ভ্যাম্পায়ার_বর পর্ব ১৭+১৮

#ভ্যাম্পায়ার_বর (সিজন ২)
#পার্ট_১৭
#M_Sonali

ভোরবেলা বেশ কিছুক্ষন বৃষ্টি হওয়ার কারণে সকালটা যেন একদম নতুন ও সবুজ হয়ে উঠেছে। গাছের পাতাগুলো সব সবুজ রাঙা। সকালের মিষ্টি রোদ লেগে সব চিকচিক করছে। আবহাওয়াটাও ভীষণ ভালো লাগছে চাঁদনীর কাছে। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশ। এমন একটি পরিবেশে মন ভালো থাকার কথা। কিন্তু তার ঠিক উল্টা হয়েছে। মনটা ভীষন খারাপ চাঁদনীর। কারণ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই ও খেয়াল করছে শ্রাবণী কিছু একটা নিয়ে ভীষণ গোমরা মুখ করে রয়েছে। একদমই কথা বলছে না প্রয়োজনের অতিরিক্ত। এমনকি চাঁদনীর সাথেও তেমন একটা কথা বলছেনা। একপ্রকার এড়িয়ে চলছে তাকে। ওর এমন বিহেভ এর কারন কোন কিছুই জানেনা চাঁদনী। তবে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর মনে মনে।

বেশ অনেক সময় ধরে এভাবে চলার পর আর সহ্য করতে পারলো না চাঁদনী। ওর যেন ভীষন উসখুস লাগছে মনের মাঝে। বারবার মনে হচ্ছে শ্রাবণী হয়তো ওকে বোঝা মনে করছে। আর তাই এমন ভাবে এড়িয়ে চলছে ওকে। কিন্তু এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না। কারণ পৃথিবীতে এখন ওর আপন বলতে কেউ থাকলে শুধুমাত্র এই শ্রাবণীই আছে। যাকে সে রক্তের না হলেও একদম নিজের আপন বোনের মত ভালবেসে ফেলেছে। তাই আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলোনা চাঁদনী। একপ্রকার জোর করেই শ্রাবণীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওর হাতটা দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো,

— আপু কি হয়েছে বলোতো তোমার? তুমি সকাল থেকে কেন এমন আচরণ করছো আমার সাথে? কেন একটা কথাও বলছো না। এভাবে মুখ গোমরা করে আছ কেন? আমি কি কোন ভুল করেছি? যদি কোন ভুল করে থাকি তাহলে আমায় মারো কাটো শাস্তি দাও। কিন্তু দয়া করে এভাবে গোমরা মুখে থাকবে না। তুমি জানো না আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে তোমার সাথে কথা বলতে না পেরে।

এতোটুকু বলে থামল চাঁদনী। ওর কথার উত্তরে ওর দিকে নীরব দৃষ্টি ফেলল শ্রাবণী। তারপর কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে কথার কোন উত্তর না দিয়ে বলল,

— খাবার টেবিলে গিয়ে বসো চাঁদনী। আমি খাবার দিচ্ছি তোমার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

কথাটা বলেই খাবার আনার জন্য রান্নাঘরের দিকে যেতে নিল শ্রাবণী। তখনই ওর হাতটা আরো শক্ত করে ধরে এবার কেঁদেই ফেলল চাঁদনী। তারপর কান্নাজরিত গলায় বলে উঠলো,

— আপু বল কি হয়েছে, তুমি কেন এমন করছ আমার সাথে? কেন এড়িয়ে চলছো আমায়? আমি যদি কোন ভুল করে থাকি সেটা আমাকে বলো, আমাকে বকাবকি করো, মারো, তবু আমি কিছু মনে করব না। কিন্তু দয়া করে এভাবে আমাকে এড়িয়ে চলো না। আমি যে সহ্য করতে পারছি না আপু। পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। এখন আমার আপন বলতেও তুমি আর আমার পর বললেও শুধু তুমি’ই আছো।

ওর কথার উত্তরে শ্রাবণী মৃদু হেসে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর ওর গালে একহাত রেখে কপালে একটি চুমু এঁকে দিয়ে বলল,

