প্রেম পাগলামি পর্ব ১৪+১৫

#প্রেম_পাগলামি
#নিহীন_রুবাইয়াত
#পর্ব:১৪

বোতল ঘুরানো হলো এবার বোতলের মুখটা গিয়ে পড়লো সৌভিক ভাইর দিকে।ওনার দিকে বোতলের মুখ ঘুরতেই সবাই বেশ আনন্দে চিল্লিয়ে উঠলো,যতোই হোক ক্যাম্পাসের ক্রাশ বয় এর পালা এবার।উনি এতোক্ষন একদম চুপচাপ ছিলেন এবার বেশ হাসি মুখে বললেন,,

–ফেসে গেলাম যে এবার।এ রুম্পা কি করলি এটা??
–ওমনি ফেসে গেলে?তোমার ঢং যে আর কতো দেখবো বুঝি না ভাই।এবার ঢং বাদ দিয়ে কোনটা নিবি বল।

উনি খুব অসহায়ের মতো রুম্পা আপুর দিকে তাকিয়ে বললেন,,
–ওকে ট্রুথ।

রুম্পা আপু তো রাজ্য জয়ের হাসি দিলেন,,
–ডু ইউ লাইক সামওয়ান?
–…………
–কি রে চুপ করে আছিস কেন?বল।সবাই জানতে চাই,আমাদের ক্রাশ বয়ের ক্রাশ কে?(সত্যিই সবাই জানতে চাই ওনার কোন পছন্দ আছে কিনা।সবাই ওনাকে জোর করতে লাগলো শুধু মাত্র শিবলি ভাইয়া চুপ করে আছে)
–আচ্ছা বাবা ওয়েট,ওয়েট।ইয়াহ,সব মানুষেরই কাউকে না কাউকে ভালো লাগেই আমারো ভালো লাগে একজনকে,ইটস ন্যাচারাল।(খুবি লজ্জার ভংগিমায় বলেন উনি)

ওনার কথাই সবাই হৈচৈ করে,হাতি তালি দেয় তখনি সাদাফ ভাইয়া বলে,নামটাও বলে দে সৌভিক।উনি বিষম খাই।শিবলি ভাইয়া হেসে দেয়,
–সাদাফ,আমাদের ক্রাশ বয়ের এতোটাও সাহস নেই যে নাম বলবে।হাহাহাহহহহহ…
–আমার সাহস নিয়ে কথা যতো কম বলবে ততোই ভালো।বুঝলে মনু?
–হুম,থাক ভাই,অফ যাও আমার মুখ খুলাইয়ো না।

উনি কাশতে কাশতে,,
–খেলা কন্টিনিউ কর রে ভাই।
–তা তো করবোই তার আগে ক্রাশ এর নাম কউ।
–কেন?এটা তো প্রশ্ন ছিল না।কাউকে ভালো লাগে কিনা জাস্ট সেটা জানতে চাইছিস তো।

তখনি থার্ড ইয়ারের উর্মি বলে ওঠে,ভাইয়া নামটা বলে দেন না প্লিইইইইইইইইজ।উর্মির কথায় সবাই হেসে দিলো কিন্তু উর্মি গায়ে মাখলো না।কিন্তু সৌভিক ভাই কেন জানি না উর্মির সাথে তাল দিলো।
–না বললেই কি নয় উর্মি?
–না না না না….প্লিজ ভাইয়া প্লিইইইইজ।
–যদি বলি তুমি?

উর্মির তো খুশিতে চোখ ছল ছল করছে,আমি মীরা তো অবাক হয়েছি কিন্তু সৌভিক ভাইর ফ্রেন্ডরা সব হাসছে মুখ টিপে।
–সত্যি ভাইয়া???
–হ্যা ৩ সত্যি।
–ও মাই গড,ও মাই গড।আই কান্ট বিলিভ দিস যে আমি আপনার ক্রাশ।ভাইয়া আপনি আগে কেন বলেননি।আমি যদি আগে জানতাম আমি আপনার ক্রাশ।আমার তো গায়ের লোম কাটা দিয়ে উঠছে,আমি নাকি ক্যাম্পাসের ক্রাশ বয়ের ক্রাশ।অঅঅ,আই এম সো লাকি।

