চেকমেট পর্ব ৬+৭

#চেকমেট
#পর্ব-৬
সৌরভ ঘরে ফিরলো রাত ১১ টার দিকে। ছয় মিনিটে গোসল শেষ করে খাবার গরম করতে দিলো ওভেনে। আজ খাবারে আছে ফুল কপির রোস্ট, চিকেন ঝাল ফ্রাই আর লেবু দিয়ে ডালের চচ্চরি। খাবারের মেন্যু দেখে সৌরভের মন ভালো হয়ে গেল। এই বুয়ার রান্না চমৎকার। তাছাড়া ভদ্রমহিলা বেশ ভালোও। কথাবার্তা বলেন কম, কাজও সারে অতিদ্রুত। খেতে খেতে সৌরভ ঠিক করে রাখলো পরদিন কী করবে। সকালে উঠে সবার আগে প্রিয়ন্তির সাথে অবশ্যই দেখা করতে হবে। সৌরভের ভাই ভাবী মানে প্রিয়ন্তির বোন, দুলাভাই ফোনে একচোট খন্ডযুদ্ধ চালিয়েছেন রীতিমতো। সৌরভের ভাইয়ের চেয়ে ভাবী গরম হয়ে আছে বেশী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছে যে প্রিয়ন্তির সাথে বিয়েশাদির কথাবার্তা এখানেই ক্লোজ। সৌরভ অবশ্য জানতো যে ভাবী ব্যপার টা নিয়ে ঘাটাঘাটি বেশী করবে তাই লাবণীকে বারন করেছিল যে ব্যাপার টা যেন না জানায়। লাবণী জানায় নি, কিন্তু প্রিয়ন্তি নাকি ইনিয়ে বিনিয়ে সব বলেছে।

সৌরভ এই ব্যাপারে প্রিয়ন্তির উপর খুব হতাশ হয়েছে। এটা ও এক্সপেক্ট করে নি। তাই এই ব্যাপারে কথা বলতে হবে।

খাওয়া শেষ করে অভ্যাস মতো কফি নিয়ে স্টাডিতে গেল। কেসের সূত্রগুলো একে একে মিলানোর চেষ্টা করছে। তখন ই লাবণীর ফোন এলো।

সৌরভ ফোন ধরে বলল, নীরা ফোন করেছিল।

লাবণী উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, হ্যাঁ। তুমি কীভাবে বুঝলে যে ফোন করবে।

সৌরভ হাসলো। বলল, বুঝেনি। আন্দাজ করেছি। আর নাইন্টি পার্সেন্ট শিওর ছিলাম যে আন্দাজ ঠিক হবে।

“কীভাবে? ”

সৌরভ হাসলো। লাবণী অধৈর্য্য গলায় বলল,

“ভাইয়া প্লিজ বলো না। ”

“যেহেতু আজ সারার লাশ দাফন করা হলো সেহেতু বাচ্চাটা আরও বেশী বেপরোয়া আচরণ করবে। তাই ও যাদের যাদের সঙ্গ পছন্দ করে তাদের সবাইকে ডাকা হবে। ও যাদের সঙ্গ পছন্দ করে তাদের একজন হচ্ছো তুমি, আরেকজন ওর আয়া। তাই অনুমান করেছিলাম যে তোমাকে ডাকবে। ”

“ওয়াও! ভাইয়া তোমার এতো বুদ্ধি!”

সৌরভ মৃদু হাসলো। লাবণী আমতা আমতা করে বলল,

“ভাইয়া প্লিজ বলো না বাথরুমে কী দেখলে?”