— এই পাগলি এত হাইপার হচ্ছ কেন তুমি? তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে! তুমি ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসো আমি তোমার খাবার নিয়ে আসছি। তারপর বলব। আর তোমার উপর আমি কোন ব্যাপারে রেগে নেই। আসলে আমার মন খারাপের অন্য একটা কারণ আছে। তুমি যাও আমি এখুনি আসছি।

কথাটা বলে চাঁদনীর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল শ্রাবণী। চাঁদনী কি করবে বুঝতে পারল না। তাই খাবার টেবিলে এসে চুপচাপ বসে পরলো। আর মনের মধ্যে উত্তেজনা কাজ করতে লাগল, কি বলবে শ্রাবণী ওকে, সেটা শোনার জন্য। বেশ কিছুক্ষন পর খাবার হাতে ওর কাছে এগিয়ে এলো শ্রাবণী। তারপর খাবার সামনে দিয়ে পাশে চেয়ার টেনে বসে পরলো। তারপর মৃদু গলায় বললো,

— খাবারগুলো আগে খেয়ে নাও। তারপর তোমার সাথে কিছু জরুরী কথা আছে আমার। আর টেনশন করবেনা একদম। আমি তোমার উপর কোন কারণে রেগে নেই। কিন্তু তোমার জন্যই আমার মন খারাপ।

শ্রাবনীর কথার অর্থ কি, বুঝতে পারলো না চাঁদনী। তবুও কোন কিছু প্রশ্ন করল না সে। দ্রুত কয়েক লোকমা খাবার মুখে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলল। তারপর শ্রাবণীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,

— বল আপু এখন কি বলবে তুমি আমায়? আমার যে আর তর সইছে না। কেন জানি না ভীষণ উত্তেজনা কাজ করছে মনের মাঝে। আর ভীষণ ভয়ও পাচ্ছি। কেন জানিনা তোমার কথা শুনতে ভীষণ ভয় হচ্ছে, তবুও শোনার জন্য ভীষণ আগ্রহী আমি। বল কি বলতে চাও তুমি আমায়!

— চাঁদনি আমি তোমার ব্যাপারে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। তুমি যদি আমাকে সত্যিই তোমার বড় বোন হিসাবে মানো, তাহলে আশা করি আমার এই সিদ্ধান্তে তুমি রাজি হয়ে যাবে। আর এজন্য তোমাকে আমি আজকের দিনটা সময় দেবো ভাব্বার জন্যে। কারণ আমি তোমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি। আর বিয়েটা অন্য কারো সাথে নয় তোমার অফিসের বস শ্রাবণ চৌধুরীর সাথে।সে কালকেই তোমাকে বিয়ে করতে চায়। আর আমিও চাই কালকে তোমাদের বিয়েটা হোক। কারণ কালকে পূর্ণিমার রাত। তোমার সাথে যা কিছু হতে পারে এই রাতে। তাই আমি আর কোনো রিস্ক নিতে চাই না।

এতোটুকু বলেই থেমে গেল শ্রাবণী। ওর কথা শুনে যেন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো চাঁদনীর। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে। হঠাৎ করে শ্রাবণী এমন একটা প্রস্তাব দিয়ে বসবে সেটা যেন মাথায় আসেনি চাঁদনীর। ভাবতেও পারেনি সে। এত তাড়াতাড়ি এভাবে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলবে, তাও আবার অফিসের বস শ্রাবণের সাথে। যাকে ও সহ্যই করতে পারে না। মনে মনে ভীষণ রাগ হল চাঁদনীর। কিন্তু সেটা উপরে প্রকাশ করল না। তবে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে তখনই ওকে থামিয়ে দিয়ে শ্রাবণী আবারো বলে উঠলো,

