হৃদয়ের দহন পর্ব -০৪ ও শেষ

#গল্পঃহৃদয়ের দহন ♥
#Mst Shefa Moni
#পর্বঃচার (শেষ পর্ব)

সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ার পরও যখন নীলা পার্কে আসলো না, তখন সানভী মিট করার আশা ত্যাগ করে বাসায় রওনা দিলো!
অর্ধেক রাস্তা না যেতেই ওকে জেসিকা ফোন করলো! সানভী সাথে সাথে ফোনটা রিসিভ করলো।
ওপাশ থেকে জেসিকা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো-
–“সানভী নীলা কি তোমার সাথে আছে?”
সানভী বাইক থামিয়ে উত্তেজিত হয়ে বললো-
–“না কেনো? নীলা বাসায় নেই?”
–“আসলে ওর ফোন থেকে শুরু করে সকল জিনিস পত্র রুমে আছে, শুধু ওই নেই! তুমি প্লিজ একটু আমাদের বাসায় আসো সামনা সামনি কথা হবে!”

সানভী সিয়াম কে নিয়ে প্রায় বিদ্যুত বেগে জেসিদের বাসায় পৌঁছুলো। সে নীলার রুমে গিয়ে দেখলো তার পাঠানো শাড়ি গুলো বেডের উপরে পরে আছে! বালিশের পাশে ফোনটা উল্টো করে রাখা আছে! আনলায় ওর পড়নের কাপড় গুলো গুছিয়ে রাখা আছে! রুমে বিশেষ তেমন কিছু অগোছালো চোখে পরলো না! সব কিছুই ঠিকঠাক ভাবে রাখা আছে! সানভী তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে পুরো গোটা রুম পর্যবেক্ষণ করেও কোন ইস্যু খুঁজে পেলো না!

তাই সে উদগ্রীব হয়ে জেসিকাকে বললো-
–“কতক্ষন থেকে সে নেই?”
জেসিকা কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো-
–“দুপুরে বাইরে যাওয়ার সময় আমি ওকে দেখে গিয়েছিলাম! তখন সে চুল বাঁধছিলো! সন্ধ্যার একটু আগে এসে দেখি সে নেই।”
–“দরজা কি লক করা ছিলো?”
–“হ্যাঁ, দরজা বাহির থেকে লক করা ছিলো! আমি ওকে পুরো বাসা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। ওর পরিচিত যে দুই একজনকে আমি জানি তাদের কাছেও নক করেছি। কিন্তু কেউ ওর বিষয়ে কিছু বলতে পারছেনা! শেষে বাধ্য হয়ে তোমার কাছে নক করলাম।”

সানভী নীলার ফোন হাতে নিয়ে দেখলো কল লিস্টে শুধু ওর আর জেসির নাম্বার আছে!
সানভীর চোখে মুখে স্পষ্ট ভাবে দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠলো। সে সিয়ামকে নিয়ে নীলার পরিচিত প্রত্যেকটা জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো! কিন্তু কোথাও নীলার হদিস খুঁজে পেলো না। শেষে বাধ্য হয়ে থানায় ডায়েরী করে বাসায় রওনা দিলো!

রাত প্রায় দশটার দিকে সানভী বাসায় চলে আসলো! সাহানা বেগম তখন কিচেনে রান্না-বান্না নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তাই সানভীর আগমন তার দৃষ্টিপাত হলোনা।

সানভী রুমে গিয়েই দরজা লক করে দিলো! সোফার উপর বসে বাম হাত দিয়ে কিছুক্ষণ শক্ত করে কপাল চেপে ধরে রাখলো। আবেগের অতিমাত্রায় চলে গেলে মানুষের যেমন স্বাভাবিক সেন্স হারিয়ে যায় সানভীর সাথেও ঠিক তেমনি হলো। অনেক চেষ্টা করেও সে কান্না থামাতে পারলো না। নীলার কথা মনে হতেই সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।

সানভীর কান্নার শব্দ শুনে সাহানা বেগম দৌড়ে ওর রুমে চলে আসলো। ভেতর থেকে দরজা লক করা থাকায় সানভীর নাম ধরে ডাকতে লাগলো! কিন্তু সানভীর সেদিকে কর্ণপাত নেই। সে ছোট বাচ্চাদের মত করে একটানা কাঁদতে লাগলো!

