মনমোহিণী পর্ব -০২+৩

#মনমোহিণী
#Part_02_03
#Writer_NOVA

সেভেন আপের বোতলে চুমুক দিতে দিতে আশেপাশে তাকাচ্ছি। যে যার যার মতো ব্যস্ত। এতো মানুষের ভিড়ে নিজেকে অসহায় বাচ্চা মনে হচ্ছে। যদিও আমি উঠানের এক কোণায় চেয়ার পেতে বসে আছি।তন্বী গিয়েছে রায়হান ভাইয়ার বউয়ের সাথে ছবি তুলতে। আইরিন ভাবী দেখতে বেশ মিষ্টি। বেচারী ছবি তুলতে হয়রান হয়ে গেছে তবুও মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে তায়াং ভাইয়াকে খুঁজলাম। নজরে এলো না। এখানে আসার পর এনাজকেও মাত্র একবার দেখেছি। বন্ধুর বিয়েতে কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে নাকি! কত কাজ তাদের। তন্বী একবার ঘরের ভেতর থেকে হাত নাড়িয়ে বললো,

‘নোভাপু এদিকে আসো।’

‘নাহ, এখানে ঠিক আছি।’

‘আচ্ছা, তাহলে এখানেই থেকো।’

নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে তন্বী অনেক পটু। কিন্তু আমি একটু গুটানো স্বভাবের। কারো সাথে সহজে মিশি না। তবে একবার মিশে গেলে তাকে পাগল করতেও খুব বেশি সময় লাগে না।

‘একলা বইসা রইছো কেন? কেউ আসে নাই লগে?’

ভারী কন্ঠের শব্দ পেয়ে পাশে তাকালাম। এক মধ্য বয়স্ক মহিলা আমার বরাবরি চেয়ার টেনে বসে কথাগুলো একদমে জিজ্ঞেস করলেন। মুখে ভারী মেকআপ চকচক করছে। ঠোঁটে মাত্রাতিরিক্ত ম্যাট লিপস্টিক লাগানোয় তাতে ফাটল ধরে গেছে।পরনে গর্জিয়াস থ্রি পিস। তার ড্রেসের সাথে সাজটা বড্ড বেমানান লাগছে। আমি সৌজন্য মূলক হাসি দিয়ে বললাম,

‘এমনি!’

‘নাম কি গো তোমার?’

‘জ্বি, নোভা।’

‘শুধু নোভা? লগে কিছু নাই?’

‘নোভা ইসলাম।’

‘তুমি কি মাইয়ার বাড়ির লোক?’

‘না আন্টি!’

‘তাহলে?’

‘বরপক্ষের।’

‘রায়হান কি হয় তোমার?’

বিরক্তিতে মুখ লুকিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লাম। এই আন্টি সমাজ আমার কাছে বিশাল বিরক্তির কারণ। পেটের নাড়িভুড়ি বের না করা অব্দি এদের শান্তি নেই। এতো কথা বলতে পারে যে আপনার কানের পর্দা ফাটিয়ে ফেলার মতো দুরবস্থা করবে। আর কথা এতো পরিমাণে পেঁচাতে পারে যে গল্মলতাকে বলবে দূরে থাক তুই। এর জন্য এদের থেকে দশ হাত দূরে থাকি আমি।

‘কি গো কি জিগাইলাম?’

‘জ্বি আন্টি বলেন।’

‘রায়হান কি হয় তোমার?’

‘ভাইয়ার বন্ধু।’

‘ওহ আচ্ছা।’

উনি চুপ হয়ে গেলেন।মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ পরেছিলাম এবার বোধহয় একটু বাঁচা যাবে।কিন্তু আমার ভাবনায় এক বালতি পানি ঢেলে উনি ফের কথা বলে উঠলেন।

‘বিয়ে হইছে তোমার?’

সবেমাত্র সেভেন আপের বোতলে একটা চুমুক দিয়েছিলাম, উনার কথা শুনে হকচকিয়ে গেলাম। ভাগ্যিস মুখ থেকে ছিটকে পরেনি।দ্রুত ঢোক গিলে তার মুখপানে তাকালাম। উনি উৎসুক চোখে আমার উত্তরের আশায় আছেন। আমার মাথায় দুষ্টবুদ্ধি উদয় হলো। মুখটা লাজুক রাঙা করে উত্তর দিলাম,

‘জ্বি আন্টি।’

‘বলো কি? তোমায় দেখে তো মনে হয় না!’

