তোমায় ছোঁয়ার ইচ্ছে পর্ব -১০+১১

#তোমায়_ছোঁয়ার_ইচ্ছে
#পর্ব_১০
#সুমাইয়া মনি

‘একটা কিছু কর ইসানা, এই মুরাদ আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।’ সোহানা ফোনে অসহায় ভঙ্গিতে ইসানাকে বলছে।
‘আজও দেখা হয়েছিল নাকি?’
‘হ্যাঁ! সেধে বিরক্ত করেছে।’
‘যাক, যাও সে মানুষ। আর আমি তো বিরক্ত হচ্ছি টাইসনকে নিয়ে।’
‘টাইসন কি করেছে আবার?’
‘এই বা’লে’র কু’ত্তা’য় এত ভাব দেখায়। মন চায় চি’পা মা’ই’র দিতে।’
‘দে! তাহলেই ঠিক হবে।’
‘হ! কু’বু’দ্ধি দিচ্ছিস। পরে কামড় কে খাবে হুহ?’
‘তাহলে সহ্য কর। এখন বল এই মুরাদের কি করব?’
‘এক কাজ কর। তোর না কলেজের বন্ধুু আছে রাতুল?’
‘আছে!’
‘তার সঙ্গে রিলেশন কর।’
‘হপ!’
‘আরে এটা মুরাদকে দেখানোর জন্য করবি।’
‘বা’লে’র আইডিয়া।’
‘তাহলে আমার কাছে কোনো সাজেশন চাইবি না।’
‘রেগে যাচ্ছিস কেন? একে তো আমি মুরাদের জন্য বিরক্ত, আর তুই টাইসনের জন্য।’
‘দেখা হলে হাত মিলাবো নে।’
‘বোইন চুপ থেকে আইডিয়া দে।’
‘তার আগে আমার সঙ্গে দেখা কর কাল।’
‘গার্ডেনে আসিস।’
‘আচ্ছা।’ বলার সঙ্গে সঙ্গে রান্না ঘরে কিছু একটা পড়ার আওয়াজ পেয়ে বের হয় ইসানা। উঁকিঝুঁকি দিয়ে রান্নাঘরে দেখে পুনরায় ফিরে রুমে। রান্নাঘরে ফ্রিজের পেছন থেকে রাদ বের হয়। পানি খেতে এসেছিল রান্না ঘরে। পাশের রুম থেকে ইসানা ও সোহানার কথপোকথন শুনছিল। তখনই পাশ থেকে স্টিলের গ্লাস নিচে পড়ে যাওয়ায় শব্দ হয়। ইসানা বের হবার আগেই রাদ লুকিয়ে ফেলে নিজেকে। পা টিপে টিপে রাদ রান্নাঘর থেকে রুমে পৌঁছায়।
__
পরদিন..

রাদ ও মুরাদ গুরুতর ভাবে ভাবনায় মশগুল। ইতিমধ্যে রাদ কালকের বলা তাদের কথপোকথন ঢালা শেষ। তাই মুরার, রাদ দু’জনে চুপ থেকে ভাবছে কীভাবে কি করা যায়। তৎক্ষনাৎ রাদ বলল,
‘তুই লাঞ্চ টাইমে ফুট গার্ডেনে যাবি। আমি শিওর, সেখানে সোহানার বন্ধুকে পেয়ে যাবি।’
‘সত্যিই পাব?’ চিন্তিত হয়ে বলল।
‘দেখে আসলে ক্ষতি কী?’
‘ওকে যাব। কিন্তু দু’জনকে এক সঙ্গে দেখলে…. ‘ লাস্টের অংশটুকু না বলে থেমে যায়। রাগ লাগছে তাঁর।
‘কুল ব্রো। এখন তুই যাহ।’
মুরাদ উঠে চলে গেলো। রাদ ইসানাকে কেবিনে আসতে বলল। দরজা ঠেলে ভেতরে এলো ইসানা। সরস কণ্ঠে বলল,
‘জি বলুন স্যার?’
