মায়ায় জড়ানো সেই তুমি পর্ব -২৫

#মায়ায়_জড়ানো_সেই_তুমি
#পার্ট_২৫
জাওয়াদ জামী

সাইফ গুটিগুটি পায়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই সাদিফ তূর্ণাকে কোলে নিয়ে তানিশার হাত ধরে নিজের রুমে আসে। সাইফ ওর সামনে শায়লা চৌধুরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাথা নিচু করে। সাইরা সাইফের হাত ধরে বাবার কাছে নিয়ে আসে। বাবাকে সোফায় নির্জীব বসে থাকতে দেখেই উপুর হয়ে তার পায়ে পরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে।
” আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা। আমার সকল অন্যায়ের শাস্তি আমি চরমভাবে পেয়েছি। তোমার উপদেশ না শোনার শাস্তি, তোমাদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়ার শাস্তি, তোমাদের সাথে বেয়াদবির শাস্তি আমি পেয়েছি। প্রকৃতি আমাকে কোন ছাড় দেয়নি। ” জামিল চৌধুরীর দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছে। কি করবেন তিনি! সাদিফ যে ওর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখান থেকে চলে গেল। যেই সন্তানের ছায়ায় একটু একটু করে তিনি সুস্থ হচ্ছেন সেই সন্তানের মতামত না জেনে তিনি কি সিদ্ধান্ত নিবেন! এদিকে সাইফের জন্যেও তার মন পুড়ছে। এমন একটা দিনও যায়নি তিনি সাইফকে না ভেবে কাটিয়েছেন। আজ আবার তার সংসার পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছে অথচ তার বড় সন্তান এখানে নেই।
একজন অসহায় বাবার নির্বাক চোখে চেয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই।

