চেকমেট পর্ব ৫

#চেকমেট
#পর্ব-৫
সৌরভ মেয়েটিকে ভালো করে দেখলো। গায়ের রঙ টকটকে ফর্সা। রোগা, পাতলা মেয়েটির বয়স কতই বা হবে! খুব বেশী হলে ২২ কিংবা ২৩ হতে পারে। মেয়েটি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলছে এক নাগাড়ে। এই মেয়েটিই জাহাঙ্গীর কবির মানে সারার স্বামীর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী।

সৌরভ পানির গ্লাস টা এগিয়ে দিতে দিতে বলল,

“আপনি কোথা থেকে এসেছেন?”

মেয়েটি নাক টেনে উত্তর দিলো, চাঁদপুর।

“খবর পেয়েছেন কারও কাছে?”

“না। পেপারে ছবি উঠছে সেই ছবি দেইখ্যা।”

মেয়েটি পানি খেয়ে নিজেকে কিছু টা ধাতস্থ করলো। সৌরভ বলল,
“আপনি একা এসেছেন?”

“আমার ভাই ও আসছে। ”

“সে কোথায়?”

“বাবুর দুধ শেষ হইয়া গেছে। তাই দুধ আনতে গেছে। ”

“আপনি কী জানেন যে আপনার স্বামীর আগের পক্ষে একজন স্ত্রী আছে?”

“জ্বি জানি।”

সৌরভ কিছুটা অবাক হলো। ভেবেছিল ভদ্রলোক হয়তো দ্বিতীয় বিয়েটা লুকিয়েই করেছিল। সৌরভ জিজ্ঞেস করলো,
“আপনার সাথে বিয়ে হয়েছিল কবে নাগাদ?”

“তিন বছর আগে।”

মেয়েটার কান্না থেমেছে। সহজ ভাবেই এখন কথার জবাব দিচ্ছে। উত্তর দেবার ভঙ্গি বেশ সাবলীল।

“আপনার স্বামীর আগের পক্ষের স্ত্রী কী জানতেন যে আপনাকে বিয়ে করেছিল?”

“জি জানতেন”।

সৌরভ কিছু একটা ভাবলো। তারপর বলল, আপনার স্বামী মারা গেছে, অথচ আপনি সেটা জানলেন দুদিন পর। ব্যাপার টা একটু অদ্ভুত না?

মেয়েটা একটুও সময় নিলো না উত্তর দিতে। বলল,

“উনি সপ্তাহে দুইদিন চাঁদপুর আসেন। বৃহস্পতিবার রাত্তিরে আসেন। শুক্র, শনি থাকার পর ঢাকা আসে। ঢাকা থাকনের সময় তারে ফোন দেয়া বারন।”

“এইজন্য আপনি ফোন করেন নি, তাই কিছু জানতেও পারেন নি। এটাই কী বলতে চাচ্ছেন?”

মেয়েটি মাথা নাড়লো।

“যদি কোনো সমস্যায় পড়তেন তাও ফোন দেয়া নিষেধ ছিলো? ”

“উনি নিজেই ফোন করতেন এক, দুই মিনিটের জন্য। দুইদিন ধইরা ফোন না দেয়ায় আমি ভাবছি উনি কাজে ব্যস্ত আছেন”।

সৌরভ আবারও চুপ করে রইলো। মেয়েটির ভাই এসেছে। ভাই টা ভীত চোখে সৌরভের দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটিকেও দেখে সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে মনে হচ্ছে। এরা নিজেদের যাপিত জীবনের বাইরে অন্যকিছু নিয়ে ভাবার মতো সময় পায় না।

সৌরভ জিজ্ঞেস করলো, আপনার স্বামীর বাড়ির লোকজন কেউ নেই?”

“ওনার কেউ নাই। আব্বা, আম্মা মারা গেছেন অনেক বছর হইছে। এক ভাই আছে সে বিদেশ থাকে। ”

সৌরভ আর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেল না। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট হাতে এসে গেছে। যা সন্দেহ করেছিল তাই। খুনী বেশ চতুর সেটা আগেই কিছুটা আঁচ করেছিল, এবার পুরোপুরি শিওর হলো। খুব চালাকী করে এই খুন টা করেছে।

সৌরভ পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট টা নিয়ে বেরিয়ে গেল। সারার মা আর ফ্যামিলির অন্যান্য মানুষের সাথে দেখা করবে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টের অপেক্ষায় ছিলো বলে তাদের সাথে দেখা করার সুযোগ পায় নি।

****
নুরজাহান রোডের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে সারার মা আর বোন থাকে। সারার মায়ের নাম ফাহমিদা খাতুন। টিপিক্যাল হাউজওয়াইফ। আর তার ছোট মেয়ে নীরা। স্মার্ট, চটপটে, সুন্দরী। শুধু সুন্দরী বললে সুন্দর টা’কে একটু কম বোঝানো হয়! বলতে হবে চোখ ধাধানো সুন্দরী। সৌরভের সাথে কথা বলেছে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। একটুও জড়তা নেই কথা বলার ধরনে। আলাপ বিনিময়ের পর হাসিমুখে বলল,

“আপনাকে কী একটু চা করে দেব?”

