ছুয়ে_দেখো_আমার_শহর পর্ব ৪

#ছুয়ে_দেখো_আমার_শহর
#লেখিকা_হৃদিতা_আহমেদ

পর্ব-৪

পুতুল আসায় ছন্দ কোনভাবেই স্কুলে যাবে না।মিসেস মধুমিতা অনেক বলেও তাকে স্কুলে পাঠাতে পারেননি।সারাদিন পুতুলকে পুরো বাড়ি আর বাগান ঘুরে দেখিয়েছে ছন্দ।পুতুলেরও বেশ ভালো লেগেছে সবকিছু, তবে সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে বাগানটা আর বাগানের বড়ো দোলনাটা।এরমাঝে মাম্মার সাথে একবার কথা হয়েছে পুতুলের।ছন্দর মজার মজার কথা শুনতে খুব ভালো লেগেছে পুতুলের।সবমিলিয়ে তার নিজের পরিবার,বাড়ি সবকিছুই খুব পছন্দ হয়েছে।আর অন্যদিকে সকালে বাবার সাথে কথা শেষে ঘন্টা খানেক পরেই বাইরে গেছে সূর্য।সারাদিন তার কোনো আতা পাতা পাওয়া যায় নি।

রাতে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এমন সময় দরজা নকের শব্দে ভ্রু কুঁচকে ফেলে পুতুল।দরজা খুলতেই দেখতে পায় সূর্য বেশ গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
-“ভেতরে আসতে পারি?” পুতুল আস্তে উত্তর দিল,
-” সিউর”
পুতুলের কথায় সূর্য ফটাফট পা ফেলে রুমে ঢুকে বিছানায় যেয়ে বসে।অনেকক্ষণ হলো সূর্য চুপচাপ বসে আছে।বসে আছে বললে ভুল হবে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুতুলের দিকে তাকিয়ে আছে।পুতুল একটা ব্লু কালারের থ্রি কোয়াটার লেগিংস এর সাথে স্কাই কালারের টিশার্ট পড়ে আছে, কাঁধ পর্যন্ত চুল গুলো দুই কাঁধে ঝুলে আছে। দেখে মনে হচ্ছে স্কুল পড়ুয়া স্টুডেন্ট।মনে মনে সূর্য নিজেকে কয়েকটা শক্ত গালি দিলো এরকম পিচ্চির প্রেমে পড়ার অপরাধে।

সকালের ঘটনার পরে সূর্যের কথা প্রায় ভুলে গেছিল পুতুল। পুতুলের বেশ অস্বস্তি হচ্ছে,অনেকক্ষণ হলো সে সূর্যের থেকে একটু দুরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কোনো কথা বলছে না কেউ, কি বলে সম্বোধন করবে ভেবে না পেয়ে বলল,
-” আপনি কি কিছু বলবেন।”
– “তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে? ”
পুতুল সর্বোচ্চ বিস্মিত হয়ে বলল,
-“মানে!!”
-“বাংলা বুঝো না, ডু ইউ হ্যাভ এনি বয়ফ্রেন্ড?”
জীবনের প্রথম এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পুতুল পুরো বোকা বনে গেছে।হতবিহ্বল হয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে কি বলবে বুঝতে পারছে না।এবার সূর্য একটু ধমক দিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই পুতুল চটপট মাথা নেড়ে না জানালো।সূর্য বেড থেকে নেমে পুতুলের সামনে এসে দাঁড়ায়।মৃদু হেসে বলল,
-” গুড, অবশ্য থাকলেও কোনো লাভ হতো না।টুস করে ধরে ঠুস করে মেরে দিতাম।”
পুতুল সূর্যর কথা শুনে অবাক হয়ে সূর্যর দিকে তাকায়।সূর্যের সাথে চোখাচোখি হতেই বড়সড় ধাক্কা খায় পুতুল।ছেলেদের এতো ভয়ংকর সুন্দর চোখ হয় নাকি? একগাদা ঘনকালো পাপড়ির মধ্যে ব্রাউন কালারের মণিটা কেমন শান্ত ভঙ্গিতে চেয়ে আছে।পুতুলের একটুও অন্য দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না।কেমন যেন খুব তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে, বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে।ঘোর কাটে সূর্যের কথায়।সূর্য পুতুলের নাক টিপে বলল,
-” ওকে,গুড নাইট পিচ্চি।” বলে যাবার জন্য পা বাড়ায়। হঠাৎ দরজা পর্যন্ত যেয়ে কিছু একটা ভেবে ঘুরে দাঁড়ায় সূর্য।আদেশর সুরে বলল,
-” আমার নাম অবাক মাহবুব সূর্য, তুমি যেকোন নামে ডাকতে পারো। আর নাম ধরে ডাকতে লজ্জা লাগলে কল মি ক্যাপ্টেন।বাট ডোন্ট কল মি ভাইয়া।” বলে ফট করে দরজা বন্ধ করে চলে যায় সূর্য।

