শ্যামারঙা,পর্ব:২৯+৩০+৩১

#শ্যামারঙা
লেখিকাঃ বৃষ্টি সরকার অধরা
পর্বঃ ২৯

শুনেছি আমাদের পরিক্ষার পর নবুর বিয়ের ফাইনাল কথা হবে।নবু এখন সব সময় হাসি খুশিতে থাকে।
খুব সুন্দর লাগে ওকে দেখতে। তবে সব থেকে বেশি সুন্দর লাগে যখন ও কথা বলার সময় লজ্জা পায়।

আগামীকাল থেকে পরিক্ষা শুরু।
আমি আমার সারারুমে বইয়ের সাগর বানিয়ে ফেলেছি।
কোনটা রেখে কোনটা পরবো কিছুই মাথায় আসছে না।

বই পরার মধ্যে যখন আমার মন তীব্র ভাবে ব্যস্ত তখনই ফোনটা বেজে উঠলো।
প্রথমে ভাবলাম ধরবো না।তাই পরপর দু’বার কর্কশ আওয়াজে ফোনটা বেজে গেল।
পাচ মিনিট পর আবার শুরু হলো সেই অসহ্য কর আওয়াজের অত্যাচার।
তাই বাধ্য হয়ে এবার পরা বাদ দিয়ে ফোন খোজায় মন দিলাম।

টানা পনেরো মিনিট পর খাটের ওপর থেকে ফোন টা আবিষ্কার করেই রিসিভ করে কানে নিলাম….

—- কে আপনি,
আর এত বার ফোন করে বিরক্ত করছেন কেন??

—- বিরক্ত মাই ফুট…
সারাদিন -রাত ডিউটি করে না ঘুমিয়ে জার্নি করে তোর বাসার নিচে দাড়িয়ে আছি আর তুই আমাকে বিরক্ত দেখাস……

কথা শুনেই অন্তরের জল শুকিয়ে গেল।
যদিও বুঝতে বাকি নেই কে ফোন দিয়েছে তার পরও নাম্বার টা চেক করে নিলাম…

— আমি বুঝতে পারিনি।
আপনি ফোন….

— কোন কথা বলবি না।
চুপচাপ নিচে আয়…
দুই মিনিট…

— পাচ তলা থেকে কি দুই মিনিটে নামা যায়??

কথা বলার সাথে সাথেই ফোন কেটে দিলেন..
আমিও আর দেরি না করে নেমে গেলাম।
আমাকে দেখেই তিনি গেটের ভেতর আসলেন…

— নিচে দাড়িয়ে আছেন কেন।
বাসায় তো আসতে পারতেন।

—- নে ধর..

— কী এটা?

— রুমে গিয়ে আরো কয়েকটি চশমা পড়ে দেখে নিস।
এখন যা…

— আপনি কি খুব টায়ার্ড?

— নারে,আমাকে দেখে কী তাই মনে হচ্ছে?
আমি তো এখন পলাপলি খেলবো,কালামাছি খেলবো…

— রেগে যাচ্ছেন কেন?

— তোরে বাসায় যেতে বলছি না।

— কিন্তু এইটা আমি কি করবো?

— ফেলে দে…

বলেই তিনি হনহন করে বেরিয়ে গেলেন
আর আমিও বাসায় চলে এলাম।
প্যাকেট টা আলমারিতে রেখে আবার বই পড়ায় মনোযোগ দিলাম…

আস্তে আস্তে দুমাস ধরে পরিক্ষা শেষ হলো।
এখন অনেক টাইম হাতে।
তাই আমরা মানে আমি আর নবু ঠিক করলাম।
যশোর যাবো পিসিমনিদের বাড়িতে বেড়াতে।
মহিমা বৌমনি ও অনেক দিন ধরে আমাদের সেখানে যেতে বলেছেন।
কিন্তু পরিক্ষার জন্য যাওয়া হয়ে ওঠে নি তাই আগামি সপ্তাহে পিসিমনি এসে আমাদের নিয়ে যাবেন।