উনি আৎকে উঠলেন। আমি মনে মনে হেসে তাকে বললাম,

‘হ্যাঁ, সবাই বলে। আমার বাবুর আব্বু তো মাঝে মাঝে বলবে, তোমার যে দুটো বাচ্চা আছে তা তোমায় দেখে বোঝা যায় না। মনে হয় অবিবাহিত মেয়ে।’

‘তোমার দুটো বাচ্চাও আছে?’

চোখ দুটো কপালে উঠিয়ে একপ্রকার চেচিয়ে উঠলো। আমার পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে। যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে স্বাভাবিক ভাবে মাথা নাড়িয়ে বুঝালাম হ্যাঁ।

‘তোমার বাচ্চারা কোথায়? নিয়ে আসোনি?’

‘ওর আব্বুর কাছে।’

মনে মনে বললাম, ভুল কিছু তো বলিনি। আমার জামাই জীবনে এলে না বাচ্চাকাচ্চা আসবে।তাহলে তো ওরা ওর আব্বুর কাছেই। কিন্তু এরপর পরলাম বিপাকে। মহিলা জেদ ধরে বসলো আমার হাসবেন্ডকে দেখবে। মরি জ্বালা! এখন আমি জামাই পাবো কোথায়? কত কি ভুজুংভাজুং দিলাম। কিন্তু মহিলা নাছোড়বান্দা! আমার জামাই দেখেই ছাড়বে। এখন কি আমি জামাই অনলাইন থেকে অর্ডার দিবো নাকি? চোখ দুটো পিটপিট করে আন্টিকে বললাম,

‘আন্টি, আমার জামাইকে আরেকদিন দেখাবোনি? ও এখন কোথায় আছে আমি তো বলতে পারছি না।’

‘না না তা হবে না। আবার দেখা হয় কিনা তাতো জানি না। মরেও তো যেতে পারি। তুমি ওকে কল দাও।’

আমার এখন হাত-পা ছুঁড়ে কান্না করতে মন চাইছে। কি দরকার ছিলো আগ বাড়িয়ে বলার আমার যে বিয়ে হয়েছে। এখন আমি জামাই, বাচ্চা পাবো কোথায়? মনে মনে নিজেকে ইচ্ছে মতো গালি দিলাম। নিজের ফাঁদে নিজেই পরছি।আল্লাহ বাঁচাও আমারে।ততক্ষণাৎ এনাজকে দেখতে পেলাম। কোলে বছর তিনকের এক বাচ্চা মেয়ে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। আন্টিকে হাত দিয়ে ইশারা করে এনাজকে দেখিয়ে বললাম,

‘ঐ তো আমার স্বামী আর বাচ্চা। আপনি দাঁড়ান আমি আমার মেয়েটাকে নিয়ে আসি।’

উনার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত গতিতে এনাজের সামনে চলে গেলাম।এনাজ দুজন লোকের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো। আমি পেছন থেকে ডাকলাম,

‘শুনুন।’

‘জ্বি।’

‘বাবুটাকে একটু দিবেন?’

এনাজের সম্মতির আগেই আমি ছোঁ মেরে পিচ্চি মেয়েটাকে কেলে তুলে নিলাম। বাবুটা অপরিচিত মানুষ দেখে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো।সেদিকে তোয়াক্কা না করে দ্রুত পায়ে মহিলার দিকে আগাতে লাগলাম। পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম এনাজ অবাক হয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।

‘তায়াং ভাইয়া বাসায় যাবা না?’

তায়াং ভাইয়া এক পলক আমার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘বন্ধুকে বিদায় না দিয়ে কি করে যাই?’

‘তাহলে আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও।’

তন্বী বললো। দুপর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। এখানে আর ভালো লাগছে না। এদিকে তায়াং ভাইয়াও বন্ধুকে বিদায় না দিয়ে যেতে ইচ্ছুক নয়। আমি আর তন্বী কখন থেকে ঘ্যান ঘ্যান করছি গাড়ি করে দাও আমরা চলে যাবো। ভাইয়া আমাদের একা ছাড়তেও নারাজ। কি একটা অবস্থা! বিরক্ত লাগছে সবকিছু।

‘বন্ধুদের মধ্যে সর্বপ্রথম রায়হান বিয়ে করলো। এখন ওকে বিদায় না দিয়ে যাই কি করে?’

