কৃষ্ণচূড়ার রং লাল-১

কৃষ্ণচূড়ার রং লাল-১.🎈
@হাফসা আলম
_________________________
ব্রেকআপ শব্দটা আজ বড্ড ভারী মনে হচ্ছে তুতুলের কাছে।”ভালোবাসি” শব্দটা যার সবজুড়ে ঘুরে বেড়ায় তার কাছে এই বাক্যাংশ খুবই বেদনা দায়ক।এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না তার ছোট মন।তুতুল স্তব্ধ হয়ে পার্কের বেঞ্চিতে বসে আছে।তার বিশ্বাসই হচ্ছে না ইয়াজ এমন একটা বাক্য নিজ মুখে উচ্চারণ করতে পারে।তুতুল একটু হাসার চেস্টা করে বললো,

“ ইয়াজ আপনি মজা করছেন কেনো??এমন বেহুদা টাইপের মজা আমি নিতে পারিনা আপনি তো জানেন।তবুও কেনো করছেন বলেন তো??এতো দিনের পরিচয়,বিয়ের কথা চলছে।দু’বছরের এই পরিচয়ে আপনি তো এক বারো এমন বাজে একটা শব্দ উচ্চারণ করেন নি।তাহলে আজ কেনো??”

ইয়াজ বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে নেয়।তুতুলের দিকে না তাকিয়ে সে বললো,

“ তুতুল তুমি এতো সেন্টি টাইপের মেয়ে কেনো আমাকে বলবে প্লিজ।জাস্ট ডিজগাস্টিং।ব্রেকআপ কমন একটা ব্যাপার এখনকার যুগে।কত অহরঅহর হচ্ছে।”

তুতুল হা করে তাকিয়ে আছে।এমন একটা কথা ইয়াজ বলতেই পারে না।এটা তার ধারনা।ইম্পসিবল!তুতুল দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে কোমল গলায় বললো,

“ ইয়াজ আপনার কি মন খারাপ??কিসব আবলতাবল বলছেন।এসব ছেড়ে আমার কথা শুনুন।মজার একটা বই পড়েছি।সেই স্টোরি।যদিও আমি বই পড়তে পছন্দ করি না।তবুও রিঝ ভাই দিয়েছে সেই বই।অনেক আগে।ছয় মাস তো তার সাথে দেখাই হচ্ছে না।শেষবার আমাদের এনগেজমেন্টেই দেখা হয়েছিলো।আচ্ছা স্টোরিটা বলি??”

ইয়াজ রেগে গেলো।চোখ রাঙিয়ে বললো,

“ শেট আপ তুতুল।আমি এখানে তোমার সাথে সব শেষ করতে এসেছি মজা বা গল্প করতে নয়।ফালতু কথা বন্ধ করো।দুই বছর তোমার প্যান প্যান শুনে আমি এবার বিরক্ত।লাইফে কখন শুনেছ বয়ফ্রেন্ডের সাথে মিট করতে এসে গার্লফ্রেন্ড নিজের পড়া বইয়ের গল্প শুনাতে??কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এটাই ইয়াজ আহমেদ সহ্য করে আসছে আজ দু’ বছর।এবার আমার ছুটি চাই।আমি বিরক্ত তোমার এসব ন্যাকামুতে।লিভ ইট।”

তুতুল খুব ইমোশনাল মেয়ে।কথায় কথায় তার চোখে জল টাইপের অবস্থা।কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার এখন পর্যন্ত সে কাঁদে নি।সে নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছে।সামনে দাড়িঁয়ে থাকা বাদাম বিক্রেতাকে হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকল সে।বাদাম বিক্রেতা গলায় গামছা দিয়ে বাদাম ভর্তি ঝুঁড়ি ঝুলিয়ে এগিয়ে আসল।তুতুল বললো,

“ মামা দশটাকার বাদাম দেও তো।”