কিছুক্ষণ পর সানভীর বাবা এসে দরজা নক করার পর সে খুলে দিলো। চোখ দুটো তার রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে। সে দরজা খুলেই ওর মা কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। সানভীর বাবা অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলো-
–“কি হয়েছে তোমার? আমায় বলো!”
সাহানা বেগম ও একই কথা জিজ্ঞেস করলেন।
কিছুক্ষণ পর সানভী কান্না থামিয়ে বললো-
–“নীলাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!”
সাহানা বেগম খুব স্বাভাবিক ভাবে বললেন-
–“তাতে আমাদের কি! মাথার উপর থেকে বোঝা টা নেমে গেছে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় কর!”
সানভী অভিমান করে বললো-
–“তুমি কাকে বাইরের মানুষ বলছো মা? নীলাকে? সে কিভাবে বাইরের মানুষ হয়?”
–“অতো কিছু আমি জানিনা! তুই যদি ফের ঐ হতচ্ছাড়ি টার কথা তুলিস তাহলে কিন্তু আমি আর এই বাসায় থাকবোনা! আর হ্যাঁ, তুই ভুলে যাসনা যে তোর কথা মতোই কিন্তু সব কিছু হয়েছিলো!”

কথাগুলো বলেই সাহানা বেগম হনহন করে তার রুমে চলে গেলো! সানভী ওর বাবার দুই হাত ধরে বললো-
–“আমি জানি বাবা, যা কিছু হয়েছে সব আমার কথাতেই হয়েছে! কিন্তু তাই বলে তোমরা এখন আমার ভুল টাকেই সঠিক বলে ধরে নেবে? আমাকে আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্য করতে দেবে না?”
সানভীর বাবা খুব ভেবে চিন্তে কথা বলতে লাগলেন-
–“তুমি তো জানো, তোমার বিয়ের ব্যাপার টা তোমার মা নিজে দায়িত্ব করে নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলো! কিন্তু তোমার কিছু বোঝার ভুলে সে তার দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে এখন ভীষণ রেগে আছে! তাই আপাতত নীলার বিষয় টা এখন না উঠানোই ভালো হবে!”

কথাগুলো বলেই সানভীর বাবাও ওনার রুমে চলে গেলেন! সানভী সেদিন রাতের খাবার না খেয়েই সারা রাত কেটে দিলো!

02-09-2016–
বিগত কয়েকদিন থেকে সানভীর ঘুম, নাওয়া খাওয়া সব বন্ধ হয়ে গেছে। সে খুব ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে রাত এগারো বারোটা পর্যন্ত তার চেনা জানা প্রত্যেকটা জায়গায় নীলাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে! বাসার কারো সাথে ঠিক ঠাক মতো কথা বলেনা! রিশা যদি একটু আধটু কথা বলার সুযোগ খোঁজে তাহলে সানভীর চোখ মুখের চাহনি দেখেই সে ভয়ে কথা বলার সাধ হারিয়ে ফেলে!

সানভীর মেজাজ খুব খিটখিটে হয়ে গেছে। নরমাল কথাতেও সে রেগে যায়!

07-09-2016–
সাহানা বেগম সানভীকে প্রায় ব্লাকমেইল করার মতো করে রিশাকে বিয়ে করতে রাজি করিয়েছেন! তিনি সানভীকে বলেছেন যদি সে বিয়েতে রাজি না হয় তাহলে উনি সুইসাইড করবেন!

11-09-2016–

আজ সানভীর বিয়ে! এই কয়দিনে তার নীলার উপরে যথেষ্ট রাগ আর অভিমান জমা হয়ে গেছে। সে বিয়েতে সম্মতি জানানোর পূর্ব মহুর্তে শুধু একটা কথায় ভেবেছে, যদি নীলা ওকে সত্যি ভালোবাসতো তাহলে কখনোই ওকে ফেলে এভাবে হারিয়ে যেতোনা!

সানভী সারাদিন ঘুমিয়ে ঠিক সন্ধ্যার দিকে উঠে পরলো। গোসল সেরে বরের বেশে ঝিম মেরে বসে রইলো। প্রথমবারের মতোই এবারো তার মনে কোন আনন্দের রেশ নেই!

বাসায় রিশার ফ্যামিলির কিছু লোকজন, সিয়াম, জেসিকার ফ্যামিলির কিছু লোকজন আর সানভীর ফ্যামিলির সদস্যরা ছাড়া বাহিরের কোন লোকজন নেই!