শিবলি ভাইয়া এবার জোরে জোরে হেসে বলে,,
–উর্মি কুল কুল।এতোটা এক্সসাইটেড হয়ে কাজ নেই।সৌভিক মজা করছে,হাহাহহাহাহহহহহ…
–কি?উনি মজা করবে কেন?সৌভিক ভাইয়া আপনি কি মজা করে বলেছেন??(ঢং করে কথাটা বলে উর্মি)

সৌভিক ভাই চুপ থাকে।সবাই চুপ হটাত উনি বলে ওঠেন,,
প্রিয়তমা যে তাকে বর্ণনা করা কি এতোই সহজ?সে তো থাকে মনের আড়ালে,তাকে ছুতে ইচ্ছা করে এই দুটি হাত বাড়ালে।

উনি চোখ বন্ধ করেন,তারপর বলেন..

বৃষ্টি লিখবো বলে, কাব্য-কৌতূহলে, শব্দ খুঁজি,
অথচ দু চোখ জানে, কী ভীষণ অভিমানে,
বৃষ্টি বলতে আমি তোমাকেই বুঝি!

সে এসে বসুক পাশে, যেভাবে অসুখ আসে,
তারপর হয়ে যাক যন্ত্রণা অনায়াসে।
তবুও আসুক সে,
জানুক, প্রিয়তম অসুখ সে।

হটাত করে ওনার ছন্দ বলায় সবাই তো অবাক।উনি ছন্দটা শেষ করেই আমার দিকে একবার আড়চোখে তাকান।সবাই এবার অনেক জোরে জোরে হাততালি দেই,সবাই বলাবলি করে উনি যে এতো সুন্দর ছন্দ জানে তা তো কেউই জানতো না।উনি মুচকি মুচকি হাসছেন আর আমার দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছেন,ওনার চোখে কেন জানি না আজ আমি কেমন লজ্জা দেখতে পাচ্ছি।ছেলেরাও যে এভাবে লজ্জা পাই তা আমার জানা ছিলো না।ওইদিন অনেক রাত পর্যন্ত আমরা আড্ডা দিলাম।সৌভিক ভাইর দিকে কেন জানি না বার বার চোখ চলে গেছে,ওনার সাথে চোখাচোখি হলেই উনি মেয়েদের মতো লজ্জা পেয়ে যাচ্ছেন।ব্যাপার টা আমার কেমন যেন লাগলো।

পরেরদিন সকালে আমরা বাসায় ফিরে আসি।তারপর কেটে যায় দুইদিন,ভার্সিটি যায়নি।রুমে সুয়ে সুয়ে শাওনের সাথে কথা বলছি,ট্যুরে যেয়ে ওর সাথে কথা বলাই হয়নি।ওর সাথে ম্যাসিজিং করছি মা রুমে এলো,,

–সারাদিন ওই ফোন নিয়েই পড়ে থাকো তুমি,আল্লাহর নাম নিয়ে বাড়ির কুটোটি তো কাটো না কিন্তু তাই বলে নিচে এসে সবার সাথে কি একটু বসাও যায় না।

আমি মায়ের কথা কানে নিলাম না।ফোন টিপেই যাচ্ছি।মা আরো কিছুক্ষন বকবক করলো,আমি এখনো ফোন টিপছি।আমার ভোলাভালা,চুপচাপ,নরম-শরম আম্মাজান এবার অনেক রেগে আমার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো।মা জাতির এই স্বভাবটা কেন জানি না আমার বেশ হাস্যকর লাগে,হুট করেই ছেলেমেয়ের ওপর রাগ করা এটা তাদের একটা অন্যতম গুন।আমার মা এমনিতে তেমন রাগে না কিন্তু যখন রেগে যায় আমার কেন জানি না মার মুখ দেখে খুবি হাসি পাই।এবারো আমি প্রতিবারের মতো হেসে ফেলেছি।আমার এই হাসি মায়ের কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো।

–তুই একটা ফাজিল,বেয়াদব মেয়ে।কোন ভদ্রতা শেখোনি।আমাদেরই ব্যার্থতা,আমিই খারাপ।

কথা বলতে বলতে মা কেদেই দিলো,আমার মা প্রতিবার এমন করে।বকা দিতে দিতে নিজেরে খারাপ বলে কান্নাকাটি শুরু করে।আমরা তিন ভাই বোন অভ্যস্ত এর সাথে।মা আমার ফোন নিয়েই চলে গেলো।আমি উপুড় হয়ে শুলাম কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।

বিকালে আপুর ডাকে ঘুম ভাংলো,
–নিহী ওঠ ওঠ,এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস??