রাদ একটি সাদা রঙের খাম এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘এর মধ্যে একচল্লিশ হাজার টাকা আছে। ভয় নেই! এগুলো অগ্রীম টাকা। যেটা আপনাকে দেওয়া হয়নি জয়েন হবার পর। বেতনের টাকা মাস শেষে পাবেন। আর নয় হাজার টাকা জরিমানা হিসাবে রাখা হয়েছে।’
ইসানা হাতে নিয়ে মনে মনে ‘খ’বি’শ’ বাক্যটি বলল। তবে সে খুশি হয়েছে।
‘ধন্যবাদ! স্যার।’ বলে চলে গেল।
রাদ চেয়ারে হেলান দিয়ে মনিটরে ইসানার পানে চেয়ে বলল,
‘মনে মনে আপনি আমাকে গালমন্দ করেন সেটা আমি ঠিক বুঝতে পারি মিস. ইসানা।’
.
সোহানা একজন ব্যক্তির সঙ্গে ফুট গার্ডেনে বসে লাঞ্চ করছিল। খাওয়ার সঙ্গে হাসিমুখে বাক্যবিনিময় করছে। মুরাদ মাত্রই পৌঁছেছে। ওপরের তলায় এসে সোহানাকে অপরিচিত একজন ব্যক্তির সঙ্গে হাস্যমুখে কথা বলতে দেখে হৃদয় যেন পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। রাদের কথা সত্য প্রমাণিত হলো। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ধপাস করে তাদের ওপর পাশের আসনে বসল। আচমকা মুরাদের আগমনে দু’জনেই থমথম হয়ে তাকায়। মুরাদ লোকটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে নিলো। গায়ে শার্ট, খয়েরী রঙের ফুল প্যান্ট। আদলে বয়স্ক ছাপ। বাঁ হাতে সোনালী রঙের ঘড়ি। পর্যবেক্ষণ করার পর নজর সরিয়ে নিলো মুরাদ। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সোহানার উদ্দেশ্যে বলল,
‘মিস, আপনার চয়েজ এত বাজে আগে জানতাম না। শেষ অব্ধি একজন আধবুড়ো লোকের সঙ্গে ডেট করছেন।’ বলতে বলতে আফসোস হয়ে টেবিলে হাত রাখল মুরাদ। সোহানা অগ্নিশর্মার ন্যায় রূপ ধারণ করেছে। ছোট চামচটি হাতে তুলে পিছন দিকটা উঁচু করে সজোরে নিক্ষেপ করে মুরাদের হাতের উল্টো পিঠে। মুরাদ চেঁচিয়ে উঠে ব্যথায় কুঁকড়ে হাত ঝাড়তে আরম্ভ করে। আশেপাশে সকলের দৃষ্টি এবার তাদের ওপর। তারা বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছে। হঠাৎ করে চেঁচামেচির কারণ অজানা। সোহানা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘ওনি আমার আব্বু!’
