বিবর্ণ সিঁদুর পর্ব ১১

বিবর্ণ সিঁদুর
পর্ব-১১
#Taniya_Sheikh

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে নির্জন সড়ক ধরে গাড়ি চলছে। হাত ঘড়িটা সাবধানে একবার দেখে নিল তন্ময়। মধ্য রাত। আশপাশের খোলা মাঠ, বসতি আঁধারে নিমজ্জিত। খুব সম্ভবত আজ কৃষ্ণ পক্ষ। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় সামনের পথটুকু দেখা ছাড়া আশপাশে একেবারে ভূতুরে অন্ধকার। তন্ময় ড্রাইভ করতে করতে লুকিং গ্লাসে চোখ রাখল। গাড়িতে সে ছাড়া সবাই ঘুমন্ত। লাইট অফ থাকায় কারো মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবুও পাগল মন কিছুতেই মানছে না মানা। ঐ অস্পষ্ট মুখশ্রী দেখবে বলেই মরিয়া হয়ে উঠেছে। এমন কবে,কখন, কেন হলো সে জানে না। শুধু জানে দিনদিন তাকে কাছে পাওয়ার বাসনা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। যে অনুভূতিকে সাময়িক আবেগ ভেবে দমনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা যেন সহজে দমছে না। এই তো আসার পূর্বেও ভুলে ছিল। হঠাৎ তার উপস্থিতিতে সব পণ্ড হলো। যেই শুনেছে সে এই গাড়িতে বসেছে ওমনি ছুটে এসেছে। এ কেমন অনুভূতি, এ কেমন পাগলামি তন্ময় বুঝেও যেন বোঝে না। চোরাবালির মতোই একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে তাতে। এসব ভাবতে ভাবতে প্রায় আনমনা হয়ে ওঠেছিল। পেছনে নড়াচড়ার শব্দ হতেই নিজেকে সামলে নেয়। নির্ঘুম বসে আছে বিধায় চোখ জ্বালা করছে ওর। বা’হাতে পানির বোতল নিয়ে দাঁতের সাহায্য খোলার চেষ্টা করছে। না, খুলছে না। বোতলটা সিল করা। বারবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে হাত ফসকে পায়ের কাছে পড়ে গেল বোতলটা৷

” আপনি কি পানি খাবেন,স্যার?” বৃষ্টি শেষের হিমেল হাওয়া গায়ের লাগলে যেমন শিহরণ জাগে। এই প্রিয়ংবদার প্রশ্নে তেমনি অনুভূতি হলো তন্ময়ের। ভেতরটা প্রশান্তির কম্পনে কাঁপলো। বিলম্ব হলো জবাব দিতে। রজনী ইতস্তত করে ঘুমজড়ানো কন্ঠে ফের জিজ্ঞেস করতেই তন্ময় নিজেকে স্বাভাবিক করে। বলে,

” না।”

” কিন্তু এই মাত্র তো আপনাকে বোতলের মুখ খোলার চেষ্টা করতে দেখলাম।”

” তো?”

তন্ময়ের এমন বিরূপ জবাবে দমে যায় রজনী। সেধে জিজ্ঞেস করায় লজ্জা পেল। কিছুটা খারাপও লাগল। মুখ কালো করে চোখ বুঝল আবার। তন্ময় নিজের ব্যবহারে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে। এমনি করে মিনিট দুই কাটতেই তন্ময় গলা ঝাড়ে। কিভাবে শুরু করবে ভাবতে ভাবতে একসময় প্রিয় নামটা ধরে ডাকে,

” রজনী!”

রজনী ইচ্ছা করে চুপ করে থাকে। জবাব না পেয়ে কিছুটা রেগে তন্ময় বলে,

” রজনী, আমি তোমাকে ডেকেছি।”

” হ্যাঁ বলুন।” আস্তে আস্তে জবাব দেয়।

” পায়ের কাছ থেকে বোতল ওঠাও।”

” আমার কাছে বোতল আছে। সেটা নিন।”

” তোমার কী মনে হয়, আমি তোমার মুখ লাগানো বোতল থেকে পানি খাব?” চাপা রাগ ঝাড়ে তন্ময়। পাছে কেউ জেগে যায় সেই ভয়ে নিচু গলায় রজনী জবাব দেয়,

” আমি তো তা বলিনি,স্যার?”

