রইলো তোমার নিমন্ত্রণ পর্ব -০৭

#রইলো_তোমার_নিমন্ত্রণ।
[০৭]

এতগুলো বছর পর দিগন্তকে দেখতে পেয়ে আবেগপ্রবণ রোজিনা হোসাইন। সেই ছোট্ট দিগন্তকে যখন ছেড়ে এসেছিলেন তখন ভুলেই গিয়েছিলেন দিগন্তের কথা। দিগন্তের সাথে তাদের আর কোনদিন দেখা হবে এটা কখনো ভাবেন নি। তবে ভূমি কিংবা তন্ময় কেও চিনতে পারেনি দিগন্তকে। দিগন্তের পরিচয় দেওয়ার পর ভূমি ওকে চিনতে পারে। ছোটবেলায় কিছু স্মৃতি তারও মনে পরে। তবে সেগুলো শুধু ছোটবেলার স্মৃতি হিসাবেই। দিগন্তের মতো সেগুলো আগলে রাখেনি। ইউনুস হোসাইন বাড়ি ফিরে দিগন্তকে দেখে বুকে জড়িয়ে নেয়। রোজিনা হোসাইনের কড়া নির্দেশ আজ দিগন্তকে তাদের সাথে থাকতে হবে। দিগন্ত তার প্রিয় বন্ধুর কাছাকাছি থাকতে পারবে।রোজিনা হোসাইনের কথায় রাজি হয়ে যায় সে। সেদিন রাতভর গল্পকরে কাটায় দিগন্ত রোজিনা হোসাইন আর ইউনুস হোসাইন। দিগন্তের মন বলছিল ভূমি আসবে। তাদের গল্পের আসরে ভূমি আসবে। শেষ পর্যন্ত ভূমি কিংবা তন্ময় কেউ আসেনি গল্পের আসরে।

পরেরদিন সকালে রোজিনা হোসাইনের বাপের বাড়ি থেকে কল আসে। তার একমাত্র ভাইঝি শিমলার বিয়ে। বিয়েটা আরো দুমাস পরে হওয়ার কথা ছিলো। কিন্ত সপ্তাহ খানেক আগে শিমলার হবু শ্বশুরমশাই স্ট্রোক করেন। তাই তিনি তাড়াতাড়ি ছেলের বিয়ে দিতে চান। আগামি পরশু শিমলার গায়ে হলুদ তারপর বিয়ে।

পরেরদিন সবাই মিলে রওনা দেয় ময়মনসিংহে উদ্দেশ্যে।
সঙ্গে দিগন্তও আছে। রোজিনা হোসাইনের জোরাজুরির কারনে অফিস থেকে চার দিনের ছুটি নিয়েছে দিগন্ত। দিগন্তের হাতে যেহেতু নতুন কোন কেইস নেই তাই ছুটি পেতে সহজ হয়েছে। তবে রফিক মির্জা শর্ত দিয়েছেন। নতুন কেইস হাতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে দিগন্তকে জয়েন করতে হবে। দিগন্ত তাতেই রাজি হয়েছে। ক্রিমিয়ার ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর রফিক মির্জা নিজ সন্তানের মতো স্নেহ করেন দিগন্তকে। সব বিপদ থেকে আগলে রাখেন। ছেলের বয়সি দিগন্তের মাঝে তিনি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। তরুন বয়সে এমনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, ও প্রখর মেধার অধীকারি ছিলেন তিনি। দিগন্তের প্রতিটা কাজে মুগ্ধ তিনি।

গাড়িতে ব্যাগপত্র তুলছে দিগন্ত আর তন্ময়। ইউনুস হোসাইন ড্রাইভারের সাথে কথা বলছেন। ভূমি রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে দিয়ার সাথে কথা বলছে। রোজিনা হোসাইন রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু একটা মনে পরতেই রোজিনা হোসাইন ভূমিকে ডাক দিলেন। ভূমি তার মায়ের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন,
” আরাভ কখন যাবে?”

” আমাকে কিছু বলেনি।”

” কিছু বলেনি মানে? ওকি যাবে না!”

” আমার সাথে কথা হয়নি।”

” আরাভকে একটা কল দে। দেখ কখন যাবে।”

” আমি কেন? তুমি দাও।”

” তুই দিবি না তো কে দিবে। এখুনি কল দে।”

দিগন্তের ব্যাগপত্র গাড়িতে তুলা শেষ। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে রোজিনা হোসাইন আর ভূমির কথা শুনছিলো সে। রোজিনা হোসাইনের শেষ কথা শুনে দিগন্তের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কে এই আরাভ? ভূমি আরাভের নাম্বারে দুইবার কল দেওয়ার পরেও কল রিসিভ হচ্ছে না। তৃতীয়বার করে দিয়ে বিড়বিড়াল ভূমি,” এবার যদি রিসিভ নাকরে আর কল দিব না”। তৃতীয়বারও কল রিসিভ হলো না। বিরক্তিতে “চ” উচ্চারণ করলো ভূমি। তারপর রোজিনা হোসাইনের কাছে গিয়ে বলল, “স্যার কল রিসিভ করছে না।”

ভূমির মুখের অঙ্গভঙ্গি লক্ষ করে দিগন্ত তন্ময়কে জিগ্যেস করলো,
” আচ্ছা, এই আরাভটা আবার কে?”