ওর ক্যারক্যারানি শুনে মেজাজ টাই গরম হয়ে গেল,,
–কি রে ফুফুর মতো তুই ভাঙা রেডিওর গান শুরু করলি কেন?
–কি আমি ভাঙা রেডিওর গান শুরু করলাম??
–হ্যা তাই করলি,এখন কি বলতে এসেছিস বল।
–তুই না একটা আস্ত শয়তানি,বলবোই না যা কি বলতে চেয়েছিলাম।

ও রাগ করে চলে গেলো,আমি ঘুরে সুলাম কিন্তু ঘুম আসলো না।উঠে বসলাম,কিছুক্ষন বসে থেকে ঘড়ির দিকে তাকালাম।হাই আল্লাহ!!বিকাল ৪ টা বেজে গেছে???আমি তো ঘুমিয়েছি সকাল ১১ টার দিকে,আমাকে কেউ একবার ডাকলোও না,দুপুরে খেতেও ডাকলো না!!একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিলাম তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে লম্বা একটা সাওয়ার নিয়ে বের হলাম।চুলে টাওয়াল পেচিয়ে নিচে গেলাম দেখি সবাই সোফায় বসে কোন একটা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছে।আমাকে দেখে সবাই একবার তাকালো তারপর আবার নিজেদের মতো কথা শুরু করলো।আমি বেশ অবাক হলাম,খারাপও লাগলো।সেই সকালে একটা ব্রেডজ্যাম খেয়েছি তারপর আর কিচ্ছু খাইনি,রুম থেকেও বের হয়নি কেউ আমার সাথে কথাও বললো না।ডাইনিং এ গেলাম দেখি আমার খাবার ঢাকা আছে কিন্তু খেলাম না,সবার ওপর অভিমান হয়েছে এখন কেন কথা বললো না তারা?আমি কিচেন থেকে একটা চিপসের প্যাকেট নিয়ে চিপস খেতে খেতে সবার পাশদিয়ে চলে যাচ্ছিলাম,দাদি ডাক দিলো।

–নিহী বুবু এখনো ঘুমাচ্ছিলি কেন?তোর আব্বা,আম্মা বোন গিয়ে ডাইকা আসলো উঠলি না।

আমি তো দাদির কথাই হা।দাদি বলে কি?আমাকে সবাই ডাকতে গিছিলো।ধুর!!আমি ভুল বুঝলাম।রাগ করে খাবারটাও খেলাম না।মন চাচ্ছে নিজের চুল নিজেই ছিড়ি।

–কি রে বুবু কথা বলছিস না কেন??
–হুম দাদি।
–আচ্ছা শোন যা গুছায় নে তোরা তো আর একটুপর তোর হবু দুলাভাইর বাড়ি যাবি।তারা তো তোদের রাতে দাওয়াত দিয়েছে।
–মানে?
–আমরা আজ সৌরভদের বাড়ি যাবো(পিছন থেকে ভাইয়া বলে ওঠে)
–ভাইয়া তুমি কখন এলে?
–ঘন্টাখানিক মতো হলো।যা যা আর কথা বলিস না সবাই রেডি হয়ে গেছে তুই বাকি আগে যা রেডি হয়ে নে।
–ওকে