বিক্রেতা এক ঠোঙা বাদাম এগিয়ে দিলো।তুতুল হাত বাড়িয়ে সে বাদাম নিলো।ইয়াজ সোজা হয়ে বসে আছে।দৃষ্টি তার কোন দিকে তা বুঝা যাচ্ছে না।তুতুল আড়চোখে একবার দেখে পুরোদমে হতাশ হলো।কিছুক্ষন আগের নিশ্চিন্ত চেহারাটা মুহূর্তে চিন্তিতো হয়ে উঠে।ইয়াজ আজ তার কিনা জিনিসের দাম দিলো না।এমনটা তো কখনো করে না।ইয়াজ যখন খুব রেগে থাকে তখন কথা কম বলে।কিন্তু তুতুল তার সামনে কিছু কিনলে টাকাটা সেই দেয়।কিন্তু আজ দু’বছরের অভিজ্ঞতাকে ঠেকড়ে ইয়াজ টাকা দিলো না।তুতুল ভাবনায় ডুবে ছিলো।বাদাম বিক্রেতা উচ্চ শব্দে বললো,

“ওই আপা কি হইছে?টাকা দেন না ক্যান?”

তুতুল হকচকিয়ে উঠে।ব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে লোকটাকে দেয়।সে স্তব্ধ।ভাবতেও পারছে না তার চিনা মানুষটা হঠাৎ করে এত অচেনা কেনো হয়ে গেছে।ইয়াজ কোনো ভনিতা না করে সরাসরি বললো,

“ ব্রেকাপ করতে চাই।আজ থেকে আমি তোমাকে চিনি না।তুমিও আমাকে চিনো না।ব্যস।”

কথাগুলো তীরের মত আঘাত করার কথা তুতুলের কোমল হৃৎপিন্ডে।কিন্তু সেই হৃৎপিন্ডে ভালোবাসা এতোটাই ভরপুর যে সে কথাটাকে উড়িয়ে দিয়ে বললো,

“ আমাদের মাঝে তো রিলেশনই নেই।ব্রেকাপ কেনো হবে??ইয়াজ আপনি রাগ করেছেন না??আসলে আপনি তো জানেন আমার সাথে ফোন নামক বস্তুর সম্পর্ক তেমন ভালো না।এক কথায় দূরের।তাই আপনার কল রিসিভ করতে পারিনি।সরি তো!!”

ইয়াজের মুখ থেকে আজ বিরক্তি যেন সরছেই না।চো করে একটা শব্দ করে সে বললো,

“ তোমার ন্যাকামি আমার ভালো লাগছেনা।”

এবার কষ্ট লেগেছে।”ন্যাকামি”শব্দটা তুতুলের খুব বাজে লাগতো।তাই এটা কখনো ভুলেও উচ্চারণ করেনি ইয়াজ।কিন্তু আজ বার বার করছে।তুতুলের বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে।চোখের কোটারে জমছে পানি।কষ্টের পানি।তবুও সে কাঁদবেনা।এতো দিন তো তার রাগ হলে ইয়াজই মানাতো আজ না হয় সে মানাবে।তুতুল এই এতো বছরেও যেটা করেনি সেটাই করলো।হাতটা বাড়িয়ে সে ইয়াজের হাতের উপরে রেখেছে।ইয়াজ ভারী অবাক হয়ে তাকালো।সে প্রচন্ড অবাক হয়েছে।সে ভাবতেও পারছেনা তুতুল তার হাত ধরেছে।কিছুসময় চুপ থেকে সে ঝিটকে হাতটা সরিয়ে দিলো।তুতুলের মনটা আজ বড্ড আঘাত প্রাপ্ত হচ্ছে।কেনো এমন করছে সে।