— চাঁদনী আমি তোমার কাছে জাস্ট একটা উত্তর শুনতে চাই। আর সেটা হচ্ছে তুমি বিয়েতে রাজি। এছাড়া আমি তোমাকে আর কোন অপশন দিচ্ছি না। তোমাকে আজকে সারাদিন সময় দিচ্ছি। ভেবে দেখার জন্য। তুমি যদি ভেবে দেখো যে আমি যে ডিসিশ নিয়েছি সেটা তোমার জন্য ঠিক আছে। তাহলে তুমি বিয়েতে রাজি হয়ে যাবে। আর সন্ধ্যা বেলা এসে আমাকে জানাবে। আর যদি আমার ডিসিশনটা তুমি না মানতে পারো। তাহলেও আমাকে সন্ধ্যায় জানিয়ে দেবে। আর সেই সাথে কখনোই আমাকে বড় বোন হিসেবে দাবী করবে না। কারণ পর কখনো আপন হয় না। সেটা তুমি আমায় বুঝিয়ে দেবে। আমি তোমার বড় বোন হিসাবে তোমার ভালোর জন্যই ডিসিশনটা নিয়েছি। আর তুমি আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারো। এই বিয়েতে তোমার ভালো হবে। কোন খারাপ কিছু হবে না। তুমি অনেক সুখি হবে শ্রাবণ চৌধুরীর কাছে। এখন বাকিটা তোমার ইচ্ছা।

কথাগুলো বলেই চাঁদনীর উত্তরের কোনো অপেক্ষা না করে সেখান থেকে উঠে দ্রুত সরে পরল শ্রাবণী। চাঁদনী কি করবে কি বলবে কিছুই যেন মাথায় আসছে না ওর।

চুপচাপ কিছুক্ষণ সেখানেই বসে রইলো চাঁদনী। তারপর উঠে নিজের রুমে চলে গেল। মনটা যেন ভীষণ খারাপ লাগছে ওর। কিন্তু কিছুই করার নেই। ও বুঝতে পারছে শ্রাবনী যে ডিসিশনটা নিয়েছে সেটা পর ভালোর জন্য। কিন্তু তবুও ওর মন সায় দিচ্ছে না। ওর বারেবারে মনে হচ্ছে বিয়েটা করা উচিত নয়। হয়তো ও শ্রাবণকে মন থেকে কখনোই নিজের স্বামী হিসেবে মানতে পারবে না। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই অফিসের জন্য রেডি হয়ে গেল চাঁদনী। তারপর বাইরে বের হতেই শ্রাবণী গম্ভির গলায় বলল,

— তোমাকে সাথে নেওয়ার জন্য শ্রাবণ চৌধুরী বাইরে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর সাথে অফিসে চলে যাও। আজকে থেকে তোমার সব দায়িত্ব ওর।

শ্রাবনীর এমন কথায় যেন বেশ অবাক হয়ে গেল চাঁদনী। কেমন যেন শ্রাবণীকে আজকে ভীষণ অচেনা লাগছে ওর কাছে। কারণ কেমন করে যেন কথা বলছে শ্রাবণী ওর সাথে। মনে হচ্ছে ওর শত্রু ও। কখনো নিজের ছোট বোন হিসেবে মানেই নি ওকে। চাঁদনী আর কোন উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে সোজা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। বাইরে বের হতেই দেখলো শ্রাবণ গাড়ি নিয়ে দুই হাত পকেটে গুঁজে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কালো সুট,কালো প্যান্ট, চোখে সানুগ্লাস হাতে দামি ঘড়ি। সব মিলিয়ে ওকে অনেক কিউট লাগছে। কিন্তু সেদিকে এখন চাঁদনীর নজর নেই। সে সোজা গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে সামনের সিটে বসে সিট বেল্ট লাগিয়ে নিল। ওর কার্যক্রমগুলো দাঁড়িয়ে থেকে সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করছে শ্রাবণ। কিন্তু কোন কিছুই বলছে না। কারণ ওর অজানা নয় কোন কিছু। সবকিছুই জানে ও। তাই কোন কথা না বলে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুপচাপ এসে গাড়িতে ড্রাইভিং সিটে বসে পরলো। তারপর গাড়ি চালিয়ে সোজা এসে অফিসের সামনে গাড়ি থামাল। গাড়ি থামতেই, চাঁদনী গাড়ি থেকে নেমে একপ্রকার দৌড়ে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসে পড়ল। খুব বেশি কান্না পাচ্ছে ওর। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছেনা। কেমন যেন নিজেকে বড্ড বেশি একা অনুভব হচ্ছে ওর। বাবা-মা বেঁচে থাকলে হয়তো এমন দিন দেখতে হতো না ওকে। মনে মনে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মা-বাবার জন্যে।

এদিকে চাঁদনী বাসা থেকে বেরিয়ে যেতেই শ্রাবণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,