মুরাদ থ হয়ে স্থির হয়ে যায়। যতটুকু ব্যথার দরুন হাত ঝাড়ছিল সেটি কর্ণপাত হতেই যেন উবে গেছে। চমৎকার মিস্টেক করেছেন তিনি। রীতিমতো সোহানার বাবা আনোয়ার হোসেন চমকপ্রদ পুরো ঘটনা দেখে। মুখে কিছু না বললেও সে আন্দাজ করে নেয় কিছুটা। মুরাদ জোরপূর্বক ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘স্যরি মিস! স্যরি আঙ্কেল! মিস্টেক হয়েছে। হাতে প্রচুর ব্যথা পেয়েছি। ডক্টরের কাছে যেতে হবে।’ বলতে বলতে দ্রুত গতিতে প্রস্থান করল মুরাদ। সোহানা তার আব্বুকে কীভাবে ম্যানেজ করবে সে-ই টেনশনে আছে আপাতত। পিছন থেকে ইসানা পুরো ঘটনাটি দেখেছে। মুখ চেপে প্রচুর হেসেছে। মুরাদ চলে যাওয়ার মিনিট কয়েক সেখানে দাঁড়িয়ে রয়। সে চাইছে বিষয়টি যেন সোহানা একাই সামলে নেয়। তারপরই সে তাদের কাছে যাবে।
_
‘আউচ! আস্তে ব্যান্ডেজ কর রাদ, ব্যথা লাগছে।’ আহত কণ্ঠে বলল মুরাদ৷
রাদ মুচকি হেসে মুরাদের হাতে ব্যান্ডেজ করতে করতে বলল,
‘ভাগ্য ভালো ছিল চামিচের উল্টো পিঠ দিয়ে আঘাত করেছে। কাঁটা চামিচ হলে হাত ছিদ্র হয়ে যেতো।’ লাস্টের অংশটুকু শেষ করে রাদ হেসে ফেলে৷ মুরাদ মেকি রাগ নিয়ে বলল,
‘হাসিস নাহ! তোর কথা শুনেই তো আমি গিয়েছিলাম। কে জানতো ওনি সোহানার আব্বু হবে।’
‘একজন বয়স্ক লোক ও ইয়াং ছেলের মধ্যে পার্থক্য বুঝিস না। তুই কী আসলেই পুরুষ?’ পিঞ্চ দিয়ে বলল।
‘তুই আমার পুরুষত্ব নিয়ে সন্দেহ করছিস। শোন ছোট বেলায় দু বার পালিয়েছি মুসলমানি করব না দেখে।’
রাদ এবার উঁচু গলায় হাসতে আরম্ভ করল। মুরাদ লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়ে। তার এটা বলা একদমই উচিত হয়নি। রাদকে পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে ভুলে বলে ফেলেছে। হাসি থামিয়ে রাদ মুরাদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
‘সমস্যা নেই, আমরা আমরাই তো। এখন তুই সোহানাকে স্যরি বল।’
‘দু তিনদিনে ওর সামনে যাবই না।’
‘যেমন তোর মর্জি!’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল রাদ।
.
‘এ দুর্দিনে ইসারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এটাই তো অনেক বেশি সোহানা। কতোই না কষ্ট পোহাতে হয়েছে মেয়েটার।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন সুরভী খাতুন। সোহানা পাশে বসে তার কথা শুনছে। আশ্বাস দিয়ে বলল,
‘মায়ের অভাব আপনি পূরণ করেছেন মামি। ও নিজেই চেয়েছিল আসতে। অনেকদিন হলো আপনাদের দেখে না। কিন্তু মামার জন্য আসার সাহস করেনি।’
‘পারলাম না আমি ওর মামাকে মানাতে। ইসানার কথা একদমই শুনতে পারে না লোকটা।’
‘মামি টাকার বিষয়টি মামার কাছ থেকে গোপন রাখবেন ইসানা বলেছে।’