মনে মনে একদম ইচ্ছা করছে ন যেতে।সত্যি কথা বলতে আমি ওনার ফ্যামিলির কাউকে চিনি না,ফ্যামিলি তো পরের কথা আমি ওনাকেউ তেমন চিনি না।মানে কথা হয়নি বেশি আমাদের।বাবা ভাইয়া সবাই যাচ্ছে তাই আমি নাও বলতে পারবো না।রুমে এসে রেডি হয়ে নিলাম।রেড আর হোয়াইট কম্বিনিশনে একটা থ্রীপিস,রেড হিজাব আর চোখে হালকা কাজল দিয়ে আমি রেডি।নিচে এসে শুনি দাদি আর মা যাবে না।তাদের অনেক বার বললাম তারা গেলো না।আর হবু শশুর বাড়ি যাওয়া কেমন দেখায় তাই আপুও যাবে না।আমি এবার মাকে বললাম,,
–মা তোমরা কেউ যাচ্ছো না।আমিও যাবো না।
–না মা এসব কথা বললে হয় না।তুই নিলুর ছোট বোন তুই যদি না যাস কেমন দেখাবে বল তো?আর তুই তো এসবে আগে আগে থাকবি।

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।ভাইয়া এসে আমাকে টেনে নিয়ে গেলো।হবু দুলাভাইদের বাড়িটা বেশ বড়।বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম সৌরভ ভাইয়া,ওনার মা-বাবা,দাদা আমাদের আপ্যায়ন করে নিলেন।আমরা সোফায় বসলাম।হটাত আমার নজর দেয়ালে থাকা বড় ছবির ফ্রেমটার দিকে গেলো।ছবিটা দেখে বেশ পুরাতন মনে হল।তিনটা ছেলে দাড়িয়ে আছে ছবিটাই।একজনের বয়স আনুমানিক ১৪-১৫,আরেকজনের ১০-১২ আর একজনের ৫-৬ হবে।১০-১২ বছরি ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা লাগল কোথায় যে দেখেছি খেয়াল হলো না।তবে আমি ছেলেটার ছবি এর আগেও দেখেছি।

আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে সৌরভ ভাইয়ার দাদা জিজ্ঞেস করলেন,
–ওভাবে কি দেখছো দিদুন?
–না না তেমন কিছু না।ছবিটা দেখছিলাম।
–ওহ ওটা।ওই যে বড় মতো দেখছো ওটা তোমার দুলাভাই সৌরভ,তার থেকে আরেকটু ছোটটা হলো আমার মেজ নাতি আর একদম ছোটটা আমার ছোট নাতি শাওন।

ওনার মুখে শাওন নামটা শুনে আমার ক্যাম্পাসের শাওনের কথা মনে পড়ে গেল।কিন্তু ও তো এটা না।এটা তো অন্য শাওন।সবাই কথা বলছে,সৌরভ ভাইয়ার মা তো আমাকে এটা সেটা খাওয়াতে ব্যাস্ত হটাত ওনাকে কেউ ডাক দেয়,

–বড়োমা আমার মোবাইলের চার্জারটা কই?
ছেলেটার গলা খুব চেনা,আমি তার দিকে তাকাতেই শকড খাই,এটা তো শাওন।তার মানে ও সৌরভ ভাইয়ার ভাই কিন্তু আমাকে আগে কেন বলিনি?ও মোবাইল টেপাই ব্যস্ত থাকাই আমাকে খেয়াল করিনি।

আমি ওরে ডাক দিই,,
–শাওন তুমি?

ও আমার দিকে তাকিয়েই যেন ফ্রিজড হয়ে যায়।

#প্রেম_পাগলামি
#নিহীন_রুবাইয়াত
#পর্ব:১৫

–শাওন তুমি?

ও আমার দিকে তাকিয়েই যেন ফ্রিজড হয়ে যায়।ওর মুখ দেখে বোঝায় যাচ্ছে ও আমাকে এখানে এক্সপেক্ট করিনি।কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর ও স্বাভাবিক হয়ে গেলো,,
–হাই নিহীন।হুয়াটস আপ?
–ফাইন বাট তুমি এখানে??

সৌরভ ভাইয়ার মা জিজ্ঞেস করেন,
–শাওন বাবা তোরা একে অপরকে চিনিস নাকি?
–হ্যা মানে বড়মা ওই আর কি।আমরা এক কলেজে পড়ি।
–ওহ ভালো।তাহলে সৌভ…..
–হ্যা হ্যা বড় মা ভাই,আমি আর নিহীন একি কলেজ।(শাওন জোর করে হাসার চেষ্টা করে)

–আচ্ছা মা তুমি বসো,আমি একটু রান্না ঘর থেকে আসছি।
উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে রান্নাঘরের দিকে যায়।