সাদিফ বিছানায় ঠাঁয় বসে রয়েছেন। তানিশা ওর পাশে বসে অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে সাদিফের দিকে।
” কেন তানিশা কেন! তুমি একটাবারও আমার সাথে কথা বলার প্রয়োজনবোধ করলেনা! ”
” আপনিতো তূর্ণাকে না দেখেই শুধু ওর পৃথিবীতে আগমনের সংবাদ শুনে ডায়েরিতে একেকটা দিন লিখে রেখেছিলেন। যখন জানলেন ও পৃথিবীতে এসেছে সেদিন নাকি অনেক পাগলামি করেছিলেন। কেন করেছিলেন?
যে সন্তানকে আপনি দেখেননি তার জন্য এত আকুলতা কিসের ছিল? আর যে বাবা-মা আজ পাঁচ বছর হতে চলল তাদের সন্তানকে দেখেনি তাদের মনের অবস্থা একবারও ভেবে দেখেছেন। অথচ তারা সেই সন্তানকে নিজ হাতে বড় করেছেন, মানুষ করেছেন। সন্তান কোন অন্যায় করলে সবচেয়ে বেশি পোড়ায় বাবা-মাকে। কিন্তু আবার সেই বাবা-মা’ই তাদের সন্তানদের সকল অপরাধ নিঃসংকোচে ক্ষমা করে দেয়। তাদের জায়গায় একবার নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেখুন সব উত্তর পেয়ে যাবেন। ”
তানিশার এই কথাগুলোর প্রেক্ষিতে উত্তর দেয়ার মত কোন কথা সাদিফের ঝুলিতে নেই। তাই সে নিশ্চুপ থাকে।
” ওকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখুন। এরপর ও কোন অন্যায় করলে আপনি যা খুশি করবেন আমি কোন বাঁধা দিবনা। আপনি একবার নিচে চলুন। বাবা-মা আপনার সিদ্ধান্তের ওপর নিজেদের চাওয়া-পাওয়াগুলোকে ছেড়ে দিয়ে রেখেছে। আমি এটা ভালো করেই জানি আপনি রাজি না হলে তারা সাইফকে এই বাসায় রাখবেনা, এতে তাদের যত কষ্টই হোকনা কেন।
প্লিজ, বাবুর পাপাই। আপনার সংসারটা পূর্ণ করতে একমাত্র আপনিই পারেন। ”
সাদিফ আর যাই করুক না কেন তানিশার এরূপ অনুনয় কিছুতেই ফেলতে পারেনা।
” বউ, এতদিন ফোনে এই ব্যাপারেই ফিসফাস করতে? চোরের ন্যায় আচরণ করতে এসব জন্যই? ”
” আপনি আমাকে চোর বলতে পারেননা। আমিতো শুধু বাবা-মা’ র মুখে হাসি দেখতে চেয়েছি। ”
” কিন্তু তুমি কিভাবে ওর খোঁজ পেলে? ”
” আসাদ আলম চাচ্চু আর রিশার ফুপির মাধ্যমে। যিনি কানাডা থাকেন। আর রিশার ফুপা কানাডায় বাংলাদেশি অ্যাম্বালসিতে কর্মরত। তাকেই সাইফের ছবিসহ ডিটেইলস দিয়েছিলাম। তিনিই সব ব্যবস্থা করেছেন। ”
” হাহ্ আর এদিকে আমি বউকে বোকা ভেবে এসেছি এতদিন। অথচ আমি নিজেই কত বড় বোকা! চল নিচে যাই। তবে একটা কথা, ওর কোনও দ্বায়িত্ব আমি নিতে পারবনা এমনকি ওকে একটা টাকাও আমি দিবনা। ”
” আপনার কিছুই করতে হবেনা। ও দেশে আসার আগে জব করত। এখানে আসার আগেই একটা জবের ব্যবস্থা করেই তবে এসেছে। আগামীকাল সেখানে জয়েন করবে। আপনি শুধু ওকে মেনে নিতে বাবা-মা’কে উৎসাহিত করবেন। ”
” ও কি পড়াশোনা কমপ্লিট করেছিল! তা সে একা এসেছে কেন? যার জন্য সবাইকে ছাড়ল, সে কই? ” সাদিফের গলায় ব্যঙ্গভাব স্পষ্ট।
” হুম সবকিছুর মাঝেও পড়াশোনা চালিয়েছে। সবকিছুর জন্য যে দায়ী সে আর ওর জীবনে নেই। যখন সাইফ বুঝতে পেরেছে সেই মেয়ে ওর জন্য সঠিক ছিলনা ততক্ষণে দেরি হয়েছিল। মেয়েটা ওকে ফাঁসিয়ে দেয়। কিছুদিন জেলও খাটতে হয়েছে সাইফকে। পরে ছাড়া পেয়ে পড়াশোনা কমপ্লিট করে একটা জব করছিল। ”
” বাহ্ কিছুই করতে বাকি রাখেনি দেখছি! কিন্তু তোমাকে এখন আমার ভিষণ ভয় লাগছে। তুমি সবকিছু জেনেও আমার কাছে লুকিয়েছ! ”
” আপনি আবারও আমাকে খোঁচা দিচ্ছেন। আপনাকে আগে বললে আপনি রাজি হতেন? বরং আমাকে বাঁধা দিয়ে থামিয়ে দিতেন। তাই সবকিছুই লুকিয়েছি, শুধু আপনার কাছে নয় সবার কাছেই। এবার নিচে চলুন। আর ওকে কিছু বলবেননা প্লিজ। ছেলেটা অনেক কষ্ট পেয়েছে। ”
সাদিফের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি। তানিশাযে এরকম একটা কাজ করবে ও ভাবতেও পারেনি।