আর সেখানে আমার যাওয়ার যতটা না ইচ্ছে তার চেয়ে বেশি ইচ্ছে নবুর।
কারণ সেখানে গেলে তো সে তার মনের মানুষের সাথে দেখা করতে পারবে।এক্সাথে সময় কাটাতে পারবে।
আর সেজন্য নবু আমাকে নিয়ে যাচ্ছে।
তবে আমার সেখানে যাবার ইচ্ছে নেহাৎ কম নয়।
কারণ মুগ্ধ দা আর মহিমা বৌমনির প্রেমের কাহিনী জানবো বলে।

পিসিমনির বাড়িতে যাবার আগে আমি আর নবু মিলে ঠিক করলাম ওই বাড়ির সবার জন্য কিছু শপিং করবো।
কারণ বিয়ের সময় তাদের সেভাবে কিছু গিফট করা হয়নি।

তাই বিকেলে শপিং য়ে গেলাম।
শপিং শেষে আমরা একটা ক্যাফেতে গেলাম।
সেখানে কোল্ড কফি অর্ডার করে দুজনে মিলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছি।
তখনই নবুর ফোনে মেসেজ এলো।
মেসেজটা দেখেই নবুর চোখ কপালে।
কারণ জিজ্ঞেস করায় বললো…

—–দাদাভাই বাড়িতে এসেছে

— মানে
তিনি তো সেদিন চট্টগ্রাম গেলেন এর মধ্যেই আবার ফিরে এলেন কি করে?
এ নবু তোর দাদাভাই সত্যি কি ডিফেন্সে জব করে নাকি মিথ্যা কথা রে….

— জানি না,
তবে দাদাভাইয়ের ইদানীং কী যেন একটা হয়েছে।

—কি হয়েছে?

— কেন যেন একটা ভাবনায় মগ্ন থাকে।
একা একা রুমে কথা বলে, হাসে,
মানে কেমন যেন একটা ঘোর ঘোর ভাব…

— তোর দাদাভাই কী প্রেম করে?

— ধুর..
আমি জানবো কি করে।
তবে জানিস তো মেঘা আগের বার আমাদের পরীক্ষার আগে যখন দাদাভাই এলো খাবার টেবিলে তো অন্যমনস্ক হয়ে বলেই দিলো “” বিয়ে করবো ”

— বলিস কি?

— হ্যা,
তারপর মা অনেক ভাবে দাদাভাইকে জেরা করেছে কিন্তু কিছুই বলেনি দাদাভাই…

— আচ্ছা চল বাসায় যাই..

— না..

— কেন?
বাসায় জাবি না কেন..?

— দাদাভাই আসবে নিতে…

— ও আচ্ছা
তাহলে তুই থাক আমি যাই…

—- না, যাইস না..
একসাথে যাবো নে..

— না, সমস্যা নেই।
আমি যাই…

বলেই চেয়ার থেকে উঠে পিছনে ফিরে দেখি ক্যাফের ডোর দিয়ে নীলাদ্রি দা ঢুকছেন।
তাকে দেখে শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল…
কালো শার্ট, কালো জিন্সের প্যান্ট আর কালো ঘড়িতে যেন অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে…
সেই সাথে চুল গুলো উল্টো করে রাখা।যদিও চুল বেশি বড় নয়।

এত সুন্দর কেন উনি?
ছেলেদের কী এত সুন্দর হতে হয়?
ছেলের বেশি সুন্দর হওয়া যে ঠিক না সেটা কি তিনি যানেন না?
এই যে এখন আমি তাকে ছাড়া অন্য দিকে তাকাতে পারছি না।
তার রূপের ঝাঝে আমার যে এখন পাগল প্রায় অবস্থা সেটা কী তিনি বোঝেন না???

নিজেকে কোন মতে সামলে নিয়ে মাথা নিচু করে নিলাম।
ততক্ষণে তিনি আমাদের টেবিলের কাছে চলে এসেছেন।
টেবিলের কাছে এসেই নবুকে বললেন..

— একটা গুড নিউজ আছে..

— কি দাদাভাই?

— অর্পন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে..

— কী?

