তুমিময় বসন্ত পর্ব -৪২ ও শেষ

#তুমিময়_বসন্ত
৪২.
#Writer_Mousumi_Akter

কুয়াশার কম্বল গায়ে ঢেকে আছে সূর্য।সাদা কুয়াশার আবরণ মুড়ে আছে শহর।চারদিক কুয়াশাছন্ন সকালের শুভেচ্ছা দিতে অতিথি পাখি সোরগোল করছে সকাল থেকে।ঠান্ডায় ঘুম বেশ এটে বসেছে চোখে।কাল রাত আট টায় আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
।আয়াস অনেক বার আমাকে ডিস্টার্ব করেছে কিন্তু লাভ হয়নি।গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলাম আমি।শীতকাল টা মানেই ঘুমকাল আমার কাছে।

‘আয়াস কাল সন্ধায় বলে রেখেছিলো শীত পড়েছে ধরে তুমি আমায় ভীষণ ফাঁকি দাও।একটুও ভালবাসতে পারিনা,আদর করতে পারিনা।হে মহান শীত দয়া করিয়া বিদায় হয়ে আমার বউ কে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।’

তার সে কথা আমি রাখতে পারিনি।ঘুম এলে পৃথিবীর কোনো হুঁশ থাকে না আমার।আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি আয়াস আমাকে খুব শক্ত ভাবে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।আজ বোধহয় তার থেকে ছাড়া পাওয়া যাবেনা যেভাবে শক্ত বাঁধনে বেঁধেছে আমাকে।আমি তার কানের সাথে ঠোঁট মিশিয়ে ফিসফিস করে কতবার ডাকলাম।একটু বেশী বেশী ডাকাডাকির ফলস্বরুপ সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে পেটের উপর মুখ গুজে সুয়ে পড়লো।পেটের উপর নাক ডুবিয়ে আবার ও গভীর ঘুমের রাজ্য মগ্ন সে।তার নিঃশ্বাস উপচে পেটের উপর পড়ছে।আয়াসের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতো ঘুমোচ্ছে।বেশ কয়েকবার ডাকাডাকির পরে ও আয়াস উঠলো না।আমার ডাক তার কানে যাচ্ছে কিনা জানিনা।অনেক বেশী ডাকের ফলস্বরূপ সে এবার কোমর জড়িয়ে ধরে আরো আয়েস করে ঘুমোনোর চেষ্টা করলো।আয়াসের চুলের মধ্য বিলি কাটতে কাটতে বললাম,

‘ শুনছো?অনেক বেলা হয়েছে উঠতে হবেনা।’

আয়াস ঘুম ঘুম চোখে তার মাথায় চালানো আমার হাত টেনে নিয়ে তার বুকের উপর রেখে বললো,

‘বেবিডল একটুও ডিস্টার্ব করোনা।অনেকদিন পর একটা রোমান্টিক সকাল পেয়েছি।একটু উপভোগ করতে দাও।’

আয়াসের বুকে চিমটি কেটে বললাম,

‘ অনেক দিন পর কোথায় রোজ সকালেই এভাবে বিরক্ত করো তুমি।’

আয়াস আবার ও ঘুম ঘুম মাতাল করা কন্ঠে বললো,

‘আজকের সকাল আর একটু বেশী রোমান্টিক।’

‘কেনো?’

‘আজ ঠান্ডা বেশী।’

‘ঠান্ডার সাথে রোমাঞ্চ এর কি রিলেশন। ‘

‘রিলেশন আছে,ঠান্ডা বেশী পড়লে আমার তোমাকে বেশী করে আদর করতে ইচ্ছা করে।মন চায় দুনিয়ার সব ভ্যানিশ হয়ে যাক।শুধু আমি আর আমার বউ সারা দুনিয়া জুড়ে প্রেম করে বেড়ায়।দুনিয়াট প্রেম ভালবাসার জন্য উন্মুক্ত করা হোক।আমি আর আমার বউ যেখানে সেখানে যেনো একটু প্রেম করতে পারি।’