ড্রয়িংরুমে জুড়ে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সাইফ তার মায়ের পা ধরে বসে আছে। জামিল চৌধুরী কাঁদছে সাথে শায়লা চৌধুরীও। সাইরা কিছু বলতে চেয়েও পারেনা। আর রাতুল দেখছে কিভাবে এক পরাজিত সন্তান বাবা-মা’র কাছে ভুল স্বীকার করে নত হয়ে গেছে।
তিয়াসা রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে একসময়ের উদ্ধতস্বভাবের সাইফকে। যে কিনা সব পুরাতন সম্পর্ক চুকিয়ে নতুনে ঝুঁকেছিল। সময় একটা মানুষকে কতটা নিচে টেনে নামাতে পারে আজ তার প্রমান স্বচক্ষে দেখছে তিয়াসা।
” মম, আমাকে তোমাদের সাথে থাকতে না দিলেও ক্ষমা করে দাও। তোমাদের ক্ষমা ছাড়া আমার কিছুতেই শান্তি নেই, মুক্তি নেই। ” হুহু করে কাঁদছে সাইফ।
” মম, তোমার ছেলে যখন এখানে থাকবেইনা তবে কেন এসেছে? নাটক করতে? সে সবাইকে দেখাচ্ছে কতটা মহান হয়েছে সে? নাকি সমাজে আবার তোমাদের ছোট করবে এই বলে, সে বাসায় এসেছে অথচ তোমরা মেনে নাওনি? এসব নাটক করতে চাইলে তাকে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে বলো। ” সাদিফের কথা শুনে মুখ তুলে চায় সাইফ। এই প্রথম সে ভাইয়া, ভাবিকে একসাথে দেখছে! সাথে একটা পরীও আছে। পরিপূর্ণ একটা সুখী পরিবার।
সাইফ উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে সাদিফের কাছে আসে। সাদিফের এতে কোন ভাবান্তর নেই। তানিশা অবাক হয়ে যাচ্ছে সাদিফকে দেখে। এই লোক যে কিনা তানিশার বিরহে পাগল হয়ে যায় আর আজকে সে ভাইয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে! এদিকে ওদের ভাইয়ের মধ্যে কথা হওয়া প্রয়োজন।
” সাইফ, তোমার ভাইয়া রাগ করে আছে। তুমি তার কাছে মন থেকে ক্ষমা চাইলেই দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। মানুষ রাগ করে কতদিন থাকতে পারে বল। ”
তানিশার কথা শুনে সাদিফ ভেতরে ভেতরে ফেটে পরছে। কিন্তু তানিশাকে কিছু বলার সাধ্য তার নেই। এই মেয়েটাকে সে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে তাই ওর সব সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। সাইফ ভাইয়ের দুই হাত জড়িয়ে ধরে।
” ভাইয়া সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমি লজ্জিত। আমি তোমাদের সাথেই থাকতে চাই। সবাইকে নিয়ে একসাথে বাঁচতে চাই। আমাকে সেই সুযোগ দিবে ভাইয়া। ” সাদিফ কবে যে এত কঠোর হয়েছে তা নিজেও জানেনা। সাদিফের জন্য কোন মায়া কাজ করছেনা ওর ভেতর। একবার বাবা-মা’র দিকে তাকায়। তারাও যেন সাদিফের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছে। বাবা-মা’ র মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের সুখের জন্য পুরনো সবকিছু ভুলে যায় সে।
” মম, ওকে ভেতরে যেতে বল। সে নিজের ইচ্ছেমত থাকুক, যা ইচ্ছে করুক শুধু যেন আমার আশেপাশে না থাকে আর আমার সাথে কথা বলতে যেন না আসে। ” কথা বলা শেষ করেই গটগটিয়ে নিজের রুমে আসে সাদিফ। রাগে ওর শরীর কাঁপছে।

সাদিফের মতামত জানা মাত্রই ড্রয়িংরুমে সবার মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। বাবা-মা তাদের সন্তানকে বুকে টেনে নেয়। সাইফ ভাই-বোনের সন্তানদের দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরে। এ বাড়ির সবকিছু বদলে গেছে। সাইরা কি সুন্দর করে ভাবির হাত ধরে রেখেছে। আবার মমও হেসে হেসে ভাবির সাথে কথা বলছে! ওরা সব ভুলে টুকটাক কথায় মেতে উঠে।