— হ্যা তাড়াতাড়ি যা ওয়েট করছে।
বেচারা কে আবার রাতেই যশোর ফিরতে হবে।

— হ্যা যাচ্ছি,
বলেই শপিং ব্যাগ গুলো সব আমার হাতে দিয়ে চলে গেল।
আর আমি একগাদা শপিং ব্যাগ নিয়ে সেখানেই বোকের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।আর ওর চলে যাওয়া দেখলাম……

নবু বেড়িয়ে যেতেই নীলাদ্রি দা আমার হার থেকে ব্যাগ গুলো নিয়ে নিলেন
আর বললেন….

— গাড়ির দিকে আয়..

আমিও বাধ্য মেয়ের মতো গাড়িতে গিয়ে বসলাম…

— মেঘা তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে।

— হ্যা বলুন…
তবে সিরিয়াস কিছু হলেই বলবেন
নচেৎ বলার দরকার নেই…

— ওকে..

বলেই তিনি গাড়ি স্টার্ট দিলেন এবং আমাকে আমার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।

ওনার এই ভাবের আমি কিছুই বুঝলাম না।
আজব মানুষ তিনি।
নিজের যা ভালো লাগবে সব সময় যে তাই করতে হবে এটা ওনার কোন রুল?
বুঝি না…

চলবে…..

#শ্যামারঙা
লেখিকাঃ বৃষ্টি সরকার অধরা
পর্বঃ ৩০

ওনার এই ভাবের আমি কিছুই বুঝলাম না।
আজব মানুষ তিনি।
নিজের যা ভালো লাগবে সব সময় যে তাই করতে হবে এটা ওনার কোন রুল?
বুঝি না…

পরেরদিন সকালে পিসিমনি এলেন আমাকে আর নবু কে নিতে।
যথারীতি বিকেলে আমাদের নিয়ে রওনা হলেন যশোরের উদ্দেশ্যে।
পিসিমনিদের বাড়িতে পৌঁছে আমাদের আনন্দ আর ধরে না।
কারণ এই এক পরিবার নতুন পরিবার।
যারা এখন আমাকে মেনে নিয়েছে।তবে মহিমা বৌমনির গুনের কদর করতে হবে।কারণ তিনি এসেই এই সব ভুল গুলোকে ঠিক করে দিয়েছেন।
তার জন্যই পিসিমনি আর আমার সম্পর্ক সহজ হয়েছে।

মুগ্ধ দা আর মহিমা বৌমনি এখন তাদের নতুন ব্যবসায়ের কাজে ব্যস্ত।তাই আমরা যখন রাতে এ বাড়িতে এলাম তখন তারা কাজ থেকে ফেরেন নি।
বাড়িতে পিসাই আর পিসিমনি আর মুগ্ধ দা মহিমা বৌমনি থাকেন।পিসাই আর দেশের বাইরে যাবেন না।তবে শুনেছি পিসাই এখন দেশেই একটি ব্যবসা শুরু করবেন আর সেটা পরিচালনা করবেন তার দুই ছেলে- মেয়ে তার তাদের জীবন সঙ্গি রা।

আমরা বাড়িতে আসার পর ফ্রেশ হয়ে পিসিমনি আর পিসাই সাথে কথা বলছিলাম।তখন মুগ্ধ দা আর মহিমা বৌমনি বাড়িতে ফিরলেন।
আমাদের দেখে মহিমা বৌমনি অনেক খুশি।
আমাদের আসার কথা শুনে তারা সবার জন্য বাইরে থেকে খাবার কিনা এনেছেন।
যদিও পিসিমনি আমরা আসার পর হালকা কিছু রান্না করেছিলেন….

জার্নি করে আসায় আমি আর নবু বেশ ক্লান্ত। সেই সাথে সারাদিন বাইরে কাজ করে মুগ্ধ দা আর মহিমা বৌমনি ও টায়ার্ড। তাই খাবার পর আড্ডা না দিয়েই আমরা যে যার মতো রুমে চলে গেলাম ঘুমাতে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দেখি পিসিমনি রান্নাঘরে সকালের খাবার বানাচ্ছেন।
আমি তার কাছে গেলাম।
আমাকে দেখে পিসিমনি বললেন…

— ঘুম ভেঙে গেছে..

— হ্যা।

— তোরা না খুব ভালো সময় এসেছিস।

— কেন?

