কোনো_এক_বসন্তে পর্ব ৫

#কোনো_এক_বসন্তে
#Khadija_Akter
#পর্ব_০৫

শেষমেষ আয়রাকে এই বলে শান্ত করলাম যে, “কাল যে করেই হোক সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমরা আহিলের কাছে যাব দেখা করতে।”

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতেই দেখি আয়রা আমার আগে উঠে বসে আছে বিছানায়।কাল রাতে ওকে আমার সাথেই ঘুম পাড়িয়েছিলাম।
আমাকে আড়মোড়া দিয়ে চোখ খুলতে দেখে অধীর আগ্রহে আয়রা জিজ্ঞেস করলো,

–ওওও তনয়া আপ্পি,তোমার এতক্ষণ লাগে উঠতে!আমি তো সেই কখন থেকেই উঠে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। আজকেও দেরী করে উঠতে হবে তোমার!

চোখ ঢলতে ঢলতে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললাম,

–আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে কেন গো পাখি?আর আয়রা মনি আজ এতো সকাল সকাল উঠে গেছে যে?আজকে কি খুব বিশেষ কোনো দিন!

–বাহ্ রে, আপ্পি তুমি ভুলে গেলে?আজ তো আমরা ভাইয়ার কাছে যাব।আমি সারারাত একটুকুও ঘুমাইনি,সকাল হবার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
আসো এখনি যাই…।

আয়রা খুব ব্যগ্র হয়ে উঠলো,যাওয়ার জন্য।

আমার মনে পড়লো,কাল রাতে একটা মিথ্যা শান্তনা দিয়ে আয়রাকে আমি শান্ত করেছিলাম।
ইশশ এই সরল মেয়েটা সেটা সত্যি ভেবেই কত আশা নিয়েই না বসে আছে!ধুর আমার মোটেও উচিত হয়নি আয়রাকে এমন মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া।

আয়রার আসল বয়স ১০ হলেও মানসিক এবং শারীরিক দিক থেকে একদম ৫ বছরের বাচ্চার মতো ও।
আমি খুব আগে কার কাছ থেকে একবার শুনেছিলাম কোনো একটা ডিসওর্ডার এ আক্রান্ত আয়রা,কিন্তু লক্ষ্মণগুলো আয়রার মাঝে একদম ক্ষীণ হওয়ার কারণে কেউ তেমন কিছু বুঝতে পারে না।আর খালামনিও কাউকে কিছু বলেন না এই ব্যাপারে।সঠিক পরিচর্যা আর অনুকূল পরিবেশ পাওয়ার কারণেই আয়রা বিশেষ শিশু হওয়া সত্ত্বেও অনেকটা আমাদের মতো স্বাভাবিক আচরণ করতে সক্ষম।

যাইহোক এই সকাল সকাল ছোট্ট আয়রার মনটা ভেঙে দিতে একদম ইচ্ছে করলো না।তাই এখনকার মতো কিছু একটা বলে ওকে ক্ষ্যান্ত করতে হবে।

–আয়রা শুনো,এতো সকাল সকাল তো আমাদের কেউ বের হতে দিবে না, তাই না বলো?আমাদের তো লুকিয়ে বের হতে হবে।কিন্তু এখন তো বাসায় সবাই আছে,আমরা তো লুকিয়ে যেতে পারবো না।

–আপ্পি লুকিয়ে কেন যাব?আমার ভাইয়ার সাথে আমি দেখা করবো তাহলে কার কি?সবাইকে জানিয়েই যাব আমরা,আমরা তো কাউকে ভয় পাই না।তাইনা আপ্পি?

–আয়রা,তুমি তো অনেক বুদ্ধিমতি।তুমি আমার কথাটা আগে শুনো তাহলে বুঝতে পারবে,ওকে?