তাদের সম্পর্কের বয়স এখন দু’বছর হলেও ইয়াজের সাথে পরিচয় ৮বছরের।যদিও তুতুল আর ইয়াজের সম্পর্ককে প্রেমের বলা চলে না।তাদের মাঝে প্রেমিক প্রেমিকার মত কোনো কথা হয় না।হলেও ইয়াজ বলে।তুতুল শুনে।ইয়াজের কারনেই এনগেজমেন্ট করতে হয়েছে ছয়মাস আগে।ইয়াজের সাথে দেখা অনেক আগে হয়েছে।বহু বছর আগের কথা।তুতুলের পরিবার ছোট।বাবা আর বড় ভাই আর তার মা।ছোট বেলা থেকেই বাবা আর ভাই তার প্রতি খুবই যত্নশীল।ক্লাস সিক্সে যখন তুতুল পড়ত তখন একদিন ক্লাসে হোমওয়ার্ক দেখাতে পারেনি বলে তুতুলের হাতে কড়া বেত আঘাত পড়েছিলো।যার কারনে তুতুল অনেক কেঁদেছিলো।কান্না করলে তুতুলের জ্বর হয়।সেবারও হয়েছিলো।ভয়ংকর জ্বর!এটা তার বড় ভাই আলভী সহ্য করতে পারেনি।স্যারের নামে বিচার দিয়েছিলো।আর তুতুলকে সেই স্কুল থেকে নিয়ে এসে তাদের বাড়ি থেকে একটু দুরে নারায়ণগঞ্জের একটা স্কুল ও কলেজ একসাথে এমন একটা স্কুলে ভর্তি করে দেয়।তার বাবা আর ভাই তাকে নিয়ে আসে দিয়ে যায়।সেদিনটি ছিলো বুধবার।স্কুলের একটা অনুষ্ঠানেই প্রেম নিবেদন করে ইয়াজ।ইয়াজ তখন ইন্টারের স্টুডেন্ট।তুতুল ছেলেদের প্রচন্ড ভয় পেত।বাবার অতি পরিচর্যা,ভাইয়ের যত্ন আদর তাকে ছেলেদের থেকে বহু দূরে সরিয়ে রেখেছে।সাথে তৈরি করেছে মনের মাঝে ভীতি।ছেলেদের থেকে দূরত্ব বজায় চলতো সে।তার এক বান্ধবী বললো,

“ তুতুল চল আজ স্কুলের পিছনের দিকে ঘুরে আসি।”

তুতুল তো ভীতু।সে কাঁপা গলায় বললো,

“ না না ভাইয়া বলেছে এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি যাতে না করি।তুই বরং যা।আমি যাবোনা।”

তুতুলের বান্ধবী নাছড়বান্দা।সে তুতুলের হাত টানতে টানতে নিয়েগেলো পিছনের দিকে।স্কুলের পিছনের অংশে তেমন মানুষ আসা যাওয়া করে না।একটা বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে।গাছে ফুল নেই।সবুজ আর সবুজ পাতা।ছোট ছোট বিনি বিনি পাতা ঝাঁক বেঁধে গাছের সাথে জড়িয়ে আছে।কিচকিচ করে একটা অদ্ভুত পোকা ডাকছে।নিচে ঘাস।কাল রাতের বৃষ্টির পানিতে ভিজে আছে পরিবেশ।নীরব স্তব্ধ হয়ে আছে সব।বাতাসে ভিজা একটা গন্ধ।তুতুল ভয় পায়।কাঁপছে।এই দিকটা ছমছমে না।খোলা মেলা।তবুও ভয় পায় সে।খুব ভীতু তুতুল।চারপাশে কেউ নেই।হুট করেই কোথা থেকে একটা ছেলে টপকে পরে।তুতুল চেঁচিয়ে উঠে।ভয়ে কেঁদে দিবে দিবে অবস্থা।কয়েক পা পিছিয়ে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে পরে সে।চিৎকার করে উঠে মৃদু।সামনের ছেলেটা শব্দ করে হাসে।তুতুল চমকায়।আল্লাহকে ডাকে।মনে মনে বিড়বিড় করে।

“ এতো ভীতু কেন তুমি তুল???”

ঠাস করে চোখ খুলে সামনে তাকায় তুতুল।তার সামনে একটা ছেলে দাড়িঁয়ে।সাদা শার্ট।গলায় লাল টাই।ছোট করে চুল কাটা।গলায় ঝুলছে নীল আইডি কার্ড।তুতুল অবাক হয়ে কিছু সময় তাকিয়ে থাকে।হঠাৎ বান্ধবীর কথা মনে পরে।পাশ ফিরে তাকায়।নেই!কেউ নেই!তুতুল আরো ভীতু হয়।ভয়ে মিইয়ে যায়।হাত কচলায়।থরথর করে কাঁপে।ছেলেটা আরো হাসে।তুতুল দৌড়াতে পথ খুঁজে।পাশ ফিরে দেয়ও একটা দৌড়।কিন্তু কেউ হাত টেনে ধরে।এই প্রথম কেউ তার হাত ধরেছে।বাবা,ভাই ,রিঝ ভাই আর পরিবারের কিছু কাছের ছেলে বাদে কেউ কখনো তার হাত ছুঁয়েছে কি না তার মনে নেই।তুতুল ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো।ছেলেটা অবাক হলো।খাণিক বিচলিত হয়ে চারপাশে তাকালো।আস্তে করে বললো,

