প্রাক্তন পর্ব ১১+১২

#প্রাক্তন
#লেখিকা- শারমিন আঁচল নিপা
#পর্ব- ১১

সেই সাথে নতুন প্রশ্ন নতুন কাহিনির সূত্রপাত ঘটল। আইডিটা ঘেটে লক্ষ্য করলাম নাফিসার সাথে অরন্যের আইডি মেনশন দিয়ে অনেক পোস্ট করা। প্রায় প্রতিদিনেই একটার পর একটা পোস্ট হচ্ছে। নাফিসা কেনই বা নতুন করে এমন করছে তার কোনো কারণ আমার জানা নেই। বেশ কৌতুহল নিয়েই নাফিসার আইডিতে ঢুকলাম তার আইডিতেও প্রোফাইল পিক অরন্য আর তার দেওয়া। আর সেটা আপলোড হয়েছে ছয়মাস আগে। আমি কিছুটা বিস্মিত হলাম। আমার মনে বারবার আগের মতোই একটা প্রশ্নই আসছে যদি নাফিসা অরন্যকে নিজ থেকে ডিভোর্স দেয় তাহলে কেন সে অরন্য আর তার কাপল ছবি তার আইডিতে দিবে। যদি সে তার প্রেমিকের কাছে চলে যায় তাহলে তার এ কাজ করে কী লাভ । প্রশ্নের বেড়াজালে আটকে গেলাম। নাফিসার আইডির ইনফরমেশন গুলো ভালো করে দেখে নিলাম। নাফিসা প্রাইভেট একটা মেডিকেল থেকে পড়াশোনা করেছে।

চট করেই আমার মাথায় আসলো আমার একটা স্টুডেন্ট সে মেডিকেলে পড়ে। তার নাম টিপটিপ। আমি যখন স্টুডেন্ট ছিলাম তখন ওকে পড়াতাম। তাহলে নাফিসার ইনফরমেশন ভালো করে নেওয়া আমার জন্য অসাধ্য কিছু না। আমি টিপটিপ কে কল দিলাম। কল দেওয়ার পর টিপটিপ ফোনটা ধরেই বলল

– ম্যাম আসসালামুআলাইকুম। কেমন আছেন?

– হ্যাঁ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?

– আমিও ভালো আছি।

– আচ্ছা টিপ টিপ তুমি এবার কোন ইয়ারে?

– ম্যাম আমি চতুর্থ বর্ষে।

– তোমাকে যদি তোমার কোনো সিনিয়র আপুর ইনফরমেশন নিতে বলি তাহলে কী নিয়ে দিতে পারবে?

– ম্যাম নাম বলেন। আর কোন সেশন সেটা বলেন আমি চেষ্টা করে একবার দেখতে পারি।

– কোন সেশন সেটা তো জানি না। তবে ছবি আছে। আমি তোমাকে ছবিটা দিচ্ছি তুমি আমাকে একটু খোঁজ নিয়ে জানাও। আর শুনো বিষয়টা যেন উনি টের না পায়।

– আপনি যা বলেন তাই হবে। আমাকে ছবি দিন আগে আমি দেখি চিনি কি না।

আমি টিপটিপ কে ছবিটা পাঠালাম। ছবিটা পাঠানোর সাথে সাথে টিপ টিপ বলল

– ম্যাম আমি যখন প্রথম বর্ষে ছিলাম তখন উনি ইন্টার্ণ ডাক্তার ছিল। আমার সাথে উনি এড আছেন। এখন কোথায় আছে সেটা তো সঠিক করে বলতে পারব না। আর আমি তো পড়াশোনার চাপে এফ বিতে তেমন ঢুকি না। আইডিটা ডি একটিভ করে রেখেছি।

– আচ্ছা শুনো তুমি কী উনার সাথে একটু কথা বলতে পারবে? আমি যা বলব তাই বলবে। যেভাবে বলব ঠিক সেভাবে। আমি যা জিজ্ঞেস করতে বলি ঠিক তাই বলবে। আর তুমি যেহেতু ঐ মেডিকেলে পড়ো তোমার কাছে উনি মিথ্যা বলবেন না।

– ম্যাম আমি আপনি যা বলবেন করব। আজকে মেডিকেলে পড়ার পেছনে আপনার অবদান কম না। তবে কোনো সমস্যা?