সৌরভ তীক্ষ্ণ চোখে খানিক সময় দেখে তারপর বলল, হ্যাঁ দিন।

নীরা উঠে চলে গেল। সৌরভ ঘাড় ঘুরিয়ে ঘর দেখতে লাগলো। বেশ গোছানো ঘরদোর। সৌরভ এদিক, ওদিক তাকিয়ে ঘর দেখছিল তখনই নীরা আসলো। সুন্দর কাপে এক কাপ চা, আর এক গ্লাস পানি। সৌরভ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনার মা কোথায় মিস নীরা?”

নীরা স্মিত হেসে বলল, মিস না, মিসেস।

সৌরভ অবাক হলো। বিয়ের পর মায়ের সাথে থাকছে! ইন্টেরেস্টিং!

নীরা বলল, মা নামাজ পড়ছে। আপনার কথা বলে এসেছি। নামাজ শেষ করেই আসবে।

“আপনার বোনের বাচ্চাটা কোথায় আছে?”

“ভিতরে আছে। ওকে ডেকে দেব?”

“না। আগে আপনাদের সাথে কথা বলি। ”

“জি বলুন। যা প্রশ্ন আছে জিজ্ঞেস করতে পারেন।”

“আপনার সাথে আপনার বোনের সম্পর্ক কেমন ছিলো? ”

“একদম ই ভালো ছিলো না।”

“সেজন্য ই আপনারা এতো স্বাভাবিক। ”

নীরা জিজ্ঞাসু গলায় বলল, আপনারা?

“আপনার ভাই, ভাবী আর আপনি। ”

নীরা মৃদু হাসলো।

সৌরভ হাসলো। বলল, বোধহয় আপনার মায়ের কাছ থেকেও এই একইরকম উত্তর পাব।

“হয়তোবা না। ”

সৌরভ সেকথার জবাব না দিয়ে বলল, আপনাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক না থাকার কারণ টা জানতে পারি?

“অনেক গুলি কারন আছে। প্রথম কারন হলো দুজনের চিন্তা ভাবনার অমিল। ”

সৌরভ মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ এটা একটা বড় কারন।

নীরা সৌরভের হাতে থাকা চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার চা যে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!

সৌরভ মৃদু হাসলো। বলল, আমার ঠান্ডা চা খাওয়ার অভ্যাস আছে।

কথাবার্তার মাঝখানে নীরার মা ঘরে ঢুকলো। ভদ্রমহিলা কে দেখে সৌরভের মনে হলো সত্যিই মেয়েশোকে উনি কাতর। ভাঙা গলায় বলল,
“আমি নীরার মা।”

সৌরভ বলল, বসুন আপনি।

ভদ্রমহিলা বসলো। সৌরভ ভালো করে ভদ্রমহিলা কে দেখতে লাগলো। বয়স পঞ্চাশের উপরে হবে। মেয়েরা ওনার সৌন্দর্য পেয়েছে।

সৌরভ বলল,

“আমি আপনার মেয়ে সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। ”

“জি বলুন। ”

“আপনি কী জানেন সারা তাবাসসুম এর কোনো শত্রু ছিলো কি না? আই মিন খুব খারাপ শত্রুতা কী কারও সাথে ছিলো? ”

“ওর তো অনেক শত্রু ছিলো। কারও সাথেই সখ্যতা ছিলো না। যেখানে থাকতো সবার সাথে ঝগড়া করতো। ”

সৌরভ নীরার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার অন্য দুই ছেলে মেয়ের সাথেও তো ভালো সম্পর্ক ছিলো না।”

ভদ্রমহিলা ফোস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, থাকবে কী করে! ভাই বোন দের সাথে বেইমানী করলে সম্পর্ক কী ভালো থাকে!

“বেইমানী বলতে?”

ভদ্রমহিলা নীরার দিকে এক পলক তাকালো। নীরা বলল,

“আমি বলছি, আসলে সম্পত্তি ভাগের নিয়ম অনুযায়ী আমাদের দু’বোনের চেয়ে ভাইয়া ভাগে বেশী পেয়েছে। কিন্তু আপু এটা নিয়ে ভাইয়ার সাথে অনেক ঝামেলা করেছে। ব্যাপার টা মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। ”

সৌরভ মাথা দোলালো। সারার ভাই জামিল ও একই কথা বলেছিল।

“আর আপনার সাথে কী করেছিল?”