“ এই কাঁদছ কেন???কেঁদো না।আরে বাবা আমি কি কিছু বলেছি??এখনো কিছুই বললাম না তার আগেই কাঁদে কা??”

তুতুল আরো শব্দ করে কাঁদে।ছেলেটা কিছুই বুঝতে পারছে না।কি থেকে কি হয়েগেছে??কিছুই মাথায় ঢুকছে না।তুতুলের শব্দ করে কান্না দেখে নিজেও ভড়কে যায় সে।হাত ছাড়ে না।তুতুল নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আরো শব্দ করে কেঁদে উঠে।ছেলেটার অবস্থা খারাপ।হাত ধরেই বলে,

“ আমি খারাপ ছেলে না।ইয়াজ আহমেদ আমার নাম।এই কলেজেই পড়ি।তোমার সিনিয়ার।প্লিজ কেঁদো না আমি ক্ষতি করবো না শুধু কিছু কথা বলবো।ব্যস।”

ইয়াজ বুঝায়।অনেক কিছু বলে।তুতুল শুনে না।চোখের পানি থামে না।লাল হয়ে উঠে মুখ।চুলের বেনুনী গুলো বাতাসে ঝুঁলে।অল্প কয়েকটা চুল কপাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে।মোটা কালো ভ্রু জোড়া কুঁচকে কাঁদছে সে।

“ আমার হাত।”

তুতুলের কান্নার শব্দে ইয়াজের ভয় করে।বিনিত সুরে বলে,

“ কান্না করার মতো কি কিছু করেছি??কাঁদছো কেন??”

তুতুল নাক টানতে টানতে বলে,

“ আপনি আমার হাত কেন ধরেছেন??আমার হাত।”

কান্নার শব্দ বাড়ে।ইয়াজ দ্রুত হাত ছাড়ে।সামান্য হাতইতো ধরেছে।এতেই কান্না!আশ্চর্য্য!!ইয়াজ হাত ছাড়তেই দু’পা পিছিয়ে যায় তুতুল।ভীতু গলায় বলে,

“ কি চাই।”

“ যদি বলি তোমাকে??”

তুতুল আবার কাঁদে।কথায় কথায় এই মেয়ে এতো কান্না কেনো করছে??ইয়াজের মাথায় ঢুকে না।কয়েক পা এগিয়ে এসে বলে,

“ আরে আরে কান্নার কি হলো।”

“ দু’হাত দুরে যান।”
তুতুলের কঠোর গলা।ইয়াজ মহা অবাক।এই কাঁদে ,এই কঠিন ভাব নিচ্ছে!!মেয়েটাকে দূর থেকে দেখতে যতটা অদ্ভুত লাগে কাছ থেকে আরো বেশি অদ্ভুত সে।ইয়াজ দুষ্টু মিষ্টি হাসি দেয়।বলে,

“ যদি না যাই??যদি আরো দু’হাত কাছে আসি??কি করবে??কান্না!!”

তুতুল কিছু বলে না।ভয়ে তার হৃৎপিন্ড ধুকপুক করে।মাথা দাপদাপ করে।হাত কচলায় সে।তালুতে তালু ঘষে।ইয়াজ সত্যি দু’হাত এগিয়ে আসতে চায়।কিন্তু পিছলা খেয়ে ধপ করে নিচে পরে।তুতুল খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।ইয়াজের পড়ে যাওয়া দৃশ্য দেখে কিছুসময়ের জন্য সে চুপ করে গেলেও পর পর খুব হাসে।হিহি করে হাসে।অদ্ভুত ভাবে তুতুলের ঠোঁটের কোণার তিলটা ইয়াজের চোখে পরে।ইয়াজ হা করে দেখে।এই হাসি নতুন।খুব নতুন।আগে কখনো দেখে নি।দেখবে কিভাবে??তুতুল তো স্কুলে চুপচাপ থাকে।একদম বরফের মত ঠান্ডা।তাকে দেখলে কেউ বলতেই পারবে না তার হাসিতে জাদু আছে।যাকে বলে ম্যাজিক!ইয়াজ নিচে বসেই বলে,

“ ম্যাজিক স্মাইল!”