আমি এবার শাওনের দিকে তাকাই,ও একদম চোরের মতো তাকিয়ে আছে।আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে আর মনে মনে কি যেন বিড়বিড় করছে।আমি চোখ বড়বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
–নিহীন আসলে আমি তোমাকে জানাতাম কিন্তু
–কিন্তু কি শাওন??(আমি চিল্লিয়ে উঠি সবাই তাকিয়ে পড়ে)
–নিহীন কোন সমস্যা নাকি মা??
–না বাবা কোন সমস্যা না।
(সবাই আবার যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে)
–শাওন তুমি সৌরভ ভাইয়ার ভাই এটা আমাকে আগে বলোনি কেন??জানো আমি কতোটা শকড হয়েছি?
–বড় ভাইয়ার কথা শুনে তুমি এতো শকড তাহলে ওর কথা শুনলে তো….
–ও মানে?
–না না কেউ না।প্লিজ নিহীন প্লিজ তুমি কিছু মনে করো না।আসলে তোমার বড় ভাইয়াই আমাকে মানা করেছিলো তোমাকে সারপ্রাইজ দেবে তাই।হিহিহিহিহহহহহহ…
–বুঝলাম না আজব সারপ্রাইজ এর কি আছে এখানে??আমরা একে অপরকে এতোদিন চিনি কিন্তু তুমি বললেও না ব্যাপার টা।আমি গতদিন বললাম তাও তুমি এমনভাব নিলে যে কিছুই জানো না যেখানে তুমি সবটাই জানো।আমাকে এভাবে ঠকালে শাওন।তুমি এমনটা করবে ভাবিনি আমি।ইউ হার্ট মি শাওন।

আমি উঠে গিয়ে বাবার পাশে বসলাম।বাবারা আমাদের থেকে বেশ দুরেই ছিলো।শাওন আমার দিকে লজ্জাবোধ নিয়ে বেশ কয়েকবার তাকিয়েই হটাত করে কি মনে করে দৌড়ে উপরে চলে গেলো।

শাওন এখন সিড়ি বেয়ে এতোটাই উপরে উঠছে যে ভাগ মিলখা ভাগ মুভিতে ফারহান আক্তার ও অতোটা জোরে দৌড়াইনি।শাওন কারোর একটা ঘরে ঢুকতে যাবে কিন্তু কারোর সাথে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে ঢপাস,অপর পাশের লোকটিও ঢপাস করে মাটিতে পড়লো।
চোখ ডলতে ডলতে তিনি বলেন,
–শানু দেখে চলতে পারিস না,এরকম স্প্যানিশ বুলের মতো তেড়ে আসছিস কেন??
–ভাই কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে রে।
–আরে ধুর তোর কেলেঙ্কারি।সর আমি নিচে যাবো খুদা পাইছে কিছু খেতে হবে।
(লোকটি উঠে শাওনকে ডিঙিয়ে যেতে যায় কিন্তু শাওন হাত ধরে ফেলে)
–ভাই যাস না ভাই যাস না।
–শানু কি করছিস হাত ছাড়।
–ভাই তোর খোদার কছম তুই এখন নিচে যাসনা।
–মানেটা কি?এই তুই কি পাগল টাগল হয়ে গেলি নাকি??
–আমি পাগল হয়নি কিন্তু তুই যদি এখন নিচে যাস অন্য কেউ পাগল হবে আমি সিউর।আর তার শোকে তুইও পাগল হবি।
–শানু ফালতু ইয়ারকি মারবি না।সর,,
(লোকটি শাওনের পায়ে হালকা করে লাথি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নেই তারপর নিচে আসার জন্য রুম থেকে এক পা বাড়ায়)
–নিচে নিহীন,যাবি যা।আমার কি?
(নিহীন নামটি শুনে লোকটি আর পা বাড়াতে পারে না।শাওনের দিকে করুন চোখে তাকাই।শাওন কলার ঝাকিয়ে একটা হাসি দেয়।লোকটি এসে মাটিতে শাওনের পাশে বসে পড়ে।)
–ভাই আমার,ছোটু আমার তুই কি ইয়ারকি মারছিস ভাই?
–জে না ভাইইইইইইইইইইইই…
–আল্লাহ!ও কেন আসলো?
–শুধু ও না ওর বাপ-ভাই ও আইছে।
–কিন্তু কেন?
–দাওয়াত আজ ওদের আমাদের বাসায়।
–কি??
–হুউউউউউউম
(লোকটি মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলো আর শাওন হোহোহহহহহ করে হাসছে।)