আমি ও তন্বী একে অপরের দিকে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে রইলাম। ভাইয়ার এক বন্ধু ভাইয়াকে ডাকতেই ভাইয়া বেরিয়ে গেলো। এনাজের সাথে এরপর আর দেখা হয়নি। বাচ্চাটাকে তায়াং ভাইয়ার কোলে দিয়ে এনাজের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। কে জানে কার বাচ্চা! মহিলাকে অবশ্য পরে সব সত্যি বলে দিছি। উনি মুচকি হেসে বলছিলো, সে নাকি সব আগেই ধরতে পেরেছে। তাই আমার স্বামী, বাচ্চাকে দেখতে চেয়েছে। কি এক বিতিকিচ্ছিরি পরিস্থিতি। আমার কাজের জন্য তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। নিজেকে নিজে ইচ্ছে মতো বকেছি। কি দরকার ছিলো এসবের।

‘আন্তি নাও এতা তোমার?’

বছর পাঁচেকের এক মেয়ে আমার দিকে লাল গোলাপ এগিয়ে দিলো। আমি বিস্মিত চোখে একবার তন্বীর দিকে তাকালাম। কিন্তু তন্বীর রেসপন্স নেই। ও তো মোবাইলে ডুবে আছে। আমি হাঁটু মুড়ে বসে ওর গাল দুটে টেনে বললাম,

‘কে দিয়েছে এটা?’

‘আমি বলতে পারবো না। এক আন্তেল বললো তোমায় এটা দিতে।’

‘কোন আঙ্কেল?’

‘বলা যাবে না সিতরেত(সিক্রেট)।’

ভ্রু কুঁচকে এলো। কে আবার আমাকে ফুল পাঠাবে?মেয়েটা অধৈর্য্য হয়ে বললো,

‘নাও ধরো।’

আমি ফুলটা হাতে নিয়ে ওর গালে একটা চুমু দিয়ে বললাম,

‘ভালোবাসা নিও।’

তন্বী আমার কথার মাঝে ফট করে বলে উঠলো,
‘ভালোবাসা কিভাবে নিবে?’

চোখ ছোট ছোট করে বললাম,
‘বোইন তুই একটা গামলা আন আমি ভালোবাসা ছুইড়া মাইরা দেখাইতাছি ভালোবাসা কেমনে নেয়। শক্তপোক্ত আনিস। নয়তো ভালোবাসার ভারে ভাইঙ্গা যাইবো।’

তন্বী মুখ বাঁকিয়ে বললো,
‘তুমি ভালো হলে না।’

ওর কথা শুনে আমি ফিক করে হেসে উঠলাম। বাচ্চা মেয়েটা আমাদের কথার মাঝখানে চলে গেছে। কিছু সময় পর তায়াং ভাইয়া এসে বললো,

‘আয় আমার সাথে?’

‘কোথায়?’

ভাইয়া আমার কথার উত্তর দিলো না। আমরা চুপচাপ তার পিছু অনুসরণ করতে লাগলাম। কতগুলো ছেলের ভিড়ের সামনে এসে থামলো। আমি নিজেকে আবার গুটিয়ে নিলাম। জড়তা নিয়ে ভাইয়ার দিকে তাকালাম। তায়াং ভাইয়া সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,

‘এই হলো আমার খালাতো বোন নোভা। আর আমার বোন তন্বীকে তো চিনিসই।’

থেমে আমার দিকে ফিরে বললো,
‘নোভা এ হলো আমার বন্ধু এনাজ, শাহেদ, নতুন বর রায়হান, ইমরান, মাহমুদ, রিমন।’

ভাইয়া একে একে সবার সাথে পরিচয় করে দিলো। আমি এদের নাম আগের থেকে জানতাম। তন্বী, তায়াং ভাইয়ার মুখে এদের নাম অনেক শুনেছি। কিন্তু আগে কখনো দেখিনি। ইমরান, শাহেদ, এনাজ, রায়হান, তায়াং ভাইয়া এই পাঁচ জন হলো জানে জিগার দোস্ত।আমি মুখে প্লাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে সবার দিকে তাকালাম। এনাজের দিকে তাকাতেই দেখি সে এক ভ্রু উঁচু করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেললাম। তার তাকানোর কারণ খুঁজে পেলাম না। আর খুজতেও গেলাম না। ইমরান ভাইয়া জিজ্ঞেস করলো,

‘কোন ইয়ারে উঠবে এবার?’