শুনো,বাসার কেউ যদি জানে তনয়া আয়রার ভাইয়াকে বিয়ে করতে চায় না।কিন্তু তবুও আয়রাকে নিয়ে দেখা করতে যাচ্ছে আয়রার ভাইয়ার সাথে।সবাই তনয়াকে পঁচা ভাববে না বলো?বলবে ছিঃ তনয়া কি পঁচা!যাকে পছন্দ করে না আবার তার কাছেই যায়!
বলবে না বলো,আয়রা?

আয়রা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কিছু একটা ভাবলো।তারপর মাথা চুলকে বলে,

–হুম বলবে তো পঁচা।
কিন্তু আপ্পি তুমি আমার ভাইয়াকে পছন্দ করো না কেন?আমার ভাইয়া কি পঁচা!

এবার আমি পড়লাম বিপাকে,কি উত্তর দিব বুঝতেছি না।আমি কি করে বুঝাবো আয়রাকে,এটা ভালো আর পঁচার ব্যাপার না।পছন্দ হতে গেলে একটা মনের টান দরকার হয়,যা আমি কখনো অনুভব করিনি আহিল ভাইয়ের প্রতি।।।

আয়রাকে কোনো জবাব দেওয়ার আগেই সোহেলী খালামনি আমার রুমে প্রবেশ করলেন।
খালামনি এসে আয়রাকে নিয়ে গেল নাস্তা করাতে।আমাকেও বললো জলদি ফ্রেশ হয়ে নিচে যেতে।
যাক আয়রার হাত থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

ফ্রেশ হয়ে আগে গেলাম ফুপা-ফুপি আর রাইসা আপুর সাথে দেখা করতে।কাল রাতে প্রায় ২টা পর্যন্ত জেগে ছিলাম আমরা ছোটরা।কিন্তু উনাদের আসতে লেট হচ্ছিল বিধায় ঘুমিয়ে গেছিলাম।এখন তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখা না করলে আবার কোন দোষ ধরে আল্লাহ মালুম!

আহিল ভাইয়ের রুমটা ক্রস করে ফুপিদের রুমে যেতে হয়।যখন আহিল ভাইয়ার রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ করে কে যেনো আমার হাতটা ধরে একটানে আমাকে আহিল ভাইয়ার রুমে নিয়ে গেল।
প্রথমে ভয় পেয়ে পরে ভালো করে চেয়ে দেখি, রাইসা আপু।

–আরেহ রাইসা আপু!কেমন আছো?রাতে কখন এসেছিলে?

–হইছে হইছে এতো আদিখ্যেতা দেখাস নে।দেখলাম তো,আমরা আসার আগেই সবাই ঘুমিয়ে মরা হয়ে ছিলি তোরা।আমাদের ওয়েলকাম জানানোর জন্য এই বাড়ির দুই-চারটা মানুষ ছাড়া একজনও জেগে ছিল না।

–আসলে আপু,আমরা তো অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি তোমাদের জন্য। কিন্তু তোমাদের আসতে লেইট হচ্ছিল তাই আর কি….

–থাক আর বলতে হবে না।বাদ দে,আমি আবার এসব ধরে বসে থাকি না।
আচ্ছা বলতো ঐ ঘরটাই কেন আবারও আমার জন্য সিলেক্ট করা হইছে?আগের বার বলে গেছিলাম না,ঐ রুমে আর থাকবো না আমি।আমার রুমের বাথরুমটা একদম পছন্দ হচ্ছে না আমার।আজকেই নানুকে বলে আমি ভালো একটা রুমে শিফট হবো।

ভালো রুম খুঁজতে এসে দেখলাম,এই রুমটাতে তো দেখি কেউ থাকে না।এই রুমের বাথরুমটাও সুইটেবল।ব্যালকনি থেকে বাহিরের ভিউটাও সুন্দর।ভাবছি এই রুমেই শিফট হবো।

–কিন্তু আপু এটা তো আহিল ভাইয়ার রুম!