– টিপটিপ একটু ব্যক্তিগত শেয়ার করতে পারছি না। তবে তুমি আমার বন্ধুর মতো তাই হালকা বললাম। তুমি কী পারবে কাজটা করতে?

– হ্যাঁ পারব। আমি এখনই মেসেজ দিব? আর ম্যাম আপনার সমস্যা না হলে আমি আমার আইডির পাসওয়ার্ড দিচ্ছি। আমার আইডিতে তেমন পারসোনাল কিছু নেই। আপনি উনার সাথে কথা বলা শেষ হলে জানাবেন আমি নাহয় পরে পাসওয়ার্ড চেন্জ করে ফেলব।

আমি যেন একটা আশার আলো পেলাম। হালকা গলায় বললাম

– তোমার সমস্যা না থাকলে দিতে পারো।

টিপটিপ আমাকে তার আইডির পাসওয়ার্ড দিল। আমি নাফিসার আইডিটায় মেসেজ দিলাম

– আপু আমি আপনার মেডিকেলের একজন জুনিয়র। কেমন আছেন?

সাথে সাথে মেসেজটা সিন হয়নি। তবে দশ মিনিট পর রিপ্লাই আসলো

– জি ভালো। তুমি কেমন আছো?

– আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আচ্ছা আপু আপনি বিয়ে করেছেন কবে? আজকে হুট করে আপনার আইডি সামনে আসলো। ভাইয়া আর আপনার পিক দেখলাম। মশআল্লাহ অনেক সুন্দর লাগছে দুজনকে।

– ধন্যবাদ। বিয়ে করেছি চার বছর হয়েছে।

– এখন কোথায় জব করছেন?

– আমি তো দেশে থাকি না। লন্ডন থাকি।

– ওয়াও গ্রেট। কত বছর হলো গিয়েছেন?

– তিন বছর হলো।

– ভাইয়াও কী আপনার সাথে থাকে?

– নাহ ও ঢাকায় থাকে।

– সব মিলিয়ে ভালো আছেন আপু?

– জি আলহামদুলিল্লাহ।

– মাঝে মাঝে নক দিব। রাগ করবেন না তো।

– ফ্রি থাকলে অবশ্যই রিপ্লাই দিব।

– আচ্ছা ভাইয়ার নাম কী?

– অরন্য।

– আপু একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি।

– হ্যাঁ করো।

– আপনাদের কী লাভ ম্যারেজ নাকি এরেন্জ। আমার মনটা ভালো না। রিলেশন নিয়ে অনেক সমস্যা আর ভুগান্তিতে পড়েছি। সবাই বলে লাভ ম্যারেজ টিকে না। এরেন্জ ম্যারেজ টিকে। আপনাদের বিষয়টা একটু বললে আমার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হতো।

– আমাদের এরেন্জ ম্যারেজ হলেও আমরা ভালো আছি। এই তো কিছুদিন পর দেশে ফিরব। তার সাথে দেখা নেই তিন বছর। কত ব্যাকুল হয়ে আছি দুজন দুজনকে দেখার জন্য। লাভ আর এরেন্জ কোনো ব্যাপার না। আন্ডারস্ট্যান্ডিংটাই মূল বিষয়। সেই দিক দিয়ে আমরা ভালো আছি।

– ধন্যবাদ এতটুকু বলার জন্য। আমি আপনাকে মাঝে মাঝে জ্বালাব।

– সমস্যা নেই ভালো থেকো।

– আপনিও ভালো থাকবেন।

নাফিসার কথায় আমি মিথ্যা পাচ্ছিলাম না কেন জানি না। বারবার মনে হচ্ছিল অরন্য আর নাফিসার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। নাফিসা যা বলছে সত্যি আর অরন্য যা বলছে মিথ্যা। টুকি টাকি সমস্যা হয়তো ওদের মধ্যে হয়েছ তবে তারা ভালো আছে সেটা নাফিসার কথায় বুঝা যায়। তবুও একটা কিন্তু থেকে যায়। ধরে নিলাম নাফিসা লন্ডনে থাকে তাই সে অরন্যের বাসায় আসতে পারে নি। আর অরন্যও নাফিসার ব্যপারে আবিরকে কিছু বলে নি। তাহলে অরন্য কেনই বা এতদিন আমার কথা আবিরকে বলে গেছে। আর নাফিসাও যেভাবে রিপ্লাই দিল তাতেও কোনো মিথ্যা পাচ্ছি না। আমার রাগ টা বাড়তে লাগল। কোনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি টিপটিপের আইডি দিয়ে নাফিসাকে কল দিলাম। ওপাশ থেকে নাফিসা কল ধরে হ্যালো বলল। আমি খুব সাবলীল গলায় বললাম