—আমাদের নতুন বিজনেসের জন্য যে অফিস টা নেওয়া হয়েছে সেটা আজ ফাইনাল হবে।

— তাই..
খুব ভালো খবর তো..

— হ্যা,তাই তো আজ দুপুরে আর রাতে আমরা বাইরে খাবো।রাতে একবারে ডিনার সেরে বাসায় ফিরবো..

— তাহলে এখন এতো রান্না করছো কেন?

— এত কোথায়?
আমাদের সবাত জন্য অল্প অল্প করে তিনটি আইটেম রান্না করছি..

— ও..

রান্না শেষ হবার প্র সকালের খাওয়া সেরে আমরা সবাই মিলে নতুন অফিস দেখতে গেলাম।
নতুন অফিসটা খুব সুন্দর পুরো পাচ তলা বিল্ডিংটা নিয়ে অফিস করা হবে।
লোকেশন সহ অফিস টা শহরের একদম প্রানকেন্দ্র অবস্থিত….

সারাদিন খুব মজা,ঘোরাঘুরি শেষে রাতে খাবার খেয়ে বাড়িতে ফিরে আমরা সবাই আবার সবার মত ঘুমিয়ে পড়লাম।
এভাবেই একসপ্তাহ কেটে গেল।আনন্দের দিন গুলো সত্যি খুব দ্রুত কেটে যায়।সেগুলোর নাগাল পাওয়া যেন দুষ্কর হয়ে যায়।

সকালে ঘুমিয়ে আছি হঠাৎ নবুর চিৎকার করে উঠলো।
ওর চিৎকার কানে আশার সাথে সাথেই আমি লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বিছানায় বসে পরলাম।
আর নবু র দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবছি ও কেন এমন করলো?
ভয় পেয়ে নাকি আনন্দে?
কারন ওর চোখ মুখের ভাব দেখে মোটেই মনে হচ্ছে না সে কোন বিষয়ে চিন্তিত বা ভয় পেয়েছে বরং ওর চোখ মুখে আনন্দের ঘনঘটা।

আমাকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হুট করে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো
আর কানেকানে যে কথা বললো তাতে আমার ও রাগ
হাসিতে পরিনত হলো…

—- তুই জানিস তোর চিৎকারে আমি কতটা ভয় পেয়েছি।

এবার নবু আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললো…..

—- আরে তুই জাস্ট ভয় পেয়েছিস আর আমিতো পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম খবরটা শুনে।

— তা সাহেব এখন কোথায় বাদলি কবে তার?

— বদলির জন্য নাকি অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করছেন।তার পর কয়েক দিন আগে নাকি নোটিশ পেয়েছেন আর আর আজ নাকি আসবেন।

— তা তোর তো ভালোই হলে বর মশাই যশোর চলে আসলো,শ্বশুর বাড়ি ও এখানে আবার পিসিমনির বাড়িও এখানেই,একই শহরে। তোকে আর পায় কে?

— ধ্যাৎ,
চুপ করতো…

— আহা….. রে..
আমি কেন চুপ করবো কেন?

দুজনে ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে দেখি সবাই আমাদের জন্য খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছে।
সকালের খাবার খেয়ে সবাই মিলে বসে গল্প করছি।
তখনই মহিমা বৌমনি আমারে হাতে একটি শপিং ব্যাগ ধরিয়ে দিলো।তারপর নবু কেও দিলো।
আমরা দুজনেই অবাক হয়ে মহিমা বৌমনি দিকে তাকিয়ে আছি।আমাদের তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে হেসে দিয়ে বললো…

—- এভাবে তাকিয়ে আছ কেন তোমরা।

—- না মানে বৌমনি হঠাৎ আমাদের শপিং ব্যাগ দিচ্ছো কেন?(নবু)

— এখানে শুধু ব্যাগ না।
ভেতরে সারপ্রাইজ ও আছে (বৌমনি)

— সেটা তো বুঝলাম কিন্তু হঠাৎ গিফট দেবার কারণ (আমি)

—- কেন তোমরা কি আমার পর যে তোমাদের কিছু দিতে পারবো না ( বৌমনি)