–আহিল!আহিল,আহিল…
ওহ্ আচ্ছা আচ্ছা।
ঐ যে ইংল্যান্ডবাসী তোর কাজিনটা?যার কথা প্রায় বলে বড় মামী?
বাহ্!এতোদিন শুধু মামীর মুখে সেই ছেলেটার প্রশংসাই শুনে এসেছি।এবার তাহলে সামনাসামনি দেখা হচ্ছে!
উনিই এই বাড়িতে আর আমরাও এখন এই বাড়িতে!একদম খাপে খাপ মিলে গেলো তো!তা উনি কি একাই এসেছেন?নাকি….

কথা বলতে বলতে রাইসা আপুর দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো বেডের সাইড টেবিলে রাখা আহিল ভাইয়ার একটা হাসোজ্জ্বল ফটোর দিকে।রাইসা আপু ফটোটা হাতে নিয়ে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে বললেন,

–বাহ্, এই সেই সুপুরুষ তাহলে!

ছবিটাতে আহিল ভাই গাঢ় নীল বর্ণের একটা থ্রী কোয়ার্টার প্যান্টের সাথে একটা ব্ল্যাক টিশার্ট পড়ে আছে,চোখে কালো সানগ্লাস,মুখে হাসি,মাথার উপরে স্বচ্ছ নীল-সাদা আকাশ।

কোনো এক রৌদ্রজ্বল দিনে এই ছবিটা তোলা হয়েছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।কারণ আহিল ভাইয়ের মুখে রোদ বেশ ঝলমল করছে।উনি একটা হাত কপালের উপর ঠেকিয়ে রেখেছেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো এতোদিন ধরে আমি এই রুমে আসা যাওয়া করছি,এর আগে একবারও ভালো করে লক্ষ্য করে দেখিনি ছবির এই মানুষটাকে।
আরও চিন্তা করে দেখলাম,ছবি তো দূরের কথা আহিল ভাইয়ের চেহারাটাও তো এর আগে অত ভালো করে কখনো দেখিনি আমি!

রাইসা আপুর সাথে কথা বলছিল,একটু পরেই আম্মুর গলা শোনা গেল।তিনি নাস্তা করতে যাওয়ার জন্য ডাকছেন আমাকে আর রাইসা আপুকে।

এসে দেখি ডাইনিং রুমে ইতিমধ্যে সবাই হাজির হয়ে গেছেন।
ছোট ফুপা-ফুপিও এখানেই আছেন।তাদের সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলাম।

ছোট ফুপা আস্তে করে সালামের জবাব দিয়ে ঘাড়টা ঘুরিয়ে অন্যদিকে চেয়ে নিচু স্বরে বললেন,”কি দিন-কালই না আসলো,এখনকার পোলাপাইন মুখে একটা সালাম দিয়েই হাত ধুয়ে ফেলে”

ফুফার কথা শুনে আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আম্মুর দিকে তাকালাম।আম্মু চোখে ইশারা করতেই আমি উঠে ফুপার দিকে গেলাম পায়ে ধরে সালাম করার জন্য।
এটা দেখে ফুপা তড়িঘড়ি দেখিয়ে বললেন,

–থাক,থাক,থাক আর সালাম করতে হবে মা।বেঁচে থাকো,বেঁচে থাকো।

এবার তাকালাম ফুপির দিকে,তিনিও হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন ‘থাক সালাম করতে হবে না’।
ডাইনিং রুমে আসার পর থেকেই ফুপি এক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছিলেন।এতক্ষণে কথা বললেন উনি,

–কিরে তনয়া!তুই এমন শুকাই গেছিস কেনো রে?খাস না নাকি?ইশ গায়ের রঙটাও কেমন পোড়া পোড়া হয়ে গেছে।কেমন চিমসা চিমসা লাগছে তোকে…

ছোট ফুপির কথা শুনে সাইকা খেতে খেতেই ফিক করে হেসে দিল।আমি কড়া চোখে ওর দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাতেই ও একদম চুপ হয়ে গেল।

