চড়ুইপাখির অভিমান পর্ব -০৬

#চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️
#পর্ব_৬
#লেখনীতে-নন্দিনী নীলা

সেদিন বিকেলে স্পর্শ নিজে আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। টুকটাক কথা হয়েছে গাড়িতে। বাসায় আসার পর আমি খুব ভয়ে ছিলাম এই বুঝি বাবা আমাকে বকবে কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। বাবা ওই বাসায় থাকা নিয়ে আর কোন কথাই আমার সাথে বলেনি। স্পর্শ এসে বাবাকে কি বলে ম্যানেজ করে গেছে তারাই জানে।
পরদিন কলেজে আসলাম সবার পরে। এদিকে নিঝুমরা সবাই আমার থেকে নববর্ষের দিন আমার সাথে কি হয়েছে জানতে সবার আগে এসে বসে আছে। কারণ এখন তো আর ক্লাসে এক সাথে বসতে পারি না। তাই আড্ডাটা বাইরেই দিতে হয়। কিন্তু আমি আগে আসতে চেয়েও আসতে পারলাম না। ঘুম থেকে উঠতেই লেট হয়েছে কোন রকম দৌড় এর উপর দশ মিনিট পর প্রথম ক্লাস উপস্থিত হলাম। স্পর্শ মনোযোগ সহকারে অংক বুঝাচ্ছিলেন
তখন আমি দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলি,
‘মে আই কাম ইন স্যার!’

স্পর্শ ব্লাক বোর্ড থেকে চোখ সরিয়ে সরিয়ে আমাকে আসার অনুমতি দেয়। আজ আর প্রথম সিট খালি নাই। আমাকে গুনে গুনে আগের সেই পেছনের সিটে গিয়ে বসতে হলো। সব সময় সামনে বসে আজ একা পেছনে বসতে কেমন জানি লাগলো। মিষ্টি কে দেখলাম আজ সামনে বসেছে। সবাই এক থেকে তিন সিটের মাঝে আছে আমি একা এই পেছনে বসলাম। আমার পাশে আছে আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে লম্বা মেয়ে জয়ন্তি। আমার দিকে দাঁত কেলিয়ে তাকালো। আমি মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে ব্যাগ থেকে খাতা কলম বের করে বোর্ডে থেকে অংক তুলতে লাগলাম।

প্রথম ক্লাস শেষ হতেই মিষ্টি আমাকে টেনে বেরিয়ে এলো ক্লাস থেকে। দুজনে ক্যান্টিনে এসে বসলাম। তারপর কালকের সব কথা বললাম মিষ্টি কে।

‘ মারু ওই কাব্য শয়তানটা কাল আমাকে মিথ্যা বলে পাঠিয়ে তোর সাথে অসভ্যতামি করতে চেয়েছিল তাই না। ও ওর শাস্তি পেয়েছে। আজ কি শুনলাম জানিস? কালকে নাকি কারা কাব্য ও ওর চাচাতো ভাই সোহেল যে অটো চালায় দুজনকে খুব মার মেরেছে। মেরে একদম হাড্ডি গুড্ডি ভেঙে দিয়েছে। দুজনে এখন হসপিটালে ভর্তি। ওদের জিজ্ঞেস করলে বলেছে যে মেরে সে নাকি মুখ ঢেকে এসেছিল তাই ওরা মুখ দেখতে পারেনি। এমন মারের কারণ ওরাও জানে না।’

আমি বিস্মিত হলাম সব শুনে।

‘ স্যার ঠিক সময়ে না আসলে তোর কি হতো ভাবতে আমার শরীরে কাঁটা দিচ্ছে। আমি বাসায় পৌঁছানোর পর থেকেই চিন্তায় অস্থির হয়ে গেছিলাম। তোর আপুর নাম্বারে ও কল করেছিলাম তুই ঠিক মতো পৌঁছেছিস কিনা জানতে। তিনি বলল তুই নাকি স্পর্শের সাথে আছিস। তখন আমি শান্ত হয়েছি। তোর সাথে কথা বলার ইচ্ছা রাতে থাকলেও স্যারের নাম্বার নাই তাই সম্ভব হয়নি।’

‘ থাক আর টেনশন করিস না। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছে‌। স্পর্শকে ঠিক সময় উপস্থিত করেছিলেন আমি বেঁচে গেছি‌।’

নিঝুম, ধারা ছুটে এসে বসলো চেয়ার টেনে। আর জানতে চাইলো সব। আমি আর কিছু বললাম না সব মিষ্টি ওদের বলল ওরা ও গালি দিতে লাগলো কাব্য কে আর স্পর্শকে নিয়ে ভালো কথা যা শুনে আমার মনে লাড্ডু ফুটছিল।