‘ইস!শখ কত।ছাড়ো আমায়।আজ শুক্রবার।পাঞ্জাবী ধুয়ে দিতে হবে।তুমি নামাজে যাবেনা।’

‘উহু!ছাড়াছাড়ি নেই।নামাজে টাইমলি চলে যাবো।এখন অন্য কিছুর টাইম।’

‘অসভ্য একটা।’

অসভ্য বলাতেই আয়াস অসভ্য একটা হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকালো।তারপর
পেটে ওষ্ট ডুবিয়ে অনেক্ষণ রইলো।তপ্ত নিঃশ্বাস ঘন ঘন পড়ছে পেটের উপর।ভয়ানক এক শিহরন খেলে গেলো শরীরের ভেতর।লোমকূপ ও দাঁড়িয়ে গেলো।হঠাত অন্য এক শিতলতা শরীরের মাঝে শিহরণ জাগালো।আমি দ্রুত আয়াস কে ধাক্কা মেরে বিছানা ছেড়ে উঠে যেতেই আয়াস সাথে সাথে হাত ধরে টান দিয়ে বিছানায় ফেলে দিলো।আমার ভারী হয়ে আসা নিঃশ্বাস ঘন ঘন পড়ছে।আয়াস আমার পেটে তার হাত রাখলো।হাতের উপর থুতনি ঠেকিয়ে ভরপুর ঘুমে ডুবুডুবু চোখে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে।চোখের পলক ই পড়ছে না আয়াসের।বড্ড বেশী নেশা তার চোখে।সদ্য ঘুম থেকে উঠা প্রেমিকের চোখে দুষ্টুমির ছড়াছড়ি দেখছি আমি।আমার হাত টেনে নিজের কাছে নিয়ে হাতের আঙুল গুলো নিজের হাতের মধ্য নিয়ে দুষ্টুমি করছে আর মৃদু মৃদু হাসছে।চাইলেই কি তার শক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।তার ঠোঁটে জেগে ওঠা দুষ্টুমি আস্তে আস্তে ভালবাসার অলংকার হিসাবে সমস্ত শরীরে ছুইয়ে দিলো।আমিও হারিয়ে গেলাম তার ভালবাসার গহীনে গভীরে।

খানিক টা সময় পর আয়াসের বাঁধন থেকে মুক্তি পেয়ে ওয়াশ রুমে গিয়ে গোসল করে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বের হলাম।আয়াস টাওয়াল কাঁধে করে দাঁড়িয়ে আছে।আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।ওর হাসি দেখে আমি ভীষণ লজ্জা পেলাম।মাথা নিচু করে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আয়াস আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।আমি লজ্জায় ওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে নিচু দিকে তাকিয়ে আছি।আয়াস আমার দুই হাতের আঙুলের ভাজে আঙুল রেখে তাকালো আমার দিকে।আমার পায়ের পাতায় ওর একটা পা আলতো ভাবে রেখে বললো,

‘কোথায় পালাও তুমি?সারাদিন শুধু পালিয়ে বেড়াও কেনো?হাউ স্ট্রেইঞ্জ। বউ তুমি আমার। ‘

বলেই আমার গালে মুখে অগনিত চুমু খেতে খেতে বললো,

‘এই ভেজা চুল,লজ্জা মাখা গাল আমাকে উ/ ন্মা/দ করতেই যথেষ্ট।’

আমি লজ্জায় আয়াস কে ধাক্কা দিয়ে রুমের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম।কুসুম ভাবির ফ্ল্যটের দিকে নজর গেলো।ভাবতেই খারাপ লাগছে ভাবির মতো নিষ্পাপ একটা মেয়ে যদি জানে তার না থাকায় তার স্বামি অন্য কারো সাথে ঘনিষ্ট হয়েছে সহ্য করতে পারবে না নিশ্চয়ই। ইস!মানুষের জীবন কত বিচিত্র।খুব বিশ্বাসের মানুষ টাও একদিন বেঈমানি করে খুব নিষ্টুর ভাবে।আচ্ছা শরীর ই কি সব।মনের ক্ষুদার থেকে কি শরীরের ক্ষুদায় কষ্ট বেশী।ব্যাপার টা আজ ও বুঝলাম না সত্যি।কুসুম ভাবি আসবেন আর কিছুদিন পর।ভাবির একটা ছেলে ও হয়েছে।অথচ এই বাসায় কুসুম ভাবির হাজবেন্ড এসব করছে।আজ ভাইয়া নামাজে গেলে এই বেটিরে আমি ধরবো।খুব করেই ধরবো।এর বিচার হওয়া উচিত।একটা পরিবার এভাবে আমি ভেঙে যেতে দেখতে পারিনা। মানে কিছুতেই পারিনাহ।