— সরি চাঁদনী, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও তোমার সাথে এমন বিহেভ করার জন্য। কিন্তু কি করবো বলো, তোমার সাথে যদি এমন আচরণ এখন না করতাম তাহলে তুমি আমার কথায় কখনই রাজি হবে না। কিন্তু এই বিয়েটা যে তোমার জন্য কতটা জরুরী তুমি জানো না। তোমাকে বাঁচাতে হলে এটা করতেই হতো আমাকে। তোমায় এখানে রাখা যে আর মোটেও নিরাপদ নয়। যখন তখন তোমার সাথে যা কিছু হয়ে যেতে পারে। এমন কি সেটা আমার দ্বারা’ই।

কথাগুলো মনে মনে ভেবে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণী। তারপর বাসায় তালা দিয়ে বেরিয়ে কোথায় যেন চলে গেল।

সারাটা দিন মনোযোগ দিয়ে অফিসের কাজ করেছে চাঁদনী। দুপুরবেলা লাঞ্চও করেনি সে। শ্রাবণ অনেক বার কাছে গিয়ে লাঞ্চ করার কথা বলেছে। কিন্তু প্রতিবারই ও শ্রাবণ কে এড়িয়ে গেছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা কথাও বলেনি। শ্রাবণও আজ কেন জানিনা ওকে একটুও বিরক্ত করেনি। বরং ও যেমন বলেছে তেমনি করেছে। শ্রাবণ হয়তো বুঝতে পেরেছে ওর ভীষণ মন খারাপ।

সন্ধ্যায় অফিস টাইম শেষ হতেই শ্রাবণ নিজে এগিয়ে নিয়ে এসে চাঁদনীকে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। চাঁদনী মনে মনে ডিসিশন নিয়ে ফেলেছে ওকে কি করতে হবে। ও বাসার মধ্যে ঢুকতেই দেখতে পেল শ্রাবণী ওর অপেক্ষায় চুপচাপ বসে আছে সোফার উপর। ওকে আসতে দেখেই কাছে এগিয়ে এসে বলল,

— চাঁদনী তুমি কি ডিসিশন নিয়েছো? রাজি তো এই বিয়েতে?

অবাক হলো চাঁদনী। মনে মনে ভাবলো, এত তাড়াহুড়ো আমাকে বাসা থেকে সরানোর জন্য? সত্যিই পর কখনো হয়তো আপন হয় না। তাইতো আজ এমনটা করছে শ্রাবণী ওর সাথে। চাঁদনী নিস্তেজ গলায় বললো,

— আমি এ বিয়েতে রাজি আপু। তোমার যা ভালো মনে হয় তুমি করতে পারো। চাইলে আজকেই আমাকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দিতে পারো।

কথাটা বলে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না চাঁদনী। চোখ দিয়ে যেন এখনই জল গড়িয়ে পড়বে। তাই সেখান থেকে দৌড়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। ওর চোখের জলটা নজর এড়ায়নি শ্রাবনীর। কিন্তু কি আর করার, ওর ভালোর জন্যই তো এই কাজটা করতে হচ্ছে শ্রাবণীকে। কারণ সামনে যে ওর অনেক বড় বিপদ অপেক্ষা করে আছে।
#ভ্যাম্পায়ার_বর (সিজন 2)
#পার্ট_১৮
#M_Sonali

গাছের পাতাগুলো একটুও নড়াচড়া করছে না। সবকিছু যেন নিরব নিস্তব্ধ হয়ে আছে। আকাশটাও ভীষন মেঘলা। একটু পরেই হয়তো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে পড়বে। প্রকৃতির সবকিছুই যেন আজ চাঁদনীর মন খারাপের সাথে মন খারাপ করে আছে। সবারই যেন মুখ গোমরা আজ। চাঁদনী বধু সেজে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এটাকে ঠিক বধূর সাজ বললে ভুল হবে। কারণ বধু সাজে কেউ কখনো কালো রংয়ের লেহেঙ্গা পরে না। যেমনটা আজ চাঁদনী পরেছে। কালো কুচকুচে রঙের একটি লেহেঙ্গা পরে বউ সেজে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে চাঁদনী। চোখ দিয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ছে তার অশ্রুধারা। কোনভাবেই যেন মনটাকে শান্ত করতে পারছেনা সে। হঠাৎ তার সাথে কি সব ঘটে যাচ্ছে সবকিছুই যেন ভীষন ভাবে কষ্ট দিচ্ছে তাকে। কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে সে এই বিয়েটা তে একদমই রাজী না। তার মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়েটা করতে হচ্ছে তাকে। কিন্তু কি আর করার এছাড়া তার কোনো উপায়ও নেই। ওর যে আপন বলতে কেউ নেই এ পৃথিবীতে। একমাত্র আপন যাকে ভেবে ছিল সেই যখন ওর বিয়েটা এভাবেই দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানেতো চাঁদনীর করার কিছুই থাকতে পারে না। ওর মন থেকে রাজি না হলেও বিয়েটা যে তাকে করতেই হবে।