— না,সেটা কিন্তু বলিনি।
শুধু কারণ টা জানতে চাইছি…(আমি)

—- কাল বাড়িতে একটি অনুষ্ঠান আছে।তাই আমি আর মুগ্ধ তোমাদের জন্য এগুলো কিনে এনেছি

বিকেলের দিকে আমি, নবু আর মহিমা বৌমনি ছাদে যাবো বলে ঠিক করলাম।
এখানে আসার পর ছাদে তেমন একটা আশা হয়নি।তবে আজ যাবার কারণ হচ্ছে বাইরে প্রকৃতি রিমঝিম বৃষ্টিতে ভিজছে।
আর বৃষ্টির এই অপরূপ দৃশ্য এরিয়ে যাবার ক্ষমতা কারো নেই।

বৃষ্টি পছন্দ করে না এমন মানুষ হয়তো এই ধরায় খুব কম আছে।আর কিছু মানুষ আছে যারা শারীরিক অসুস্থতা বা সমস্যার কারণে বৃষ্টিতে আপন মনে ভিজতে পারে না।
বৃষ্টি মানেই তো প্রকৃতির সব নোংরা ধুয়ে সব কিছু পরিষ্কার আর সজীব করে তোলা।

বাসায় থাকলে মা কখনোই আমাকে ভিজতে দেয় না। তাই আজকের এই সুবর্ন সুযোগটা কোন কিছুতেই হাত ছাড়া করা যাবে না।

তাই তিন জন মিলে ঠিক করলাম।আজ যাই হোক না কেন আমরা ভিজবো। আর পিসিমনি, পিসাই আর মুগ্ধ দা ওরা বাইরে গেছে ওদের ফিরে আসার আগেই আগেই আমাদের কাজটা সারতে হবে।
আর মহিমা বৌমনির কথা মতে ওদের শপিং করে বাড়িতে ফিরতে পায় দুই ঘন্টার বেশি সময় লাগবে…

তাই আর দেরি না করে ছাদে চলে গেলাম ভিজতে।

বেশ অনেকটা সময় ভিজলাম।
আমাদের আরো ভেজার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু বৃষ্টি থেমে যাবার কারণে মন খারাপ করে আমাদের চলে আসতে হলো।

ছাদের সিড়ি থেকে নেমে রুমে আসার সময় হঠাৎ কানে এলো কলিংবেলের আওয়াজ।
আওয়াজ কানে আসায় ভয়ে আমাদের তিনজনের অবস্থা খারাপ।
তিনজন তিনজনের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম।
তখনই আমাকে অবাক করে দিয়ে ওরা দৌড়ে নিজেদের রুমে গিয়ে রুম লক করে দিলো।
এবার আমি কোথায় যাবো?
কারণ আমি আর নবু তো একই রুমে থাকি?

কি আর করা। “বলির পাঠ” তো এখন আমাকেই হতে হবে…

ভয়ে ভয়ে মেইন ডোর খুলে দিলাম।সামনে তাকিয়ে আমি শেষ।
মানুষ ঠিকই বলে ” যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়”””

এখন আমি পালাবো কোথায়?
কারন আমার সামনে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন..

” নীলাদ্রি দা””‘

চলবে…..

#শ্যামারঙা
লেখিকাঃ বৃষ্টি সরকার অধরা
পর্বঃ ৩১

ভয়ে ভয়ে মেইন ডোর খুলে দিলাম।সামনে তাকিয়ে আমি শেষ।
মানুষ ঠিকই বলে ” যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়”””

এখন আমি পালাবো কোথায়?
কারন আমার সামনে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন..