আমি নিচে বসে বসে ভাবছি শাওন কেন করলো এমন।আমার খুন রাগ হচ্ছে সাথে কান্নাও পাচ্ছে।আমি তো শাওনকে অনেক ভালো বন্ধু ভাবতাম কিন্তু ও কেন করলো এমন ও??আমার বিশ্বাস নিয়ে খেললো ও।আমি ওকে ক্ষমা করবো না।আমার খুব কান্না পাচ্ছে এমন সময় সৌরভ ভাইয়ার দাদু আসলো,
–কি ব্যাপার দিদুন তুমি এখানে একা বসে আছো কেন?তোমার কি কোন কারনে মন খারাপ??
–না না দাদু মন খারাপ হবে কেন??আমার মন ভালো আছে।
–ও,তাহলে ঠিক আছে।দিদুন তুমি আর শাওন কি একে অপরকে আগে থেকেই চিনতে?না মানে তখন ওভাবে চিল্লিয়ে উঠলে তো….
–…………….
–তুমি আমাকে বলতে পারো দিদুন।
–দাদু আসলে….
–ব্যক্তিগত কিছু??
–না না দাদু তেমন কিছু না।আসলে আমি আর শাওন খুব ভালো বন্ধু,একি ভার্সিটিতে পড়ি কিন্তু ও আমাকে আগে থেকেই চিনতো কিন্তু সৌরভ ভাইয়া যে ওর ভাই তা আমকে আগে কোনদিন বলিনি।
–কি বলছো দিদুন?ও তোমাকে জানাই নি?
–না
–ও তোমার কাছে এতো বড় কথা লুকালো?তাহলে তো তুমি মেজ সাহেব কেউ চেনো না হয়ত।কি একটা কান্ড বলতো,,একি সাথে পড়ো কিন্তু তুমি জানলেই না ওরা তোমার বড় বোনের দেবর হয় তা।অবশ্য ওরাই তো তোমাকে বলিনি,দোষ তো তোমার না।দাড়াও ওদের ব্যবস্থা করছি।
(দাদুর ওরা কথাটা ঠিক বুঝলাম।ওরা বলতে কি বুঝালো আর এই মেজ সাহেব টাই বা কে?)
–দাদু ওরা মানে বুঝলাম না তো।মানে মেজ সাহেবটা কে?
–তুমি আমাদের মেজ সাহেব কে চেনো না?শাওনের আগের জনটা।শুনেছি ভার্সিটির সব মেয়ে নাকি ওর ওই সাদা চামড়ার পাগল।
–দাদু একটু ক্লিয়ার করে বলবেন কি?আর তাছাড়া আমি তো জানতাম সৌরভ ভাইয়ারা দুই ভাই।
–হ্যা ওরা দুই ভাই তো।
–তাহলে বড়,ছোট,মেজ এসবের মানে ঠিক।
–আরে সৌভ
–দাদুউউউউউউউউউউউউউউউউউউউউউউউউউউ