‘গোপন রাখতে হবে না।’ বাক্যটি বলে ক্ষোভ নিয়ে এগিয়ে এলো লিয়াকত আলী। স্বামীকে দেখে চমকে উঠেন সুরভী খাতুন। সোহানাও ঘাবড়ে যায়। তিনি এগিয়ে এসে বললেন,
‘অভি’শপ্ত, পোড়ামুখীর টাকা দিয়ে আমার মেয়ের বিয়ে দিবো না। ফিরিয়ে দেও ওর টাকা সুরভী।’
সুরভী খাতুন স্থির থাকতে পারলেন না আর। ছোট থেকেই ইসানার প্রতি এরূপ আচরণ মুখ বুঁজে সহ্য করেছে। শেষ অব্ধি বিয়ে দিয়েও মেয়েটির জীবন নষ্ট করে ক্ষান্ত হয়নি। এখন তাদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে এটাও সহ্য হচ্ছে না। চটজলদি দাঁড়িয়ে গেলেন। খেঁকিয়ে বললেন,
‘অভি’শপ্ত ইসানা নয়, তুমি? মনে নেই কয়েক বছর আগে কীভাবে সংসার চালাতে? ইটের ভাটায় অর্ধেক বেলায় কাজ করে, আর অর্ধেক বেলা জুয়া খেলে সব টাকা উঠিয়ে দিতে। কত কষ্টের মধ্যেই আমাকে কাজ করে সংসার চালাতে হয়েছে। ছোট্ট মেয়েটি ঘরে তোমার দুই ছেলেমেয়ে দের দেখাশোনা, যত্নআত্তি করেছে। আজ তোমার জন্যই ইসানার এই অবস্থা। টানাপোড়ায় ঠিকমতো সংসার চালাতে পারো নি। যদি মেয়েটাকে ভালো কোনো ঘরে বিয়ে দিতে সুখে থাকত। আজ অন্যের অধীনে কাজ করে পেট চালাতে হতো না। একবার ভাবো, মনে করে দেখো। কতোটা অকথা, বিশ্রীভাবে গালিগালাজ করেছো। একবারও তো মুখ ফুটে কিছু বলেনি মেয়েটা। নিজের মেয়েকেই বড়ো বলে গন্য করেছো, অথচ ওদের চেয়ে বড়ো ইসানা। নিজের বাবার চোখে দেখেছে তোমাকে।’ পুরোটা বলে তিনি জোরে জোরে নিশ্বাস নিলেন। লিয়াকত আলীর দৃষ্টি নত। বিন্দু বিন্দু অনুতপ্ত বোধ তীরের মতো হৃদয়ে আঘাত আনছে তার।
সুরভী খাতুন নজর সরিয়ে নিয়ে বলল,
‘অল্পতেই থেমে যেতে চাই। ইসানার জন্মদাত্রী মা আমি নই, তবে নিজের সন্তানের চেয়ে কম নয় ইসানা। আজ আমি বলছি, আমার বড়ো মেয়ের টাকা দিয়েই মেজো মেয়ের বিয়ে হবে। এতে কারো যদি আপত্তি থাকে, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। এ বিয়েতে ইসানাও থাকবে। সোহানা তুমি এখন যাও।’
হ্যাঁ সম্মতি জানিয়ে সোহানা বেরিয়ে এলো। সুরভী খাতুন তার কামরাতে চলে গেলেন। সিমা ও মানিক পাশে দাঁড়িয়ে মায়ের সব কথা শুনছিল। তারাও তাদের কক্ষে চলে এলো। রয়ে গেলো শুধু লিয়াকত আলী। এ প্রথম আজ নিজেকে ঘৃ’ণা লাগছে । আদরের ছোট বোনকে কতোই না ভালোবাসতো। ইসানা পৃথিবীর আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন আদরের বোন৷ তখন থেকেই ইসানাকে অভিশপ্ত ভেবে নিয়েছিলেন। কিন্তু এটা যে তার ভুল ধারণা আজ সে বুঝতে পেরেছে। সে আজ অনুতপ্ত!
.
.
.
#চলবে?

কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ।#তোমায়_ছোঁয়ার_ইচ্ছে
#পর্ব_১১
#সুমাইয়া মনি

‘সোহানা আমি চাই না আমার জন্য মামা মামির মাঝে কোনো প্রকার ঝামেলা সৃষ্টি হোক। দূর থেকে তাদের সাহায্য করতে চাই। এটাই উত্তম।’
‘মামি তোকে বিয়েতে নিমন্ত্রণ করবে। তুই যাবি?’