তুতুল হাসি থামিয়ে দেয়।চোখ পিটপিট করে তাকায়।ইয়াজ হাটু ভাজে বসে।ডান পাশের পকেট থেকে টকটকে লাল গোলাপ বের করে তুতুলের সামনে এগিয়ে দেয়।তুতুল ভয়ার্তক চোখে তাকায়।গোল গোল কালো চোখ বড় বড় করে।ঘন পাপড়িতে পল্লব জোড়া ডাকা চোখ।ইয়াজের মনে হয় এই চোখ সে আগে কখনো দেখেনি।এতো বড় গোল চোখ হয় না কি!!ইয়াজ নতুন প্রেমিক।যাকে বলে বাল্য প্রেমিক।এদের কাছে সব প্রেম প্রেম লাগে।প্রেমিকার হাঁটার মাঝেও এরা প্রেম খুঁজে বেড়ায়।চুলের নড়চড়ে ও অনুভুতি খুঁজে নেয়।যাদের জীবনে প্রথম প্রেম আসে তাদের চোখের ভাষা ভিন্ন।অদ্ভুত মায়াবী হয় সেই চোখ।ইয়াজ শীতল কন্ঠে বলে,

“ চলো প্রেম করি।
এক সাথে প্রেমে পড়ি।
প্রেম উজার করে ভালোবাসি।”

“প্রেম!!” এ যেনো ভয়ংকর শব্দ।এই শব্দের সাথে তুতুলের পরিচয় নেই বললেই চলে।সে শুনেছে,তাদের ক্লাসের এক মেয়ে প্রেম করে।তার ভাই তাকে রাস্তায় একটা ছেলের সাথে দেখে কি মাইর না দিয়েছে।সে প্রেম করলে তার ভাইয়াও তাকে মারবে??কিন্তু তার ভাইয়া তো তাকে কখনো মারে না।তুতুলের হাত পা থরথর করে কাঁপে।মাথা ঝিম ঝিম করে।সারা অঙ্গ কাঁপনি দিয়ে উঠে।ইয়াজ চমকায়।চকিতেই মুখের দিকে তাকায়।দাঁতে দাঁত লেগে শীতে যেমন কাঁপে মানুষ।তুতুল তেমন করে কাঁপছে।তার দাঁতের উপরে দাঁত পড়া ক্ষিন শব্দ কানে আসছে ইয়াজের।তুতুল মাথায় হাত দেয়।মাথা ঘুরছে তার।এক্ষনি পরে যাবে যাবে ভাব।ইয়াজ আতঙ্কিত গলায় ডাকে,

“ তুতুল।তুতুল।এই যে তুতুল।”
___________
তুতুল চমকে পাশ ফিরে তাকায়।অতীত নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলো যে পাশে বসে থাকা মানুষের কথা তার কানেই গেলো না।তুতুল পাশ ফিরে তাকায়।ইয়াজ রাগি চোখে তাকিয়ে আছে।রাগি গলায়ে বলে,

“ সমস্যা কি তোমার??এতো অন্যমনস্ক কেনো তুমি??আশ্চর্য কাজ কারবার তোমার।বলটা দেও।”

তুতুল নিজের কোলের দিকে তাকায়।তারপরে সামনে তাকায়।বাচ্চারা হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে।তুতুলের কাছে বল থাকায় তারা তার দিকে তাকিয়ে আছে।তুতুল দ্রুত বল এগিয়ে দেয়।বাচ্চাগুলো হাসতে হাসতে চলে যায়।ইয়াজ চোখমুখ কুঁচকিত করে বলে,

“ দেখেছ??তোমার মতো এমন অন্যমনস্ক মেয়ের সাথে কে প্রেম করবে বলো তো??পাগল না কি কেউ??আমিই মনে হয় এই দুনিয়ার এক মাত্র ছেলে।যাই হোক বিয়ের আগে সুবুদ্ধি হয়েছে এতেই আমি খুশি।আমি ব্রেকাপ করতে চাই।”

তুতুল হা করে তাকিয়ে থাকে ইয়াজের মুখের দিকে।এতো বাজে ভাবে কথা কেনো বলছে??সে জানে না।কিন্তু তার ভালো লাগছে না শুনতে।তাই বললো,

“ আপনার সমস্যা কি বলবেন??”