আসলে ছোট ফুপি এমনই,যাকে একবার ধরবেন তাকে সহ তার চোদ্দগুষ্টির দোষত্রুটি সব তুলে ধরবেন একে একে। আমরা অবশ্য ফুপির কথায় কোনো মাইন্ড করি না।যার যেমন স্বভাব আর কি!
কিন্তু আজ ঘরভর্তি লোকের সামনে যখন উনার পাল্লায় পড়লাম আমি,তখন মনে মনে খুব রাগই লাগছিল।

ফুপি আরও কিছু বলার জন্যই তৈরি হচ্ছিলেন কিন্তু আয়রার জন্য আমি বেঁচে গেলাম।
আয়রা এসে আমাকে টেনে নিয়ে গেল ড্রয়িং রুমে,ওখানেই ওর খাবার দেওয়া হইছে।
‌খালামনি আয়রাকে খাওয়াতে চেষ্টা করছেন খুব,কিন্তু আয়রা কিছুতেই খেতে চাইছে না।সে খেলে,তনয়া আপ্পির হাতেই খাবে।

‌ড্রয়িং রুমে আসতে খালামনি বললো,

‌–দেখতো এই ত্যাঁদড়টাকে খাওয়াতে পারিস কিনা।আহিল যাওয়ার পর থেকে একটা বেলাও ঠিকঠাক খাচ্ছে না একদম।আমার হয়েছে যত জ্বালা,ঐদিকে ঐটায় একা একা থাকছে।কি খাচ্ছে না খাচ্ছে কিছুই জানি না।ঠিকমতো ফোনও ধরে না।এইদেশে এসেও কিসের এতো কাজ বুঝি না বাপু।

‌আর এইদিকে ছোটটায় করছে এমন জ্বালাতন।আহিল সামনে থাকলে সব ঠিক থাকবে তার।আহিল নাই আর অমনি মর্জি শুরু হইছে!

‌খালামনি জিদ করে রুখে যান আয়রাকে মারতে।আমি খালামনি কি জোর করে আটকে রাখলাম।

‌–খালামনি,তুমি যাও তো।যাও, সবাই খেতে বসেছে তুমিও নাস্তা করে নাও।
আমি ওকে খাওয়াচ্ছি,তুমি এতো প্যারা নিও না।আর আমার নাস্তাটাও এখানে দিয়ে যেও।আয়রা আর আমি একসাথে খাবো,তাই না আয়রা?

‌আয়রাকে খাইয়ে দিতেই ভদ্র বাচ্চার মতো খেয়ে উঠলো।তবে খেতেও খেতেও আমাকে বারবার প্রশ্ন করছিল,”কখন যাবা, কখন যাবা ভাইয়ার কাছে?” আমি ঝোঁকের গায়েই কথা দিয়ে দিলাম যে বিকালে যাব তোমার ভাইয়ার কাছে।

‌আসলে আয়রাকে ধমক দেওয়া বা নিরাশ করার মতো কোনো কারণই খুঁজে পাই না আমি।কেনো জানি আয়রাকে দেখলেই ভীষণ রকম আদর করতে ইচ্ছে করে।এত্তো কিউট,যে কেউ দেখলেই ভালোবাসতে চাইবে।
‌আয়রার ঠোঁটের নিচের লালচে ছোট্ট তিলটা জাস্ট অসাধারণ! সেইম জায়গায় সেইম তিল কার যেনো দেখেছিলাম,কার যেনো দেখেছিলাম….মনে করেও করতে পারলাম না।

‌—————————-
তিন্নি আপুর বিয়ের আর বেশিদিন বাকী নেই।এখন থেকেই কেনা-কাটা করতে শুরু না করলে পরে সময়মতো শেষ করতে পারবো না সব।
তাই আজকে নাস্তার পরপরই কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে আমরা কাজিনরা সবাই বের হলাম মার্কেটে যাওয়ার জন্য।
আপাততঃ নিজেরা নিজেদের জন্য টুকটাক যা যা লাগে কিনে ফেলবো।

