তোমারই আমি আছি পর্ব ১১

#তোমারই_আছি_আমি
পর্ব-১১
#SaraMehjabin

তুরাগ জঙ্গলঘেরা একটা জায়গায় গাড়িটা পার্ক করে হাত ও পায়ের বাঁধন খুলে সারাকে নামিয়ে আনল। তারপর সারাকে একহাতে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল।

সারাকে চোখবাঁধা অবস্থায় একটা জায়গায় নিয়ে এল। তারপর কারো একটা উদ্দেশ্যে বলল, নেন ভাই এনে দিয়েছি। এখন আপনার যা ইচ্ছা করেন। এই যে আপু এইবার চোখটা খুলেন দেখি। আপনাকে কোথায় কিডন‍্যাপ করে এনেছি দেখবেন না।

চোখের বাধন খোলার সাথে সাথে সায়ান, ফারিহা, আজমী, সিফাত (আজমীর বয়ফ্রেন্ড) সবাইকে সামনে দেখতে পেল। সারাকে দেখে সবাই একযোগে চিৎকার করে উঠল, সারপ্রাইজ! ( কি? সবাই কি মনে করছিলা? তুরাগ সারাকে তুলে নিয়ে রেপ করবে, তারপর আকাশ আসবে etc etc.তাদের সবার জন্য একসের সমবেদনা)

চারপাশ লাল-নীল-সবুজ লাইটিংয়ে ঝলমল করছে,,,বিভিন্ন রঙের বেলুন উড়ছে,,,কাঠের ছাউনির মতো জায়গাটা খুব সুন্দর ভাবে ফুল দিয়ে সাজানো।।

সারা আশ্চর্য হয়ে সব দেখতে লাগল। লোকটা তাকে এখানে এনেছে কেন? ভাইয়ারা সব কিভাবে আসল? সারার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।

ফারিহা আর আজমী এসে সারাকে জড়িয়ে ধরল। সায়ান বলল, তোর জন্য সারপ্রাইজ ছিল বোনু। তোর তো মুড অফ। তাই ভাবলাম কিভাবে তোর মুডটা অন করা যায়। সবাই মিলে প্ল‍্যান করলাম আজকে এই জায়গাটায় সারাদিন থাকব,,অনেক ঘুরব,,তোর তো নিরিবিলি খুব পছন্দ।

সারা: ভাইয়া জানো এই লোকটা( তুরাগকে দেখিয়ে) আমাকে ধরে এনেছে। আস্ত শয়তান লোক একটা। আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। পেছনে যে গাড়ি ছিল খেয়াল করি নি এই লোকটা আমাকে বাঁচায়। তারপরে চিনির মতো মিষ্টি মিষ্টি কথা,,,,আমাকে গাড়ি দিয়ে বাসায় পৌঁছে দিবে। আমার তখনই সন্দেহ লাগছিল। কিন্তু লাইফ রিস্ক নিয়ে বাঁচিয়েছে তাই মুখের ওপর না করতে পারলাম না। তখনো কি জানতাম সব-ই আসলে ট্র‍্যাপ। গাড়িতে উঠলাম,, উঠার পর সে কি মিষ্টি মিষ্টি কথা। হঠাৎ দেখি গাড়ি শহর ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমি যেই চিৎকার করলাম ওমনি কাপড় দিয়ে আমার হাত-পা বেঁধে ফেলল। আমি এক্ষুনি পুলিশে ফোন দিব। ওর মতো লোকজনের জেল উপযুক্ত জায়গা। এদের কারনেই আমরা কোথাও নিরাপদ নই। উনার নামে কিডন‍্যাপিং এর কেস করব।

তুরাগ: সায়ান ভাইটা ভালো মুইরে বাঁচা। তোরে হেল্প কইরা আমি আজ কিডন‍্যাপিং এর আসামী।

সারা: মানে তুমি এই ক্রিমিনালকে চেনো? ছিঃ ভাইয়া,,,দিনে দিনে কাদের সাথে মেলামেশা করছ! তুমি জানো এই লোকটা একটা জঘন্য একটা শয়তান একটা অসভ্য লোক,,,শুরুর থেকেই গায়ে পড়ে কথা বলছিল। আমাকে বেঁধে নিয়ে এসেছে। তুমি বুঝতে পারছ তার উদ্দেশ্য কি?