” তুমি চেনো না ভাইয়াকে?”

” তোমার আরো কোন ভাই আছে?” মাথা চুলকে লাজুক হাসি দিয়ে বলল দিগন্ত।

” আমার আপন ভাই নয়। আরাভ ভাইয়া আমার দুলাভাই হয়। আপুর হবু বর।” মৃদু হেসে বলল তন্ময়।

তন্ময়ের কথা শুনে দিগন্তের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। আকস্মিক দুপা পিছিয়ে যায়। মাথাটা কেমন ঘুরতে থাকে। চারিদিকে অন্ধকার দেখতে পায়। স্তব্ধ, বিমূঢ় দিগন্ত যেন স্থান কাল পাত্র সব ভুলে গেল। বুকের ভিতরে চাপা কষ্ট অনুভব করছে সে। চোখদুটো ভিষন জ্বালা করছে। এ যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। দিগন্তের চোখের কোনে জমাট বাধলো অশ্রু। আড় চোখে তাকালো ভূমির হাস্যউজ্জল মুখের দিকে। মুহূর্তেই যেন নিজের কষ্ট উপশমের ওষুদ পেল সে। ভূমির হাসি মাখা মুখটা দেখেই নিজের সব দুঃখ কষ্ট অনায়াসে ভুলে থাকতে পারবে। নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো দিগন্ত। চোখ বন্ধকরে দীর্ঘশ্বাস নিলো। যতই সে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিকনা কেন? মন ভাঙার কষ্টটা সে উপলব্ধি করছে। বুকের ভিতরের চাপা কষ্টটা তাকে ঠিক থাকতে দিচ্ছে কই। নিজেকে আরো বেশী দূর্বল লাগছে। না দিগন্ত পারবে না, ভূমির সামনে থাকতে। ভূমিকে যতবার দেখবে তাতবারই মনে হবে, তার ভূমি, তার প্রিয় মানুষটা অন্যকারো। এটা সহ্য করতে পারবে না দিগন্ত। তারচেয়ে ভালো সে দূরে চলে যাক। দিগন্ত রোজিনা হোসাইনের কাছে গেল।

” কাকিমনি, আমার না গেলে চলবে না?”

” সে কি কথা। যাবে না কেন? তোমাকে যেতেই হবে।”

” আমার জরুলি একটা কাজ পড়েগেছে আমাকে যেতে হবে কাকিমনি।”

” তুমি না ছুটি নিয়েছো?”

” ডিটেকটিভদের আবার ছুটি। আমাকে এখন যেতে হবে বুঝলে কাকিমনি।”

” যেতেই হবে।”

” হুম। আমি নাহয় বিয়ের দিন আসবো। এখন আসি হুম।

রোজিনা হোসাইন সম্মতি দিয়ে দিগন্তের মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় দিলেন। যাওয়ার আগে দিগন্ত ভূমির দিকে একপলক তাকিয়ে মনে মনে বলল,

” আমি তোমাকে ভালোবাসি আর ভালোবাসবো।দূর থেকেই ভালোবাসবো তোমায়। ঠিক আগের মতো। দূরে গেলে কি ভালোবাসা কমে যায়। না। কমে না। দূরে গেলে ভালোবাসা আরো গাঢ় হয়। আরো গভীর ভাবে ভালোবাসবো তোমায়। তুমি সেটা জানতেও পারবে না। তোমার জন্য কেউ একজন ভিতরে ভিতরে নিঃশেষ
হয়ে যাচ্ছে। না তুমি জানলে, না তুমি শুনলে, না তুমি দেখলে। অথচ মানুষটা কি ভয়ংকর ভাবে তোমার শূন্যতা অনুভব করে যাচ্ছে। নিজেকে হারাতে বসেছে এক ঘোর অনিশ্চয়তায়। সেই খবর তুমি জানো না, হয়ত জানবেও না কোনদিন। ভালো থেকো। নিজের একান্ত প্রিয় মানুষটার সাথে ভালো থেকো।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তন্ময় আর ইউনুস হোসাইনের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় দিগন্ত।

______________________
আরাভের কল এলো রাতের এগারোটার পরে। ভূমি তখন মাত্র ঘুমিয়েছে। নাম্বার না দেখেই কল রিসিভ করে বলে,
” হ্যালো, কে বলছেন?”

