কুয়াশা মন পর্ব ৫

#কুয়াশা মন

পর্ব ৫…

বড় একটা ক্লাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বিয়ে শেষ হতে রাত অর্ধেক পেরিয়ে গেল। ভেবেছিলাম মজা তেমন একটা করতে পারব না। কিন্তু নিঃসঙ্কোচে আনন্দ যা চেয়েছিলাম লুটিয়ে নিয়েছি। তাতে ফুফি বা মিহির ভাইয়ার ভ্রূক্ষেপ ছিল না। তাঁরা তাদের মতোই বিয়েতে মশগুল ছিলেন। বিয়ে শেষে বর আর কনে চলে আসার অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমরা ক্লাবে ছিলাম, ফুর্তি করেছিলাম। আমি, আমার আপু, মায়া আপু, মুক্তা এবং তাদের বন্ধুবাধবরা সকলেই।
রাত এগারোটা নাগাদ সবাই বেরিয়ে এলাম। যে যার মতো গাড়িতে উঠছিল। অনেকাংশই আমার অপরিচিত হওয়ায় আমি গর্দভ বেশে দাঁড়িয়ে রইলাম। দু’একটা ছেলে জায়গা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের আশেপাশে। মিহির ভাইয়ারা সবাই যে যার-যার বাইকে। আমার পাশে এসে আচমকা দাঁড়াল মুক্তা। আমার পাশ থেকেই চিল্লিয়ে বলল, “ঐ, ওখানে আর কয়জনের জায়গা অবশিষ্ট আছে?”
দুলাভাই প্রায় চেঁচিয়ে বলল, “ওগো জানপাখি, জায়গা তো তেমন নেই। অনেক কষ্টে একটু করেছি। তুমি চলে এসো।”
বউয়ের প্রতি বলা ভাইয়ার আদুরে কথাগুলো শুনে আমরা সবাই হো হো করে হেসে দিলাম। পেছন থেকে মিহির ভাইয়া মুক্তাকে ডেকে বলছেন, তাঁর বাইকের পেছনেই বসতে।
দুলাভাইয়ের কাছে যেতে যেতে মুক্তা বলল, “উনি আমাকে ছাড়া বসবে না। তুমি বরং সাবিহাকে তোমার বাইকে নাও। ও বেচারি, আগেভাগে কোনোদিকে বসেনি।”
আমি বোকার মতো হা করে ছিলাম, জায়গাই পাচ্ছিলাম না। মুক্তা যাওয়ার সময় এক চোখ টিপে দিয়ে চলে গেল। এ কী করল সে? সে কি আমার পক্ষে? আমাকে আর মিহির ভাইয়াকে এক করার কথা ভাবছে না তো? তা হলে বরং সে তো আমায় বড় অসুবিধায় ফেলে গেছে। ভাইয়া আমাকে মোটেও পছন্দ করেন না। নেবেন আমাকে? আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম।
অল্পক্ষণের মধ্যে সবাই যে যার মতো করে বেরিয়ে পড়েছে। একা রয়ে গেলাম আমি। পেছনে ফিরে যেই দেখি, একি! ভাইয়া এখনও আছে। কীভাবে রাগে ফুঁসছে আমায় দেখে দেখে। এরচেয়ে বরং আমি কোনো একটা গাড়ি খুঁজে চলে যাই। শতগুণে রেহাই পাব। না, ভাইয়া তো আমার অপেক্ষায় আছেন। আমি বরং তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
“আমি আগেই তোমাকে সঠিকভাবে চিনেছি, চালবাজ হিসেবে। মুক্তাকেও নিজ পক্ষে করে নিয়েছ। তাই না? দেখেছিলাম আমি, কীভাবে সে ভাইয়াকে প্ল্যান বুঝাচ্ছিল, ‘আপনাকে জায়গার কথা জিজ্ঞেস করলে চিল্লিয়ে বলবেন শুধু আমার জন্যই জায়গা আছে।’ আর কতটুকু নিচে নামবে যদি বলে দিতে তবে উপকৃত হতাম।”
সেদিনের মতো আবারও আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। আমাকে নিয়ে তিনি যে হারে ঘৃণাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, আমার সাফাই কি কানে নেবেন?