‘ফাইনাল ইয়ারে।’

শাহেদ ভাইয়া বললো,
‘তুমি কি ভয় পাচ্ছো নাকি?’

আমি মাথা নাড়িয়ে না বুঝালাম। রায়হান ভাইয়া আশ্বস্ত গলায় বললো,

‘ভয় পেয়ো না। আমরা তোমার ভাইয়ের মতোই।’

এনাজ এক হাত উঁচিয়ে বললো,
‘আমি না।’

সবাই চমকে একসাথে এনাজের দিকে তাকালো। এনাজ ভাবলেশহীন ভাবে আগের মতো তাকিয়ে আছে। সব বন্ধু সমস্বরে জিজ্ঞেস করলো,

‘মানে?’

এনাজ দুই হাত বুকে গুঁজে বললো,
‘মানেটা ওকেই জিজ্ঞেস কর।’

আমি ভ্যবলাকান্ত চেহারায় প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকাচ্ছি। কি উত্তর দিবো আমি তাতো বুঝতে পারছি না। তায়াং ভাইয়া বললো,

‘আমি কাহিনি বুঝলাম না।’

শাহেদ ভাইয়া বললো,
‘আমিও না।’

এনাজ পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে ভাইয়াকে বললো,

‘তোর বোন এক মহিলাকে আমাকে দেখিয়ে কি বলেছে তা জিজ্ঞেস করে দেখ।তাহলে কাহিনি বুঝবি।’

আমার মাথায় শুকনা ঠাডা পরলো। এই কাহিনি এই বেডায় জানলো কি করে?সবাই এবার এনাজকে ছেড়ে আমার দিকে তাকালো।আর আমি! আমি তো এখন পারলে মাটির ভেতর ঢুকে পরি। আমার রিয়েকশন এখন,’ছাইড়া দে বাপ, কাইন্দা বাঁচি!’

বেশি পাকনামির ফল। লও এবার ঠেলা সামলাও।

#চলবে

#মনমোহিণী
#Part_03
#Writer_NOVA

সকাল সকাল উঠে পরেছি আজ। নিজের কাজে নিজেই অবাক৷ যেখানে সকাল দশটা বাজে আমাকে ডেকে উঠাতে পারে না। সেখানে আমি সকাল সাতটা বাজে ঘুম থেকে উঠে পরেছি।নিজের কাধে হাত দিয়ে বাহবা দিয়ে বললাম, হাউ, গুড গার্ল আই এম! ব্রাশ হাতে দাঁত মাজতে মাজতে বাড়ির আনাচে কানাচে হাঁটছি। তন্বী কুম্ভকর্ণের মতো পরে পরে ঘুমাচ্ছে। খালামণিকে দেখলাম রান্নাঘরে রুটি বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

দূরের ক্ষেতে কৃষকের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে।বাড়ির পাশেই ফসলি ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় শস্য শ্যামল জমির দেখা মিলে।গাছের ডালে বসে শালিক কিচিরমিচির করছে। গ্রাম এলাকা ছাড়া আজকাল শহরে পাখিদের তো দেখাই যায় না।আমি এখন আছি তায়াং ভাইয়াদের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে।মাদারীপুর পদ্মা বিধৌত নিম্ন পলল ভূমি এলাকা। এর ভু-ভাগ বেলে দোআঁশ মাটি দ্বারা গঠিত। এটি একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল।চারটি উপজেলা নিয়ে গঠিত মাদারীপুর জেলাটির জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। যা মোট আয়ের ৫২%। এ অঞ্চল মূলত খেজুর রস ও খেজুর গুড়ের জন্য বাংলাদেশে বিখ্যাত। এছাড়াও এখানে নারিকেল, সুপারি, পাট, সরিষা, ডাল এবং গম বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। রবি ও খরিফ ফসল হিসেবে চীনাবাদাম চাষ হয়।