ইসানা চুপ থাকে। বাড়িতে ফিরে সোহানা ফোনে ইসানাকে পুরো ঘটনা জানায়। ইসানা নিরুত্তর হয়ে রয় মিনিট কয়েক। সোহানা খুশি মুডে বলল,
‘আরে বিয়েতে আমরা দু’জনেই যাব। খুব মজা করব দেখিস।’
কিছুক্ষণের জন্য ইসানার ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে উঠে। পরক্ষণে আবার মিলিয়ে যায়। সোহানা সিরিয়াস মুড নিয়ে বলল,
‘ভালো কথা। কাল আব্বু তোকে কি বলেছে বললি না তো?’
‘তেমন কিছু বলেনি। ঐ তোর বিষয় খবরা-খবর নিচ্ছিলো।’
‘যেমন?’
‘এই পড়াশোনা করছিস কি-না, প্রেম-ট্রেম চক্করে আসিস নাকি এসব।’
‘মুরাদের বিষয় কিছু বলেছে?’
‘নাহ! কেন? তুই কাল তাকে বলিস নি সব।’
‘বলেছি। প্রথম ঘটনা থেকেই সব বলেছি। জানসই তো আমি মিথ্যা কথা সাজিয়ে বলতে পারি না। বলতে গেলেই ধরা পড়ে যাব। এজন্য সব বলে দিয়েছি।’
‘একদম ঠিক করেছিস।’
‘আব্বু আমাকে তেমন বকাবকি করেনি। বলেছে নিজের ক্যারিয়ারে ফোকাস করতে।’
‘ঠিকিই বলেছে।’
‘তাই তো করছি। আজকের পর থেকে মুরাদের সঙ্গে কোনো কথা বলব না। বেটার সাহস কত্তবড় আমার আব্বুকে..। ছিঃ বলতেই ঘৃ’ণা লাগছে।’
‘সে না জেনে বলেছে। সব দোষ রাদের।’
‘মানে?’
‘কাল তোর সঙ্গে কথা বলার সময় সে দরজার বাহিরেই ছিল। সব শুনে নিয়েছে।’
‘কীভাবে বুঝলি?’
‘আমি তাকে রান্না ঘরে ফ্রিজের পিছনে লুকিয়ে থাকাকালীন পা দেখেছিলাম।’
‘ওরে হা’রা’মি। তো এই পা’দের বাচ্চাই অন্য পা’দকে বলেছে।’ চোয়াল শক্ত বানিয়ে বলল সোহানা।
‘কী রাদ, মুরাদ থেকে শেষে পা’দ…’ বলেই হেসে দেয় ইসানা।
‘তো আর বলবে কী ওদের? দু’টোই এক পানির মাছ।’
‘হেসে নেই..’ খিলখিল করে হাসছে ইসানা।
ইসানার হাসি শুনে সোহানাও হাসে। হেসে বলে,
‘শোন পা’দ এক হলো রা’দ, পাদ দুই হলো মুরাদ। মনে থাকে যেন।’
‘আবার ওয়ান, টু পা’দ…।’ বলে পুনরায় হাসতে আরম্ভ করল।
দু’বান্ধবীর হাসাহাসির পর্ব শেষ করে আরো কিছুক্ষণ কথা বলে। তারপর ফোন রেখে দেয়। ইসানা পুরোনো স্মৃতিগুলো ভাবছে। হঠাৎ বাহির থেকে রাদের ডাক আসে। ইসানা ভাবনা থেকে বের হয়ে বাহিরে এলো।
রাদ টাইসনকে কোলে নিয়ে পায়ের ওপর পা উঠিয়ে সোফায় বসে ছিল। ইসানা রাদের নিকটে এসে বলল,
‘কিছু বলবেন স্যার?’
‘আজকাল পা’দ নিয়ে বেশ চর্চা হচ্ছে দেখছি।’ গম্ভীর গলায় টাইসনের পানে তাকিয়ে বলল রাদ।
ইসানা থমথম হয়ে তাকায়। হতবাক হয়ে যায় কয়েক মিনিটের জন্য। পরক্ষণে কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,
‘অন্যের পার্সোনাল কথা শোনা ঠিক না।’
রাদ তির্যক দৃষ্টি ফেলে বলল,
‘এটা আমার বাড়ি..’