– হ্যালো আমি অপ্সরা। চিনতে পারছেন কী না জানি না। তবে অরন্যের বন্ধু। এটা আরেকজনের আইডি দিয়ে আপনাকে মেসেজ দিয়েছিলাম। আপনার সাথে অরন্যের ব্যপারে কিছু কথা ছিল।

গম্ভীর কন্ঠে উত্তর আসলো

– জি চিনতে পেরেছি। কী কথা বলুন। আর এত বছর পর কেনই বা কল দিয়েছেন?

– সেটার কারণ আছে বলেই দিয়েছি। অরন্যের সাথে কী আপনার ডিভোর্স হয়েছে কি না জানতে চাই।

– আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে আপনাকে বলতে বাধ্য নই। আমার অরন্যের সাথে সাময়িক ঝামেলা হয়েছে সেটা আবার মিটিয়েও নিব।

– অরন্যের সাথে আমার কথা হয়েছে সে আমার জীবনে ফিরে আসতে চায় আর আপনার সাথে ডিভোর্স হয়েছে বলেছে কথাটা কি সত্যি? আর অরন্যের আইডিটাও নাকি আপনার কাছে? কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যা সেটাই আমি জানতে চাচ্ছি।

নাফিসা মৃদু হাসলো। তারপর বলল

– এখন থেকে তুমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং মূখ্য গুটি। তোমাকে পরিষ্কার করে বলায় যায় বিষয়টা। শুনো অরন্যের সাথে আমার সম্পর্কের সাময়িক বিচ্ছদ ঘটেছে তবে ডিভোর্স হয়নি। আমি আমার পরিবারকে বুঝিয়ে অরন্যকে ডিভোর্স দিতে চাইলে আমার পরিবার বলল অরন্য যেন ডিভোর্স দেয় সে ব্যবস্থা করতে তাহলে আমি কাবিনের পুরো টাকাটা পাব। যেহেতু তোমাকে নিয়ে সমস্যা ছিল তাই অরন্য আমাকে ৩০ লাখ কাবিন ধার্য করে বিয়ে করেছিল। তখন পরিবারের চাপে বিয়ে করেছিলাম। কারণ আমি ভালোবাসতাম সালমানকে। সালমানের সাথে বিয়ের পর সব ঠিক করে নিয়ে একটা সময় পর পরিবারকে নিজের মতো করে বুঝিয়ে সালমানের জন্য লন্ডনে চলে আসি। আর অরন্য আমার কাছে তিন বছর সময় চেয়েছিল, বলেছিল তিন বছরের মধ্যে কাবিনের সমস্ত টাকা দিয়ে ডিভোর্স দিবে।

তিন বছর প্রায় সম্পন্ন হতে চলল। এদিকে সালমানের সাথেও আমার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। আমি নিজের কাছে নিজে অনুতপ্ত। পরিবারকে সব বলার পর পরিবার বলল অরন্যের সাথে সব ঠিক করে নিতে। অরন্যকে বলার পর সে রাজি হলো না। বরং বলল টাকা দিয়ে ডিভোর্স দিয়ে দেবে আর তোমাকে বিয়ে করবে। কিন্তু আমি তো ডিভোর্স দিব না। যেহেতু আমাদের আইনগত ডিভোর্স হয়নি আর সাময়িক বিচ্ছেদের কথা কেউ জানে না সেহেতু আমি অরন্যের সাথে সম্পর্ক ঠিক করার জন্য যা করা লাগে করব। দরকার হলে আইনের সাহায্য নিব। আর এর মাঝে তুমি আসলে তোমাকেও ছাড়ব না।