সাড়ে বারোটা বাজে আয়াস কে আমি পাঞ্জাবীর বোতাম লাগিয়ে দিতে দিতে বললাম,

‘জিলেপি নিয়ে আসবা কিন্তু।মসজিদ এর টা খেতে ভাললাগে।’

আয়াস আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো,

‘ওকে ম্যাডাম আনবো।’

এরই মাঝে কুসুম ভাবির বাসার কাজের মহিলা রেনুকা উঁকি মেরে বললো,

‘আসবো ভাইজান।’

‘আয়াস হাসি মুখে বললো,এসো রেনুকা।’

আমি ভয়ানক রাগি মুডে আয়াসের দিকে তাকিয়ে আছি।আয়াস আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো,

‘তোমার কষ্ট হয় তাই।পাশের ফ্ল্যাটেই যখন কাজ করে তোমার ও কাজ করে দিবে।’

বুকে হাত বেঁধে অগ্নি চোখে আয়াসের দিকে তাকিয়ে বললাম,

‘তোমাকে বলেছি আমি কাজের মহিলা লাগবে।’

‘আশ্চর্য তুমি বলবা কেনো?তোমার কষ্ট হয় আমিতো বুঝি।’

‘আমার নাকি তোমার কাজের মহিলার প্রয়োজন ঠিক বুঝছিনা আয়াস।’

আয়াস ভ্যাবাচেকা খেলো আমার কথা শুনে।আমি কাজের মহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম,

‘এই হ্যালো আপনি?হা করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন কেনো?এটা আমার বাসা।আমার বাসায় প্রবেশ করতে হলে আমার পারমিশন নিতে হবে।আপনি ওর পারমিশন নিলেন কেনো হুয়াই। পুরুষ মানুষ দেখলে তার গায়ে পড়ে কথা বলতে হয় বুঝি।এই মহিলা বারবার ওর দিকে তাকাস ক্যান।আমার দিকে তাকা আর আমার কথার উত্তর দে।যদি আয়াসের সাথে আর কখনো ভুলেও কথা বলিস আমি কি করবো তোর আইডিয়া ও নেই।’

‘আফা আপনি এমন করতাছেন ক্যানো?

‘কেমন করবো।এই চরিত্রহীন মহিলা।অন্যর জামাই নিয়ে ইটিস পিটিস করিস ক্যান।ক্যান করিস।শরীরে খুব জ্বালা তাইনা?বিয়ে করিস না ক্যান তাইলে।বিয়ে না করে অন্যর বিবাহিত জামাই নিয়ে ইটিস পিটিস।তোর বিয়ে করা লাগবে।আর আমি তোর বিয়ের ব্যবস্থা করবো সবার আগে।শোন বজ্জাত মহিলা তোরা পুরুষ মানুষের মাঝে কামনার সৃষ্টি করিস।আর তখন শ/য়/তা/ন ভর করে পুরুষ মানুষের মাঝে।আর তোদের মায়াজালে ফেঁসে যায়।পৃথিবীতে নারী জাতীয় কারণে যত ঘর সংসার ভেঙেছে তার বেশীরভাগ দোষ এইসব দুঃচরিত্রা মহিলা।এক মেয়ে হয়ে অন্য মেয়ের কষ্টের কারণ কিভাবে হস।মানুষ না কি তোরা।কারো স্বামির প্রেমিকা হওয়া বুঝি খুব গর্বের কাজ।আমার বাসা থেকে বের হ। এক্ষুণি বের হ।’