‘তাই বলে কি সব কথা কান পেতে শুনতে হবে।’ গমগম আওয়াজে বলল।
‘শুনুন! আপনাদের ফোনালাপ শোনার কোনো ইচ্ছে নেই আমার৷ রুমের পাশ থেকে যাওয়ার সময় আপনাদের কথপোকথন কানে এসে লাগে বিটক ভাবে। আর আপনি চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে কথা বলেন এটা কি জানেন?’
‘আমি আস্তেধীরে কথা বলতে পারি না।’
‘জোরে জোরে কথা বলে অন্যকে শোনাতে পারেন, কথা ধরলেই দোষ। কী অদ্ভুত!’
‘স্যরি!’
‘জরিমানা দিন তিন হাজার এক্ষুনি।’
‘কেন?’
‘এ বাড়িতে জোরে জোরে কথা বলা একদমই নিষেধ।’
‘এখন আমার কাছে টাকা নেই। পরে দিবো।’ কোমলভাবে বলল।
রাদ কপার কোঁচকায়। বলে,
‘কালই না আপনাকে টাকা দেওয়া হয়েছে।’
‘হিসাব দিতে ইচ্ছুক নই!’
‘লাগবে না। কেটে রাখা হবে বেতন থেকে।’
ইসানা চলে যাওয়া ধরলে রাদ ক্ষিপ্র গতিতে বলল,
‘যেতে বলেছি?’
ইসানা চোখমুখ ঘুচে কিছু না বলে ফিরে তাকায়। রাদ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
‘কফি খাব।’ শুনে ইসানা আবার চলে যেতে নিলে রাদ পুনরায় বলল,
‘আমি কী এখন চলে যেতে বলেছি?’
ইসানা রাগের চোটে চোখ বন্ধ করে নেয়। স্বাভাবিক হয়ে ফিরে তাকায়। রাদ ফের বলল,
‘টাইসনের জন্য খাবার নিয়ে আসুন।’
ইসানা দৃষ্টি নত রেখে দাঁড়িয়ে রয় পরবর্তী আদেশের জন্য। রাদ ইসানার আদলে তাকিয়ে ভারী কণ্ঠে বলল,
‘দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছি?’
ইসানা রেগেমেগে হনহনিয়ে প্রস্থান করল। রাদ টাইসনের মাথায় হাত বুলিয়ে স্মিত হাসে। পা’দ নিয়ে চর্চার ফল ভোগ করতে হচ্ছে তাকে। সে জানে এটা তাদের নাম নিয়েই বলা হয়েছিল তখন। তাই ইসানাকে একটু রাগিয়েছে।
__
পরের দিন মুরাদ ইসানাকে নিয়ে ক্যান্টিনে এসেছে কফি খাওয়ার জন্য। মুরাদ মূলত সোহানার বিষয়ে আলোচনা করার জন্যই এসেছে।
‘আপনার হাতের ব্যথা কমেছে?’
‘এত তাড়াতাড়ি কি সারবে। একটু তো সময় লাগবেই।’
ইসানা মৃদু হাসে। মুরাদ বলে,
‘সোহানা মনে হয় আপনাকে সব বলেছে।’
‘আমি সব জানি।’
‘আসলে, আমার উচিত হয়নি। সত্যি বলতে আমি জানতাম না ওনি তার আব্বু।’
‘হ্যাঁ! বুঝতে পেরেছি। এতে আপনার কোনো দোষ নেই ভাইয়া।’
‘একদম! কিন্তু সোহানা আমাকে ভুল বুঝেছে।’
‘হুম।’
‘প্লিজ! তাকে একটু বোঝান আপু। আমি সত্যি জানতাম না।’
‘আপনি কি সোহানাকে পছন্দ করেন?’