আমি নাফিসার কথায় মৃদু হাসলাম। তারপর হালকা গলায় বললাম

– জাতে জাত মিলে। আপনিও যেমন স্বার্থপর অরন্যও তার ব্যতিক্রম না। আপনারা স্বার্থের জন্য যা ইচ্ছা করতে পারেন। কখনও ভালোবাসার মানুষকে ছুড়ে ফেলতে পারেন। আবার কখনও ভালোবাসার মানুষকে প্রয়োজনে বুকে টেনে নেন। আপনাদের আগা গোড়া পুরোটাই স্বার্থে মোড়ানো। আমিও চাই দুই স্বার্থপর এক হোক। ধন্যবাদ পরিষ্কার ভাষায় সবটা বলে দেওয়ার জন্য। ভালো থাকবেন।

বলেই কলটা কেটে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলাম। অরন্য কতটা জঘন্য হলে নাফিসাকে ডিভোর্স না দিয়েই আমার জীবনে ফিরে আসতে চায়তেছে সেটাই শুধু ভাবছিলাম। অরন্যের যে টাকা দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না তা না বরং আমার মনে হয় তিন বছর সময় নিয়েছিল হয়তো ভেবেছিল এর মধ্যে নাফিসার সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। যখন কিছুই ঠিক হলো না তখন সে তীব্রভাবে আমাকে অনুভব করছিল তাই এখন নাফিসা তার জীবনে আসতে চাইলেও সে মেনে নিতে পারছে না। এ মানুষটা সব সময় নিজের স্বার্থটা আগে দেখেছে। এখন আমাকেও ভালো থাকতে দিচ্ছে আর সেও ভলো থাকতে পারছে না। আমি চট করেই মোবাইলটা নিয়ে অরন্যকে কল দিয়ে বললাম

– নাফিসাকে ডিভোর্স না দিয়েই আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছ তাই তো? এত নোংরা কেন তুমি?

– অপ্সরা আমি মুখে মুখে নাফিসাকে তালাক অনেক আগেই দিয়ে দিছি। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সে আমার স্ত্রী না। আর তখন কাবিনের টাকা পুরোপুরি ছিল না বলে তিন বছর সময় নিয়েছিলাম।

– তোমার তো টাকা দেওয়ার ক্ষমতা ছিলই তাহলে তিন বছর সময় কেন নিয়েছিলে? নাফিসা এর মধ্যে ফিরে আসে কি না সেটার জন্য?

– তুমি শুধু শুধু ভুল বুঝতেছো। আমি নাফিসাকে বিয়েটা আমার পছন্দে করেছিলাম। আর পরিবারও আমার কথায় তোমার সাথে আমার বিয়েটা ভেঙ্গেছিল। আর পরবর্তীতে নাফিসাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য আমার কোনো টাকা ছিল না। চাকুরির এক বছরে তো আমি ৩০ লাখ ইনকাম করে ফেলে নি। আর পরিবার ও তখন আমাকে সাপোর্ট দেয়নি। সব মিলিয়ে আমি তিন বছর মসয় চেয়েছিলাম। আর নাফিসাও লন্ডন চলে যায় সালমানের কাছে। এখন নাফিসা আমার স্ত্রী না। আইনগত যে কাজগুলো বাকি সেটা আমি খুব শীঘ্রই ও আসার পর পরই পূরণ করে এ সম্পর্ক থেকে মুক্তি নিব। আর এ চার বছর এজন্যই তোমার সামনে যাইনি। কারণ আমি চেয়েছিলাম সব শেষ করে তোমার সামনে যাব। কিন্তু ভাগ্য এর আগেই তোমার সামনে আমাকে দাঁড় করাল।

– নাফিসা তো ভুল বুঝে ফিরে আসতেছে তাকে মেনে নাও।

– এটা কখনও সম্ভব না। যে মেয়ে আমাকে নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করতে পারে তাকে আমি আর চাই না।

– তাহলে আমি কেন তোমাকে চাইব? কেন আমি তোমার হব? তোমার আর নাফিসার মধ্যে পার্থক্য কী?