শাওন চিল্লিয়ে ওঠে,আমি আর দাদু ভয় পেয়ে যায়।
–ছোট সাহেব তুমি চিল্লাচ্ছো কেন?
–দাদু তোমার না এখন টিভি দেখার সময় যাও যাও টিভি দেখো।
–না আজ আর টিভি দেখবো না।তুই এদিক আই আগে।
(শাওন এসে দাদুর পাশে বসে।দাদু তখন শাওনের কান মোড়া দেয়)
–আউচ আউচ দাদু কি করছো কি এটা?ব্যাথা লাগছে তো
–লাগুক ব্যাথা।ব্যাথা পাওয়ার জন্যই তো ধরেছি।এরকম ফুলের মতো একটা বাচ্চা মেয়েকে তোরা এভাবে ঠকালি,ওরে বললিই না।দেখ তো মেয়েটা কতোটা কষ্ট পেয়েছে।
(এভাবে শাওনের কান মোড়া দিয়াই আমার বেশ হাসি পাই কিন্তু আমি হাসি না।মুখ গোমড়া করে বসে থাকার এক্টিং করি।কারন শাওন আমার সাথে যেটা করেছে সেটা অন্যায়)
–দাদু আগে আমার কথাটা তো শোনো।
–বল কি বলবি বল
–তার আগে কানটা ছাড়ো প্লিজ খুব ব্যাথা লাগছে।প্লিজ দাদু।
–না কান ছাড়বো না।
–নিহীন প্লিজ দাদুকে বলো আমার কান ছেড়ে দিতে।সত্যি বলছি অনেক ব্যাথা লাগছে।
(আমার মনে মনে শাওনের অবস্থা দেখে খুব হাসি পাচ্ছে।মনে মনে তো বলছি ঠিক হচ্ছে,তোমার আরো বেশি শাস্তি পাওয়া দরকার।কিন্তু তাও ওর মুখ দেখে মায়া হলো)
–দাদু ওর কান ছেড়ে দেন
–না দিদুন ওরা যেটা করেছে সেটা অন্যায়।
–তাও ছেড়ে দেন দাদু।
(দাদু ওর কানটা ছেড়ে দেয়)
–দেখ মেয়েটা কতো ভালো।আর তোরা এভাবে…
–দাদু তোরা বলতে বার বার কি বোঝাচ্ছেন বুঝতে পারছি না।
–আরে শানু মানে শাওন আর সৌ..
–সৌরভ,দাদু সৌরভ বলতে চাইছে নিহীন।ভাইয়াই মানা করেছিলো।
–কি?সৌরভ(উনি কথা শেষ করতে পারেন না।
–আব্বা এদিকে আসেন(সৌরভ ভাইয়ার মা ডাক দেয় উনি চলে যায়)

ধুর,দাদু কথা শেষ করতে পারলো না।এই বাসায় সব কিছুই কেমন যেন পেচালো।শাওন আর সৌরভ ভাইয়া ভাই।আবার কোন মেজ সাহেব এটা আবার কে?শাওনি বা এমন বিহেব করছে কেন?আর আপু যতটুকু বলেছিলো সৌরভ ভাইয়ারা ২ ভাই।আমার মাথা ঘুরছে,কি হচ্ছে এগুল আমার সাথে।
শাওন আমার দিকে তাকিয়ে মিচকি মিচকি হাসলো,যদিও আমি দেখলাম না।আমার আড়ালেই উপরের দিকে তাকিয়ে কারোর দিকে হাত দিয়ে ইশারা করলো সব ঠিক আছে।উপরে দাড়িয়ে থাকা লোকটা আমার দিকে একবার তাকিয়ে বুকে হাত দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।উপরে দাড়িয়ে থাকা লোকটি বললো
–সরি নিহীপাখি এখনি সত্যিটা তোমাকে জানাতে পারবো না।সময় হোক আমি নিজেই তোমার কাছে ধরা দেবো।

নিচে বসে শাওনের দিকে রাগি লুক দিলাম।ও অনেক বার সরি বললো,বার বার সেই এক কথা আমাকে নাকি সারপ্রাইজ দিতে চাইছিলো।আমার মন কেন যেন মানতে চাইলো না কথাটা কিন্তু আমি ওর ওপরেও রাগ করে থাকতে পারলাম না।আমার এই এক ভালো দিক আবার সমস্যাও আমি কারোর ওপরি বেশিক্ষন রাগ করে থাকতে পারিনা। রাতে সবার সাথে ডিনার করলাম দাদু,সৌরভ ভাইয়ার বাবা বারবার মেজ সাহেব নাম নিচ্ছিলেন কিন্তু শাওন প্রতিবারি বলছে ভাই পরে খাবে।ও পড়াশুনা করছে ওরে যেন কেউ ডিস্টার্ব না করে।এরপর কেউ আর এই মেজ সাহেবটার কথা বললো না।আমার মনের ভিতর কেমন লাগছে।আপু এতোদিন মিথ্যা কেন বললো যে সৌরভ ভাইয়ারা ২ ভাই,ওনারা তো ৩ ভাই।আর ওদের মেজ ভাইটাই বা কে?আমাদের ভার্সিটিতে পড়ে আবার নাকি মেয়েদের ক্রাশ।মেয়েদের ক্রাশ কথাটা মাথায় আসতেই আগে সৌভিক ভাইর কথা মনে পড়লো।না না এটা কিভাবে সম্ভব?উনি হতে পারেন না আর তা ছাড়া ভার্সিটিতে তো আরো অনেক সুন্দর ছেলে আছে।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার শাওনকেউ তো কোনদিন কোন সিনিয়র ভাইর সাথে সেভাবে দেখিনি।হচ্ছেটা কি এসব আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না।