” বলা লাগবে কেন? বুদ্ধি কি তোমার চেয়ে কম আমার? যা বলেছি তাই করো।”

” হুম।”

রজনী ঝুকে এসে সামনের দুই সিটে বোতল খুঁজতে লাগল। ঝুঁকে বসায় ওর চুলের একাংশ হেলে পড়েছে একপাশে। ওড়না সরে ফর্সা কাঁধের নিচের কিছুটা এই অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিল তন্ময়। এতোকিছু করল শুধুমাত্র রজনীর মুখখানা কাছ থেকে একবার দেখবে বলে। রজনী ওর দিকে ঘুরে বা’হাত দিয়ে হাতড়াচ্ছে নিচটা। তন্ময় চোখের কোনা দিয়ে একবার মুখটা দেখে সামনে তাকিয়ে তাগাদা দিয়ে বলল,

” পেলে?”

” পেয়েছি, কিন্তু ধরতে গেলেই সরে যাচ্ছে।”

” দেখো সাপ টাপ যেন আবার না ধরে আনো।”

” সাপ! বাপরে।” রজনী ভয়ে হাত সরাতেই হাতটা গিয়ে তন্ময়ের কোলের উপর পড়ে। নিজেও কিছুটা হেলে পড়ে তন্ময়ের দিকে। চোখাচোখি হতেই লজ্জিত হয়ে দ্রুত সরে যায় পেছনে। স্যারের সিট ধরে বসে আছে। রজনীর গায়ের সুবাস পাচ্ছে তন্ময়। ওকে এতোটা কাছে পাবে আশা করেনি। প্রথমে নিজেও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রজনীর বোকামি দেখে মুচকি হাসে। কোনোরকমে সেটা সংবরন করে চাপা ধমকে বলে,

” কী হচ্ছে এসব? যেটা খুঁজতে বলেছি খোঁজো।”

” কিন্তু, আপনি যে বললেন সাপ,,!” রজনীর গলা কাঁপতে লাগল।

” বলেছি বলেই কি সাপ চলে আসবে? খোঁজো বলছি।”

রজনী গাল ফুলিয়ে ভয়ে ভয়ে সিট ধরে একটুখানি ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে আবার হাতটা বুকে চেপে ধরে বলে,

” স্যার, আমার ভয় করছে। আপনি আমার বোতল থেকে পানি খান না,প্লীজ।”

আরও কাছাকাছি দুজন৷ তন্ময়ের মন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। নিজেকে কোনোমতে সামলে রাগী গলায় বলল,
” না, আমি যার তার ছোঁয়া খাই না। তোমার খোঁজা লাগবে না। যাও।”

” আমি খুঁজে দিচ্ছি, স্যার।”

” বললাম তো লাগবে না,যাও।”

রজনী গোমড়া মুখে সিটে গিয়ে বসে। স্যারের অপ্রত্যাশিত মত বদলে খারাপ লাগল। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে এখন। স্যার একটা কাজ দিল সেটাও পারল না। ” কিচ্ছু হবে না তোকে দিয়ে। কিচ্ছু না। ভীতুর ডিম কোথাকার।”

রজনীর সাথে ওমন করে কথা বলে মোটেও শান্তি পেল না তন্ময়। নিজেই নিজেকে তিরস্কার করল মনে মনে। কিছু সময় যেতেই তন্ময় আস্তে করে বলল,

” রজনী, ঘুমিয়ে গেছ?”

” না, স্যার। পানি খাবেন? বোতল তুলে দেব?”

রজনীর এই উৎকণ্ঠিত গলার স্বরে তন্ময়ের বুকের ভেতরটা পর্যন্ত দুলে উঠল। ভালো লাগায় মনটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কতোটা ব্যাকুল ছিল কেবল ওর মনই জানে। পাছে প্রেম ব্যর্থ হয়, প্রেয়সী হারিয়ে যায়; এই ভয়েই ভালোবাসাটা হয়ে ওঠে নি। বলতে গেলে তেমন করে ভালো কাওকেই লাগেনিও রজনীকে ছাড়া। পানি পান ছাড়াই সমস্ত দেহমন যেন তৃপ্ত হলো। তৃষ্ণিত পথিক ধূ ধূ বালুচরেও পানিপূর্ন খাল দেখতে পায়। তন্ময়ের ভাবনা আর রজনীর ভাবনায় বিস্তর ফারাক। রজনীর উৎকন্ঠা স্যার নামক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির কষ্ট হলো ভেবে। এর বাইরে কিছুই নয়। তন্ময় এই মিথ্যাকেই সত্য ভেবে এক প্রস্থ হাসল আনমনে। রজনীকে জবাবের আশায় আর প্রতিক্ষা না করিয়ে বলল,