– অপরাজিতা আমি নাফিসাকে ভালোবাসে নি কখনও মোহে পড়ে বিয়ে করেছিলাম। আর তুমি আমাকে ভালোবাসো। তাই তোমার উচিত আমাকে মেনে নেওয়া। আর যত যাই বলো নাফিসা কিন্তু আমার স্ত্রী ন। আর এখন একমাত্র ইসলামিক দৃষ্টি কোণ থেকে আমরা স্বামী স্ত্রী। সুতরাং তোমার আর আমার বিষয়টা কখনও নাফিসার সাথে তুলনা যোগ্য না।

– তুমি বড্ড হাসালে অরন্য। আমাকে মাফ করো। নাফিসাকে তুমি কী করবে আমি জানি না। তবে এ সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে আমি মুক্তি চাই। আমি কখনও তোমাকে মেনে নিতে পারব না।

বলেই কলটা কেটে দিলাম। দিন দিন জটিল সম্পর্কের বেড়াজালে আটকে যাচ্ছি। জানি না এর ভবিষ্যত কী। তবে আপাতত আাবিরকে সবটা বলতে হবে।

পরদিন সকালে তৈরী হয়ে কলেজে গেলাম। ক্লাস নিলাম যথারিতী। তারপর আবিরের কাছে গেলাম। আবির তখন ঘুমাচ্ছিল। আবিরের পাশে বসতেই সে আমার দিকে তাকাল ঘুম ঘুম চোখে। আমি আবিরের মাথায় আলতো হাত রেখে বললাম

– শরীর কেমন?

– এখন ভালো।

– আমার কিছু কথা ছিল। কথা গুলো শুনার পর তোমার যদি কষ্ট হয় আমাকে ক্ষমা করে দিও।

আবির আমার হাতটা তার বুকে নিয়ে বলল

– কী বলবে বলো।

আমি মৃদু গলায় বলা শুরু করলাম। বুঁকটা কাঁপছিল বলার সময় তবুও বলতে লাগলাম।
#প্রাক্তন
#লেখিকা- শারমিন আঁচল নিপা
#পর্ব-১২

আমি মৃদু গলায় বলা শুরু করলাম। বুঁকটা কাঁপছিল বলার সময় তবুও বলতে লাগলাম। বলতে বলতে কখনও আঁৎকে উঠছিলাম কখনও স্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলা শেষ করলাম। সব কিছু বলে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে ছাড়লাম। আবির ততক্ষণে স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমার হাতের উপর যে হাতটা ছিল সেটাও ইতোমধ্যে চলে গেছে। আবিরের চোখ গুলো লাল হয়ে আছে। মুখটা ফ্যাকশে। আবিরের নিস্তবতায় বলে দিচ্ছে সে বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে নি। আমার চোখ দিয়ে ততক্ষণে অশ্রু গাল বেয়ে পড়ছিল। আমি চোখের জলটা মুছে আবিরের দিকে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে বললাম

– আবির কিছু একটা বলো। আমি জানি তোমার খারাপ লাগছে। তবে আমি চেয়েছিলাম এ অতীতটা নিশ্চিহ্ন করে সামনে এগুতে। তাই অতীতটা তোমাকে জানাইনি। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলেও একই কাজ করত। তবে অতীতটা সামনে আসায় তোমাকে না বলে পারলাম না৷ আমার ভুল হলে ক্ষমা করে দিও। তবু কিছু একটা বলো। এভাবে চুপ থাকলে বড্ড কষ্ট হয়৷

বলেই আবিরের হাতটা ধরলাম। আবির সাথে সাথে তার হাতটা আমার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল

– তুমি তো অন্য কারও স্ত্রী। তোমার হাত ধরাও ঠিক হবে না। আর সব মেনে নিতাম। রিলেশন সবার হয় কিন্তু তোমার বিষয়টা এত জটিল যে আমি মেনে নিতে পারছি না। অরন্যের জায়গায় অন্য একটা ছেলে হলেও কষ্ট হত না। ওর সাথে আমার সম্পর্ক গভীর। ওর সাথে এতকিছু আমি মানতে পারছি না। তার উপর তুমি এখনও অরন্যের স্ত্রী অরন্যও তোমার জীবনে আসতে চাচ্ছে। আর তোমাদের একটা বাচ্চাও হওয়ার কথা ছিল। এটা ঠিক অরন্য যা করেছে ভুল করেছে তবে সে তো তার ভুল বুঝতে পেরেছে। একদিকে তুমি একদিকে অরন্য আমি তো দুটানায় পড়েছি অপ্সরা। আমাকে নিয়ে এভাবে না খেললেও পারতে। আগে বললে হয়তো এত বড় সিদ্ধান্ত আমি নিতাম না। আমি সত্যিই মানতে পারছি না। আমার পক্ষে মানা বেশ কঠিন।