তুরাগ: আরে আমি কি করব? তোমার ভাই ভিলেনের রোল দিলে সেটাই করতে হবে,,, না?

সায়ান: সারা বোনু কিডন‍্যাপিং-এর প্ল‍্যানটা ছিল তোকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য ছিল। আর ও হচ্ছে তুরাগ,,,আমার অনেক ক্লোজ ফ্রেন্ড। জানিস তুরাগ কিন্তু ভীষণ ব্রিলিয়ান্ট। লন্ডন থেকে স্টাডি কমপ্লিট করে এসেছে। এখন ফ‍্যামিলি বিজনেস জয়েন করবে।

তুরাগ: হাই!

সারা তুরাগের কথার কোন উত্তর না দিয়ে ভাইয়ের দিকে রাগী দৃষ্টিতে বলল,

ভাইয়া,,এটা একটা কাজ করলে তুমি? তুমি জানো আমি কতটা ভয় পেয়েছি। আমার সিচ‍্যুয়েশন কি হয়েছিল চিন্তা করতে পারো।

সায়ান: স‍্যরি রে বোনু। কি করব বল্ ভালো মুখে বললে তুই জীবনেও আসতি না। এই দ‍্যাখ,, কান ধরছি।

সায়ান হাঁটু গেড়ে কান ধরে বসে।

সারা: থাক হয়েছে হয়েছে। এইসব টেকনিকে আমার রাগ ভাঙাতে হবে না। আমি এমনিও আমার ভাইয়ার উপর রাগ করে থাকতে পারি না। যাও যাও।
যারে এসব করে রাগ ভাঙাতে হবে তারে গিয়ে করো।

আজমী( ফারিহাকে ধাক্কা দিয়ে): এহেম এহেম।

ফারিহা: ধুত,,,এইজন্য এইসব অসভ‍্যের সাথে আসতেই চাই নাই আমি।

সারাটাদিন ওরা সবাই আনন্দে কাটাল। সবচেয়ে বড় কথা,সারার মুড আগের থেকে অনেকটা ভালো। সকালে ভার্সিটির ঘটনাটার প্রভাব নেই। পুরোটা সময় তুরাগ ওদের সাথেই কাটাল। সারার সাথে অনেক কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু সারা কোন কথা বলে নি। ওকে এড়িয়ে গেছে।

সন্ধ্যা সন্ধ‍্যা সময়। একটু পরে ওরা ব‍্যাক করবে। সবাই মিলে ঘাসের ওপর ট্রুথ-ডেয়ার, পাসিং পিলো, মিউজিক‍্যাল চেয়ার অনেক কিছু খেলল। অবশেষে ছিল গানের কলি। সিস্টেমটা অন‍্যরকম। প্রত‍্যেকজনের সামনে অপরজনদের নাম কাগজে লিখে দেওয়া হলো। এক্ষেত্রে যার কাগজে যার নাম আসবে সে তার সঙ্গেই ডুয়েট গাইবে। আজমী আর সারা প্ল্যান করে সায়ান আর ফারিহাকে ডুয়েট গাওয়ালো।

এরপরেই সায়ান বলল, আমার একটা সারপ্রাইজ নিউজ দেওয়ার আছে সবাইকে। আমি কানাডায় স্কলারশিপের জন্য এপ্লাই করেছিলাম। ওরা আমাকে সিলেক্ট করেছে। দুইদিন পর আমার ফ্লাইট।

সারা: ভাইয়া তুই বিদেশে যাচ্ছিস তাও মাত্র দুইদিন পর? অথচ আমাদেরকে কিছুই বলিস নি। কিন্তু তুই তো কখনো বিদেশে যেতে চাইতি না।

সায়ান: স‍্যরি বোনু। এটাও সারপ্রাইজ ছিল,,, আম্মু-আব্বু আর তোর জন্য। আর আমাকে তো আমার ক‍্যরিয়ারের কথা ভাবতে হবে,,,তোদের কথা ভাবতে হবে,,,আব্বু সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছে,,,বড় ছেলে হিসেবে আমার অনেক দায়িত্ব। তাছাড়া যে কারণে যেতে চাইতাম না ভেবে দেখলাম সেই কারনটা ভুল। অন‍্যের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়ার কোন মানেই হয় না। আমার কাছে সবার প্রথমে আমার ফ‍্যামিলি; যেমন অন‍্য অনেকেই তাদের ফ‍্যামিলির খুশির জন্য অন‍্য মানুষের খুশি-আনন্দ কেড়ে নিতে দ্বিধাবোধ করে না।