‘ভাই আপনেই তো ডাকছেন। আফা এমন ব্যবহার করতাসে ক্যান।’

‘আবার ভাই।এই মহিলা এই তুই কি পুরুষ মানুষের সাথে ছাড়া কথা বলতে পারিস না।তোর সাথে আমার এমনিতেও কথা আছে।এখন বের হ আগে।’

রেনুকার সাথে এমন ব্যবহারের কোনো কারন ই আয়াস খুজে বের করতে পারলো না।আয়াস হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।#তুমিময়_বসন্ত
৪৩.
#writer_Mousumi_Akter

আয়াস আমার ঝগড়া দেখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।আসলেই আয়াস বুঝতে পারছেনা আমার কি হয়েছে।আমি কেনো এমন করছি।

রেনুকা বেরিয়ে গেলো।আয়াস এবার বেশ বিরক্ত কন্ঠে বললো,

‘এটা কি হলো মুগ্ধতা।তুমি এসব কি বললে আজ।ছি ঃএকটা কাজের মহিলার সামনে এমন আপত্তিকর কথা কিভাবে বললে তাও আবার আমাকে নিয়ে।আমাকে তুমি এমন ভাবলে কি ভাবে।দিন দিন তুমি খুব সন্দেহজনক মেয়ে হয়ে যাচ্ছো।আজ থেকে সিরিয়াল দেখা বন্ধ তোমার।এসব দেখে দেখে এমন হচ্ছো তুমি।’

‘তোমাকে আমি কি বলেছি আমার কষ্ট হচ্ছে গো।একটা কাজের বুয়া এনে দাও।আজকাল যা যুগ পড়েছে পুরুষ মানুষ আর বিশ্বাস করা যাচ্ছেনা।তুমি এই রেনুকার সাথে প্রেম করবা বলে ডেকেছো আমি নিশ্চিত।’

‘এই মেয়ে বলে কি।আমাকে বিশ্বাস করোনা তুমি।’

‘কিভাবে করবো।’

‘আশ্চর্যজনক কথা বললে তুমি।আমি কি বিশ্বাস ভঙ্গের কিছু করেছি।’

‘ওই রেনুকা কুসুম ভাবির বরের সাথে অবৈধ সম্পর্ক করে।আমি অনেক বার দেখেছি।আগামিকাল কুসুম ভাবি আসবে সে জানলে কি হবে বলোতো।রেনুকাকে আমি দু’চোখে দেখতে পারছি না।ওই রেনুকার একটা ব্যবস্থা করো প্লিজ।তোমার তো কত ক্ষমতা রেনুকার একটা ব্যাবস্থা করো প্লিজ।এসব মেয়ে মানুষ আমি দু’চোখে দেখতে পারিনা।’

‘আগে তোমার একটা ব্যবস্থা করি তারপর রেনুকার করবো।আজ রাত হোক,এই ঠান্ডায় গায়ের সমস্ত কাপড় খুলে দাঁড় করিয়ে রাখবো।’

‘অশ্লিল লোক একটা।’

‘রেনুকার কি একটা ব্যবস্থা হবেনা।আমি নিজ চোখে দেখেছি রেনুকা আর ভাইয়া জড়াজড়ি করে।’

‘ওহ মাই গড! উনার মতো মানুষ এমন কিভাবে করতে পারেন।আচ্ছা শান্ত হও তুমি।নামাজ পড়ে আসি।’

‘তাহলে ভাবো।আর তুমি কিনা ওই মহিলাকে আমার বাসায় কাজের বুয়া নিয়ে এসছো।আমি কোনদিন বাসায় কাজের বুয়া রাখবো না।’

‘মানুষ অন্যর বরকে জড়িয়ে ধরে আর তুমি নিজের বর কেও জড়িয়ে ধরতে লজ্জা পাও।’

