মনমোহিণী পর্ব -০৪

#মনমোহিণী
#Part_04
#Writer_NOVA

তায়াং ভাইয়াদের বাড়িটা মোটামুটি বিশাল বড়। দক্ষিণ দিকে ঘেরা দেয়া ইটের দেয়াল। সেই দেয়ালের মাঝে বাড়িতে ঢোকার প্রধান ফটক। ফটক থেকে সাত কদম পেরুলে পাঁচ রুমের টিনশেড দালান। সামনে নাগ বারান্দা। সেখানে বসার জন্য সিমেন্টের বেদি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। উত্তর দিক জুড়ে বড় উঠান। উঠানের একপাশে টিন ও পাটকাঠির সমন্বয়ে গড়া রান্নাঘর। রান্নাঘর থেকে একটু দূরেই অগভীর পুকুর। শান বাঁধানো একটা ঘাটও আছে। ভাইয়া পুকুরে মাছ চাষ করে। সরপুঁটি, সিলভার কাপ, বাটা, নোলা, তেলাপিয়ার বাচ্চা ছেড়েছিলো। তা এখনো পুরোপুরি বড় হয়নি। পুকুরের পাড়ে নানা শাকসবজি ও ফলের গাছ লাগানো। এগুলো খালামণি লাগিয়েছে। একসারিতে লাউ, কুমড়ো, মরিচ, পেঁপে গাছ। অন্য সারিতে নারিকেল, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি আরো গাছ আছে। পুরো বাড়িটা গাছের ছড়াছড়ি।

এতবড় বাড়িতে মানুষ থাকে মাত্র তিনজন। খালামণি, তন্বী ও তায়াং ভাইয়া। খালু প্রবাসে থাকেন। তন্বীর দাদা-দাদি কেউ বেঁচে নেই। অন্য দুই চাচারা ওদের পুরাতন বাড়িতে থাকে। খালু আলাদা জমি কিনে নতুন বাড়ি করেছে। আগে তায়াং ভাইয়ার পড়াশোনার সুবাদে তারা ঢাকা থাকতেন। দুই বছর ধরে গ্রামে চলে এসেছেন। ভাইয়া তেমন কোন কাজ করে না। মন চাইলে পুকুরে মাছ চাষ করে নয়তো কোন কাজ নেই। বড় বাজারে খালু দুটো দোকান কিনেছেন। সেই দোকান ভাড়ার যে আয় হয় তার পুরোটা অংশ যায় ভাইয়ার পকেটে। বেকার ঘুরাফিরে সেই টাকা উড়ানোই তার কাজ।

বাড়ির পাশ ঘেঁষে পরিত্যক্ত জমি। এখানে কোন শস্য বোনা হয় না। তাই জমিটাকে এলাকার ছেলেপুলেরা মাঠ বানিয়ে ফেলেছে।বিকেলে খেলতে আসে অনেকে। বাড়ি থেকে দশ মিনিট হাঁটলে পদ্মার শাখা নদী। আমি মাদারীপুরে এলেই কাজিন সমাজ নিয়ে একসাথে নদীতে গোসল করতে যাই।

দুপুরবেলা ভাইয়া জাল দিয়ে মাছ ধরতে নেমেছে। সাথে এনাজ, ইমরান ভাইয়াও আছে। শাহেদ ভাইয়া আসেনি। সে রায়হান ভাইয়ার সাথে তার শ্বশুর বাড়ি গিয়েছে। ইমরান ভাইয়ার ভীষণ ইচ্ছে হয়েছে জাল দিয়ে মাছ ধরে সেই মাছ রান্না খাবে। এনাজ পুকুরে নামতে চায়নি। ওকে জোর করে নামিয়েছে। এর জন্য ইমরানকে বকে বকে মুখ ব্যাথা করে ফেলছে। আশেপাশের বাড়ি থেকে তিনটা পুঁচকে বাচ্চা ছেলেও এসেছে। আমি ও তন্বী দুজন ঘাটে দাঁড়িয়ে তাদের মাছ ধরা দেখছি।আমাদের দুজনের কাজ হলো পাতিল নিয়ে এদিক থেকে সেদিক দৌড়ানো।

‘ইমরান রে আমার যদি ঠান্ডা লাগে তাহলে তোর খবর আছে শালা। এমনি আমার শ্বাসকষ্টের সমস্যা। যদি কিছু হয় তাহলে সম্পূর্ণ দায়ভার তোর।’

এনাজ দাঁত চিবিয়ে কথাগুলো বললো। ইমরান ভাইয়া ওর হুমকিকে বিশেষ পাত্তা দিলো না। মুখ বাঁকিয়ে বললো,

‘আমিও তো এই বাড়িতে আসতে চাইনি। আমাকে জোর করে নিয়ে এসেছিস। এখন রায়হানের শ্বশুর বাড়ি থাকলে কত আদরযত্ন করতো। তোর জন্য আমি যদি এতো খাবার-দাবার সেক্রিফাইস করতে পারি তুই আমার জন্য এতটুকু করতে পারবি না?’