আজকে থেকে আব্বু আর চাচ্চুও ছুটি নিয়ে নিয়েছেন অফিস থেকে।
তিন্নি আপু বেশ মন খারাপ করছিল,কিছুদিন পর এই বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে অথচ কেউ একটুও গুরুত্ব দিচ্ছে না এই বিয়েটাকে।এখনও নিজেদের অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সবাই।

তিন্নি আপুকে খুশি করতেই ম্যানেজ করে অফিস থেকে লিভ নিয়েছেন আব্বু আর চাচ্চু।
যতটা পারা যায় ঘরে বসেই অফিসের গুরত্বপূর্ণ কাজগুলো করবে আজ থেকে তারা।

অনেকদিন পর আব্বু আর চাচ্চুর দুইটা গাড়িই আজ ফ্রী পেলাম।
চাচ্চুর গাড়িতে তিন্নি আপু ড্রাইভ করবে,তিন্নি আপুর পাশের সিটে রাইসা আগে আগে গিয়ে বসে পড়লো।
পিছনে রাহি,রাফি,সাইফা উঠে গেল তড়িঘড়ি করে।

এদিকে সাইকা আর শুভ দৌঁড়ে গেল আব্বুর গাড়ির সামনের সিটে বসার জন্য।শুভর আগে সাইকাই গিয়ে বসে পড়েছে সামনে।শুভ মুখ কালো করে পিছনে গিয়ে বসলো।এটায় ড্রাইভিং করবেন রনি ভাইয়া।

আমি আয়রাকে নিয়ে গাড়ির পিছনের সীটে বসিয়ে নিজে যখন বসতে যাব।তখনি রনি ভাই সাইকাকে হুকুম দিল,

–সাইকা,তুই পিছনে যা।আর তনয়া তুমি সামনে চলে আসো।

রনি ভাইয়ার ডিশিসন শুনে সাইকা কপাল কুচকে ঘাড় ত্যাড়া করে রনি ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,

–কেনো,কেনো,কেনো?পিছনে যাব কেন?
আ্যহ্ আমি আগে এসে বসছি না?আমি পিছনে যেতে টেতে পারবো না।ব্যাস..

–এই তুই জানিস না,গাড়িতে তনয়ার বমি হয় মাঝেমাঝে?ওকে সামনে বসতে দে,যা ভাগ।

সাইকা আগের মতোই ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,

–না,আমি যাচ্ছি না।

–যাচ্ছিস না?তাহলে তুই সামনের সীট দখল করে এখানেই বসে থাক মূর্তির মতো যা।আমরা সবাই আহিলের গাড়ি দিয়ে যাই।
আয়তো শুভ…..

খেয়াল করলাম বাড়ির সামনে আব্বু আর চাচ্চুর দুইটা গাড়ির পাশেই আহিল ভাইয়ার গাড়িটাও পার্ক করা আছে।আহিল ভাই গাড়ি রেখে গেছে;তারমানে বাইক নিয়ে গেছে!

রনি ভাই,গাড়ি থেকে এক পা বাড়িয়ে নামতেই যাবার অভিনয় করে কাজ হয়ে গেল।
সাইকা ঠাস করে দরজা খুলে দিয়ে প্যানপ্যান করতে করতে নেমে পিছনের সীটে গিয়ে বসে পড়লো।
সাইকাকে পিছনে আসতে দেখে এবার শুভ হাততালি দিয়ে একটু আগে সে সাইকার কাছে পরাজিত হওয়ার প্রতিশোধটা নিয়ে নিল!

এবার আমি গিয়ে রনি ভাইয়ের সাথে সামনের সীটে বসে পড়লাম।
আসলে সামনে বসলে,যেতে যেতে বাহিরের ভিউটা খুব সুন্দর দেখা যায়।তাছাড়া আসলেই গাড়িতে আমার একটু বমি বমি ভাব লাগে।।তাই এই উপকারটার জন্য রনি ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতাসুলভ মুচকি একটা হাসি উপহার দিয়ে দিলাম।