আয়াস নামাজে গেলো কিন্তু দুইটার বেশী বাজে আর ফিরলো না।আমি ফোন দিয়েছি বললো তার লেট হবে আমি যেনো খেয়ে নেই।অনেক বার জিজ্ঞেস করাতে বললো,কুসুম ভাবির হাজবেন্ড এর সাথে কিছু কথা আছে। যাক নিশ্চিন্ত হলাম আয়াস তাহলে ভাইয়াকে বুঝাবে। আর আয়াসের কথা ভাইয়া রাখবে আমি জানি।বেশ আনন্দে লাফাচ্ছি আমি।কুসুম ভাবিদের রুমে গেলাম আমি।রেনুকা বসে টিভি দেখছে।

‘আমি রেনুকার হাত চেপে ধরলাম আর বললাম অন্যর বেডরুমে কি করিস।এমন ভাবে সুয়ে আছিস যেনো এটা তোর জামাই এর রুম। ফেসবুকে একটা লাইভ শেয়ার করি তোর।তোর ছবি দিয়ে পোষ্টার লাগিয়ে দেই এই মহিলা হতে সাবধান।একটুও কি লজ্জা নেই।এত নিচ কেনো তোরা।কি ভাবছিস কিচ্ছু জানিনা।এ বাসায় সিসি ক্যামেরা আছে।তোর সব কুকির্তীর ভিডিও আছে।এসব পুলিশ কে দেখাবো আর তোর নামে সংসার ভাঙার অভিযোগ দিবো।আচ্ছা তোর অবস্থা দেখ।তোর আর ভাইয়ার কি সম্পর্ক। বিয়ে করবে ভাইয়া তোকে।কখনো না,শুধু শুধু ইউজ করছে।সরকারের কাছে তোদের মতো দেহ ব্যবসায়ী দের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থার দাবি জানাতে হবে।পরপুরুষে আসক্ত নারী আর পরনারীতে আসক্ত পুরুষ কে নিষিদ্ধ করা হোক দুনিয়া থেকে।
আয়াস যে অনেক বড় অফিসার তুই জানিস।আয়াস তোর কি করবে ঠিক নেই।জাস্ট রেডি হ শাস্তির জন্য।একটা সংসার ভাঙার জন্য তোদের মতো মহিলা যথেষ্ট।এসব মহিলাদের কোনদিন সংসার হয়না।সারাজীবন এভাবেই মানুষের বিছানা চেঞ্জ করে বেড়াতে হয়।অন্যর স্বামির সাথে পরকিয়া করা কি খুব গর্বের কাজ।’

রেনুকা আমার পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইলো।তার ভুল স্বীকার করলো।আয়াস যেনো তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয় সে জন্য বারবার ক্ষমা চাইলো।ভয়ে কাঁপছে রেনুকা।এইজন্য ই বাসায় কাজের বুয়া না রাখাটায় ভালো।বেশীর ভাগ কাজের মহিলার সাথে বাড়ির পুরুষের একটা অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।বাপের বাড়ি বা কোথাও দীর্ঘদিনের জন্য গেলে কাজের বুয়ার বাসায় যাতায়াত অফ করে দেওয়াটা বেটার।

‘রেনুকাকে বললাম,আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে কি বিপদ থেকে বাঁচতে চাইছো।আল্লাহ ক্ষমা করবেন না কখনো।সংসার ভাঙার শাস্তি আল্লাহ তোমাকে দিবেন।তোমার মতো অন্তত একজন মহিলার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।সেই শাস্তির উদাহরণ দেশ বাসিকে দেখানো উচিত।তাহলে কোনো মহিলা আর এমন সম্পর্কের দিকে আগাবে না।ওই সব পুরুষ যারা নিজের ওয়াইফ থাকতে অন্য মেয়েদের সাথে ঘনিষ্ট হয় তাদের অন্ডকোষ কর্তন করে দেওয়া উচিত তাহলে আর কেউ এসবের দিকে আগাবেনা।’