ওপাশ থেকে কোন আওয়াজ এলো না। ভূমি পরপর কয়েকবার জিগ্যেস করার পরেও কোন সাড়া পেল না। নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে ভূমি বলে উঠে,

” কথা বলবেন না তাহলে কল করছেন কেন? যত্তসব আজাইরা পাবলিক। রাতবিরাতে মেয়েদের ডিস্টার্ব করাই এদের কাজ। আর একবারও যদি কল করছেন তাহলে আপনার নামে থানায় ইভটিজিং এর ডাইরি করবো।”

কল কটে মোবাইল সুইচ অফ করে ঘুমিয়ে পরে ভূমি। সকালের মিষ্টি রোদ এসে মুখে পরতেই আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে উঠে ভূমি। চাদর সড়িয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ঝলমলে চিকচিক আকাশের দিকে তাকাতেই মৃদু হেসে ফেলে সে। মনে হচ্ছে রাতের দিকে বৃষ্টি হচ্ছে সকালে কেমন ঝলমলে মিষ্টি রোদ। দু হাতে প্রসারিত করে প্রাণভরে শ্বাস নেয় ভূমি। শহরে এই সুন্দর সতেজ সকালটার অভাববোদ করে। এরকম প্রানভরে শ্বাস নিতে পারে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড়ায়,
” আজকের সকালটা একটু বেশীই সুন্দর।”

আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো একমনে। মনে মনে সাজালো এক নতুন জগৎ। সাদা মেঘের ভেলা, তার উপর বসে আছে ভূমি আর আরাভ। আরাভের বুকে মাথা রেখে মেঘের উপর ভেসে যাচ্ছে ভূমি আর আরাভ দুহাতে তার প্রিয় রমনীকে আগলে রেখেছে। মাঝে মাঝে অধোর স্পর্শ করছে ভুমির মাথায়। কি সুন্দর, মনোমুগ্ধকর দৃষ্টি। হেসে ফেলল ভূমি।

চুলের টান পেয়ে আহ্ শব্দকরে নিজের ভাবনার জগৎত থেকে বেড়িয়ে আসে ভূমি। বাস্তব অবস্থান বুঝতে আরো কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। যখন বুঝতে পারে তখন রাগে কটমট করে তাকায় সামনে থাকা তন্ময়ের দিকে। তন্ময় তার দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলে,

” মোবাইল কোথায় তোর? ভাইয়া সকাল থেকে কতবার কল করেছে তোর ধারনা আছে?”

” ভাইয়া।” ভ্রু কুঁচকে ফেলে ভূমি। পরক্ষনে স্বরনে আসতেই জিহ্বা কামড়ে ধরে। তন্ময় ভূমির মাথায় চাটি মেরে বলে,

” তোর ঘুম জিবনেও শেষ হবে না। মোবাইল অন করে ভাইয়ার সাথে কথা বলে নি।”

তন্ময় চলে যাবে তখনি ওর পিঠে দুমকরে একটা কিল পরে। তন্মর রাগী চোখ করে ভূমির দিকে তাকাতেই ভূমি ডোন্ট কেয়ার ভাবনিয়ে বিছানায় এসে নিজের মোবাইল হাতে নেয়। মোবাইল অন করতেই কয়েকটা একটা মেসেজ আসে। ভূমির মেসেজ সিন করে পড়তে থাকে।

” কন্ঠে কি আফিম মিশিয়েছ শুনি। যা আমার সর্বশক্তি গ্রাস করে নিয়েছে। আর তুমি আমার নামে ইভটিজিং এর মামলা করবে। মামলা তো তোমার নামে করা উচিৎ।”

প্রথম অংশে পড়ার সময় লাজুক হাসলেও পরের অংশ পড়ে সেই হাসি, সেই লাজুকলতা সব উবে গেল। মনে পরল কাল রাতের কথা। তখন স্যার কল করেছিলো। তাড়াতাড়ি নাম্বার চেক করলো ভূমি। উহঃ শিট। দু আঙ্গুল দিয়ে কপালে স্লাইড করে ভূমি। নাম্বার না দেখে বড্ড ভুল করেছে। স্যার কি এজন্যৈ ওর নামে থানায় মামলা করবে। চিন্তায় ভূমির কপালে সুক্ষ্ম ভাজ পরলো। না স্যারের কছে ক্ষমা চাইতে হবে। আরাভের নাম্বারে কল করবে ভূমি ওমনি তন্মর ভূমির হাত থেকে মোবাইল নিয়ে দেয় দৌড়। পিছনের দিকে একবার তাকিয়ে বলে,

” আমাকে মারার শাস্তি এটা। আজ সারাদিন তুই মোবাইল পাবি না।”

ভূমি তন্ময়ের পিছনের ছুটে বলে,
” ভাই আমার মোবাইলটা দে। তোকে আর মারবো না। এই দেখ কান ধরছি আর মারবো না। আমার মোবাইলটা দে।”

চলবে,,,,,,,,

Mahfuza Afrin Shikha.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here