পুতুল বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে, তার সাথে ঠিক কি হলো বুঝতে পারছে না।ভাইয়া টা না মানে অবাক আরে ধুর ছেলে টা ঠিক কি বলে গেল সব তার মাথার উপর দিয়ে গেছে।আর এসব বললোই বা কেন? হতবাক হয়ে নিজের নাক নিজেই টিপে বলল,
-” এটা কি ছিল! ”

রুমে এসে সূর্য গড়াগড়ি দিয়ে কিছুক্ষণ হাসলো।পুতুলের বোকা বোকা চাহনি মনে হতেই দফায় দফায় হাসি পাচ্ছে।নাহ,,,,আর হাসা যাবে না।শেষে দেখা যাবে হাসির চোটে হার্ট এট্যাক হয়ে যাবে।পরে নিউজপেপারে হেডলাইন হবে ‘হাসির তোড়ে দেশের তরুণ সৈনিকের অক্কা পাত।’ উহুম এটাতো কিছুতেই হতে পারে না, এ দেশকে তার প্রয়োজন। দেশের জন্য তার বেচে থাকতে হবে, আর দেশের জন্য তাকে এখন ঘুমতে হবে। ভেবেই গুরুতর ভাবে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে সূর্য, মনে হচ্ছে সে না ঘুমলে সত্যি দেশের ভীষণ ক্ষতি হয়ে যাবে।হঠাৎ ফিক করে হেসে বলল,
-” কেঁদে আমার ঘুম উড়িয়ে নিজে শান্তিতে ঘুমনো, হবেনা পিচ্চি হবেনা।আজ থেকে তোমাকেও আমার সাথে জাগতে হবে সোনা।”

সকালে নাস্তার টেবিলে মি. মাহবুব বেশ ফুরফুরে মেজাজে নাস্তা করছেন।হঠাৎ কিছু একটা ভেবে সূর্যকে বললেন,
-” অবাক আজ তুমি পুতুলকে নিয়ে ছন্দর স্কুলে যাবে।” বড় আব্বুর কথায় পুতুল ভয়ে ভয়ে একবার সূর্যর দিকে তাকালো, এই অদ্ভুত ছেলেটার সাথে তাকে কেন যেতে হবে? সূর্য খেতে খেতে বলল,
-” টুকটুকির স্কুলে পুতুলকে নিয়ে যাব কেন?”
-” ছন্দদের স্কুল টা স্কুল অ্যান্ড কলেজিয়েট, সো আমি চাই পুতুল ওখানেই ভর্তি হোক।প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলায় আছে,তুমি পুতুলকে নিয়ে গিয়ে শুধু ফর্মালিটিস গুলো পূরণ করে আসবে।আমার একটা জরুরি মিটিং পড়ে গেছে নইলে আমিই যেতাম।”
অবাক দুর্দান্ত খুশি হয়ে বলল,
-” ওকে বাবা।”
-“ওয়াও,আমি আর পুতুল আপু রোজ একসাথে যেতে পারবো। থ্যাঙ্কিউ বাবা।” ভীষণ খুশি হয়ে বলল ছন্দ।
মেয়ের কথায় মৃদু হাসলেন মি.মাহবুব।তারপর পুতুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-“মামনি তুমি তোমার পেপারস গুলো ঠিক করে নিয়ে যেও, কেমন? ”
প্রতিত্তোরে পুতুল মাথা নেড়ে আচ্ছা বলল।