নীরা উত্তর দেবার আগেই ওর মা বলল, একসাথে দুজন মিলে পার্লার করবে বলে টাকা নিয়ে সেই টাকায় মৌজ, মস্তি করছে।

ভদ্রমহিলা কথাগুলো বেশ আক্ষেপের সুরে বলল৷ নীরা বলল,

“তারপর টাকা চাইতে গেলে উলটো সিন ক্রিয়েট করেছিল।

নীরার মা বলল, আমার এই মেয়েটা আমার সঙ্গে থাকে এটা নিয়েও ওর অভিযোগ ছিলো। ও চেয়েছিল নিজে থাকবে। আমি রাজি ছিলাম না বলে বাসায় এসে কত ভাঙচুর করতো!

সৌরভ জিজ্ঞেস করলো, আপনি ছেলের সাথে থাকেন না কেন?

“ছেলে যে বাড়িতে থাকে সেটা তার শ্বশুরের। আর আমার স্বামীর বাড়ি ভেঙে ডেবেলপার রা চারটে ফ্ল্যাট দিয়েছিল। একটা আমার আর বাকী তিনটা তিন ছেলে মেয়ের। ”

সৌরভ নীরার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার হাজবেন্ড?

নীরা বলল, উনি এই বাসায় ই আছেন। একচুয়েলি উনি অসুস্থ। একটু বেশী ই অসুস্থ। ডাক্তার রা ওনার কোনো রোগ খুঁজে পাচ্ছে না।

“ওনার সাথে দেখা করা যাবে?”

“উনি ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছেন। তাছাড়া আপনি তো আবারও আসবেন। তখন না হয় দেখা করবেন। ”

“ওকে। তাহলে আজ উঠি। ”

দরজার কাছাকাছি গিয়ে সৌরভ ফিরে তাকিয়ে বলল, আপনার বোনের বাচ্চাটা উঠেছে?

“হ্যাঁ। ”

সৌরভ হেটে ঘরের ভিতরে আসতে আসতে বলল, ও কোন ঘরে আছে?

নীরা বলল, আসুন।

****
বাচ্চাটা এক মনে ড্রইং খাতায় ছবি এঁকে যাচ্ছে। সৌরভ বলল,
“হ্যালো বাবু। ”

এক পলক তাকিয়ে আবারও ছবি আঁকায় মন দিলো।

সৌরভ জিজ্ঞেস করলো, কী আঁকছ?”

ছেলেটা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ ই করলো না। সৌরভ নীরার দিকে তাকিয়ে বলল, ও কী শুনতে পায়?

“হ্যাঁ। আসলে ও এখনো আপসেট। সারাক্ষণ খিটখিটে আচরণ করছে।”

“স্বাভাবিক। এক কাজ করুন, ও যাদের সান্নিধ্যে পছন্দ করে তাদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।”

“হ্যাঁ সেটাই ভাবছি। ”

“ওকে মিসেস নীরা আপনি যেহেতু বলেছেন আমাদের আবারও দেখা হবে সেহেতু অপেক্ষায় রইলাম। ”

নীরা হাসলো, তবে সেটা জোর করে।

সৌরভ বাইরে বেরিয়ে লাবণীকে ফোন করে বলল, গেট রেডি লাবু। তোমাকে এবার সত্যিই কাজ দেয়া হবে।

লাবণী ফোনের ওপাশ থেকে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, কী কাজ?

“তুশল কে আঁকা শেখানোর জন্য খুব শিগগিরই তোমার কাছে ফোন আসবে। ”

“তারপর? ”

“ওই বাসায় থেকে সবার উপর নজরদারী করবে। ”

“ওয়াও। আমি তো এখনই এক্সাইটেড। ”

“হুম। তোমাকে আরেকটা ব্যাপার জানাই। আমার হাতে পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এসেছে। ”

“কী আছে রিপোর্টে? ”

লাবণীর উচ্ছ্বাস যেন কমে গেল।

সৌরভ বলল, ভিক্টিমের শরীরে বিষ পাওয়া গেছে।

“তার মানে টেবিলে যে খাবার ছিলো তাতে বিষ ছিলো? ”

“না।”

“তাহলে? ”

“সেটা এখনো জানা যায় নি।”

“তাহলে ছুড়ি মারার ব্যাপার টা? ”

“বিষক্রিয়ায় নিস্তেজ হবার পর ছুড়ি মারা হয়েছে, যেন ভিক্টিম চিৎকার কিংবা আত্মরক্ষার সুযোগ না পায়। ”

“ওয়াও। এই ব্যাপার টা তুমি আগেই বুঝেছিলে? ”

“কিছুটা। ”

“কীভাবে? ”

“সেদিন যে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে বাথরুমে গিয়েছিলাম মনে আছে?”

“হ্যাঁ। ”

“তখন বুঝেছি। ”

“কীভাবে? ”

সৌরভ হেসে বলল, ক্রমশ প্রকাশ্য….

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here