“দাঁড়িয়ে কেন আছ? আমি তোমাকে নিতে চাই না। গাড়ি খুঁজে নাও নিজের জন্য।”
আমি মুখ ফিরিয়ে রাস্তার দিকে চলে এলাম। সেদিনের মতো শব্দ করে কাঁদলাম না। তবে লক্ষ্য করলাম, নিষ্ঠুর চোখগুলো বাধা মানল না। চোখের আশপাশ ভিজিয়ে দিলো। আমি নিরুপায় হয়ে নির্জন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ি পাওয়ার আশায় এদিক-ওদিক চোখকে ঘুরাচ্ছিলাম। কতদূর হবে এখান থেকে ফুফার বাসা? এক মাইল তো হবেই না। হেঁটে তো যাওয়া যাবে। গাড়ি আসে না যখন হাঁটা ধরাটাই শ্রেয়। তাছাড়া চেনা পথ। নির্বিঘ্নে চলতে লাগলাম।
একটু পর হঠাৎ পাশে মিহির ভাইয়া বাইক নিয়ে এসে দাঁড়ালেন। আমি লুকিয়ে চোখ মুছে আমার মতো করে হাঁটতে লাগলাম। এতক্ষণেও কেন তিনি যাননি? যাইহোক, তিনি অপমানের ওপর অপমান করবেন আর আমি কেবল শ্রোতা হয়ে থাকব? আমারও আত্মসম্মান বোধ বলতে কিছু আছে কি না?
ভাইয়া এবার বাইক নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “উঠে পড়ো। এতো রাতে এখানে গাড়ি সহজেই পাওয়া যায় না।”
আমি আমার মতোই হাঁটতে লাগলাম।
“কী বলছি শুনছ না? তোমার তো আবার বাবাকে সবকিছু বলে দেওয়ার অভ্যাস। তোমায় নিয়ে না যাওয়ার খবরটা বাবার কাছে পৌঁছতে মুহূর্ত খানেকও লাগবে? এভাবে হেঁটে যেও না। উঠে পড়ো বাইকে।”
আমি হাঁটতেই আছি দেখে ভাইয়া বাইক থেকে নেমে আমাকে টেনে বাইকের পাশে নিয়ে গেলেন। আবার কোনোকিছু হলে আমাকে দোষারোপ করবেন। তাই অগত্যা উঠে পড়লাম। তারপর তিনি বাইক চালাতে লাগলেন। বিগত সময়গুলোতে তার ব্যবহারে আমার মনটা আবার প্রবল ঘৃণায় ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। একটা মানুষকে যাচ্ছেতা বলার স্বভাব এখনও তার গেল না। তিনি হঠাৎ বাইক থামিয়ে আমায় রুমাল দিলেন, “চোখ মুছে নাও।”
একি! তিনি কি আমায় কাঁদতে দেখে ফেলেছেন? লুকিং গ্লাসের দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম, আমার মুখের প্রতিবিম্ব ওখানে সরাসরি ভাসছে।
“সামান্য বিষয়েও কান্নাকাটি করার স্বভাব এখনও গেল না তোমার?”
“সিরিয়াসলি! সামান্য বিষয়?”
“সামান্য কেন হবে না? সবকিছুতে দোষ তো তোমারই।”
আমি কোনো প্রতিশব্দ করলাম না। করলেও বা লাভ কী তাতে? দোষীই থাকব। তিনি আবার আগের মতো করে বাইক চালাতে লাগলেন।
তিনি অর্ধেক যেতেই আমি বলতে লাগলাম, “ফুফার কাছে নিশ্চয় শুনেছেন, রাতে আমি বেশি উত্তেজিত হয়ে ঘুমালে অর্ধরাতে বেড থেকে নিচের ফ্লোরে পড়ে যাই। আমি ফুফাকে এসব কথা অনেক আগেই শেয়ার করেছিলাম। তিনি অনেককেই বলে বেড়িয়েছিলেন।
ওইদিনটা ঠিক অমনই হয়েছিল। আমি ঘুমের ঘোরে পড়ে যাওয়ার সময় পাশে টেবিল থাকায় হাতসহ কিছু কিছু জায়গায় আঁচড় লেগেছিল। পরদিন ফুফার মাথায় তেল মালিশ করার সময় ফুফা ওই আঁচড়গুলো দেখলেন। আর এর একটু আগেই যখন তিনি জানতে পেরেছিলেন, ফুফির আমাকে রেখে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা, তখনই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেরাত আমি আর আপনি বাসায় একাই ছিলাম