সূর্য গাড়িতে বসে পুতুল ও ছন্দর জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ছন্দ দৌড়ে এসে গাড়িতে বসে টুপ করে ভাইয়ের গালে চুমু দেয়।সূর্য ভ্রু কুঁচকে বলল,
-” কী চাই?”
-“শুনো না ভাইয়া আমিও তোমাদের সাথে মলে যাব।”
-” তোকে কে বলল মলে যাব?”
-” আম্মু তোমাকে তখন বলছিল না পুতুল আপুকে ফোন কিনে দিতে আমি শুনেছি।”
-“টুকটুকি গতকাল স্কুলে যাসনি আমি জানি, সো নো হাংকি-পাংকি।”
ভাইয়ের কথায় ছন্দ মুখ ফুলিয়ে ফট করে গাড়ি থেকে নেমে চট করে গাড়ির ব্যাক সিটে যেয়ে বসে।সূর্য মৃদু হেসে সামনে তাকাতেই হা হয়ে যায়।পুতুল একটা সিম্পল সাদা সেমি লেং ফ্রক এর সাথে শর্ট জিন্স কোর্ট পড়েছে আর পায়ে সাদা কেডস,কাধ পর্যন্ত চুল গুলো খোলা। দেখে মনে হচ্ছে সবে ক্লাস নাইন টেনে পড়ুয়া মেয়ে।সূর্য হতাশ ভঙ্গিতে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
-” আমার পকেট আজ ফাঁকা করতে হবে, এই ক্রায়িং বেবিকে ম্যাচিউর করতে।”

প্রিন্সিপালের রুম থেকে বের হয়ে সূর্য ফটাফট পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে।আর পুতুল তার পিছু পিছু অনেকটা দৌড়াচ্ছে।উফফ এই ছেলে টা এতো লম্বু কেন?ভেবে বিরক্তি নিয়ে এগোচ্ছে পুতুল।গাড়ির কাছে আসতেই সূর্য চট করে গাড়ির সামনের দরজা খুলে দেয়।পুতুল কোন কথা নাা বলে চুপচাপ উঠে বসে।সূর্য গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল,
-” তোমার ভাগ্য ভালো তাই ফাইনালের ছয়মাস আগেও ভর্তি হতে পারলে।বাট নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে না।সো প্রচুর হার্ড ওয়ার্ক করতে হবে।”
জবাবে পুতুল মাথা নেড়ে হুম বলল।

গাড়ি একটা মলের সামনে থামাতেই পুতুল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সূর্যের দিকে তাকায়।সূর্য ভাবলেশহীন ভাবে গাড়ি থেকে নেমে পুতুলকে নামার ইশারা করে। আগত্য পুতুলও নেমে সূর্যের পিছু পিছু হাটতে শুরু করে।সূর্যকে লিফটের দিকে যেতে দেখে পুতুল ফট করে বলে উঠে,
-” ভাইয়া ”
পুতুল ভাইয়া ডাকার সাথে সাথেই সূর্য কঠিন চোখে পুতুলের দিকে তাকায়।সূর্যের চাহনি দেখে পুতুল ভয়ে একটা ফাঁকা ঢোক গিলল।সূর্য গমগমে গলায় বলল,
-” কাম ফাস্ট ” বলেই লিফটের ভেতরে চলে যায় সূর্য।বাধ্য হয়ে পুতুলও তার পাশে এসে দাঁড়ায়।কিন্তু সে তো সূর্যকে বলতেই পারলো না তার লিফটে ভীষণ ভয় লাগে।পুতুল কাচুমাচু হয়ে সূর্যের পাশে দাড়িয়ে আছে, লিফট চালু হওয়ার সাথে সাথেই পুতুল ফট করে সূর্যের বা হাত নিজের দু’হাতে জাপটে ধরে। হঠাৎ হাত ধরায় সূর্য অবাক হয়ে পুতুলের দিকে তাকাতেই দেখে পুতুল শক্ত করে চোখ বন্ধ করে আছে।

চলবে

গতকাল ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম তাই দিতে পারিনি। দুঃখিত😞। হ্যাপি রিডিং 🙂

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here