তিয়াসা আর রহিমা খালা মিলে নাস্তা এনে ওদের সামনে রাখে। সাইভ রহিমা খালার সাথে কথা বলে, তাকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে। কিন্তু তিয়াসাকে চিনতে না পারায় সাইরার দিকে প্রশ্নবোধক চাহনি দেয়।
সাইরা জানায় ও ভাবির বোন তিয়াসা।
আজকের রাতটা যেন চৌধুরি বাড়িতে খুশির জোয়ার নিয়ে এসেছে। সবাই একসাথে বসে খাবার খায়। যদিও সেখানে সাদিফ ছিলনা। সে রুমেই খেয়েছে। তানিশার অনুরোধে সাইরা,রাতুল আজ থেকে যায় এখানে।

তানিশা রুমে সাদিফের অপেক্ষা করছে কিন্তু সে বাইরে গেছে। এদিকে তানিশাও একা। তূর্ণা তিয়াসার সাথে শুয়েছে। তানিশার কিছুই ভালো লাগছেনা। সাদিফকে কয়েকবার ফোন করেছে কিন্তু সে রেসপন্স করেনি। তাই সময় কাটাতে নিজের ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে।
বেশ কিছুক্ষণ পর সাদিফ আসে। কিন্তু তার মুক ভার। তানিশা বুঝতে পারছে সবকিছু। কিন্তু ও চায়না সাদিফ রেগে থাকুক। সাদিফ বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পরলে তানিশা ওর বুকে মাথা রাখে। সাদিফও একহাতে জড়িয়ে ধরে তার প্রেয়সীকে।
” আমার ওপর রাগ করে আছেন। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আপনি বুঝতে পারছেননা! ”
” কে বলেছে আমি তোমার ওপর রাগ করেছি! আমার বউ আজকাল দেখছি একটু বেশিই বুঝতে পারে। অথচ আমার আগের সেই বোকা বউটাই ভালো ছিল। আমার প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস ছিল, আমাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত। আজ তার মধ্যে ভালোবাসার থেকে দ্বায়িত্ববোধ বেশি দেখতে পাই। অথচ আমি ভালোবাসাই বেশি চেয়েছিলাম। দ্বায়িত্বপালনের জন্য আমি ছিলাম সবসময়ই। ” সাদিফের গলায় অভিমান স্পষ্ট। তানিশার বুক কেঁপে উঠে। তবে সে কি সাদিফকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে! তানিশা নিজেকে সামলাতে পারেনা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। সাদিফের কাছ থেকে কোন অভিমান, অভিযোগ ও সহ্য করতে পারবেনা। অনেক কিছুর পর সে সাদিফকে পেয়েছে। সে আরেকবার সাদিফকে হারাতে চায়না।
তানিশার কান্নার শব্দে সাদিফ চমকে উঠে।
” বউ, তুমি কাঁদছ কেন! বিশ্বাস কর আমি তোমার ওপর একটুও রাগ করিনি। তোমার জন্য আমার শুধুই ভালোবাসা আছে কোন রাগের ঠাঁই সেখানে নেই। ” সাদিফ চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিচ্ছে তানিশার মুখ।
” আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি। এই বাড়ির সবাইকে খুব ভালোবাসি। তাই সব সময়ই চাই আমরা একসাথে মিলেমিশে থাকি। এরপর থেকে আপনাকে না জানিয়ে কিছুই করবনা। আমি প্রমিজ করছি। তবুও আমার ওপর কোন অভিযোগ রাখবেননা। ”
সাদিফ আরো শক্ত করে তানিশাকে বুকের পাঁজরে জড়িয়ে ধরে। পারলে বুকের মাঝে ঢুকিয়ে নেয়।
” ভালোবাসি বউ, তোমাকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি। যাকে ভালোবাসা যায় তার ওপর কখনোই রাগ, অভিমান, অভিযোগ কিছুই আসেনা। যেখানে ভালোবাসা থাকে সেখানে অন্য কিছু কখনোই ঠাঁই পায়না। ”
দুজন কপোত-কপোতী এভাবেই নিজেদের ভেতরের সকল দূরত্ব ঘুচিয়ে নেয়। যেখানে মান-অভিমান কখনোই জায়গা করতে পারেনা। যেখানে বিরাজমান শুধুই ভালোবাসা আর ভালোবাসা।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here