“ আমার সমস্যা তুমি!তুমিই আমার মূল এবং একমাত্র সমস্যা।আংটি ফিরে পেতে চাই।”

ইয়াজের গলার কন্ঠ সহজ।খুবই সহজ গলায় সে কথা বলছে।তুতুলের বুকটা কেঁপে উঠে।চোখের কোনে জনে পানি।বাম হাতের আংটিটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।এটা কিছুদিন আগের এনগেজমেন্টের আংটি।কিছুদিন আগে বললেও ভুল,ছয় মাসেরও আগে।কিন্তু আজ কেনো চাইছে ফিরিয়ে নিতে??

“ কেনো চাইছেন এটা??” কান্নায় আটকে আসা গলায় তুতুল বললো।

“ কারন সহজ।আমি তোমার সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই না।আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না।সব সম্পর্কের ইতি টানতে চাই।আর আমার জিনিস ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই।ব্যস।আর কিছু না।”

“ আপনার মূল সমস্যা কোথায়??কেনো এমন করছেন??কেনো ব্রেকাপ বা যাই বলুন আপনি কেনো করছেন??কারন কি??”

তুতুল কষ্টের কন্ঠে বলছে।খুব কান্না পাচ্ছে তার।আকাশে কালো মেঘ জমছে ধীরে ধীরে।ঠিক তুতুলের মনের মত অবস্থা।কালো মেঘে নীল আকাশের রূপ পাল্টে যাচ্ছে।ইয়াজের চোখে অস্বস্তি।সে বললো,

“ কারন আর কি হবে।একটাই কারণ তুমি।তোমাকে আমার ভালো লাগছে না।তোমার চাইতে মিফতা হাজার হাজার গুনে ভালো।তোমার মত বিরক্তি কর মেয়েকে বিয়ে করা চলে না।তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।আর সবচাইতে বড় কথা আজ পর্যন্ত আমাদের মাঝে তেমন কিছুই হয় নি যার জন্য তুমি কেঁদে বুক ভাসাবে।সো কুল।আংকটি খুলে দেও আর নিজের বাড়িতে যাও।সবাইকে সব বলে দেও।প্রেম তো নামে ছিলো কখনো তো জড়িয়ে ধরাও হয় নি।হাতটা ধরতাম তাও জোড় করে।তাই এসব ন্যাকা কান্না বাদ দেও।”

“ আপনিই কিন্তু আমার পিছনে ঘুরেছেন আমি না।আর এখন আপনার মনে হচ্ছে আমাকে আপনার ভালো লাগছে না??কেনো??” তুতুলের কঠিন গলা।

“ ভালো লাগা মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার।”

“ মানুষের মনও কি আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার??যাকে নিয়ে মজা করছেন??”

তুতুলের চোখে পানি টলমল করছে।নিচের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি আটকে রাখতে চাইছে সে।নিজেকে অনেক কঠিন তৈরি করতে চায় কিন্তু পারে না।নরম মানুষ কঠিন হতে খুব সময় লাগে।কয়েক মুহূর্তে তো আর কঠিন মানুষ হওয়া যায় না।কিছুকেই না।তুতুল নিস্তব্ধ হয়ে পরে।মাঠের বাচ্চারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।ইয়াজ বিরক্ত।চরম বিরক্ত সে।তুতুলের নিশ্চুপ ভাব তাকে আরো বিরক্ত করছে।তুতুল কাঁদছে নিরবে।হয় তো মনে মনে।আজ তার অনুভব হচ্ছে এভাবেই বুঝি সম্পর্ক ভাঙ্গে??হুট হাট??সবার কি এমন হয়??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here