রনি ভাই কাজের সূত্রে ঢাকার বাহিরেই থাকেন বেশিরভাগ সময়।মাসে একবার এসে কিছুদিন থেকে যান এই বাড়িতে মায়ের কাছে।
আমার সাথে রনি ভাইয়ের তত একটা মেলামেশা না থাকলেও সাইকা,সাইফা,শুভদের সাথে আবার খুব ভাব।এজন্যই হয়তো আমাদের সব কাজিনদের মধ্যে শুধু আমাকেই রনি ভাই ‘তুমি’ সম্বোধন করেন।

———————–
মার্কেটে গিয়ে অনেক ঘুরাঘুরি করে অবশেষে সবাই কিছু না কিছু টুকটাক কিনলো।
আমি তেমন কিছুই কিনলাম না।আসলে আমার সব জিনিসই আগের থেকেই আছে,তাই কেনার মতো তেমন কিছুই নেই।আমি সবার সাথে কেনাকাটায় হেল্প করে দিলাম।
রাইসা আর রনি ভাই মিলে সবচেয়ে বেশি জিনিস কিনলো।ওদের দুইহাত ভর্তি হয়ে গেছে ব্যাগ দিয়ে।

সবশেষে আমি একটা শো-পিসের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম।নেড়েচেড়ে শো-পিস গুলো দেখছিলাম।পিছনে রনি ভাই কখন এসে দাঁড়িয়েছেন টেরই পাইনি,

–হাতের এটা পছন্দ হয়েছে তনয়া?
ভাই,এটা প্যাক করে দিন তো।

–আরে না,না।আমি তো এমনি দেখছিলাম রনি ভাই।

–কিনে নাও না,সমস্যা কি!তোমার ড্রেসিং টেবিলের উপরে রাখবে।আসতে-যেতে চোখে পড়বে আর আমার কথা মনে পড়বে।
হাহাহা…জাস্ট কিডিং!ডোন্ট মাইন্ড তনয়া।

— ইট’স ওকে, রনি ভাই।এখানে মনে করার মতো কিছু নাই।

‌প্যাকিং হয়ে যেতেই রনি ভাই দামটা মিটিয়ে দিল।আমরা শোপিসের দোকান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে যাচ্ছি।সবারই শপিং করা মোটামুটি শেষ। একে একে জড়ো হচ্ছে সবাই গাড়ির কাছে।
গাড়ির কাছে যেতে যেতে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে রনি ভাই বললো,

‌–তো….কাজটা কিন্তু তুমি ঠিকই করেছো তনয়া।

‌–কোন কাজটা রনি ভাই!

‌–ঐ যে আহিলের সাথে তোমার বিয়েটা ভেঙে দিয়ে।যাকে তুমি পছন্দই করো না,তার সাথে সারাটাজীবন কিভাবে কাটাবে বলোতো?
এই জন্যই আমি এরেঞ্জ ম্যারেজের চেয়ে লাভ ম্যারেজ বেশি প্রেফার করি বুঝলে তনয়া?
‌তোমার উচিত,বিয়ে করতে হলে এমন কাউকে করা যাকে তুমি চেনো-জানো,যে তোমাকে বুঝবে,তোমার খেয়াল রাখবে,যার সাথে তোমার বোঝাপড়া ভালো থাকবে।বুঝছো আমার কথা?

‌–হুম বুঝছি,রনি ভাই।

—————————
বাসায় ফিরতে ফিরতে আমাদের প্রায় বিকাল হয়ে গেল।
খেয়ে-দেয়ে সবাই ঘুমিয়েছে।শুধু ছোট ফুপি আর সোহেলী খালামনি জেগে আছেন,আমাদের অপেক্ষায়।

এই অল্প সময়ের মধ্যে তাদের দুজনের বেশ খাতির জমে গেছে।এর আগে দুজন দুজনার কথা শুনলেও, এইবারই প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ করার সুযোগ ঘটলো উনাদের।