সৌরভ রসিকতা করে বলল, দেখছিলাম যে বাথরুমের কমোড ঠিকঠাক আছে কী না।

“প্লিজ ভাইয়া মজা নিও না। বলো না প্লিজ।”

“শোনো ব্যাপার টা ডিটেইলে বলি,
আমি আজ নীরা আর নীরার মায়ের সাথে যখন কথা বলছিলাম তখন নীরা আমাকে চায়ের অফার করে। আমি রাজি হই। চায়ের কাপ নেয়ার সময় ধাক্কা লেগে একটুখানি চা পড়ে যায়। নীরা সাথে সাথেই জায়গাটা পরিস্কার করে ফেলে। তাছাড়া ওর ঘরদোর দেখে যতটুকু বুঝলাম তাতে এটুকু শিওর হলাম যে টিপটপ থাকতে পছন্দ করে। একটু মেনে নিলাম যে স্বাভাবিক। হিউম্যান সাইকোলজি বলে পুরুষদের তুলনায় মেয়েরা পরিষ্কার থাকার ব্যাপারে বেশী সচেতন। কিন্তু যখন বাচ্চাটার ঘরে গেলাম তখন আমি খেয়াল করলাম যে বাচ্চাটার রঙ, পেন্সিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দেখে ওর কপাল কুচকে গেল, এবং যতক্ষণ ওই ঘরে ছিলো ততক্ষণ পর্যন্ত ওর দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ ছিলো।

লাবণী বুঝতে না পেরে আমতা আমতা গলায় বলল, এটার সাথে বাথরুমের কী সম্পর্ক বুঝিয়ে বলবে একটু?

সৌরভ বলল, এতো অধৈর্য্য হলে চলবে না। আমি সব টা বুঝিয়ে বলছি।

“ওক।”

“ওইদিনের ফ্ল্যাশব্যাকে যাও। কী কী দেখেছিলে মনে করার চেষ্টা করো। ”

লাবণী কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, মেঝেতে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত, টেবিলে আধ খাওয়া খাবার। এছাড়া আর তো কিছু মনে পড়ছে না। আই মিন চোখে লাগার মতো।

সৌরভ বলল, রান্নাঘর তুলনামূলক একটু বেশীই পরিস্কার। তাছাড়া ঘরের অন্যান্য ঘরের বাথরুমের চেয়ে ওই বাথরুমের বেসিনসহ অন্যান্য জিনিস একটু বেশী ই পরিস্কার।

লাবণী বলল, ওহ মাই গড! বাট এর সাথে বিষের সম্পর্ক টা কী? মানে কীভাবে তুমি বুঝলে?

“মানে প্রমাণ লোপাটের জন্য এবং হাতের ছাপ মুছে দেয়ার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করা হয়েছে। একটা ব্যপার ভেবে দেখো তো, যেভাবে ছুরি দিয়ে ভিক্টিম কে আঘাত করা হয়েছে তাতে যদি ভিক্টিম দাঁড়িয়ে কিংবা বসে থাকতো তাহলে রক্তের ফোটা সরাসরি ঘরের দেয়ালেও থাকতো। একমাত্র ভিক্টিম যখন শুয়ে থাকে তখন ব্লাড শুধু মেঝেতে গড়ায়। আর ভিক্টিম কখন শুয়ে থাকে! যখন তাকে অচেতন করা হয়। তাই আমার ঘরের পরিবেশ দেখে প্রথমেই মাথায় এলো যে ভিক্টিম কে অচেতন করে তারপর যা করার করা হয়েছে। কিন্তু যখন দেখলাম রান্নাঘর স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী ঝকমক করছে তখন দেখতে গেলাম যে বাথরুমেও সেইম কেস কী না!

“তারমানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে ভিক্টিম সবকিছু পরিস্কার করে প্রমাণ লোপাট করার জন্য গোসল করেছে?”

“একদম এটাই ভেবেছি। রান্নাঘরের উপরের তাকের জিনিসপত্র যেমন রাখা ছিলো, নিচে তারচেয়ে বেশী গোছানো। তেমনি ওই বাথরুমের জিনিসপত্র প্রত্যেকটা জায়গামতো ঠিকঠাক রাখা। ”

আরেকটা ব্যাপার আছে,

“কী?”

“খুনী এই কাজ টা করেছে নিজের অজান্তে। নিজের অজান্তে স্বভাবসুলভ কাজ করেছে। কারণ দুটো খুনের পর তার স্নায়ু কিছু দূর্বল হয়ে যায়। অবচেতন মন জানান দিচ্ছিল যে অতিদ্রুত পালাতে হবে তাই তার মাথায় ছিলো না যে সে কী করছে।

“ওহ মাই গড!”