‘ভালোবেসে ফেলেছি আপু। শুনতে খারাপ শোনা গেলেও এটাই সত্যি!’
‘বয়সের পার্থক্যটা… ‘
‘সেটা মেটার না। আমরা জানি ভালোবাসা বয়স দেখে হয় না আপু। আমি জানতাম না সোহানা আমার বড়ো। জেনেও ভালোবাসা বিন্দু মাত্র কমেনি। আমি তাকে বড়ো হিসাবেই না হয় ভালোবাসলাম। সবার চেয়ে আলাদাভাবে। ভুল হবে কী আপু?’
‘নাহ ভাই। তবে আমাদের সমাজের লোকচক্ষে এটা অনুচিত, অস্বাভাবিক!’
‘বিয়ের পর আমি সমাজ নিয়ে থাকব না। তাকে নিয়ে থাকব। বড়ো বলে বউ হিসাবে আমি ও আমার পরিবার যদি তাকে স্বীকৃতি দেয় সমস্যা কী? অন্যের কথায় আমাদের কিচ্ছু যায় আসবে না আপু।’
মুরাদের কথা শুনে ইসানার বেশ ভালো লাগে। আনমনে হাসি ফুটে উঠে তার ঠোঁটে। ফোনের স্ক্রিন একবার ক্লিক করে বলল,
‘আমি আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাব।’
‘বেশ উপকার হবে আপু। আপনি তার সঙ্গে কথা বলুন।’
‘আচ্ছা!’ দু’জনের মাঝে আরো কিছুক্ষণ কথা হয়। মুরাদের মজার মজার কথা শুনে ইসানা খিলখিল করে হেসে উঠে। বেশকিছুক্ষণ বাক্যবিনিময় হয় তাদের মাঝে।
.
অপরপ্রান্তে রাদ চেয়ারে বসে ক্যান্টিনে তাদের বাক্যবিনিময় দেখে কপাল কুঁচকে ফেলে। ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ জাগ্রত হচ্ছে। ইসানার সঙ্গে মুরাদের হাসিখুশি মুখে কথা বলা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। অজান্তেই তার পরাণে জ্বলন অনুভব করছে। আচমকা লিসার আগমনে রাদ স্বাভাবিক হয়ে ক্যান্টিনের দৃশ্য পরিবর্তন করে ফেলে।
‘রাদ চলো ঘুরতে যাই।’
‘আমার কাজ আছে। তুমি মুরাদকে সঙ্গে নিয়ে যাও।’ ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল রাদ।
‘নাহ! ও আমার সঙ্গে যাবে না। ইসানার সঙ্গে ক্যান্টিনে বসে গল্পগুজব করছে।’
রাদ চোখ গরম করে তাকায়। বলে,
‘ইসানা তোমার বড়ো। তাকে আপু বলে সম্বোধন করো।’
‘তুমি তো তাকে আপু বলো না। আমি কেন বলব?’
‘আমি ওনার স্যার।’
‘তাতে কী? বাসায় থাকাকালীন তুমি তো তার স্যার নও।’
‘ব্যতিক্রম কথাবার্তা আমি লাইক করি না। নেক্সট টাইম নাম ধরে ডাকবে না তার। নাউ আউট!’ লাস্টের কথা নজর সরিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে। লিসা মনঃক্ষুণ্ন করে বেরিয়ে এলো। তার প্রচুর রাগ হচ্ছে। তবে রাদের উপর নয়, ইসানার উপর। তার কারণেই রাদের কাছে কথা শুনতে হয়েছে তাকে।
.
.
.
#চলবে?

কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। আমার অবস্থাও আপনাদের বুঝতে হবে। আগের মতো হাতে অফুরন্ত সময় এখন আর নেই। একদিন পর পর গল্প দেওয়ার চেষ্টা করব। যদি না পারি, দুঃখিত!

সুমাইয়া মনি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here