রেনুকা তখন ই চলে গেলো বাসা ছেড়ে।

পরের দিন কুসুম ভাবি এসছে কোলে ফুটফুটে একটা ছেলে বাবু নিয়ে।কিন্তু এবার বাসায় ফেরার পর সুখের সংসার আর সুখের নেই।অশান্তিতে ভরপুর।ভাবির প্রাণের থেকে প্রিয় স্বামিকে ভাবি আর আগের মতো ভালবাসে না।সব সময় খিটমিট করে।আসলে সত্য কখনো চাপা থাকেনা।কুসুম ভাবি ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিলো রেনুকার সাথে ভাইয়ার কিছু একটা চলেছে।ভাবি যখন বাপের বাড়ি ছিলো ভাইয়া নাকি খুব একটা ফোন করেনি,খোজ নেয় নি, খিটমিট করেছে।বেশ কতদিন সংসারে অশান্তি হওয়াতে ভাবি ভাইয়াকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।কুসুম ভাবি ফিরে আসার পর ভাইয়া সব সময় অনুতপ্ত,কিন্তু ভাবি আর ভাইয়াকে মেনে নিতে পারছে না।এসব অশান্তি নিয়ে ভাবি আবার ভাইয়াকে ছেড়ে চলে গেলো।ভাইয়া অনেক ক্ষমা চেয়েছে কিন্তু আর ভাবি আসতে রাজি নয়।আয়াস ভাইয়াকে বুঝানোর পর ভাইয়া খুব লজ্জিত।ভাবিকে হারিয়ে দিশেহারা ভাইয়া ঘুমের ওষুধ খেয়ে রাস্তায় চলাচল করে এক্সিডেন্ট হয়।প্রায় মৃত্যু সজ্জায় পড়ে যায়। আয়াস আর আমি ভাবিকে বুঝালাম।তখন ভাবি ফিরে আসে আর ভাইয়াকে আরেক বার সুযোগ দিয়ে দেয় সন্তানের জন্য।

ভাবি আমাকে বললো,

‘ভালবাসার মানুষ যদি একবার বিশ্বাসঘাতকতা করে আর কোনদিন তাকে ভালবাসা যায়না।মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয় সেটা কোনো মলমেও মিটে নাহ।’

কথাটার মানে অনেক গভীর।ভালবাসা হওয়া চাই ফ্রেশ সেখানে দাগ পড়লে কলঙ্কিত হয়ে যায়।হারামে সত্যি আরাম নেই।কুসুম ভাবিকে ভাইয়া আগের মতো করে চাইছে কিন্তু আর পাচ্ছেনা।সেই টান আর ভালবাসা কিছুই নেই।এখন সময় বলতে পারবে কুসুম ভাবি আগের মতো আর ভালবাসতে পারবে কিনা।কিছু জিনিস নির্ভর করে সময়ের উপর।যার সমাধান সময় ছাড়া আর কেউ দিতে পারে নাহ।কুসুম ভাবির হাজবেন্ড এর সব থেকে বড় শাস্তি হলো ভালবাসা হারানোর শাস্তি।এক ই ছাদের নিচে আছে অথচ ভাবিকে আর আগের মতো পাচ্ছেনা।

সময়, দিন,মাস এগিয়ে গেলো।আজ আমাদের দ্বীতীয় এনিভার্সারী।শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছি আমরা।বাড়িটা লাল,নীল আলো দিয়ে সাজিয়েছে অয়ন।আয়াস একটা সবুজশাড়ি এনে দিয়ে বললো,এটা পরো।এক গুচ্ছ সবুজ চুড়ি আর সবুজ শাড়ি পরে সাজলাম।আম্মু আমার জন্য দুটো বালা নিয়ে এসছে।খালামনি একটা শাড়ি নিয়ে এসছে।বাড়ির সবাই ভীষণ আনন্দে আছে।আয়াসের আম্মা রান্নাঘরএ রান্না করছে।আম্মু আর খালামনই আয়াসের আম্মার সাথে হেল্প করছে আর গল্প জুড়েছে।শ্রুতি বাটিতে মাংস এনে চেয়ারে বসে খাচ্ছে।অন্যদিকে অয়ন চুপটি মেরে বসে আছে সোফার কোনায়। ভীষণ মন খারাপ অয়নের।আমি বুঝে উঠতে পারছিনা অয়নের কি হয়েছে।

‘অয়নের পাশে গিয়ে বললাম,কি হয়েছে? ‘

‘অয়ন চোখ তুলে তাকিয়ে বললো,বিয়ে করতে চাই।’

‘আমি হাসলাম।’

‘মজা করছি না।বিয়ে করতে চাই।’

‘করো,সমস্যা কি?’