দ্বিতীয় ক্লাস আর করা হলো না। আমরা ক্যান্টিনে বসে এটা ওটা খেতে লাগলাম। স্পর্শের দ্বিতীয় ক্লাস ফার্স্ট ইয়ারের। তাকে ফার্স্ট ইয়ারের কমার্সের ক্লাস থেকে বের হতে দেখলাম আমি। তিনি বারান্দায় থেকেই আমাদের ক্যান্টিনে বসে আড্ডা দিতে দেখলো। তারপর চলে গেল অফিস রুমে।

টেবিলে দুহাত ভাঁজ করে মাথার ঠেকিয়ে ওদের কথা শুনছি আর স্পর্শের কথা ভাবছি তখন হঠাৎ স্পর্শের আওয়াজ শুনতেই চমকে মাথা উঁচু করলাম। আমাদের টেবিলের সামনে স্পর্শ দাঁড়িয়ে আছে। আর ক্লাস বাদ দিয়ে এখানে আড্ডা দেওয়ার জন্য কথা শুনাচ্ছে। নিঝুম রা মাথা নিচু করে স্পর্শের কথা শুনছে। আমি ও তারাতাড়ি দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি।

‘ ক্লাস বাদ দিয়ে এখানে কিসের আড্ডা চলছে হ্যা। তোমাদের ক্লাসে এক সাথে বসতে মানা করেছি এখন বাইরে এসে আড্ডা দেওয়া শুরু করছো।’

মিষ্টি আচমকা বলে উঠলো, ‘ স্যার আপনি আমাদের সব সময় এই ভাবে অত্যাচার করেন কেন বলেন তো। আমাদের বান্ধবী কাল কত বড় একটা বিপদে পরেছিল তাই নিয়ে আমরা একটু সুখ দুঃখের কথা বলছিলাম আর আপনি চলে এলেন আমাদের বকতে এটা কিন্তু ঠিক না।’

নিঝুম তখন হঠাৎ করে বলে উঠল, ‘ আপনি তো আমাদের শুধু স্যার না। আপনি আমাদের দুলাভাই হোন। খালি শাষণ না করে একটু তো মিষ্টি কথাও বলতে পারেন শালিকাদের সাথে। চার মাত্র শালিকা আপনার দুলাভাই হয়ে একদিন আমাদের ট্রিট ও দিলেন না উল্টা খালি কড়া শাসন করেন। কতো স্বপ্ন দেখেছিলাম দুলাভাই স্যার হয়েছে এবার বুঝি ম্যাথের প্যারা দূর হবে।’

স্পর্শ বলল, ‘ এখানে না আমি তোমাদের দুলাভাই আর না তোমরা আমার শালিকা। এখানে আমাদের একমাত্র সম্পর্ক স্যার স্টুডেন্ট এর। তাই কলেজে বাইরে এই ট্রিট ফিটের কথা বলো। তাই চুপচাপ ক্লাসে যাও সবাই।’

মিষ্টি মুখ কালো করে বলল, ‘ স্যার রুপে দুলাভাইয়ের প্যারায় আমাদের জীবন শেষ হয়ে গেল।’

আমি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ওদের কথোপকথন গিললাম। নিঝুম যে এইভাবে কথা বলবে ভাবিনি। আর স্পর্শ এতোটা স্বাভাবিক ভাবে উওর দিবে তাও কল্পনা করিনি।
সবাই কম বেশি ভালোই খেয়েছি মিষ্টি টাকা নিয়ে বিল দিতে গেল তখন ক্যান্টিনের মামা টাকা নিল না। পাশে স্পর্শ দাঁড়িয়ে আছে। মিষ্টি কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

‘ টাকা নিচ্ছেন না কেন মামা। আমাদের কি ফ্রী খাওয়ালেন নাকি?’

ক্যান্টিন মামা কিছু বলার আগে স্পর্শ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ শালিকাদের আবদার কি না রেখে পারা যায়! তাই আজকের বিল না হয় আমিই দিলাম।’

‘ এই না বললেন আপনি কলেজে শুধু আমাদের স্যার তাহলে বিল কেন দিলেন?’

‘ বিশেষ কারো জন্য দিলাম। স্যার হ‌ই বা দুলাভাই সব তো তার জন্যেই।’

‘ মানে?’