তায়াং ভাইয়া ইমরান ভাইয়ার কথা শুনে হো হো করে হাসতে হাসতে বললো,

‘ইমরান, তীরটা একেবারে মোক্ষম জায়গায় মে’রেছিস।’

এনাজ উবু হয়ে পায়ের নিচ থেকে একদলা কাদা হাতে তুলে নিয়ে তায়াং ভাইয়ার শরীরে ছুঁড়ে মেরে বললো,

‘একদম ওর আইন টানবি না, শালা।’

‘সমন্ধি বল, সমন্ধি।’

ইমরান ভাইয়া দাঁত কেলিয়ে বললো। এনাজ আরেকদলা কাঁদা উঠিয়ে ইমরান ভাইয়ার শার্টে ছুঁড়ে মেরে ধমক দিয়ে বললো,

‘চুপ থাক।’

ব্যাস শুরু হয়ে গেলো কাঁদা ছুড়াছুড়ি। মাছ ধরা রেখে তারা এখন উজাতে ব্যস্ত। তাদের কান্ড দেখে আমি ও তন্বী হাসতে হাসতে একে অপরের ওপর ঢলে পরছি। আমাদের হাসতে দেখে তায়াং ভাইয়া বললো,

‘আস্তে হাস শাকচুন্নি। কানের পর্দা ফাটিয়ে ফেলবি?’

আমি তন্বীর দিকে তাকিয়ে বললাম,
‘দেখছিস তোর বিটলার ভাইয়ের কাজ? সবসময় আমার সাথে এমন করে। এর খবর আছে।’

‘আহ, নোভাপু বাদ দাও তো। জানোই তো ভাইয়া কেমন!’

তন্বী থামিয়ে দিলো।আমি ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মির করে নিজের রাগটাকে পিষিয়ে নিলাম। এর মধ্যে তারা কাঁদা রেখে চুবানির প্রতিযোগিতায় লেগেছে। মনে হচ্ছে তিনটা বাচ্চা ছেলে বহুদিন পর পুকুরে গোসল করতে নেমেছে।

মাছ কুটতে কুটতে কোমড় শেষ। তারা আনন্দে আনন্দে এক পাতিল মাছ ধরে ফেলেছে। এখন সেই মাছ কুটতে গিয়ে আমাদের অবস্থা খারাপ। পাশের বাড়ি থেকে দুই চাচী এসে আমাদের মাছ কুটতে সাহায্য করেছে। তবুও যেনো মাছ শেষ হয় না। তিনজন মাছ ধরা শেষ করে এখন গেছে নদীতে গোসল করতে। খালামণি মাছ কাটা রেখে দুপুরের রান্নার যোগাড়যন্ত্র করতে ব্যস্ত। বড় যেই মাছগুলো কাটা হয়েছে সেগুলো নিয়ে ধুয়ে ভাজতে লেগে পরেছেন।

‘ও মা আমি আর মাছ কুটতে পারবো না।’

তন্বী বিরক্তিতে চেচিয়ে উঠলো। আমিও সুর দিয়ে বললাম,

‘খালামণি আমিও পারবো না। আমার কোমড়, পিঠ ব্যাথা হয়ে গেছে।’

খালামণি মাছ উল্টে দিয়ে আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললো,

‘অল্প কয়টা আছে। সবাই হাতে হাতে কাটলে হয়ে যাবে। এখন এসব কথা বলিস না মা।’

তন্বী বললো,
‘তোমার পোলারে কে বলছিলো এতো মাছ ধরতে? আমি জানতাম সব আমাদের দিয়ে কাটাবা তুমি।’

‘এখন এই কথা বললে কাজ হবে? তখন মানা করতে পারিসনি? আমি কি দেখছি কতগুলা ধরছে? তোরা তো সামনে ছিলি।’

‘তখন মানা করছিলাম এতগুলা ধরো না। তোমার ছেলে আমার কথা শুনেনি।’