কিনা। আমি হ্যাঁ-বোধক উত্তর দিয়েছিলাম। এরপর ফুফা আমাকে আর কোনো কথা না বলে উঠে চলে গেলেন। এসব শোনার পরও যদি আপনার মনে হয় যে, আপনার সাথে ঘটা ঘটনার জন্য আমি দায়ী, তবে আপনি ভুল করছেন। আর পরশু আমরা একে অপরের সাথে ধাক্কা খাওয়ার পর কুশল বিনিময় করিনি দেখে মুক্তা ভেবেছে আমাদের মাঝে কোনো ঝগড়া বেধেছে প্রতিবারের মতো। ওইজন্যই হয়তো এভাবে আমাকে আর আপনাকে একসাথে সময় কাটানোর জন্য প্ল্যান করেছে। অথচ আমি জানতাম না ওর প্ল্যানের কথা।
আপনার সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই। সবসময়ই ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যায়। আর আপনারও এভাবে পুরো ঘটনা না জেনে আমাকে অহেতুক অপমান করাটা, সেদিনের তুই-তোকারি করে কথা বলাটা সাঝেনি।”
এ পর্যন্ত বলে নিশ্চুপ রইলাম। শেষের সামান্য মিথ্যেটা বলার দায়ে নিজেকেই ধিক্কার জানাতে লাগলাম। সত্য বলে দিলে তো রক্ষা নেই। তিনি নিজের মতো করে বাইক চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিছুদূরে বাইকটা আবার থামালেন। জিজ্ঞেস করলেন, “আইসক্রিম খাবে?”
আমি এবারও সায় দিইনি। তা দেখে তিনি আমায় জোর করে নামিয়ে নিয়ে গেলেন। আমার প্রিয় ফ্লেভারের আইসক্রিমটা নিয়ে দিলেন।
ভেবেছিলাম বিগত সময়ে বলা কথাগুলো নিয়ে তিনি আমাকে অনেক ঝাড়বেন। অহেতুক বকবেন, যেমনটা প্রতিবার করেন। কিন্তু এবার মৌন রইলেন। আমার বলা কথাগুলোর কোনো প্রতিক্রিয়া পেলাম না। কিন্তু তবু আশঙ্কা রয়ে গেল, এখন যে বকাটা পাইনি তা নিশ্চয় পরে পাওনা হিসেবে আদায় করে দেবেন। সে আশঙ্কা নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম।
এসেই মুক্তার কাছে ওই কাণ্ডের জন্য প্রতিবাদ করলাম। সে বলল, “সরি, আসলে আমি তোদের মাঝের ভুল বোঝাবুঝিটা ঠিক করার জন্যই ওইরূপ বোকামো প্ল্যান করেছিলাম। ভাবা উচিত ছিল, হিতে বিপরীত হয়ে গেলে তোর রক্ষা নেই। স্যরি রে।
আমি চেয়েছিলাম কী জানিস? আমার ভাইদুটোর স্ত্রীগুলো যেন আমার বান্ধবীসরূপ হয়। কিন্তু দেখা গেল, বড় ভাইয়া নিজের জন্য মেয়ে নিজেই পছন্দ করে রেখেছেন। ওখানে আমার পছন্দের বিষয়টা আর উঠল না। আর বড় ভাবীকে দেখে মনে হয় না, তিনি তাঁর ননদকে নিজের বান্ধবীর মতো করে দেখবেন। তবে দেখ, ছোট ভাইয়ারটা আমার হাতের মুঠোয় আছে। মানে ভাইয়া তো জানিস, মেয়েদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। আর তাঁর কোনো পছন্দের মেয়ে নেই। সেই হিসেবে ছোট ভাবীর সিলেকশন’টা আমার নিজের হাতের মুঠোয়। তো ভাবলাম, পর কোনো মেয়েকে ছোট ভাবী হিসেবে আনলে তাঁর সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ার সম্ভাবনাটুকু তো দিতে পারব না। তোর ডায়েরি পড়ে ভাবলাম, তার চেয়ে বরং আপন বান্ধবীকেই আরও আপন করে নিই। কিন্তু যার সাথে তোর সেটিং করতে চেয়েছিলাম, সেই উল্টো তোর উপর নারাজ হয়ে গেল। ধুর!”
মুক্তা নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। আমি তখন মুচকি হাসছিলাম।
“কিরে, হাসছিস কেন?”