‘ নাথিং।’
আমার দিকে চোখ রেখেই স্পর্শ কথা বলছে। আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছি দুজনের দিকে এক্সজেকলি ওরা কি নিয়ে কথা বলছে বুঝতে চেষ্টা করছি। কিন্তু এতো দূর থেকে আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। মিষ্টি টাকা ফেরত এনে সবাইকে সবার টাকা দিয়ে দিল। তখন ও নিজের গরগর করে সব বলে দিল।

.
বাসায় লেগে গেছে বিয়ের ধুম। আপু এখন দিনের অর্ধেক বেলা পরে থাকে পার্লারে। মুখ আর চুল নিয়ে তার কতো কি করা আমি নিরব মানুষ খালি দেখে যাই। আপুর ধৈর্য আছে বলা যায় সারদিন এটা ওটা মুখে মেখে বসে থাকে।
কাল শুনলাম আজ নাকি মাহিন ভাইয়ার সাথে আপুর শপিং মলে যাওয়ার কথা বিয়ের ড্রেস চুজ করার জন্য। সেজন্য আমাকেও নেওয়া হবে আমি থ্রী পিচ আর মাথায় হিজাব পরে বসে আছি। আপু সাজছে। ভাইয়ার কল পেয়ে আমাকে তারা দেখিয়ে ছুটে নিচে এলো। আমার জন্য নাকি তার লেট হচ্ছিল নিচে এসে বলল। আমি চোখ বড় করে আপুর বানোয়াট কথা শুনছি আর নাক ফুলাচ্ছি রাগে। এই জন্য ছোট হতে নেই। লেখিকা নন্দিনী নীলা এই বড় বোনের দোষ গুলা সব সময় তারা ছোট দের উপর দিয়ে বসে থাকে। রাগে গজগজ করে গাড়িতে পেছনে গিয়ে বসতেই স্পর্শ কে নজরে এলো তিনি বসে ফোন টিপছে। আমি চেঁচিয়ে চমকে উঠলাম আচমকা তাকে দেখে। তারা তারি গাড়ি থেকে নেমে আপু জিজ্ঞেস করলাম এসব কি? তিনিই বললেন তিনি আব্বু নাকি স্পর্শ কেও আস্তে বলেছে আমি কোমরে হাত দিয়ে আপুকে বললাম,

‘ তুমি আমাকে আগে বলবা না‌ উনি আসবে।’

” কেন কি হয়েছে?’

‘ নিজে তো খুব সুন্দর করে সেজে এসেছো। আর আমি খালি একটু পাউডার মেখে চলে এলাম। উনি আসবে জানলে আমি একটু সাজতাম। তুমি আমাকে আগে কেন বললে না। আমি এখন যাব না!’

‘ বোন আমার তোকে না সাজতেই এতো সুন্দর লাগছে কি বলবো। দয়া করে আর ঝামেলা করিস না আজ আমার বিয়ের শপিং চল প্লিজ‌।এমন না হয় তোর জন্য আমার শপিং টা ভেস্তে যায়। এমনিতেই আমার শাশুড়ি নিজের পছন্দে আমার বিয়ের ড্রেস চুজ করতে চেয়েছিল অনেক বলে আমি মাহিনকে রাজি করিয়েছি। এখন আর তা ভেস্তে যেতে দিস না বোন।’

আপুর এই ইমোশনাল মার্কা কথা শুনে আর কি করার আমি রাজি হলাম। আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। স্পর্শ আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল,

‘ কোনো সমস্যা?’

আমি মুখে মেকি হাসি এনে বললাম, ‘ না তো। আসসালামু আলাইকুম!’

স্পর্শ সন্দেহে চোখে তাকিয়েই সালামের উত্তর নিল। আমি আবার বললাম,

‘ ভালো আছেন?’

‘ আলহামদুলিল্লাহ। তুমি ঠিক আছো? ওই ভাবে চলে গেলে কেন?’

আমি ঢোক গিলে বললাম, ‘ না মানে আসলে আমি একটা জিনিস রেখে এসেছিলাম তাই‌!’

‘ ওহ আচ্ছা। আমি ভাবলাম তুমি বোধহয় ভূত দেখে চেঁচিয়ে উঠলে।’

আমি কাচুমাচু মুখ করে বললাম, ‘ সরি কিছু মনে করবেন না। আমি মাঝে মাঝে এমন চেঁচিয়ে উঠি।’

‘ আমি তো কিছু মনে করিনি। ভাবলাম তোমার কি হলো এমন চিৎকার করলে কেন?’

আমি আর কিছু বললাম না। সব আশ্চর্য জনক ঘটনা আমার সাথেই ঘটতে হয়‌।

#চলবে…

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here