এখন ঘড়িতে বিকেল ৪.০৫ মিনিট বাজে
চাঁদনী কিছুতেই বুঝতে পারছেনা শ্রাবণী কেন ওকে এত তাড়া দিচ্ছে বিয়েটা এখনই করার জন্য। যেন সন্ধ্যা হতেই অনেক বড় কিছু হয়ে যাবে ওদের সাথে। শ্রাবণী একপ্রকার জোর করেই বিয়ের জন্য রেডি করিয়েছে চাঁদনীকে। তার একটাই কথা যেভাবেই হোক সন্ধ্যার আগে বিয়েটা কমপ্লিট করে শ্রাবণের সাথে এ বাসা থেকে চলে যেতে হবে চাঁদনীকে। কেন এমনটা করছে শ্রাবণী ওর সাথে? এমন ভাব করছে যেন এখানে থাকলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে শ্রাবনীর। এসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই নেই চাঁদনীর কাছে। সে যেন এক প্লাস্টিকের পুতুল। যাকে যেভাবে খুশি নাচাচ্ছে শ্রাবণী। সে চাইলেও কিছু করতে পারছে না। এসব কথা ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল চাঁদনী। তারপর চোখের জলটা মুছে জানালার পাশ থেকে সরে এল রুমের মাঝে। তখনই শ্রাবণী হুরমুর করে ওর রুমে প্রবেশ করল। তারপর ওর কাছে এগিয়ে এসে বলল,

— চাঁদনী কাজী সাহেব এসে গেছে। এখন দ্রুত বিয়েটা করে এখান থেকে চলে যাও। শ্রাবণের সাথে ওর বাড়িতে।

শ্রাবণীর মুখে এমন একটা কথা যেন মোটেও আশা করেনি চাঁদনী। সে ভ্রু কুঁচকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শ্রাবণীর দিকে। যে মেয়েটা কিছুদিন আগেও চাঁদনীকে নিজের বোনের চাইতে বেশি ভালবাসতো। সব কিছুর থেকে আগলে রাখতো। সেই মেয়েটাই আজকে এমন আচরণ করছে যেন তার বাসায় থাকলে তার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। এমনকি চাঁদনীকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দিতে পারলেই যেন তার শান্তি। চাঁদনী খুব কষ্ট করে মুখে হালকা মুচকি হাসলো। তারপর শান্ত গলায় বললো,

— আমি রেডি আছি আপু। তুমি কাজী সাহেব কে ডাকো।

ওর কথায় মুচকি হাসল শ্রাবণী। চাঁদনীর এমন কথায় যেনো দেহে প্রান ফিরে পেলো সে। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে কাজী সাহেব কে সাথে করে নিয়ে আবার ফিরে আসলো। কাজী সাহেব এসে বিয়ে পড়ানো শুরু করলো। চাঁদনীকে কবুল বলতে বললে! ও বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের চোখের জল আড়ালে বিশর্জন দিলো। তারপর শ্রাবণী কবুল বলার জন্যে তারা দিলে, ও মৃদু স্বরে তিন বার কবুল বললো। ও কবুল বলাতে যেন অনেক বড় চাপ থেকে বাঁচল শ্রাবণী। এতক্ষণ যেন নিশ্বাস বন্ধ করেছিল সে। কখন চাঁদনী কবুল বলবে সেই অপেক্ষায়। ওর এমন ভাব দেখে চাঁদনী মনে মনে ভাবতে লাগল, হয়তো শ্রাবণ অনেক টাকার বিনিময়ে তাকে কিনে নিচ্ছে শ্রাবণীর থেকে। তাই হয়তো শ্রাবণী এভাবে ওকে পাঠিয়ে দিচ্ছে শ্রাবণের সাথে। মনে মনে ভাবল সে যে কারণেই হয়ে থাকুক না কেন, শ্রাবণী ওকে নিজের কাছে জায়গা না দিলে তো ওর থাকার কোন জায়গা ছিল না। না হয় তার ঋণ শোধ করার জন্য সে তার কথায় শ্রাবণকে বিয়ে করে নিল।