শাওনের সাথে আর কথা বললাম না।রওনা নিলাম ওদের বাসা থেকে।গাড়িতে বসে ভাবছি কখন বাসায় পৌছাবো।ওই বাসা থেকে তো কিছুই জানতে পারলাম না এখন আপুই সব সত্যিটা বলতে পারবে।গাড়িতে বসে ঘুমাই গেলাম।ঘুম ভাংলো বাবার ডাকে।

–নিহী ওঠো মা,বাসায় চলে এসেছি।

আমি চোখ মেলে তাকালাম।বাসায় এসেছি শুনি তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে আপুর রুমে চলে গেলাম।আমাকে আজি সব জানতে হবে।কিন্তু আপুর রুমে গিয়ে লাভ হলো না।ওর নাকি খুব মাথা ব্যাথা করছিলো তাই ঘুমিয়ে পড়েছে।আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।রাতে ঘুম হলো না,অপেক্ষা কখন সকাল হবে।সকালে নিলু আপুর কাছে শুনবো।ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি বুঝতে পারিনি।ঘুম ভাংলো দাদির ডাকে।উঠে দেখি ৮ টা বেজে গেছে প্রায়।আমি আপুর রুমে গেলাম কিন্তু পেলাম না।অবশ্য পাওয়ার ও কথা না।রবিবারে ও ৬ টাই বের হয়ে যায় ভার্সিটির জন্য।আমার খেয়াল ছিলো না রবিবার আজ ওর রুমে যেয়ে ওরে না দেখে খেয়াল হলো।মেজাজ গরম হয়ে গেল খুব।ক্লাসের সময় হয়ে যাওয়ায় না খেয়েই ভার্সিটির জন্য বের হলাম।ভার্সিটিতে যেয়ে আজ শাওনকে ধরব,ওরে বলাই লাগবে সব।

আমি শাওনকে খুজছি কিন্তু হটাত করে সামনে শিবলি ভাইয়া চলে আসে।
–এই ফুলকলি কেমন আছো?

এমনিতেই মন মেজাজ ভালো না।তারপর ওনার মুখে ফুলকলি ডাক শুনে আরো রাগ হলো।

–কি হলো ফুলকলি চুপ কেন?
–আপনি আমাকে ফুলকলি বলেন কেন হ্যা?আমার নাম কি ফুলকলি নাকি আমার কোন নাম নেই যে এই নামে ডাকা লাগবে?সিনিয়র বলে যা না তাই বলে ডাকবেন??আপনারা আসলেই অনেক অসভ্য,কাউকে মানুষ বলেই মনে করেন না।মানুষ হয়ে আর একজন মানুষের সাথে অমানুষের মতো ব্যবহার করেন। আর একদিন যদি আমাকে এসব নামে ডাকেন তাহলে খবর আছে।

উনি আমার আচারনে বেশ অবাক হয়েছেন হয়তো।উনি মাথা নিচু করে বলেন,,
–সরি নিহীন।আমি আর কোনদিন বলবো না।আমি শুধু এটা বলতে এসেছিলাম সৌভিক তোমাকে ক্যান্টিনে ডাকছে।

উনি কথাটা শেষ করে আর দাড়ায় না। চলে গেলেন।আমার ব্যবহারে হয়তো অনেক কষ্ট পেয়েছেন।ধুর আমি শুধু শুধু অন্যের রাগ ওনার ওপর ঝাড়লাম।খুব রাগ হচ্ছে এবার নিজের অপর।

চলবে…….
(কোন ভুলত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন।আর নেক্সট নেক্সট না করে গল্পটা কেমন লাগছে সেটা জানালে বেশি খুশি হবো।ধন্যবাদ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here