পুকুর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে তিনটা খেজুর গাছ।সেদিকে তাকিয়ে পাড়ের মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আফসোস করতে লাগলাম। কেনো শীতের দিনে আসলাম না। শীতের সময় এলে খেজুরের রস খেতে পারতাম। গাছ থেকে নামানো ঠান্ডা কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার স্বাদই অন্য রকম। একেবারে মনে হয় অমৃত। আর খালামণির হাতের কাঁচা রসের পায়েসের তো জুড়ি নেই। মনোযোগ সহকারে দাঁত মাজতে মাজতে খেজুর গাছ দেখতে লাগলাম।

‘এতো ঘষলে তো দাঁত ক্ষয় হয়ে যাবে।’

‘আল্লাহ গো! কে?’

চিৎকার দিয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেলাম। কানের কাছে হঠাৎ কারো কন্ঠস্বর পেয়ে আমি সত্যি ভয় পেয়ে গেছি৷ একদলা থুথু মাটিতে ফেলে চোখ বড় করে পাশ তাকিয়ে আরেকদফা অবাক। এনাজ মুখ টিপে হাসছে। আহা, ফের এই লোক! ইনিয়ে বিনিয়ে নানা কথা বলে গতকাল কোনরকম বাঁচতে পেরেছি। কানে ধরেছিলাম জীবনে এই লোকের সম্মুখীন হবো না।কিন্তু ঘুরেফিরে উনি আমার সামনে কেন পরেন?

‘এভাবে কেউ কথা বলে?’

‘কেন কি হইছে?’

‘দেখেন না ভয় পেয়ে গেছি।’

চোখ নাচিয়ে এনাজ ফের হেসে উঠলো। হঠাৎ খেয়াল হলো স্বপ্ন-টপ্ন দেখছি না তো? এই লোক এখানে কি করে এলো? রাতে ঘুমানোর আগেও তো বাসায় ভাইয়ার কোন বন্ধু ছিলো না।

‘তায়াং এর থেকে শুনছিলাম তুমি নাকি কাউকে ভয় পাও না।’

নিজেকে স্বাভাবিক করে জোর গলায় বললাম,
‘জ্বি ঠিকই শুনেছেন।পথ ছাড়েন বাসায় যাবো।’

‘যাক বাবা, আমি আবার পথ কখন আটকালাম?’

‘তারখাম্বার মতো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকলে আমি যাবো কোথা দিয়ে?’

‘এতো মোটা তুমি? সারা রাস্তা লাগে?’

ভ্রু নাচিয়ে কৌতুকের স্বরে এনাজ বললো। আমি ব্রাশটা ডান হাত থেকে বাম হাতে নিয়ে তর্জনী আঙুল উঠিয়ে শাসিয়ে বললাম,

‘বেশি হচ্ছে কিন্তু!’

এনাজ ভয় পাওয়ার ভান করে দুই হাত নাড়িয়ে বললো,

‘ওরি বাবা, ভয় পাইছি।’

তার রিয়েকশন দেখে আমি মুখ লুকিয়ে হাসতে হাসতে সাইড কাটিয়ে চলে এলাম। এর থেকে আমার দূরে থাকাই মঙ্গল। গতকাল বিকেলের কথা ভুলিনি আমি। অল্পের জন্য নাকানিচুবানি খাইনি।

পুকুর ঘাট থেকে মুখ ধুয়ে উপরে উঠতে নিলেই এনাজ ‘ভাউ’ বলে চেচিয়ে উঠলো। আচমকা এমন হওয়ায় এবারও ভয় পেয়ে গেছি। টাল সামলাতে না পেরে পা পিছলে পরে যেতে যেতে পাশের এক ছোট আমগাছ ধরে বেঁচে গেলাম। এনাজ তার হাত বারিয়ে দিয়েছিলো কিন্তু আমি তার হাত ধরিনি। আমি আবার যারতার হাত ধরি না, হুহ! চোখ লাল করে তার দিকে তাকালাম। উনি হু হা করে হাসতে হাসতে আমাকে বললো,

‘তুমি নাকি কাউকে ভয় পাও না? এই ভয় না পাওয়ার উদাহরণ?’

এই লোকটার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে আমার মান-ইজ্জ্বত ফালুদা হয়ে যাচ্ছে। মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে সেখান থেকে চলে এলাম।আসার আগে বললাম,

‘সাবধানে হাসেন। নয়তো লুঙ্গি খুলে যাবে।’

‘খালামণি, এই লোক এখানে কেন?’