কথাগুলো ভেবে চোখের জল ফেলতে লাগল চাঁদনী। সেদিকে খেয়াল না করে তখনই কাজী সাহেব কে নিয়ে দ্রুত রুম ত্যাগ করলো শ্রাবনী।

প্রায় দেরঘন্টা পর ফিরে এলো শ্রাবণী, শ্রাবণ কে সাথে নিয়ে। শ্রাবণ কালো রঙের একটা শেরওয়ানি পড়েছে।মাথায় কালো রঙের পাগড়ী। হাতে কালো রঙের ঘড়ি। আর পায়ে কালো সু। একদম যেন কালো রাজকুমার লাগছে তাকে। একনজর ওর দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল চাঁদনী। এখন কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না তার। সবাইকে যেন বিষের মত লাগছে তার চোখে। মনের মাঝে বিষন্নতা ছেয়ে আছে সারাক্ষণ। চোখের পানি টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে অঝোর ধারায়।

শ্রাবণী এসে চাঁদনীর পাশে বসলো। তারপর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

— কান্না করো না চাঁদনী, আমি জানি তুমি আমার উপর ভীষণ রেগে আছো। হয়তো আমাকে ভুলও বুঝছো এই মুহূর্তে। কিন্তু যখন সময় আসবে, যখন সবকিছু ঠিকঠিক জানতে পারবে। তখন বুঝতে পারবে আজকে তোমাকে এভাবে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কারণ। আমি যে নিরুপায়, প্লিজ তুমি এভাবে কান্না করো না। আমি যা করছি তোমার ভালোর জন্যই করছি। তুমি আর এখানে মোটেও সুরক্ষিত নয়। তুমি শ্রাবণের কাছেই ভালো থাকবে। আর শ্রাবণের উপর আমার পুরো বিশ্বাস আছে।

কথাগুলো বলতেই চাঁদনী কান্না করতে করতে শ্রাবণীকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। শ্রাবণীও ওকে জড়িয়ে ধরল। এদিকে সূর্য প্রায় ডুবুডুবু করছে পশ্চিম আকাশে। আর কিছুক্ষণ এর মাঝেই যেন বেলা ডুবে যাবে। হঠাৎ চাঁদনীকে জড়িয়ে ধরে থাকতে থাকতেই শ্রাবনীর চোখ দুটো গাঢ় নীল হতে শুরু করলো। শ্রাবণী চাঁদনীকে হালকা করে ছেড়ে দিয়ে ওর গলার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ওর যেন মনে হচ্ছে এখনই নিজের সরু দাঁত দুটো চাঁদনীর গলায় বসিয়ে দিয়ে জোকের মত রক্ত চুষে খাবে সে। ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ করে শ্রাবণীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো সরু লম্বা দুটো ধারালো দাত। তখনই শ্রাবণ চাঁদনীর হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে ওকে দাড় করিয়ে নিজের পাশে নিয়ে এলো। তারপর শ্রাবণীকে জোরে ধাক্কা দিয়ে বলল,

— আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি চাঁদকে নিয়ে আমার বাসায় যাচ্ছি।

শ্রাবণের ধাক্কা খেয়ে যেন হুশ ফিরলো শ্রাবণীর। আবারও স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসলো সে। তারপর অন্য দিকে তাকিয়ে থেকেই গম্ভীর গলায় বলল,

— যাও তাড়াতাড়ি এখান থেকে চাঁদনী কে নিয়ে চলে যাও। আমি চাঁদনীকে আর এখানে দেখতে চাচ্ছি না।