কথায় কথায় সোহেলী বেগম দুইদিন আগে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনাই শেয়ার করলেন তনয়ার ছোট ফুপি আসমা বেগমের কাছে।
আসমা বেগম আহিল ছেলেটার সাথে তনয়ার বিয়ে হবে,এটা আগে থেকে জানলেও এখন যে বিয়ে ভেঙে গেছে সেই খবরটা এইমাত্রই কানে গেল তার।
তিনি খুব করে গজরাতে লাগলেন,”তাকে কেউ এই ব্যাপারে কেনো বলেনি,এই বাড়িতে এতো কিছু ঘটে যায় অথচ তাকে কেউ কিছুই জানায় না!সে কি এই বাড়ির কেউ না!হুম কত্ত সাহস,উঠুক আজকে বড় ভাবী।”

সোহেলী বেগম পড়লেন বিশাল মুশকিলেন।এই আসমা আপাটা আবার এই বিষয়তা নিয়ে কখন কি ফ্যাসাদ লাগিয়ে দেয় ঘরে আল্লাহই জানেন।তারই উচিত হয়নি,তনয়া আর আহিলের ব্যাপারটা তোলার।

আমরা ঘরে ঢোকা মাত্রই ছোট ফুপি দৌঁড়ে আসলেন রাইসার দিকে হা রে রে রে করতে করতে,

–ইশশ আমার মেয়েটা একদম ঘেমে গেছে দেখি।তোদের গাড়িতে কি এসি নাই রে রনি?আমার মেয়েটার কি অবস্থা হয়েছে দেখ।ইশ..
দেখেন দেখেন সোহেলী আপা,এই দেখেন আমার মেয়েটা অল্পতেই কেমন ঘেমে লাল হয়ে গেছে।অনেক আদরে রাখি তো তাই একটুও গরম সহ্য করতে পারে না।
উফফ,আসো আম্মু আসো, রুমে আসো।লেবুর শরবত করে দিচ্ছি….

ছোট ফুপি রাইসাকে নিয়ে চলে যেতেই আমরা একজন অন্যজনের দিকে চেয়ে চেয়ে হোহো করে হেসে উঠলাম।
ছোট ফুপির মেয়ে তো না যেনো একদম হীরার টুকরা!
আর আমরা সবাই ভেসে আসা খড়কুটো!
সোহেলী খালামনি আমাকে আর আয়রাকে রুমে নিয়ে গেলেন।বাকী সবাইও যার যার মতো করে রুমে চলে গেল।

ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে,খেয়ে-দেয়ে আবার সবাই সবার নিজের রুমে চলে গেল রেস্ট নেওয়ার জন্য।

আমিও রুমে এসে বিছানায় গা’টা এলিয়ে দেওয়া মাত্রই আয়রা এসে আমাকে হাত ধরে টানতে শুরু করলো।

“সে ভাইয়ার কাছে যাবে,আর এক্ষুনি যাবে।আমি সারাদিন নিব নিব করেও নেইনি।বিকালে তো নেওয়ার কথা!একটু পর সন্ধ্যা হয়ে যাবে,তারপর তো আরও আগেই নিব না।আজ যদি না নেই তাহলে সে আর কোনোদিন আমার সাথে কথা বলবে না।”

আয়রাকে অনেক বুঝানোর পরেও কোনো কাজ হলো না এবারে।মাঝেমঝে ও এমন জিদ দেখায় যে সেটা করতেই হয়,নয়তো ওর বিশেষ সিনট্রোমগুলো আবার দেখা দিতে থাকে।

ওকে থামাতে না পেরে অবশেষে আমি উঠে গিয়ে বাসার সবাইকে একবার চেক দিয়ে এলাম।সবাই সবার রুমেই আছে।আমি দ্রুত রেডী হয়ে,আয়রাকেও রেডী করে নিলাম।তারপর চুপি চুপি বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম।

একটু পরেই সন্ধ্যা নেমে যাবে,দ্রুত গিয়ে আয়রাকে দেখা করিয়ে আবার তাড়াতাড়ি চলে আসতে হবে।