‘মা-বাবা আর ভাইয়াকে রাজি বানানোর দায়িত্ব তোমার।’

‘কাকে বিয়ে করবে?’

‘আরহী?আরহীকে প্রপোজ করেছি।সে বলে প্রেম ভালবাসায় সে বিশ্বাসী নয়।সে আর ঠকতে চায়না।আচ্ছা কে বলেছিলো তোমাদের দু’বোন কে ওই গভেট এর সাথে প্রেম করতে।আরহী প্রেম করতে চাইছে না এর মানে বিয়ে।’

‘আমি অয়ন কে বললাম,তুমিও বিয়ে করবে ভাই।আমার তো বিশ্বাস ই হচ্ছেনা।’

‘ভালবেসে ফেলেছি কি করবো।কিচ্ছু করার নেই ভাবি।প্লিজ ম্যানেজ করো বাড়িতে।’

সন্ধ্যায় অনুষ্টান শেষ হবার পর বাড়ির সবার মাঝে অয়ন আর আরহীর বিয়ের কথাটা তুললাম।আমি আয়াস সবাইকে বুঝিয়ে বিয়েতে রাজি করালাম।

অয়ন আর আরহীর বিয়ের একদিন আগে সারিকা মেসেজ করেছে,’কেমন আছো?’
তেলে বেগুনে জ্বলে আয়াসের ফোন আছাড় মেরে বললাম,এই সারিকা আবার মেসেজ দিয়েছে কেনো।দেখো আমিও কিন্তু প্রেম করবো একটা।আয়াস হেসে বললো,সারিকার বিয়ে সামনে।আর প্রেম আগামি সাত জন্মে তোমার প্রেমিক হয়েই আমি জন্ম নিবো।

অয়ন আর আরোহীর বিয়ে হয়ে গেলো।বেশ ধুমধাম করে বিয়েটা দেওয়া হলো।

অয়ন আর আরহীর বিয়ের রাতেই ছাদে পাটি বিছিয়ে আয়াসের হাতে মাথা রেখে দুজনে সুয়ে আছি।প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস বইছে ছাদে।মৃদু মৃদু বাতাসে আয়াসের বুকে মাথা রেখে পূর্ণিমার চাঁদ দেখছি।আয়াস আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ পরে বললো,

বেবিডল তুমি ও একটা চাঁদ।আকাশের ওই চাঁদ টা সবার।আর তুমি শুধু আমার।আয়াস আমার ঘাড়ে নাক ডুবিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুপটি মেরে সুয়ে রইলো।আয়াসের বুকে মাথা রেখে ঘুম,ওর ঘামের গন্ধ,ওর উষ্ণতা সব ই আজ আমার কাছে ভয়ংকর এক নেশা।আয়াস মৃদু মৃদু ভাবে ওষ্ট স্পর্শ করছে ঘাড়ে।বার বার কেঁপে উঠছি আমি।ভালবাসার শিহরণে আয়াসের পিঠের শার্ট খামচে ধরলাম দু’হাতে লজ্জায়।আয়াস যতবার আমাকে জড়িয়ে ধরেছে আমি ততবার ই লজ্জায় মিহিয়ে গিয়েছে।আয়াসের দুষ্টুমি থামবে না জানি।আমি আস্তে করে বললাম,

‘এটা কিন্তু ছাদ।’

আয়াস নেশাক্ত কন্ঠে বললো,

‘বেডরুমে চলো।বলেই আমাকে কোলে তুলে নিলো’।

আমি লজ্জায় ওর বুকে মাথা গুজে বললাম,

‘চাঁদটা সুন্দর না?একদম গোলাকার।’

‘আয়াস আমার গালে চুমু দিয়ে বললো,আমাদের দুজনের চন্দ্রবিলাস হওয়া উচিত তাইনা?’