“এটুকু তোমাকে ডিটেইলে বলার কারন হলো তোমাকে চোখ, কান আরও বেশি খোলা রাখতে হবে ওই বাসাতে। বুঝতে পেরেছ?”

“হ্যাঁ। তুমি কী নীরা নামের ওই মহিলা কে সন্দেহ করছ?”

“কেউই সন্দেহের বাইরে নয় লাবু। সবাইকেই সন্দেহ করা হচ্ছে। এমনকি সারাদের পাশে যেহেতু তোমরা থাকছ সেহেতু তোমাদেরও লিস্টে রাখা হচ্ছে। ”

লাবণী আঁতকে উঠে বলল, হায় হায় এসব কী বলছ!

সৌরভ নিঃশব্দে হাসলো। বলল, কিন্তু যে মেরেছে সে সারার কাছের কেউ। এবং তার মোটিভও হয়তো খুব স্ট্রং ছিলো। তাই খুব ই প্ল্যান করে এই কাজ টা করেছে। এবং তার নিয়মিত যাতায়াত আছে সারার বাসায়। যে কারনে সে সিসিটিভি ফুটেজ এড়িয়ে ঢুকেছিল।

“ইশ! কবে যে খুনী ধরা পড়বে!”

সৌরভ হেসে ফেলল। বলল, এতো অধৈর্য্য হলে চলবে না লেডি অজিত।

লাবণীও হেসে ফেলল।

সৌরভ বলল, আচ্ছা রাখছি। আর নিয়মিত আপডেট দিতে যেন ভুল না হয়।

“ওকে ভাইয়া।”

সৌরভ ফোন রেখে দিলো। কথা বলতে বলতে যে কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে সেদিকে খেয়াল ই ছিলো না। তাই আরেক মগ কফি বানানোর জন্য অগত্যা উঠতে হলো।

****
কফিতে চুমুক দিয়ে সৌরভ ভাবতে লাগলো সারার কথা। এই সারা আর ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন সময়ের সারার সাথে অনেক পার্থক্য। সারা সবসময় ই উচ্চবিলাসী মেয়ে ছিলো। টাকাওয়ালা ছেলে পেয়ে সৌরভ কে ছেড়ে দিতে এক মুহুর্ত দ্বিধা করে নি। অবশ্য সম্পর্কে কখনো কমিটমেন্টও ছিলো না যে সৌরভ কোনো অজুহাত দেখিয়ে আটকে রাখবে কিংবা বিয়ের কথা বলবে। তবে সাময়িক দুঃখবোধ তৈরী হয়েছিল এ্যাজ ইউজুয়াল।

তবে এতোটা ডেস্পারেট কখনো লাগে নি আগে। তাছাড়া ওর সঙ্গে যেটুকু কথা হয়েছিল তাতে ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক বার ই বলার চেষ্টা করেছে যে দাম্পত্য জীবনে মোটেও সুখী না। ভুল করেছে মধ্যবয়সী লোক টা’কে বিয়ে করে। সৌরভ পাত্তা দেয় নি। ওসব প্রেম টেম মাথা থেকে অনেকদিন আগেই ঝেড়ে ফেলেছিল বলে আগ্রহও তৈরি হয় নি কোনো। কিন্তু খটকা একটা থেকেই যায়। যে ফোন টা পাওয়া গেছে সেটা সারার পারসোনাল ফোন। খুব সম্ভবত এই ফোনের ব্যাপারে অল্প কিছু মানুষ জানে। আর যারা ওই নাম্বার টা জানে তারা সারার অভিসন্ধি সম্পর্কেও জানে। ওই নাম্বার টার কললিস্ট বের করার জন্য পাঠানো হয়েছে। হাতে আসলে হয়তো কিছু ক্লু পাওয়া যাবে।