” নীলাদ্রি দা””‘

নীলাদ্রি দা দরজার ওপাশে রাগী মুডে দাঁড়িয়ে আছেন আর আমি দরজার এপাশে ভেজা কাপড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি।
ভয়ে আমার গা- হাত- পা কাপছে সাথে খুব শীত শীত লাগছে।
মনে হচ্ছে যেন এখনি জ্বর আসবে।
আমাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নীলাদ্রি দা কোন কথা না বলেই পাশকাটিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলেন।

আমি খুব কষ্টে বাড়ির মেইন দরজা বন্ধ করলাম।
মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। চোখে কেমন ঝাপসা দেখছি।
সিড়ির দিকে যাচ্ছি কিন্তু ক্রমেই মনে হচ্ছে সিড়ি দূর চলে যাচ্ছে।
কোন ভাবেই সিড়ির নাগাল আমি পাচ্ছি না।
তবুও অনেক কষ্ট করে হাটতে লাগলাম।
হঠাৎ মাথাটা কেমন করে উঠলো।
সামনের সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।

চোখ মেলে সামনে তাকিয়ে দেখি সবাই চিন্তিত মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আর আমি শুয়ে আছি।
সবার মুখের ভাব দেখে ভাবতে লাগলাম কি করেছি আমি?যে সবাই এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর আমি এখানে শুয়ে আছি কেন??

আমাকে তাকাতে ফেখে মহিমা বৌমনি আমার পাশে এসে বসলেন।আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন..

— আগে কেন বলো নি যে তোমার বৃষ্টির জলে এলার্জি আছে?
এই যে এখন ধুম জ্বর এসেছে এর কি হবে??

তাই তো এখন কি হবে আর আমায় রুমে আনলো কে?
জিজ্ঞাসু ভাবে মহিমা বৌমনির দিকে তাকালাম।
আমার মুখ দেখে তিনি কিছু আন্দাজ কতেছিলেন তাই বলেন…

— ভাগ্যিস নীলাদ্রি তখন নিচে ছিলো তাই তো যখন তুমি জ্ঞান হারালে তোমাকে সামলে নিয়েছিলো।

মহিমা বৌমনির কথা শুনে আমি আবার আশ-পাশে চোখ বুলিয়ে নিলাম।কিন্তু নীলাদ্রি দাকে দেখতে পেলাম না…

তারপর এক এক করে পিসিমনি, পিসাই আর মুগ্ধ দা আমাকে সামান্য বকা- ঝকা করে রুম ত্যাগ করলেন।
ওদের চলে যাবার পর নবু মুখ গোমরা করে আমার পাশে এসে বসলো…

ঠান্ডা লাগলে আমার কথা বলতে খুব কষ্ট হয়।
তারপর ও অনেক কষ্ট গলা থেকে আওয়াজ বের করে নবু কে জিজ্ঞেস করলাম…

—কি হয়েছে রে তোর,
এভাবে বাংলার পাচের মতো মুখ করে রেখেছিস কেন?

— তুই তো একটু মনে করিয়ে দিতে পারতি?

— বাদ দে না রে..

— বাদ দেবো মানে?
তোর জন্য আমি আজ কত বকা শুনেছি। সে বিষয়ে তোর কোন ধারণা আছে?

— বকা কেন শুনেছিস,আর কে বকেছে?

— কে আর বকবে দাদাভাই ছাড়া।
আর কেন বকেছে সেটা জিজ্ঞেস করিস না…
আর শোন আজ থেকে আমার রুম আলাদা হয়েছে।

— কেন?

— আজ থেকে তোর এই ঘর থেকে বের হওয়া মানা আর দাদাভাইয়ের অনুমতি ছাড়া তোর সাথে কেউ দেখা করতে পারবে না।
আর..

–কি?

— আর আজ থেকে যতদিন না তুই সুস্থ হচ্ছিস ততোদিন দাদাভাই তোর খেয়াল রাখবে…

— কী

— হ্যা…
বৌমনি চলো দাদাভাই আসার সময় হয়ে গেছে।
এখানে এসে যদি দেখে আমাকে আবার বকবে…

ওরা চলে যাবার কিছু সময় পর নীলাদ্রি দা রুমে এলেন।আমি।চুপচাপ শুয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করছি। তিনি আমার পাশে এসে দাড়ালেন আর কী এক্সেন ভাবছিলেন।
আমি ওনাত দিকে তাকাতেই।
আমাকে ইশারা দিয়ে উঠে বসতে বললেন।
আমিও উঠে বসলাম।
তখন তিনি আমার হাতে থার্মোমিটার দিয়ে বললেন….

— তাপমাত্রা টা মেপে দেখতো?