তন্বী বটি থেকে হাত সরিয়ে পা মাটির ওপর লম্বা করে ছড়িয়ে দিলো।

‘এই হইয়া গেছে। এহন কথা না কইয়া চালু কইরা হাত চালাও। মাছ নরম হইয়া গেলে কাইট্টা শান্তি পাইবা না।’

এক চাচী বলে উঠলেন।আমি চুপচাপ সরপুঁটি মাছের আঁইশ ছাড়াতে ছাড়াতে তাদের কথোপকথন শুনছিলাম। কিছু বলতেও পারছি না আবার এই জ্বালা সহ্য করতে পারছি না।

প্রায় ঘন্টা খানিক পর তিনজন নদীর থেকে গোসল সেরে ফিরে এলো। লুঙ্গি, টি-শার্টে ওদেরকে দেখলে আমার হাসি পায়। যদিও খারাপ লাগে না দেখতে।ইমরান ভাইয়া এসেই চেচিয়ে উঠলো,

‘আন্টি, রান্না হইছে?’

‘না, বাবা। সবে ভাতের মাড় ঝরালাম।’

‘জলদী রান্না করেন। খুদায় পেট চোঁ চোঁ করছে।’

এনাজ খানিক সময় দাঁড়িয়ে আমাদের মাছ কুটা দেখলো। এরপর কোন কথা না বলে ঘরের ভেতর চলে গেলো। ইমরান ভাইয়া রাম্নাঘরের পাশে দাঁড়িয়ে মাছ ভাজা দেখতে দেখতে বললো,

‘আহা, কি ঘ্রাণ! তাজা মাছের ঘ্রাণ অন্যরকম। ঘ্রাণে পেট ভরে,যাচ্ছে।’

তন্বী হাতের মাছ কাটা শেষ করে শরীর টান করে ইমরান ভাইয়াকে বললো,

‘ঘ্রাণেই যখন পেট ভরে যাচ্ছে তাহলে খেয়ে কি করবেন? ঘ্রাণ শুঁকেই পেট ভরিয়ে ফেলেন। এতে আমাদের মাছ কম লাগবে।’

‘তুমি ভীষণ দুষ্টু হয়ে গেছো তন্বী।’

ইমরান ভাইয়া বললো। আমি বললাম,
‘ভাইয়া খেতে ইচ্ছে হলে খেয়ে নিন। কিন্তু দয়া করে ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকে নজর দিবেন না। পরে আমাদের পেট ব্যাথা করবে।’

আমার কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। ইমরান ভাইয়া বললো,

‘এই তন্বীর থেকে ডাবল দুষ্টু হচ্ছো তুমি।’

এনাজ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। হাতে বাঁশ ও বেতের তৈরি মোড়া। হঠাৎ শরীরের পানির ছিটা পরতেই পিছনে তাকালাম। দেখি এনাজ মোড়া হাতে আমার পিছনে দাঁড়ানো।ইচ্ছে করে আমার পিছনে তার ভেজা চুল ঝাড়া দিচ্ছে।আমি চোখ পাকিয়ে তাকাতেই মিটমিট করে হেসে আমাদের থেকে দুই হাত ফাঁক রেখে মোড়ায় বসলো। সে এখন এখানে বসেছে মানে আমার সাথে লাগবে। হলোও তাই। বসেই আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

‘তুমি যেভাবে মাছকে ধরছো মনে হচ্ছে মাছ ব্যাথা পাচ্ছে।ওরে কি কাটতেছো নাকি আদর করতেছো?’

দুপুরের খাবার খেতে খেতে তিনটা বেজে গেলো। খাওয়ার পরপরই তিন বাঁদর বেরিয়ে গেছে ঘুরতে। তায়াং ভাইয়াকে বললাম,

‘আমাদেরকে সাথে নিয়ে যা।’

ভাইয়া ভেংচি কেটে বললো,
‘বুড়া বেডি নিয়া আমরা ঘুরি না।’

এর থেকে বড় অপমান কি কিছু আছে? শুধু পারি নাই ওরে চিবিয়ে খাইতে। তন্বীতো দুম করে ভাইয়ার পিঠে এক কিল বসিয়ে দিয়ে বললো,

‘বোনকে সাথে নিয়ে যেতে কষ্ট লাগে। গার্লফ্রেন্ড নিয়া তো ঠিকই ঘুরতে পারবা।’

‘আমি বেডি মানুষ নিয়া ঘুরতে যাই না। বেডি মানুষে আমার এলার্জি।’