কফি শেষ হবার দু মিনিটের মাথায় সৌরভের মেইলে ম্যাসেজ এলো। ভিক্টিমের শরীরে যে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে সেটার নাম হেমলক।
#চেকমেট
#পর্ব-৭
লাবণী পরদিন বিকেলে সারার মায়ের বাসায় গেল। সারার বাচ্চাটা লাবণীর সাথে নরমাল আচরণ ই করতে লাগল। সৌরভের কথামতো লাবণী চোখ, কান খোলা রাখছে। প্রতিটি বিষয়ই খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। তবে এই বাসায় আসার পর চোখে পড়ার মতন কিছু দেখে নি। নীরা বিকেলে কোথা থেকে যেন ফিরেছে। ফিরেই লম্বা সময় নিয়ে গোসল সেড়ে এক কাপ চা নিয়ে ড্রইং রুমে বসে ম্যাগাজিন পড়ছে। নীরার মা একবার এসেছিল লাবণীর কাছে কুশল বিনিময় করতে। ভদ্রমহিলা কে দেখে লাবণীর ঠিকঠাক ই মনে হয়েছে। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট। বাড়িতে যিনি আছে তিনি সত্যিই অসুস্থ। ছুটা বুয়া যখন কাজ করেছে তখন অতি সাবধানে কাজ করেছে লাবণী সেটা খেয়াল করেছে। তাছাড়া নীরা যখন ফিরেছে তখন কলিংবেলও বাজায় নি। মা’কে ফোন করে দরজা খুলতে বলেছে।

তবে তুশলের আচরণে কিছুটা চেঞ্জ এসেছে। এই ছেলেটা বেশ ভালো ছবি আঁকে। তবে এখন যা আঁকছে সেগুলো হাবিজাবি। লাবণী কিছু বলল না৷ হয়তো বিক্ষিপ্ত মন মেজাজ তাই এমন করছে৷ তাছাড়া এই বাচ্চা ছেলেটা তো কথাও বলতে পারে না, যে কাউকে কষ্টের কথা বলবে। লাবণী বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। তুশল হাত সরিয়ে নিয়ে ক্রুদ্ধ চোখে লাবণীর দিকে তাকালো।

***
ওসি সাহেব চিন্তিত গলায় বলল,
“সারা তাবাসসুমের ব্যাংক লোন ই আছে ত্রিশ লক্ষ টাকা। এছাড়া অন্যান্য ধার দেনা তো বাদ ই দিলাম।”

সৌরভ আনমনে বলল, হু।

“এই দম্পতির শত্রুর তো অভাব নেই।”

“হু। ”

“এতো শত্রু থেকে খুনীকে বের করা তো খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা।”

“আমাদের তাই ই করতে হবে ওসি সাহেব। খড়ের গাদা থেকে একটা সূঁচ খুঁজে বের করতে। ”

“কিন্তু কথা হলো হেমলকের মতো বিষ কোথায় পেল। এটা তো খুব একটা এভেইলেবল না। ”

“বিষ কোথায় পেল এটার চেয়েও এখন জরুরী হচ্ছে খুনী কে?”

ওসি সাহেব কিছু বললেন না। বিরস মুখে চায়ে চুমুক দিলেন। খানিকক্ষণ পর বলল,
“যে সমস্ত খাবার টেবিলে ছিলো তাতে কিন্তু কিছু খুঁজে পাওয়া যায় নি।”

“খুব ই সহজ ব্যাপার। যে খাবার টা’য় হেমলক ছিলো সেই খাবার টা সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কিংবা ভিক্টিম পুরো খাবার খেয়ে ফেলছে।

সৌরভ হঠাৎ মনে পড়ে গেল এমনভাবে বলল,
“সকলের কল রেকর্ড কী বের করা হয়েছে?”

“হ্যাঁ তাতেও সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় নি। ”

সৌরভ কিছু বলল না। হাতে নিয়ে সবার আগে নীরার কল রেকর্ড এর লিস্টে চোখ বুলিয়ে দেখলো। আশ্চর্য ব্যাপার হলো ঘুরে ফিরে সন্দেহ টা সারার পরিবারের দিকেই যাচ্ছে। সেটার কারণ হলো তাদের আচরণ। পরিবারের একজন আপন মানুষ নৃশংস ভাবে খুন হয়েছে অথচ তাদের আচরণ নির্লিপ্ত। এই বিষয় টা’ই অদ্ভুত!