আমি আবিরের কথায় মৃদু হাসলাম। আশার আলোটা ধূপ করে নিভে গেল। এটা হওয়ারেই ছিল। কারণ আবির কোনো সুপার হিরো না। বাস্তবে সুপার হিরো নেই যে, যারা হিরোইনের সব মেনে নেবে। বাস্তবতা বড়ই কঠিন। এর কষাঘাতে প্রতিনিয়ত বলি হতে হয়। আমার হাসি দেখে আবির জিজ্ঞেস করল

– হাসার মতো কী বললাম হাসছো যে?

– তাহলে কী কান্না করা উচিত?

আবির নিশ্চুপ। আমি পুনরায় বললাম

– একটু আগেও বলেছিলে অতীত নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। অতীত যাইহোক মেনে নিবে। এর আগে বলেছিলে অতীতে আমার কোনো ভুল না থাকলে আর অতীতটা যদি আমাদের ভালো ভবিষ্যতের জন্য লুকিয়ে রাখি তাহলে সব মেনে নেবে। তোমার ঐ কথাগুলো মনে হয়ে হাসি পাচ্ছে। আমার তো এতে কোনো দোষ নেই। বিনাদোষে বারবার শাস্তি পেয়েছি। তবে শুনো তুমি চাইলে বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পারো আমার তাতে কিছু আসবেও না যাবেও না। আর আমি অরন্যকেও আমার জীবন থেকে মুছে ফেলব। সে জীবনে না থাকবে তুমি না থাকবে অরন্য। কারও খেলার পুতুল আমি না। আমি আমার জায়গায় পারফেক্ট। নিজেকে আমি বারবার ভাঙ্গতে দেখেছি আবার বারবার গড়ে নিয়েছি। আমি এবারও গড়ে নিব আরও শক্ত করে। এ মনের আবেগী জায়গায় আবারও প্রাচীর উঠবে সেটা হবে আরও শক্ত। প্রাচীরের এ পাশে থাকব আমি যেখানে আমি আমার মতো রাজ্য বিস্তার করব। আর প্রাচীরের ঐপাশে থাকবে তুমি যে কী না, চাইলেও আর আমার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারবে না।

– অপ্সরা তুমি ঠিকেই বলেছিলে আমি কথা গুলো যতটা সহজে বলেছিলাম বাস্তবতা তার ব্যতিক্রম। আমি চাইলেও মানতে পারছি না। আমি মানতে পারতাম যদি অরন্যের জায়গায় অপরিচিত কেউ থাকত। অরন্য আমার ভাই তার বউ তুমি। এখানে চাইলেও আমি কিছু করতে পারব না। আমার হাত পা বাঁধা।

আমি এবার অট্ট হাসলাম। হেসে হালকা গলায় বললাম

– ভালো থেকো।

বলেই উঠতে নিলাম। আবির আমার হাতটা টান দিয়ে বলল

– আমাকে কী সময় দেওয়া যায় না?

– সম্ভব না। আজকে তুমি বিষয়টা মানতে দ্বিধা করছো সে দ্বিধাটা তোমার আজীবন থাকবে৷ সারা জীবন তোমার কথা শুনতে হবে। আমি কেন এ পথ বেছে নিব বলো? তিলে তিলে মরার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আমার জীবনে তুমি বা অরন্য কারও স্থান নেই। আমার রাজত্বে আমি একাই বিরাজমান। আমি নিজেকে এর আগে সামলে নিতে পেরেছি এখনও পারব। আর তোমার মাকে সবটা জানানো হয়নি আজকে মাকেও সবটা জানাব। আমার পরিবার জানা বাকি আমার পরিবারকেও জানাব। সব মিলিয়ে বিষয়টা শেকড় থেকে শেষ করে নতুন ভাবে নিজেকে গড়ে নিব৷ সেখানে আমি ব্যতীত আর কারও স্থান নেই। ভালো থাকবে।

