ফুটতেই হীর বিছানা ছাড়লো। সাবাবের ঘুমের গভীরতা মেপে চলে গেলো তার নিজের রুমে। নিজের রুমে তার অনেক পুরনো জিনিসপত্র আছে। সাবাব যদি কালকে রাতের কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করে তাহলে তার এই রূপ নিমিষেই খোলসা হয়ে যাবে সাবাবের কাছে। কারন সাবাব তার বাবার মতোই তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের অধিকারী। কোনো জিনিসের প্রতি তার একবার সন্দেহ হলে আর নিস্তার নেই। তার গোড়া অব্দি উগড়ে নেওয়ার ক্ষমতা সাবাবের আছে।

হীর তাড়াহুড়ো করে তার লক করা ড্রয়ার গুলো খুললো। এখানে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অনেক প্রমান রয়েছে যা সে গত পাঁচ বছর ধরে একটু একটু করে সংগ্রহ করেছে। অপরাধীদের আসল মাথা তিনজন। একজন এখানেই আছেন। আর বাকি দু’জন আছেন মালয়েশিয়া। একজন এসে তো আবার ফিরে গেলেন। বাকি একজন বারো বছর মুখ লুকিয়ে পড়ে আছে সেখানে। তাকে পেতে হলে মালয়েশিয়া যেতে হবে। তার সম্মুখে দাঁড়াতে হবে। তারপর তো হবে প্রতিশোধ। হীর কাগজ গুলো হাতে উঠিয়ে বাঁকা হাসলো। কাগজগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল,

—-‘ বারোটা বছর ধরে অনেক খেল দেখালে তোমরা। এবার আমার খেল দেখানোর সময় এসেছে। এবার দেখতে থাকো আগে আগে কি হতে থাকে!’

বলতে বলতে হেঁসে উঠলো হীর। তৃষ্ণামূলক হাসি। এবার যে সব পাপের বিনাশ করার সময় এসেছে। পাপের বিনাশ হবে এবার। বিনাশ!

এদিকে কেউ আসছে। হীর কারোর পায়ের শব্দ শুনেই সতর্ক হয়ে গেলো। চোখের পলক ফেলার আগেই কোনো এক গোপনীয় স্থানে সব প্রমান গুলো লুকিয়ে ফেলল। এ যেন দক্ষ হাতের খেলা। হীর প্রস্তুত হয়ে গেলো যে কারোর উপস্থিতির জন্য। সামনের ড্রেসিং টেবিলের উপর তার সব ব্যবহারের জিনিস পড়ে আছে। সে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে কিছু জিনিস লুফে নিলো। সেগুলো হাতে করে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলো নাজমা বেগম তার রুমের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। হীর যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো এক চিলতে মিষ্টি হাসি। নাজমা বেগম হীরের হাসি মাখা মুখ দেখে সেও একই রকম হাসলেন। বড়বড় ধাপ ফেলে এগিয়ে এলেন হীরের কাছে। হীরের হাতে এসব দেখে প্রশ্নসূচক মুখ করে বললেন,

—-‘ এগুলো কি নিজের ঘরে যাচ্ছে?’

হীর হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বলল,

—-‘ নিজের ঘর আর কই? বলো তোমার ছেলের ঘরে-

—-‘ শোন মেয়ের কথা! বিয়ের পর স্বামীর ঘরই তো নিজের ঘর হয় পাগলী। আমার ছেলের ঘর মানে ওটা তো আমার হীরপরিটারও ঘর।’

হীর অবাক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,

—-‘ এমন নাকি! আমি জানতাম না তো।’

নাজমা বেগম প্রাণোচ্ছল হাসলেন। হীরের হাত থেকে কিছু জিনিস নিজের হাতে তুলে নিয়ে বললেন,

—-‘ এতোগুলো জিনিস সব একসাথে নিলে কেন? দুই পাও তো যেতে পারবেনা। তার মধ্যেই সব হড়বড় করে পড়বে।’

হীর চোখ জোড়া সরু করে দরজার দিকে তাকালো। বড়মার কথাটা ঠিক কতটুকু বাস্তবায়ন হতে পারে তারই হদিশ চালালো। হ্যাঁ, খুব সম্ভাবনা আছে হাত থেকে সব পড়ে যাওয়ার। দরজা থেকে চোখ সরিয়ে সে বড়মার দিকে তাকালো। হাতের বাকি জিনিসগুলো সামলে ধরে হাঁটা শুরু করে বলল,

—-‘ বড়মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?’

নাজমা বেগম হীরের পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটা ধরলেন। জিনিসগুলো পড়ে না যায় সেদিকে সতর্ক হয়ে হীরের দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে বললেন,

—-‘ কি কথা?’

হীর নির্বিকার ভঙ্গিতে পূনরায় প্রশ্ন করলো,

—-‘ জীবনের ২৫টা বছর একজন অমানুষের সাথে কি করে পার করে দিলে? কখনও নিজের মনকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করেনি, কেন পড়ে আছি এই অত্যাচারী লোকের কাছে। কেন থাকছি তার সাথে? কেন সব অন্যায়, অবিচার মুখ বুঝে মেনে নিচ্ছি! কেন কোনো প্রতিবাদ করছিনা? কেন তাকে শাস্তি দিচ্ছি না?কখনও মনে হয়নি?’

নাজমা বেগম থমকে গেলেন। তার পা আঁটকে গেলো ফ্লোরের সাথে। সে চেয়েও যেন কদম ফেলতে পারছেন না সামনে। হীরের দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালেন নাজমা বেগম। হীরের দৃষ্টি স্থির। এই দৃষ্টিতে আগে ভয় ছিলো। কাঁপন ছিলো। কিন্তু আজ তা নেই। আজ আছে সত্য কথা, সততা, আর অভয়। নাজমা বেগমেরও যেন সাহস হলো। হীরের অগ্নি দৃষ্টি আর অগ্নি তেজে যেন তারও ভয় উধাও হয়ে গেলো। তিনি তার হাতের জিনিস গুলো হীরের হাতে ঠেসে দিয়ে বললেন,

—-‘ মা রে তুই এগুলো নিজের ঘরে রেখে আয়। আমি দেখছি সাবাবের বাবা উঠেছে কি না। আজ তোকে আমার অনেক কথা বলার আছে মা। অনেক কথা বলার আছে।’

হীর অবাক হয়ে গেলো নাজমা বেগমের কথায়। মুহুর্তেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো বাবা-মায়ের খুনিদের সম্পর্কে আরও কু-কর্মের হিসাব নিয়ে বসতে। হীর দ্রুত ছুটে গেলো নিজের রুমে। হাতের জিনিস গুলো কোনো রকমে রেখে আবারও ছুটে বেরিয়ে এলো। নাজমা বেগমও হন্তদন্ত হয়ে গিয়ে আবার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। হীরের হাত ধরে নিয়ে ছুটে গেলেন ছাদের দিকে। আজ সে তার মনে চেপে রাখা সমস্ত সত্য হীরকে বলবেন। পঁচিশ বছর ধরে চেপে রাখা কষ্টগুলো কে আজ সে চিরতরে বিদায় দিতে পারবেন। এর থেকে সুখের, প্রশান্তির আর কিছু হতেই পারেনা এই সংসারের। কিছু হতেই পারে না।

#চলবে_

[ বিঃদ্রঃ এতদূর কষ্ট করে পড়ে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করবেননা। যদি ছোট্ট একটা মন্তব্যে আপনার মতামত জানাতে কষ্ট হয়। ধন্যবাদ। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here