****

প্রিয়ন্তির কাছে সব কেমন যেন বাড়াবাড়ি ঠেকছে৷ লাবণীর এই কেসে ইনভলব হবার ব্যাপার টা এখন বিরক্ত লাগছে। সৌরভের টাচে ছিলো সেই পর্যন্ত ঠিক ছিলো। কিন্তু যেচে ওই বাসায় যাওয়ার ব্যাপার টা’তে একটু বেশী ই বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে৷

লাবণী মুখ মুছতে মুছতে চিকেন রোলের প্লেট টা হাতে নিলো। বলল,

“আরেকটা প্লেটে বেড়ে দাও না প্লিজ। ভাইয়াও আসছে। ”

প্রিয়ন্তি বিরক্তি চেপে বলল,

“লাবু কী দরকার ছিলো এতো রিস্ক নিয়ে ওই বাসায় যাওয়ায়? ”

লাবণী স্মিত হেসে বলল, আরে রিস্ক কিসের?

“ওদের আমার মোটেও ভালো মনে হয় না। ”

লাবণী আশ্বস্ত করে বলল,

“আরে পুলিশ প্রটেকশন আছে তো। চিন্তা কিসের। ”

প্রিয়ন্তি কথা বাড়ালো না। এইসব ওর কাছে অসহ্য লাগছে। কেন যেন সৌরভ কেও খুব অসহ্য লাগছে৷ প্রিয়ন্তির বোন এখন আর চাইছে না যে সৌরভের সাথে বিয়েটা হোক। আশ্চর্য ব্যাপার হলো প্রিয়ন্তি নিজেও চাইছে না। কেন চাইছে না সেটার স্ট্রং কোনো লজিক ওর কাছে নেই। প্রিয়ন্তি এ যুগের স্মার্ট মেয়ে। সৌরভের সাথে সারার সম্পর্ক ছিলো কিন্তু তার জন্য যে সৌরভ কে অসহ্য লাগছে তা না। ব্যাপার টা যে ঠিক কী সেটা ও নিজেও জানে না।

সৌরভ এলো সন্ধ্যেবেলায়। মাথায় নানান রকম চিন্তা ভাবনা। বিকেলে বানানো চিকেন রোল ওভেনে একটু গরম করে লাবণী দিয়েছিল। অল্প একটু খেয়ে সেটাও আর খায় নি। তবে বেশী চিনি দিয়ে এক কাপ চা খেল। পুরো সময় টা’তে প্রিয়ন্তি নিজের ঘরে মাথা ব্যথার অজুহাতে বসেছিল। সৌরভের সাথে দেখাও করে নি। আপাতত সেটা নিয়ে সৌরভ ভাবছেও না। এখন ভাবনা চিন্তা কেবল ওই ডাবল মার্ডার কেস নিয়ে।

লাবণীর কাছে ওই বাড়ির ব্যাপারে পুরো ডিটেইল শুনে নিলো। পুরো সময় কেবল হু হ্যাঁ তেই চালিয়ে নিলো সৌরভ। তেমন একটা কথা বলল না।

ফেরার সময় ভাবলো এসেছে যখন তখন একবার সারার ঘর টা আরেকবার দেখবে। তাই দারোগা সাহেব কে ফোন করে চাবি পাঠানোর কথা বলল।

****

সৌরভ আজ অনেক টা সময় নিয়ে ঘরের জিনিসপত্র দেখছে। ঘরে অল্প কিছু ফার্নিচার। এতো বড় ফ্ল্যাটে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশীই ফার্নিচার থাকার কথা। কিন্তু তেমন মনে হচ্ছে। মাস্টার বেড রুমে যা একটু ফার্নিচার দেখা যাচ্ছে। বাকী রুমসহ গোটা ঘর টা’ই কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

সৌরভ ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকারের সাথে দেখা করতে গেল। ভদ্রলোক পুলিশ দেখে কিছুটা ভরকে গেল। ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

“জি স্যার বলুন। ”

“সারা তাবাসসুম কী নিয়মিত ভাড়া দিতেন? ”

“জি স্যার। ”

“আমি যতদূর শুনেছি উনি অনেকের সাথেই ঝগড়া করেছেন, নরমাল ব্যাপারেও অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিতেন। তার জন্য কী ওনাকে বাড়ি ছাড়বার কোনো নোটিশ দেয়া হয়েছে?”