হঠাৎ শ্রাবণীর এমন কথায় যেন অবাক হয়ে গেল চাঁদনী। অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। তখনই চাঁদনীর হাত ধরে টান দিয়ে নিয়ে যেতে চাইলো শ্রাবণ। কিন্তু ও সেখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। সে যেতে নারাজ শ্রাবণের সাথে।তার ইচ্ছে করছে না এখান থেকে ওর সাথে যাওয়ার জন্য। ওকে কোনভাবেই টেনে নিয়ে যেতে না পেরে দ্রুত কোলে তুলে নিল শ্রাবন। হঠাৎ ওর এমন করাতে যেন আকাশ থেকে পড়লো চাঁদনী। কিন্তু ও শ্রাবণকে কিছু বলবে তার আগেই ওকে নিয়ে একপ্রকার দৌড় দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল শ্রাবণ। তারপর দ্রুত গাড়ির কাছে এগিয়ে যেতে লাগলো। এতে চাঁদনী ভীষণ রেগে গিয়ে শ্রাবণের বুকে কিল ঘুষি মারতে মারতে বলতে লাগল,

— কি করছেন কি আপনি! নামান আমাকে আমি আপনার সাথে যাব না। আমি আপুর সাথে কিছু কথা বলতে চাই। আপুর সাথে আমার দরকার আছে। আমায় পরে নিয়ে যাবেন। আমাকে নামান বলছি। নইলে আজকে আপনাকে মেরে ফেলবো। নামান বলছি, এভাবে জোর করে একদম আমাকে নিয়ে যেতে পারবেন না আপনি।

ওর কথা শুনতে শুনতেই গাড়ির কাছে পৌঁছে গেল শ্রাবন। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত গম্ভির গলায় বলল,

— আর একটা যদি কথা বলেছ তাহলে উপর থেকে এমন ভাবে ফেলে দেবো যে, কোমরের হাড্ডি এমনভাবে ভেঙে যাবে যে সারাজীবন আমার কোলে চড়ে ঘুরতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হবে না তোমার। তাই বলছি চুপচাপ থাকো। এখন তোমার আপুর সাথে কোন কথা বলতে হবে না। পরে যখন প্রয়োজন হয় আমি তোমাকে নিয়ে আসব। সূর্য ডুবতে চললো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের বাসায় যেতে হবে।

কথাটা বলেই গাড়ির দরজা খুলে চাঁদনীকে গাড়ির মধ্যে বসিয়ে দিলে শ্রাবণ। তারপর নিজে দ্রত গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। কাজগুলোর এত দ্রুত করলো যে চাঁদনী যেনো নিঃশ্বাস ফেলার সময়ও পেল না।

গাড়ি নিয়ে বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর’ই শ্রাবণ বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেল সূর্য ডুবে যেতে আর বেশিক্ষণ দেরী নেই। হয়ত এখনই ডুবে যাবে সূর্যটা। শ্রাবণ কিছু একটা ভাবল। তারপর গাড়িটা সেখানেই ব্রেক করলো। চাঁদনী তখন থেকে কান্না করেই চলেছে। গাড়ি ব্রেক করতে দেখে আর চোখে শ্রাবণের দিকে তাকাল সে। শ্রাবণ এই সুযোগটা নষ্ট না করে দ্রুত এসে চাঁদনীকে জড়িয়ে ধরল। এতে অবাক ও বিরক্ত হয়ে চাঁদনী কিছু বলবে তার আগেই নিজের গলায় সুচ ফোটার মতো কিছু একটা অনুভব করল। আর সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে গেল সে।

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

গতকালকে গল্প দিতে পারিনি সে জন্য আমি অনেক দুঃখিত। আসলে কালকে অনেক বেশি ব্যস্ত ছিলাম তাই গল্প লেখার সময় পাইনি। আজকের পর্বটা কেমন লাগলো জানাবেন সবাই। ধন্যবাদ সবাইকে
চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

সবাইকে চাঁদনী আর শ্রাবণের বিয়ের দাওয়াত রইলো। আইসক্রিম নিয়ে বিয়ে খেতে এসো সবাই। অনেকদিন হলো আইসক্রিম খাই না। সবাই বেশি বেশি আইসক্রিম নিয়ে আসবা কেমন! ধন্যবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here