‘কার কথা বলছিস?’

তাওয়ায় রুটি সেকতে দিয়ে খালামণি আমার দিকে তাকালো। আমি তার পাশে পিঁড়ি টেনে বসে পরলাম। হাত দিয়ে মাটির চুলোর ভেতরে লাড়কি ঠেলে দিয়ে বললাম,

‘তোমার ছেলের বন্ধু।’

‘এনাজের কথা বলছিস?’

‘হুম!’

‘রাতে এসেছে।’

‘কখন?’

‘তোরা ঘুমিয়ে পরার পর।’

‘কখন যাবে?’

‘কেমন কথা এগুলা?’

‘বন্ধুর বাড়িতে এতো থাকে নাকি মানুষ?’

‘শুনো বেআক্কল মেয়ের কথা। ছেলেগুলো এমনি আসে না। প্রায় দুই বছর পর এসেছে। দুদিন থাকতে না দিয়ে যেতে দিবো নাকি?’

‘ওহ, এখন কি জামাই আদর করবা নাকি?’

‘তোর হয়েছে কি বল তো? হঠাৎ ওদের ওপর চেতলি কেন?’

‘কিছু হয়নি। তুমি বরং তন্বীকে বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই রেখে দাও।’

‘এই কি হয়েছে তোর বলতো? এমন কথা বলছিস কেন?’

‘কিছুই হয়নি। নাও তুমি কাজ করো। রুটি বেলে দাও আমি সেকে দিচ্ছি।’

খালামণি রুটি বেলতে মনোযোগ দিলো। আমি ওড়নাটা কোমড়ে বেঁধে রুটি সেঁকতে লেগে পরলাম।

‘এই নোভা এক কাজ করতো তুই।’

‘হুম বলো।’

‘গরম গরম রুটিগুলো ওদের দিয়ে আয়। কড়াইতে আলু ভাজি আছে। সেগুলোও দিস।’

‘আমি পারবো না। তুমি দিয়ে আসো।’

‘হাতের কাজ ফেলে যাই কি করে?’

‘তুমি তোমার ছেলেদের আদরযত্ন করো। আমি এদিক সামলাচ্ছি।’

চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললাম। আমি এনাজের সামনে কিছুতেই যাবো না। আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করা! এর উসুল আমি খুব শীঘ্রই উঠাবো। খালামণি জোড়াজুড়ি করেও আমাকে উঠাতে পারলো না। তাই বাধ্য হয়ে উনি চলে গেলেন।

দুই হাতে দ্রুত গতিতে রুটি বেলছি। কতগুলো রুটি বানালাম। আরো বাকি আছে। রাক্ষসগুলা না জানি কতগুলো রুটি খায়। বিরবির করে এনাজকে একগাদা বকে নিলাম। মাঝে মাঝে রুটি উল্টে দিচ্ছি।কিছু সময় পর এনাজ এসে রান্নাঘরের বাইরে মোড়া পেতে বসলো। আড়চোখে একবার তার দিকে তাকিয়ে নিজের কাজে মন দিলাম। এমন ভান ধরেছি তাকে আমি দেখতে পাইনি।

‘তুমি কি রুটি বেলছো নাকি মসলা বাটছো?’

কপাল কুঁচকে তার দিকে এক পলক নজর দিয়ে আমার কাজ আমি করতে থাকলাম।আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করছে কেন? কাহিনি কি? এনাজ আমার উত্তর না পেয়ে চুপ হয়ে গেলো।

‘মেয়ে অনেক কাজের বিয়ে দিতে হবে।’

তার খোঁচা মারা কথায় আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,

‘আমার বিয়ে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না।’

‘অবশ্যই করতে হবে। শতহোক বন্ধুর বোন বলে কথা।’

ইশ, দয়াবান সাজা হচ্ছে! কত চিন্তিত মানুষ। মুখ খুলে ছিলাম বেশ কতগুলো কড়া কথা শুনিয়ে দিবো। তার আগেই খালামণি হাজির।

‘তুমি এখানে? আমি আরো ইমরানকে জিজ্ঞেস করছি এনাজ কোথায়। হাত-মুখ ধুয়ে নাস্তা খেয়ে নাও।’