কেয়ারটেকার ভদ্রলোক শুকনো ঢোক গিলল। বলল,

“জি না স্যার। ”

“কেন দেয়া হয় নি? এটা তো এই শহরে বাড়িওয়ালাদের নিয়ম। ”

“আসলে স্যার উনি ছয়মাসের ভাড়া এডভান্স পেমেন্ট করে ফ্ল্যাটে উঠেছিলেন?”

সৌরভের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। বলল,

“এরকম কেন? নরমালি তো দুই মাসের এডভান্স ক্লিয়ার করতে হয়!”

“স্যার আমি এই ব্যাপারে সঠিক জানিনা। উনি বাড়িওয়ালার সঙ্গে আগে কথা বলে নিয়েছিলেন।”

সৌরভ আর কিছু বলল না।

****

ঘরে ফিরে সৌরভ খাওয়া দাওয়া আর গোসলের জন্য বিশ মিনিট ব্যয় করলো। তারপর কম্পিউটারের সামনে বসে পড়লো এক কাপ কফি নিয়ে। প্রথমে ইন্টারনেটে সার্চ করে হেমলক সম্পর্কে জানলো।

হেমলক সম্পর্কে যা জানলো তা হলো হেমলক দেখতে প্রায় গাজরের মতো। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে মূল অবস্থায় গাজরের মতো দেখতে। এমনকি স্বাদ ও প্রায় গাজরের মতো। তাই সালাদ কিংবা জুসের সাথে মিশিয়ে দিলে টের পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। অপরাধী ভিক্টিমদের শরীরে হয়তো এভাবেই হেমলক দিয়েছে।

আরেকটু ঘাটাঘাটি করতেই জানতে পারলো যে হেমলক খাওয়ার সাথে সাথে মৃত্যু হয় না। মৃত্যু হতে ম্যাক্সিমাম দুই থেকে তিন ঘন্টা লাগে। সেক্ষেত্রে শরীরে শরীরে বিষ পৌছালে আস্তে আস্তে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। হাত, পা নিস্তেজ হতে শুরু করে। এমনকি ভিক্টিম কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে। সোজা ভাবে বলতে গেলে তিলে তিলে মরে যাওয়া। ভিক্টিম বুঝতে পারে যে সে মারা যাচ্ছে কিন্তু কোনোরকম সাহায্য কিংবা নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারে না।

সৌরভ মোটামুটি একটা ব্যখ্যা দাঁড় করালো। খুনী একজন ই। কিন্তু খুনীর সাথে সক্রিয়ভাবে আরও কয়েকজন হয়তো আছে। হেমলক যোগাড় করে সেটা খাবারে। খুব সম্ভবত সালাদে মিশিয়ে ভিক্টিমের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খাওয়া দাওয়ার পর যখন ভিক্টিমের শরীর যখন নিস্তেজ হলো, কথা বলা যখন বন্ধ হলো তখন অতিদ্রুত সালাদের প্লেট টা পরিষ্কার করা হলো৷ এরপর আলাদা করে যে খাবার টা নিয়ে এসেছিল সেটা সুন্দর ভাবে টেবিলে গুছিয়ে রাখা হলো, যেন দেখে মনে হয় খেতে খেতে অজ্ঞান হয়ে গেছে। এরপর ব্লেড দিয়ে হাতের শিরা কেটে ঘরের সব জায়গা থেকে প্রমাণ লোপাট করা হলো। যেহেতু খুনী প্রফেশনাল না, কিন্তু বুদ্ধিমান সেহেতু সে গোসল করে পরিপাটি হয়ে বিল্ডিং থেকে বেরিয়েছিল।

এতটুকু ব্যখ্যা সৌরভ দাঁড় করালো। ঘটনা এরকম হবার চান্স আশি পার্সেন্ট। তবে একটা ব্যাপার হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর যে ভিক্টিম সারার খুব পরিচিত কেউ। যার অনেক গোপন তথ্য সারা কিংবা ওর হাজবেন্ড জানে।

চলবে…
(কষ্ট করে কমেন্ট করতে ভুলবেন না।)
চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here