“হিতে বিপরীত হয়েছে কিনা তা জানি না, তবে বিপরীত না হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকটুকু।”
“মানে? মানে? কী হয়েছে আমায় বল না।” উত্তেজিত হয়ে উঠল মুক্তা।
“তোর বোকামোর কারণে তার সাথে কথা একটু বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। সে সুযোগে মনের সব অভিমান উজাড় করে দিয়েছিলাম। কথাগুলো এমন করুণভাবে বলেছিলাম যে, তিনি কোনো উল্টো প্রতিক্রিয়া দেননি। সাধারণত আমাদের মাঝে যতবারই ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, ততবারই তিনি আমার সাফাইয়ের কোনো গুরুত্ব দেননি। কিন্তু এবার গুরুত্ব দেননি, এমনটা বলতে পারব না। কারণ ওসব কথা শোনেও তিনি চুপচাপ ছিলেন। তার মানে একটু আন্দাজ করা যায়, হিতে বিপরীত হয়নি।”
“সর্বেসর্বা।” মুক্তার কণ্ঠ উত্তেজিত শুনাল, “কিন্তু তোদের বিয়ের ব্যাপারে কারও সাথে কী কথা বলব? জানিস তো, মা তোকে ওই ঘটনার পর থেকে তেমন একটা পছন্দ করেন না। আর বাবার সাথে আমার তেমন ভালো হাবভাব নেই, যতটা না তোর সাথে আছে। আর মায়া আপুকে তো চিনিসই, একঘেয়েমিপনা ভরে আছে। ও তো কেবল সর্বক্ষণ নিজ স্বার্থের কথাই ভাবে। সে বড় মেয়ে বিধায় সে না হয় কথাটা পেড়ে দেখতে পারত। কিন্তু কারও জীবন নিয়ে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। তাই তার কাছ থেকে কিছুই আশা করা যায় না। এমনও হতে পারে, এই বিষয়টা জেনে ও আমাদের বিপক্ষতা করতে পারে। অন্য কিছু করার জন্য ভাবতে হবে।”
“তুই টেনশন করিস না। আমার ভাগ্যে যা লেখা আছে তাই হবে।”
ডায়েরিতে লিখতে লিখতে রাত অর্ধেক যে পেরিয়ে গেছে খেয়ালই করিনি। এখন আর ডায়েরি লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বরং ঘুমিয়েই পড়ি।
.
.
কলিং বেলটা বেজে উঠল। বুয়া গিয়ে দরজা খুলে দিয়েছে। বাসায় এসময় মিহিরের আসার কথা নয়। নিশ্চয় মুক্তা। রুমের দিকে কেউ একজনের হেঁটে আসার শব্দ পেয়ে সামিরা তড়িঘড়ি করে ডায়েরিটা বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেলল। বসে থাকার ভান করে রইল।
মুক্তা এসে পাশে বসতেই জিজ্ঞেস করল, “কিরে, কেমন আছিস?”
“ভালো।”
“শুধুই ভালো? আর আমি কেমন আছি জিজ্ঞেস করবি না?”
“কেমন আছ?”
“জিজ্ঞেস করার পরই? আমিও ভালো আছি। আচ্ছা, বল, তোর কি কোনো বন্ধুবান্ধব নেই?”
সামিরা মাথা এপাশ-ওপাশ করে ঝাঁকাল।
“বন্ধুবান্ধব থাকলে মানুষ হাসতে খেলতে শেখে। তুই তো সারাক্ষণ একঘেয়েমিভাবে বসে থাকিস। তোর মনে কী চলে রে সামিরা? কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাতে পারিস।”
“কোনো সমস্যা নেই।” ভাবলেশহীনভাবে জবাব দিলো সামিরা, “মুক্তা, তুমি যাও এখান থেকে। আমি পড়ব এখন। গল্প পড়ব।”
“আহা…এই মেয়েকে নিয়ে আমি আর পারলাম না। বড়দের নাম ধরে ডাকতে নেই। তোর বয়স বারো চলে এখন। তবুও তুই শিখলি না? আর কখনও আমায় নাম ধরে ডাকবি না। ফুফি ডাকবি আমাকে।”
“ফুফিরা ভালো না।”
“কে বলেছে তোকে?” কিঞ্চিত বিস্মিত হয় মুক্তা, “কে বলেছে তোকে এ কথা?”