” দাও।”

নিজের পাশ থেকে বোতলটা হাতে নিয়ে মুখ খুলে এগিয়ে দিতেই থেমে গেল। স্যার একটু আগে বলেছেন তিনি কারো ছোঁয়া খান না। রজনী সেই ভেবেই বললো,

” কিন্তু।”

” কোনো কিন্তু না। পানি দাও।”

” নিন।”

তন্ময় বোতল হাতে নিল। পানি খেয়ে সেটা আবার রজনীর হাতে দিয়ে বলল, ” হাতে কিছুটা পানি ঢালো।”

” কেন স্যার?” তন্ময় এমন ভাবে তাকাল যেন খুব বড়ো অন্যায় করে ফেলেছে সে। ভয়ে বেচারী টু শব্দটি না করে পানি ঢালল নীরবে। তন্ময় বা’হাতে পানি নিয়ে চোখে মুখে ছিটিয়ে নিল। পানি ঢালা শেষ হতেই ছোঁ মেরে বোতলটা কেড়ে নেয়। রজনীর অবাক হলেও কিছুই বলল না। নিজের জায়গায় এসে আরামে চোখ বুঝল আবার। হঠাৎ মনে হলো,” আচ্ছা স্যারের যদি আবার কিছু দরকার পড়ে?” পরক্ষনেই ভাবে, “না, বাবা! আর কিছু বলতে যাব না। শেষে আবার ধমক খাব। দরকার পড়লে তিনিই ডাকবেন।” রজনী আবার চোখ বন্ধ করে। কিন্তু ঘুম আর এলো না সহজে। ও বসেছে জানালার সাইডে। ঠিক সামনে তন্ময় স্যারের সিট। রজনী আরেকবার স্যারকে দেখল। চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছে সে। চোখ সরিয়ে অদূরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে তাকায়। গাড়ি স্পিডে চলছে। আশেপাশের মাঠ, বসতি চোখের নিমিষে হারিয়ে যাচ্ছে। জীবনটাও বুঝি এমন৷ দেখতে দেখতে একবছর হয়ে গেল। এই তো সেদিনের কথা, দুর্গাপূজার আগে আগে কতো আমেজই না থাকত ওর। আর সবার মতো নতুন জামা না পেলেও আনন্দের কমতি ছিল না। মহালয়া রাতে বাড়িসুদ্ধ লোকের জেগে থাকা। পূজোর সময় পিঠা, মোয়া, নাড়ু, বিভিন্ন মিষ্টান্ন আরও কতো খাবার তৈরি করত ওরা। পূজোর আমেজ ধীরে ধীরে বাড়ত। দলবেঁধে ঠাকুর দেখা,ভোগ খাওয়া। তারপর, সবাই মিলে একটা দিন কব্জি ডুবিয়ে মাংস খেত। এভাবে করেই বিসর্জন চলে আসত। সেসব দিন চোখের তারায় ভেসে উঠল আজ। সেদিন এদিনে কত ফারাক তৈরি হয়েছে। বদলে গেছে সম্পর্ক, বদলে গেছে সেই আমেজ। পুরোনো মধুর স্মৃতি বড্ডো ব্যথা দিল। নীরবে গড়াল চোখের নোনোজল। অশ্রুসিক্ত চোখে আকাশ পানে তাকায়। কালো মেঘে ঢেকে আছে পুরো আকাশ। সেই কালো কিছুটা যেন ওর জীবনেও এসে জমেছে। একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। শূন্যতার মাঝে হারিয়ে যাওয়া প্রবল বাসনা জাগে ইদানিং। হয়তো কোনো কাকডাকা ভোরে কিংবা গোধূলি বিকেলে হারিয়ে যাওয়ার সেই বাসনা সফল হবে। মুক্তি পাবে মহাপাপে পাপী হয়ে। নিরর্থক জীবন টানা যে বড়ো কষ্টের। চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রজনীর ভেতর থেকে। ধীরে ধীরে চোখের পাতা ঢুলে আসে।