সারা অসহায় দৃষ্টিতে ফারিহার দিকে তাকায়। ভাইয়াকে যে কি করে বোঝাবে ফারিহার অবস্থা! ভাইয়া তো সব জানেই, তাও অবুঝের মতো অভিমান করছে।

কথাগুলো দাঁতে দাঁত চেপে শুনে ফারিহা তৎক্ষনাৎ সেখান থেকে উঠে গেল। মেয়েটা ভীষণ চাপা। কাউকে চোখের পানি দেখাতে চায় না। সারাও ওর সঙ্গে গেল। যেভাবেই হোক, সায়ান আর ফারিহার ভুল বোঝাবুঝি সারাই মেটাবে।

—————————————————————————–

খান বাড়িতে বিশাল পার্টির আয়োজন হয়েছে। পার্টি হচ্ছে বাড়ির সামনে লনে। ঘ‍রের আবদ্ধ পরিবেশে পার্টি এখন অনেকেই পছন্দ করে না। জায়গাটা শহরের বেস্ট ডেকোরেটরকে দিয়ে প্ল্যান করে সাজানো। ইভেন্ট ম‍্যানেজমেন্টের লোক দিয়ে সব অ্যারেন্জ করা হয়েছে। একপাশে ফুড কর্নার, চেয়ার-টেবিল, খাবারের ব‍্যবস্থাও অনেক ধরন: ইংলিশ, চাইনিজ, স্প‍্যানিশ, ইতালিয়ান। যে যার পছন্দমতো খাচ্ছে। একপাশে বার-সিস্টেম করা হয়েছে কারন এখানকার প্রায় সব গেস্টের-ই ড্রিংক করা লাগবে। যদিও ওয়েটাররা ড্রিংকস সার্ভ ক‍রছে। লাউড ভলিউমে ডি.জে মিউজিক কান ধাধিয়ে দেয়।

নূরুন্নাহার: উফ বাবাগো কি শব্দ। বড়বৌমাআআ বড়বৌমাআআ

মনীরা: জ্বি আম্মা।

নুরুন্নাহার: কোন পাগলে এইরকম চিৎকার করতাছে( ডি.জে মিউজিক)। এক্ষুনি ওইটারে বাঁধো। আরে সব মানুষজন চিক্কারের তালে তালে মাথা ঝাকায় ক‍্যান? এরাও পাগল না মৃগী রোগে ধরছে সবটিরে? এইসমস্ত পাগলের চিৎকার এক্ষুনি বন্ধ করো,,,মৃগী রোগীগুলারে ঘাড় ধইরা হাসপাতালে দিয়া আসো। এদের চিকিৎসা দরকার। এইটা আমার বাড়ি, ভদ্রলোকের বাড়ি। এই বাড়িতে এইসব পাগলাগারদের রোগী ঢোকানোর সাহস কার? কোন বান্দরনীর পোলা এইসব করছে!

মনীরা: জ্বি আপনার পোলা।

নূরুন্নাহার: কিইহ! বৌমা, তুমি আমারে বান্দর কইলা,,,হ‍্যা? দাঁড়াও,,আমি বেবিনরে বলব। বলব এই বৌ রাখা যাবে না। আমারে বান্দ‍রনী কয়।

মনীরা: বুড়িটা পাগল বানিয়ে ফেলল,,,, ধুততেরি।

অদ্বিতী: আরে বড়মা দাদি তোমাকে কি পাগল বানাবে! পাগল তুমি এখন হবে। ঐদিকে দ‍্যাখো।

ঐদিকে দেখো বলতে অদ্বিতী মেধাকে দেখাতে চাইছে। মেধাকে দেখে মনীরা খানের সত্যিই পাগল হওয়ার দশা। মেধা শাড়ি পড়েছে,,,মেধা! যার ড্রেস কিনা কখনো হাটুর নিচে যায় না। যে ওড়না বলতে কোন পোশাক আছে তাই জানে না। যার কোন স্লিভওয়ালা ড্রেস নেই। ব‍্যাকের কথা নাই বললাম। সেই মেধা শাড়ি পড়েছে। যদিও শাড়ি পুরোটাই নেট। হালকা কালারের হওয়ায় নেটের ফাঁকে পুরো শরীর-ই দৃশ্যমান। ফিতার মতো ব্লাউজ যার পেছন পুরোটাই ফাঁকা।