“কেউই বলেনি। ধারণা করেছি। তুমি এখন যাও। আমার কথা বলার মোড নেই।”
মুক্তা জানে সামিরা তার মায়ের মতোই হয়েছে। সহজে অন্তর্নিহিত কোনো কথা বের করানো যায় না। আগে সামিরাকে যাও ঠিক লাগত। এখন অতিরিক্ত মৌনতায় ডুবে গিয়েছে সে। কী নিয়ে ভাবে সারাক্ষণ? কার কথা ভাবে? ভাইয়াই হয়তো জবাব দিতে পারবে।
মুক্তা প্রতিবার এলে মিহিরের সাথে তেমন একটা দেখা হয় না। মিহির সাধারণত নিজেকে ব্যস্ত রাখতে সকাল অফিসে চলে গেলে আর ফিরে আসে না। গভীর রাত অবধি বাসায়ই ফেরে না। তাই মুক্তা রয়ে গেল। সাথে পনেরো বছর বয়সী বড় মেয়ে রাফাকে নিয়ে এসেছে। হুজুগে মুক্তা বেশ কয়েকবার রাফাকে সামিরার রুমে পাঠাতে চেয়েছিল বন্ধুত্ব করানোর জন্য, যেমনটা প্রতিবার চেষ্টা করে। কিন্তু সামিরা দরজা ভেতর থেকে ভেজিয়ে রেখেছে। নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছে তাই কথাও বলছে না। রাত অবধি মিহিরের জন্য অপেক্ষা করল মুক্তা।
মিহির ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার টেবিলে চলে গেল। মুক্তাও এসে বসল।
“ভাইয়া, কেমন আছ?”
“ভালো।”
“তোমাকেও দেখি সামিরার রোগে পেয়েছে।”
“ও কিছু না।” কিঞ্চিত হাসার চেষ্টা করে মিহির বলল, “দুজনেই যে একই ছাদের নিচে থাকি। অভ্যাস একটু-আধটু বিনিময় হওয়ারই কথা।”
“তাহলে অন্য কারো স্বভাব সামিরার কাছে বিনিময় হয় না কেন?”
“তা জানি না।”
“আচ্ছা, ও তোমাকেও কি নাম ধরে ডাকে?”
“ও তো আমাকে ডাকেই না।” খেতে খেতে বলল মিহির, “ওর কাছে কখনও আমার প্রয়োজন হয়নি। তবে বুয়া কখনও আমার কথা বললে সে আমাকে মিহির বলেই সম্বোধন করতে শুনেছি।”
“ও কি কখনও তোমাকে বাবা বলে ডাকবে না?”
“জানি না।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিহির বলল, “অতিরিক্ত প্রত্যাশা খুব ভয়ংকরী। ওসবের প্রত্যাশা করি না। যেমনটা চলছে, তেমনই চলুক।”
“মেয়েটা দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। আমার খুব চিন্তা হয় ওর জন্য। রাফাকে যতবার নিয়ে আসি, ততবারই বলে রাখি ওর সাথে বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে। কিন্তু সে অতিরিক্ত বন্ধুত্ব ভালো না বলে উড়িয়ে দেয়।”
“ও একা থাকতে চাইলে কিছু করার নেই।”
মিহির যদিও বা কথাগুলো সরলভাবে বলে দিয়েছে, সে জানে তার মন আজও সামিরার মুখে বাবা ডাক শোনার প্রত্যাশায় জেগে আছে।
.
সামিরা আজ ডায়েরি না পড়েই বিরক্তির সাথে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে যে নিষ্ক্রিয় থাকতে চায়, তা কেউ বুঝে না। দিন কয়েক মুক্তা বাসায় থাকায় সে ডায়েরি পড়েনি। মুক্তা যাওয়ার পর একদিন ডায়েরি নিয়ে বসল। বেশ কয়েক পৃষ্ঠা ঘেঁটে সামিরা সাবিহার বিষণ্ণ মনের নানান কথার মালা দেখে। লেখা আছে, কীভাবে সে বিয়ের পর বাসায় ফিরে আসার পর থেকে মিহিরের খেয়ালে সবটে সময় দগ্ধ ছিল। বেশ কয়েক পৃষ্ঠা পর সামিরা বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ল।
(চলবে…)
লেখা: ফারিয়া কাউছার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here