কথাটা বলেই বের হলাম আবিরের রুম থেকে। আবিরের রুম থেকে বের হতেই অরন্যের সাথে দেখা। অরন্য আমার পথ আটকে দিয়ে বলল

– দয়াকরে মাফ করে দাও। আমার তো ভুল হয়েছে আমি স্বীকার করি। প্রতি পদে পদে আমি সেটা অনুধাবন করেছি।

কথাটা শুনার সাথে সাথে আমি অরন্যের গালে কষিয়ে চড় দিয়ে বললাম

– আমার সামনে যেন তোমার এ মুখটা কখনও না আসে। বেয়াদব,কুত্তা, আমার জীবনটা নরক করতে বিবেকে বাঁধল না? যদি ভালোইবাসতে আমাকে, তাহলে আমার সুখটা নষ্ট করতে না। তোমার বিয়ের পর তোমার জীবনে তো আমি ঝামেলা করে নি। কারণ আমি তোমায় ভালোবাসতাম। আজকে কেন তুমি আমার জীবনটা নরক করতে উঠে পরে লেগেছ।

বলেই অপর গালে আরেকটা চড় দিলাম। তারপর বললাম

– তুমি জানো? তোমার এ সামান্য আবেগ সামান্য লোভ আমার জীবনে কি ক্ষতি করেছে? ভালোবেসার সাগরে হাবুডুবু খেয়ে তো আমাকে বাচ্চার মা বানিয়ে ফেলেছিলে। সেদিন তোমার সাথে যোগাযোগের কম চেষ্টা তো করে নি। কই ছিল সেদিন তোমার ভালোবসা যেদিন আমার বাচ্চাটাকে খুন করতে হয়েছে। সেদিন অধিকার ফলাতে তো তোমাকে দেখি নি৷ আমি তোমাকে মন থেকে ঘৃনা করি। আবিরকে সবটা বললাম আমার পরিবারকেও সবটা বলে এ নাটক আমি শেষ করব। আমাকে যতটা আবেগী ভাবো প্রয়োজনে তার চেয়ে কঠিন হতে আমার সমস্যা হবে না। আমার জীবনের পাতাতেও আর তোমাকে রাখতে চাই না।

কথাগুলো বলেই দৌড়ে বের হতে নিলাম। মা আমার হাতটা ধরে বলল

– কী ব্যপার অপ্সরা কী হয়েছে? অরন্যকে চড় দিলে কেন?

আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম

– আপনি আমার মায়ের মতো। আপনাকে বলতে পারছি না। বলার ধৈর্য আমার নেই। অরন্য আর আবিরের কাছ থেকে বাকিটা জেনে নিবেন।

কথাটি শেষ করেই আমি বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। তারপর সে বাসায় কী ঘটেছে সেটা আমার জানা নেই। রিকশা নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম। বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। বরাবরেই আমি মানুষ চিনতে বড্ড ভুল করে বসি। যদিও এখানে আবিরের দোষ নেই কারণ আমি হলেও বিষয়গুলো স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারতাম না। প্রতিটা কাজের একটা ভালো দিক থাকে। এই যে আরন্যের আগমনটা হয়ে ভালোই হয়েছে। বিয়ের পর যদি অরন্যের আগমন হতো তাহলে হয়তো আরও বেশি কষ্টের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরতাম। আজকাল আমি বড্ড ইতিবাচক স্বভাবের হয়ে গেছি। প্রতিটা বিষয়ে ইতিবাচক দিক গুলোই বের করি। হালকা কষ্ট হচ্ছে তবে এটা সাময়িক। রিকশায় বসে আকাশের দিকে তাকালাম। রাতের আকাশটা বড্ড সুন্দর। সে সাথে ধূলিমিশ্রিত বাতাস বইছে। এ আকাশে ডানা মেলে উড়ার জন্য একটা পাখা দরকার। সে পাখার সন্ধান কই পাব। মনে মনে এসব আওরাতে আওরাতে হাসতে লাগলাম। আজকাল বড্ড ছেলে মানুষী করি। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু জড়ছে সেদিকে আমার খেয়াল নেই।