আমি তন্বীকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
‘তন্বী কথাটা মনে রাখিস। বিয়ের পর যদি ও ওর বউ নিয়ে ঘুরতে যায় তাহলে খবর আছে। আর বেডি মানুষ বেডি মানুষ করলো না। আমিও দেখবো ও বিয়েটা কাকে করে! বেডা মানুষকে নাকি বেডা মানুষরে।’

তায়াং ভাইয়া আমার চুল টেনে ধরে বললো,
‘বেশি কথা শিখে গেছিস।’

ভাইয়ার হাত থেকে চুল ছাড়িয়ে নিতেই ইমরান ভাইয়া ও এনাজের আগমন। ইমরান ভাইয়া হয়তো আমাদের কথা শুনছে। তাই এসে বললো,

‘যাও বাচ্চারা গিয়ে রেস্ট করো। আজকে অনেক কাজ করছো। এখন তোমাদের ঘুমানো উচিত।’

‘এই আমরা বাচ্চা না।’

আমি জোর গলায় বললাম। এনাজ ভ্রু নাচিয়ে একগালে শয়তানি হাসি দিয়ে বললো,

‘তাহলে কি বাচ্চার মা?’

‘আপনি একদম আমার সাথে কথা বলবেন না। সবসময় আমার সাথে লেগে থাকেন কেন?’

আমি এনাজকে শাসিয়ে বললাম। এনাজ অবাক হওয়ার ভান ধরে তার থেকে আমার দুরত্ব হাত দিয়ে মেপে বললো,

‘কোথায় তোমার সাথে লেগে আছি? আমি তোমার এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছি।’

‘ধূর!’

জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে চেচিয়ে উঠলাম। তায়াং ভাইয়া এক হাতে এনাজকে টেনে দরজার দিকে নিতো নিতে বললো,

‘ওদের সাথে কি কথা বলিস?ছাড় তো! আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে চল।’

বন্ধু পেয়ে আমাকে যখন নয় তখনই অপমান করছে। একদিন শুধু বাগে পাই এই তায়াংইয়া রে। ওর সেদিন আসলেই খবর আছে। আমি হাত মুঠ করে রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করে নিলাম।

অতঃপর আমাদের রেখেই ওরা চলে গেছে। এতো কিছু বলেও নিয়ে যাইনি। তাই মনের দুঃখে তন্বীর রুমে এসে খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে মোবাইল নিয়ে বসলাম। পিঠ, কোমড় এখনো ব্যাথা করছে। খালামণি কোন কাজ করতে বললে কতগুলি মাছ কুটছি সেই কথা বলে দুই বোন ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকতাম।অথচ এই শরীর নিয়েও আমরা ঘুরতে যেতে চেয়েছি। অলস মানুষ হলে যা হয় আরকি!

ভিডিও কলে আম্মু, আব্বুর, ছোট বোনের সাথে কথা বললাম অনেকখন। আসরের আজান দেওয়ায় উঠে ওজু করে নামাজ পরে নিলাম। আবার মোবাইল নিয়ে বসলেই তন্বী বাইরে থেকে এসে বললো,

‘নোভাপু বউচি খেলবা?’

‘না রে ভালো লাগতেছে না।’

‘আরে চলো না ভালো লাগবে।’

‘শরীর চলবে না।’

‘ঠিকই তো আবার ঘুরতে চাইছিলা।’

‘খোঁটা দিতেছিস? তোর বিটলার ভাই তো নিলো না।’

‘ওদের কথা বলো না। চলো আমরা বউচি খেলি।’

‘ঐ খেলার বয়স আছে আমাদের? সঠিক বয়সে বিয়ে হলে আমাদের বাচ্চারা এখন বউচি খেলতো।’

‘সবই কপাল বুঝছো। এখন আর সেই আফসোস করো না চলো খেলতে যাই।’

‘মাঠে না বিকালে ছেলেরা ক্রিকেট খেলে।’

‘আজকে ওরা আসে নাই। তাই আশেপাশের বাড়ি থেকে কতগুলো মেয়ে জুগাইছি খেলার জন্য। তুমি মানা কইরো না প্লিজ।’

তন্বীকে মানা করেও লাভ হলো না। আমাকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে খেলতে নিয়ে গেলো। এতবড় হয়েছি, এখনো কি খেলার বয়স আছে? কিন্তু তা এই মেয়েকে কে বুঝাবে?

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here