খালামণি বললো। এনাজ মাথা চুলকে নিচু গলায় বললো,

‘পরে খাবোনি আন্টি।’

‘পরে না। রুটি ঠান্ডা হয়ে যাবে। গরম গরম খেয়ে নাও।’

‘হাত-পা ধুতে হবে আন্টি।’

‘তাহলে ধুয়ে নাও।’

‘আসলে আপনাদের কল এত শক্ত। আমি চাপতে পারি না।কেউ যদি একটু চেপে দিতো।’

কতবড় মিথ্যা কথা! এত বড় দামড়া খাসি পোলা নাকি সামান্য টাইট চাপকল চাপতে পারে না। এটা কি আদোও বিশ্বাসযোগ্য? শরীরটা কি খেয়ে খেয়ে নাদুসনুদুস এমনি হয়েছে? আর আমার খালামণিও আছে। ছেলের বন্ধু বলতে অজ্ঞান। তাই সে আমার দিকে ফিরে বললো,

‘নোভা উঠ। এনাজকে কল চেপে দিয়ে আয়।’

‘কেন তোমার ছেলের কি হাত নেই?’

‘শুনলি তো ও কি বললো!’

‘দেহটা কে শুধু খাবার খেতে কাজে না লাগিয়ে এসব কাজেও লাগাতে পারে।’

এনাজ ইনোসেন্ট ফেস করে খালামণিকে ডেকে উঠলো,

‘আন্টি!’

‘আহ কি শুরু করলি?’

খালামণি আমাকে ধমকে উঠলো। আমি ফোঁস করে উঠে বললাম,

‘কল চাপতে না পারলে ঘাটে যেতে বলো। পুকুর ভর্তি পানি আছে।’

‘পুকুরে যদি আমি পরে যাই আন্টি।’

মুখটা হা হয়ে গেলো। পোলা মানুষ এতো ন্যাকামি করতে পারে তাকে না দেখলে জানতামই না। আর আমার খালাও আছে। এর তালে তালে নাচতাছে। খালামণির পিড়াপিড়িতে আমাকে যেতেই হলো। যাওয়ার আগে এক হাতে লুকিয়ে একটা জিনিস নিয়ে নিলাম। সময়মতো কাজে লাগাবো।

এনাজ বিটকেল হাসি দিয়ে বুঝালো সে জিতে গেছে। তোমার জিত আমি বের করছি। একটু অপেক্ষা করো। সে এক হাতে লুঙ্গি উঁচিয়ে ধরে কলের মুখের সামনে দাঁড়ালো। তার দুই হাত দূরে আমি ঠায় মেরে দাঁড়িয়ে আছি।

‘কি হলো কল চাপ দাও।’

‘জ্বি দিতেছি।’

‘তাহলে দাঁড়িয়ে আছো কেন?’

কলের হাতলে এক হাতে ধরে তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে গেলাম। মিষ্টি হাসি দিয়ে চোখের পাতা এক নাগাড়ে কিছু সময় নাড়িয়ে কোকিল কন্ঠে বললাম,

‘আপনাকে দেখছি।’

আমার আচারণ আর কথা শুনে এনাজ ঘাবড়ে গেলো। ইতস্তত করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই মুহুর্তে আমার দ্বারা এসব যে সে ভাবেনি তা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

‘একটু চোখ বন্ধ করুন না।’

লাজুক হাসি দিয়ে কথাটা বলতেই বেচারা বিষম খেলো। মাথার তালুতে হাত ডলতে ডলতে বললো,

‘কেনো?’

‘আরে করুন না। একটা জিনিস দেখাবো।’

‘না করবো না। তায়াং বলেছিলো যখন তুমি অতিরিক্ত ভালো ব্যবহার করবে তখন বুঝতে হবে ঘাপলা আছে।’

‘আচ্ছা, তাহলে চোখ বন্ধ করতে হবে না। তাকিয়ে থাকেন।’

বলে হাতের মুঠ থাকা বস্তুটা তার মুখে ছুঁড়ে মেরে হাসতে হাসতে ঘরে দৌড় দিলাম। আচমকা এমন আক্রমণে সে হতভম্ব। যখন বুঝতে পেরেছে তখন পুরো মুখ, চোখ আটায় মাখামাখি।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here