বাসায় এসে হাত মুখ ধুয়েই খেয়ে নিলাম। নিজেকে এতটায় স্বাভাবিক করে রাখলাম যে কিছু একটা হয়েছে সেটা কাউকে বুঝতেও দিলাম না। খাওয়া শেষে নিজের মতো করে ঘরে এসে বসলাম। যখন একা খাটের কোণে বসলাম তখন কান্নাটা বুক ফেটে আসতে লাগল। আমি চিৎকার দিয়ে মুখে হাত চেপে কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়লাম। আজকে নিজেকে বেশ ছন্নছাড়া লাগছে। নিজের পরিবর্তনটাও নিজের কাছে অদ্ভুত লাগছে। একটা সময় এই আমি অরন্যের জন্য রাতের পর রাত কান্না করতাম ওকে পাওয়ার জন্য আর আজকে ওকে আমি সহ্যই করতে পারছি না। অরন্যকে কেন জানি না আমি ক্ষমা করতে পারছি না। বারবার মনে হচ্ছে একে ক্ষমা করলে আমি শান্তি পাব না।

রাত তখন ১১ টা। আমার ফোনে কল আসলো। আবিরের মা কল দিয়েছে। আমি কান্না থামিয়ে কন্ঠটাকে স্বাভাবিক করে হ্যালো বললাম। ওপাশ থেকে উনি বেশ মোলায়েম কন্ঠে বললেন

– আমি জানি তোমার সাথে যা হয়েছে অন্যায় হয়েছে। মা আবির তোমাকে আর চাচ্ছে না। আবিরের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। তুমি তোমার বাবা মা কে বুঝিয়ে বলো। আর আমি কষ্ট দিয়ে থাকলে মাফ করে দিও।

– আপনি কেন কষ্ট দেবেন। আমি ব্যপারটা ম্যানেজ করে নেব। আর শুনেন আবির আমাকে চাই না বলে ওকে ছেড়ে দিচ্ছি তা কিন্তু না বরং এখন আবিরকেই আমি চাই না। আর আবিরকে এটা ভাবতেও নিষেধ করবেন যে আমি অরন্যের হয়ে যাব। আমি অরন্যকেও আমার জীবনে চাই না। সারা জীবন একা থাকব তবুও অরন্যকে চাই না। দুনিয়াতে একটা ছেলে অরন্য থাকলেও তাকে আমি মেনে নিব না। ভালো থাকবেন।

কলটা কেটে দিলাম। কথাগুলো বলতে পেরে একটু হালকা লাগছে। এর মধ্যেই অরন্য কল দিল। অরন্যের কলটা ধরে গালি দিতে যাব এমন সময় ও বলে উঠল

– অপরাজিতা আমি আর তোমার জীবনের কাটা হয়ে দাঁড়াতে চাই না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার সুখের পথে দুঃখ আনতে আর চাই না। তুমি চাইলে আমি কালকেই তোমাকে ডিভোর্স দিব। সময় মতো চলে এসো। কাগজপত্র আমি প্রস্তুত রাখব।

অরন্যের কথা শুনে একটু স্বস্তি পাচ্ছিলাম। আমি হালকা গলায় বললাম

– ঠিকানা টেক্সট করো। কালকেই আসতেছি আমি।

কলটা কেটে খাটে হেলান দিলাম। কালকে নরকীয় অতীত থেকে মুক্তি পাব ভেবে মনটা শত কষ্টের মধ্যেও স্বস্তি লাগছিল। জানালার পর্দাটা সরানো রাতের কালো আকাশটা দৃশ্যমান। এ আঁধার গুচিয়ে খুব শীঘ্রই আলোর রেখার খুঁজ মিলবে। হয়তো এ কয়দিনে জীবন থেকে অনেক কিছুই বিয়োগ হয়েছে তাতে কী, আবেগের মোহে না থেকে বাস্তবতায় তো নিজেকে সামলাতে পেরেছি এটাই অনেক। আবিরকে তো চিনতে পেরেছি। এসব যোগ বিয়োগের জীবনের অংকগুলো ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে উঠেই অরন্যের দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছে গেলাম।

(কপি করা নিষেধ)
( কপি করা নিষেধ। বেশি বেশও শেয়ার করে পাশে থাকুন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here