মেইন রাস্তায় এসে খালি রিকশার জন্য অপেক্ষা করছি এখন।একটা রিকশা পেয়ে গেলেই হয়।
আয়রাদের বাসাটা এখান থেকে খুব বেশি দূর না,আবার একদম কাছেও না।রিকশায় যেতে ৪০ মিনিটের মতো লাগবে হয়তো।

একটা খালি রিকশা পেতেই উঠে বসলাম আমরা দুজন।যদিও এর আগে রিকশা দিয়ে যাওয়া হয়নি কখনো ঐ বাসায়।তবুও
খালামনিরা যতবার দেশে আসে,ততবারই তাদের বাড়িতে যাওয়া হয়েছে এক-দুই বারকরে।তাই রিকশা দিয়েও তাদের বাসা চিনতে আমার কোনো অসুবিধা হলো না।

—————————–

গেটের ফলকে বড় বড় করে লিখা “আহনাফ খান ভিলা” আয়রার বাবার নামে নাম এই বাড়িটার।

মেইন গেইটে অনেক্ষন নক করার পর,বাড়ির কেয়ার-টেকার আব্দুল চাচা হন্তদন্ত করে এসে গেট খুলে দিলেন।

গেইট খুলে আমাদেরকে দেখতেই উনি দুপাটি দাত বের করে বললেন,

–ছরি,ঘুমায় আছিলাম।শুনবার পাই নাই পরথমে।তাই আইতে একটু দেরী হইয়া গেল।আহেন,আহেন ভিতরে আহেন মামুনীরা।

আব্দুল চাচার এই একটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগে।সবসময় মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখেন তিনি।না হেসে কথাই বলতে পারেন না একদম।এই যে আমরা হঠাৎ করে এখানে আসলাম,কেন আসলাম বা কি আসয় বিষয়, এগুলো নিয়ে উনার কোনো মাথা ব্যাথা নেই।আমরা যে এসেছি এটাই ঢেঢ় উনার কাছে।বলতে গেলে একদম সরল-সোজা মানুষ একজন।বাড়ির ভিতরে যেতে যেতে বললাম,

–আচ্ছ চাচা,
আহিল ভাইয়া আছে তো বাসায়?

–হ,হ আছে।ছোড সাব তো সারাদিন বাসাতই থাহে।

–চাচা,আর একটা কথা?
আমরা যে এই বাড়িতে এসেছি,কাউকে বলার দরকার নেই।

–ঠিক আছে মামুনী,ঠিক আছে।
ঐ যে ঐ মাঝের ঘরটা দেখতাছেন না?ঐ ঘরটাতেই ছোড সাব আছেন।
আপনারা যান,আপনাগো দেখলে আবার মাইন্ড করবো না।কিন্তু আমারে কইয়া দিছে যহন তহন যেনো আমি ঐঘরে যাইয়া সাবের কাজে ডিস্টার্ব না করি।
আপনাগো লাইগা চা-নাস্তার ব্যাবস্থা করতাছি আমি।যান আপনারা যান…..।

আব্দুল চাচা কিচেনের দিকে চিলে যেতের আমি রকহাতে আয়রার হাতটা ধরে,ধীর পায়ে এগুলাম মাঝখানের রুমটার দিকে।
একদম কাছাকাছি এসে এখন নিজের ভিতরে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে আমার আহিল ভাইয়ের সামনে যেতে।শেষ রাতে আহিল ভাইয়ের সাথে আমি খুব বেশি ভালো ব্যবহার করিনি সেদিন।
এখন আমাকে দেখে উনি কি না কি ভাবেন।

এসব ভাবতে ভাবতে দরজায় আলতো করে নক দিয়ে দিলাম।
একবার,দুইবার,তিনবার নক দিলাম।

ভিতর থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছি না।দরজার নিচ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি রুমে আলো জ্বলছে,তারমানে আহিল ভাই তো রুমেই আছেন।

এবার আর নক না দিয়ে সরাস্যদরজার হাতল ঘুরিয়ে দরজাটা একটুখানি ফাঁক করে মাথাটা ভিতরে ঢুকিয়ে উঁকি দিলাম।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here