আমি অকারণেই লজ্জা পাচ্ছি।শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে বললাম,

‘আমাদের দুজনের নয় তিনজনের।’

‘তিনজন কোথায় পেলে।এটুকু বলেই আয়াস চোখ বড় বড় করে বললো,সত্যি।বাট আমরা তো প্রটেকশন নিয়েছি।’

‘আমি হেসে বললাম,আমি ওইসব কিছুই করিনি।বিকজ আমার বেবির শখ ছিলো।’

‘আমাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো,আমি সত্যি সারপ্রাইজড মুগ্ধ।আনন্দে আমার কেঁদেই দিতে ইচ্ছা করছে জানো।কিছুদিন আগে আমি একটা ব্যাক্তিগত সমস্যায় ডাক্তার দেখিয়েছি।ডাক্তার বললো আপনি বাবা হতে পারবেন কিনা বলা মুশকিল।সেদিন থেকে রোজ তোমাকে জড়িয়ে ধরতাম আর আর ভাবতাম এই মেয়েটাকে আমি কি বলবো।আমি একজন অক্ষম পুরুষ।এই মেয়েটা মা হতে পারবেনা জানলে আবার ও ভেঙে পড়বে।তোমাকে বুঝতে দিবোনা বলে ফ্যামিলি প্লানিং অকারণ করে গিয়েছি।’

আয়াস কে দুইহাতে জড়িয়ে ধরে বললাম,

‘সন্তান দেওয়ার মালিক আল্লাহ,ডাক্তার নন।সব ইনফরমেশন সব সময় সত্য হয়না।আমি জানতাম আমি মা হতে পারবো।’

আয়াস আমার পেটে হাত রেখে বললো,

‘তোমার মাম্মির খুব খেয়াল রাখবো আর তোমার বেষ্ট পাপ্পা হবো প্রমিজ। ‘

আয়াস আমাকে আবার ও কোলে নিয়ে রুমে নিয়ে আসলো।বিছানায় বসিয়ে আয়াস ফ্লোরে বসলো আমার কোলে মাথা রেখে বললো মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবে প্লিজ।আমি আয়াসের মাথায় চুমু দিয়ে বললাম,

‘এমন স্বামি ভাগ্য কপাল কজনের হয়।পৃথিবীর সব মেয়ের থেকে আমি বেশী ভাগ্যবতী।আমার স্বামির মানে ভালবাসার অন্য জগত।এত ভালবাসবেন আমাকে সত্যি আইডিয়া ছিলো না।’

আয়াস আমার দিকে তাকালো।মৃদু হেসে বললো,

‘মুগ্ধতা তুমি মানেই সরলতার প্রতিমা, তুমি মানে মুগ্ধতায় পরিপূর্ণ আমি।বসন্ত উৎসবে দেখেছিলাম তোমাকে।সেখান থেকে প্রতিটা দিন ই আমার জীবনের রঙিন বসন্ত।তুমিময় বসন্তে রঙিন আমার জীবন।শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমার সাথেই থেকো।পরকালে ও আমার সাথেই থেকো।’

সেদিন থেকে আয়াস আমার যত্ন আরো বাড়িয়ে দিলো।আয়াসের মা-বাবা,অয়ন-আরহী,আমার আম্মু-বাবা সবাই শুধু দিন গুনতে শুরু করলো।কবে বেবি পৃথিবীতে আসবে।জীবনে বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুর কি প্রয়োজন আয়াস এর মতো কেয়ারিং স্বামি আর এমন পরিবার থাকলেই যথেষ্ট সুখের অভাব হয়না।রোজ সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি এমন একটা আয়াস যেনো সব মেয়ের জীবনেই আসে।আর ভালবাসায় পূর্ণ হয় জীবন।

সমাপ্ত।

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here