সানভীর বাসাতেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন হলো। জাস্ট পাত্র-পাত্রীকে শুধু আলাদা রুমে রেখে কবুল নেওয়া হয়েছে। সানভী অবশ্য একবারো জানতে চায়নি কেনো রিশার বাসাতে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হলো না। সেদিকে তার কোন আগ্রহ নেই!

তার মাথায় এখন শুধু একটা চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কখন রাত পেরিয়ে ভোর হবে আর কখন সে দেশের বাইরে পাড়ি জমাবে!

প্রায় মাঝরাতের দিকে সানভী বাসর ঘরে প্রবেশ কলো। যদি ওর রুমে বাসর সাজানো না হতো তাহলে সে বাসর ঘরে ভুল করেও প্রবেশ করতো না। এসেই সে ওর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছগাছ করতে শুরু করলো। কাপড়-চোপড় থেকে শুরু করে কাগজ পত্র সব। বেডের দিকে সে ভুল করেও তাকালো না।

সবাই জেগে ওঠার আগেই সে খুব ভোরে বাসা থেকে বের হবে। তাই সব কিছু প্যাকেট করে নিয়ে সে গেস্ট রুমে যাওয়ার জন্য দরজার কাছে গেলো। কিন্তু দরজা খুলতে গিয়ে দেখলো বাহির থেকে দরজা লক করা।

রাগে সে চিৎকার চেঁচামেচি করতে চাইলো! কিন্তু ভদ্রতা বজায় রাখতে গিয়ে সেগুলো কিছুই করতে পারলো না!

এতোক্ষণ পর সে বেডের দিকে তাকালো। আর তাকাতেই সে কিছুটা চমকে গেলো। নীলা যেমন বাসর রাতে বড় একটা ঘোমটা টেনে বসেছিলো রিশাও তেমনি একটা বড় ঘোমটা টেনে বসে আছে। তার চেয়েও বেশি অবাক করার বিষয় হলো সেদিন নীলার পড়নে যে শাড়ি ছিলো আজ রিশার পড়নেও সেই একই শাড়ি!

তবু সানভীর সেদিকে কোন ইন্টারেস্ট নেই। সে চুপচাপ সোফায় গিয়ে শুয়ে পরলো! একটু পর ওর মা আর রিশার মা একটা গ্লাসে করে সরবত নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো। সানভী শোয়া থেকে উঠে বসলো! রিশার মা সানভীর হাতে সরবতের গ্লাস টা দিয়ে বললো-
–“নাও বাবা, এটা আগে তুমি খাও তারপর ওকে খাওয়াও!”
সানভী মুখটা কাঁচুমাচু করে ঢোক গিলতে গিলতে গ্লাস টা হাতে নিলো। এক চুমুক খেয়েই সে রিশার কাছে গেলো! রিশার ঘোমটা টা তুলতেই সে যেনো আকাশ থেকে পরলো। সাথে গ্লাস টাও হাত থেকে পরে গেলো!

এ যে নীলা! সানভী ফ্যালফ্যাল করে নীলার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর এক এক করে সবাই রুমে আসলো! রিশা, জেসি, সিয়াম! মুলত এই তিনজনেরই প্ল্যান টা ছিলো!

কিছুক্ষণ পরেই সানভীর ঘোর কেটে গেলো! সে রিশাকে একটা বড় করে ধন্যবাদ জানিয়ে দিলো। সবাই কিছুক্ষণ সানভীকে জ্বালিয়ে রুমে থেকে বেরিয়ে গেলো! সানভী দরজা ভেতর থেকে লক করে দিলো!

নীলা সানভীকে দেখে ভয়ে মুখ আমতা আমতা করে বললো-
–“আআমি কিন্তু কিছু করিনি!”
সানভী একটা তৃপ্তির হাসি হেসে বললো-
–“নো প্রবলেম! আমিও জানি কিভাবে সবকিছু সুদে আসলে বুঝে নিতে হয়!”
কথাটা বলেই সে রুমের লাইট অফ করে দিলো!
নীলা ঢোক গিলতে গিলতে বললো-
–“ঐ রুমের লাইট অফ করলে ক্যান?”
সানভী শয়তানি হাসি দিয়ে বললো-
–“সরি মাই ডার্লিং! রুমের লাইটে আমারও কোন আপত্তি নেই!”
সানভীর কথা শুনে নীলা তো পুরাই ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো!

………… .সমাপ্ত…………..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here