মাপা শেষে ওনার হাতে থার্মোমিটার টা দিলাম….

—১০৪ ° তাপমাত্রা?

এই তুই কি মানুষ?
তোর বৃষ্টি র জল সহ্য হয় না তারপরও এর ছেলে মানুষী কেন?
মনটা যা চাচ্ছে না….

বলেই তিনি হাত মুষ্ঠি বদ্ধ করে দেওয়ালে আঘাত করলেন।
ওনার রাহ দেখে আমি ক্রমশ ঘামছি।
অনেক ভয়ে ভয়ে কোন মতে মুখ থেকে উচ্চারণ করলাম…

— সরি।

সরি শুনে তিনি রক্তিম চোখে আমার দিকে তাকালেন।
তারপর ফোন বের করে কাকে যেন ফোন দিলেন আর রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আমি ভয়ে ক্রমশ ঘামছি।
মাথাটা আবার ঝিম ঝিম করছে। মনে হচ্ছে সব কিছু অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে…..

কানে আসছে কেউ যেন আমাকে ডাকছে।
কিন্তু চোখ খোলার শক্তি আমি পাচ্ছি না।
চোখের পাতায় যেন ভারি কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ডাকটা ক্রমেই আরো বেশি কানে আসতে শুরু করলো তাই অনেক কষ্ট করে চোখমেলে তাকালাম।

আমার সামনে সবাই চিন্তিত মুখে দাড়িয়ে আছে।
আর পাশে বসে আছে একটি লোক যিনি আমার হাতের নাড়ীর গতি-বিধি নিরিক্ষা করছেন।
আমাকে তাকাতে দেখে সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালেন।
আর পাশেবসা লোকটার কাছে জিজ্ঞেস করলেন আমার কন্ডিশন কি?

তিনি বলেন…
— জ্বরের কারণে এমন হয়েছে আর ব্লাড প্রেশার কমে গিয়েছে যার দরুন জ্ঞান হারিয়ে ছিলাম।
প্রোপার রেষ্ট আর কোন ভাবেই ঠান্ডা লাগে এমন কিছু করা যাবে না।
সেই সাথে মেডিসিন গুলোও ঠিক ভাবে খেতে হবে না হলে ইনজেকশন নিতে হবে।

রাতে নীলাদ্রি দা আমার রুমে এলেন।
আমি তখন শুয়ে ছিলাম।
তিনি এসে খাবার খাওয়ার আগের মেডিসিনটা দিলেন।
আমি কিছু সময় ওনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
যার অর্থ ” আমি খাবো না”

আমার তাকানোকে গ্রাহ্য না করেই তিনি চোখ লাল করে তাকালেন আর আমি ভয়ে খেয়ে নিলাম।

এভাবেই একসপ্তাহ কেটে গেল।
আমার জন্য পিসিমনিদের অনুষ্ঠানটি হয়নি। তবে সেটা কিছু দিন পর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এখন আমি মোটামুটি বেশ সুস্থ। তাই আজ আমরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছি তবে সেটা আমাদের ইচ্ছে তে নয়।
নীলাদ্রি দার ইচ্ছেতে।
এই কয়দিনে লোকটা আমার সাথে কোন কথা বলেন নি।
আমি যতবার বলতে গিয়েছি ততোবারই তিনি আমাকে ইগ্নোর করেছেন।

গাড়িতে বসে আছি।
একটি গাড়িতে আমি আর নীলাদ্রি দা যাবো অন্যটা তে যাবে নবু আর অর্পন দা

এই লোকটা কে আমি জাষ্ট বুঝতে পারি না।
এমন কেন উনি?
একেই আমি।অসুস্থ তার ওপর আমার সাথে তিনি কোন রকম কথা বলেন নি ও বলছেন না।
আর সেই সাথে কারোর সাথে আমাকে কথা বলতেও দেন নি।

যদিও গলা ব্যথার দরুন আমারও কথা বলা হয়ে ওঠে নি।
তারপর ও তো আমি শুনতে পাই।

নাকি আমি বোবা আর বয়রা ( কানে কালা)।।।

চলবে….

( দেরি করে দেবার জন্য সরি।
সেই কারণটা আপনারা যানেন)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here