মনীরা: হায় আল্লাহ এতদিন জানতাম মেয়েটার বাবা-মা মেয়েটাকে জামা কিনে দেয় না। তাই ছোটবেলার জামাগুলো পড়ে। আজকে দেখি পোশাকের অভাবে বাসার মশারি পেঁচিয়ে পার্টিতে এসেছে। মেয়েটা আমাকে বললেই পারত কত জামা আমার,,, একটা দিতাম। নাহ,মেয়েটার বাবা-মা মেয়েটাকে একটা পোশাক-ও দেয় না।

মেধা জীবনে কোনদিন শাড়ি পড়া দূরে থাক, কোনদিন ছুঁয়েও দেখে নি তাই আজ মেধার সেবা করতে আজ ওর বাসা থেকে দুইজন এ্যাসিসে্টেন্ট পাঠানো হয়েছে। একজন ওর শাড়ি সামলে দিচ্ছে। আরেকজন ওর ভ‍্যানিটি ব‍্যাগ হাতে ওকে বাতাস করছে। আর মেধা কারনে অকারণে ওদেরকে ধমকাচ্ছে।

আকাশকে দেখা গেল গাঢ় নীল ব্লেজারের নিচে অফহোয়াইট শার্ট, ব্লেজারের কলার উঁচু করে রাখা, অফহোয়াইট জিন্স প‍্যান্ট। কানে ইয়ার‍রিং । এই সিলভারের ইয়ার রিং আকাশের কানে সবসময় থাকে। এটা যেন ওর সোন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

মেধাকে দেখে আকাশ অন‍্যদিনের চেয়ে আলাদা ব‍্যবহার করল। মেধা আসতেই একহাত মেধার কোমরের পেছন ব‍রাবর চালিয়ে ওকে কাছে টেনে আনল। নেশামাখানো দৃষ্টি নিয়ে তাকাল ওর দিকে।

মেধা: হোয়াট আর ইউ ডুয়িং আকাশ? সবাই দেখছে।

আকাশ: দেখুক। ভালোই যখন বাসব সেটা লুকিয়ে কেন? সবাই জানবে সবাই দেখবে আমার ভালবাসার নগরী। যেখানে শুধু তুমিই রানী–

বলেই আকাশ নেশাতুর দৃষ্টিতে মেধার ঠোঁটের দিকে ঠোঁট এগোতেই বাধা আসে মেধা তরফ থেকে।

মেধা: এখন না। আগে এসো তোমার সাথে একজনের পরিচয় করাই। ভাই আয়।

ব্ল‍্যাক শার্ট ব্ল‍্যাক জিন্স চোখে সানগ্লাস ছেলেটা আকাশের সামনে এসে দাঁড়ায়। আকাশকে দেখে সানগ্লাস সরিয়ে মুচকি হাসি দেয়। দীর্ঘসময় দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন কারো মুখে কথা বলার শক্তি নেই। দুজনেই ঠোঁটে বিস্তৃত রহস্যময় হাসি।

মেধা: আমার ছোট ভাই। লন্ডন থেকে স্টাডি কমপ্লিট করে এসেছে। যদিও স্টাডি কমপ্লিট হয় নি। কিন্তু ভাই বলল ও আর পড়তে চায় না। তাই ড‍্যাড দেশে ফিরিয়ে এনেছে। আর ভাই ও তোর জিজু। আমার উড বি হাজবেন্ড। (আকাশের এক বাহু দুই হাতের মধ্যে নিয়ে ,আকাশের কাধে মাথা হেলিয়ে)

হাত বাড়িয়ে দেয় ছেলেটি, এহসান হক তুরাগ।

আকাশ-ও হাত বাড়ায়,মাকসুদুল সাদাত আকাশ

: নাইস টু মিট ইউ,,,,

: নাইস টু মিট ইউ টু।

ছেলেটা যেতেই রহস্যময় হাসল আকাশ, দ‍্য গেইম ইজ স্টার্ট এগেইন।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here