সামনের লুকিং গ্লাস সরিয়ে আবছায়ায় একবার রজনীকে দেখে নেয় তন্ময়। রজনী ততোক্ষণে ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করেছে৷ ভারী নিঃশ্বাস ফেলে সামনের আলো আঁধারিতে চোখ রাখল। আজও ভাবে কবে,কিভাবে এই মেয়ের মোহে পড়ার শুরু ছিল। এমন চাহনী, এমন ভীরু, বোকা মেয়ে দু’টো দেখেনি তন্ময়। ক্লাসে ঢুকলেই আপনা আপনিই দৃষ্টি ওর উপর যেত। যেদিন ক্লাসে ঢুকে প্রথম হাসতে দেখেছিল, সেদিনই বোধহয় মরেছিল। এরপর বাঁচার কত চেষ্টা হলো কিন্তু ফল শূন্য। শুনেছিল প্রেমের মড়া জলে ডোবে না,আর ওর প্রেম প্রদীপ কোথাও গিয়ে নেভে না। বরঞ্চ আরও উজ্জ্বল হতে লাগল দিনকে দিনকে। কলেজের রাস্তার পাশের, বাড়ির সামনের দোকানে বসে লুকিয়ে দেখাতেও যেন লজ্জিত হতো না মন। বন্ধু মহলে ফিসফাস শুরু হলো ওর গতিবিধির পরিবর্তন লক্ষ্য করে। কেউ কেউ তো বুঝেও নিল কোন প্রতিমা গড়েছে নয়নে। কিন্তু সাহস করে সম্মুখে বলল না কেউ। প্রেমে পড়লে এমন দিকবিদিক শূন্য হয়ে যায় লোকে এই প্রথম জানল তন্ময়। এখন না পারছে বলতে কিছু আর না পারছে সইতে। নিজেকেই আজকাল ধিক্কার দেয়,” স্যার কেন হলি? অন্য পেশায় যেতে পারলি না। রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা,অটোওয়ালা হলেও তো এতো কষ্ট আজ হতো না। ছাত্রীকে ভালোবাসিস এ’কথা লোকে শুনলে কী বলবে? ছি! ছি! করবে। লোকের কথা বাদ দে। রাই কে কী করে বলবি? রাই।” মনটা ফের ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সে ভালোবেসে রজনীর নাম দিয়েছে রাই। কিছুক্ষণ এই রাই, রাই জপে ফের ভাবে,” এখন তো আমি ওর স্যার নই। তাহলে বাধা কোথায়?” মুচকি হেঁসে পুনরায় ভাবে,” কোনো বাধা নেই। এই বোকা মেয়ে আমার হবে। পৃথিবী সুদ্ধ ভালোবাসা আমি ওর পায়ের কাছে এনে দেব। এই তন্ময় শুধু রাগতে নয় ভালোও বাসতে পারে সেটা দেখাব। আর একটু সবুর করো, রাই। অকারণে যতটা বকেছি তার চেয়ে সহস্র গুন ভালোবাসা দেব তোমাকে। এতো ভালোবাসা যে, তুমি তোমার সারা জীবনের অপূর্ণতা ভুলে যাবে।” তন্ময় ঠোঁট সরু করে লম্বা শ্বাস নিল। ভেতরে ভেতরে প্রবল উত্তেজনা কাজ করছে ভবিষ্যত ভেবে। সাথে কিছুটা শঙ্কাও রয়েছে। কে জানে যদি এই মেয়ে ওকে ফিরিয়ে দেয়। না, না। অধৈর্য হয়ে কিছুই করবে না তন্ময়। যা করবে শান্তিতে,ঠান্ডা মাথায়। এই এক বছরে তো এতোটুকু বুঝেছে রাই’য়ের জীবনে কেউ নেই। কেউ নেই? না, এই তো সে আছে। তার রাই’য়ের মনের গহীনে লুকিয়ে, তবে এবার এই লুকোচুরিতে ক্ষান্ত দেবে। এমন সুযোগ ঈশ্বর বার বার দেয় না। এবার বলতে না পারলে হয়ত কোনোদিনই বলা হবে না আর। অস্থির মনটাকে একটু শান্ত করে অস্ফুটে বলে,” আমাকে তুমি না করতে পারবে না, রাই। হ্যাঁ ভিন্ন কোনো উপায় যে রাখব না আমি।”

চলবে,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here