তুমিই আমার প্রিয় নেশা পর্ব ১৪+১৫

#তুমিই_আমার_প্রিয়_নেশা
#পর্ব:14
#Suraiya_Aayat

নূরের হাত ধরে বসে আছে আয়াশ, নূরের হাতের আঙুল গুলোকে মুঠিবদ্ধ করে রেখেছে৷ নূরের দিকে তাকিয়ে আছে আয়াশ এক পলকে ৷ আজ ওর একটু অসাবধানতায় নূরের এই অবস্থা ৷ কিছুখন আগের কথা আয়াশের বারবার মনে পড়ছে , মেয়েটা হাওয়াই মিঠাই খেতে চেয়েছিলো তাও হলো না ৷ যে এই কাজটা করেছে আয়াশ তাকে ছাড়বে না যেকোনো মূল্যে তকে সাজা পেতেই হবে ৷ নূরের কপালের কাটা অংশটার দিকে তাকালো আয়াশ, সেখানে সাদা পট্টি দিয়ে ব্যন্ডেড করা আর চার টে সেলাই পড়েছে সেখানে, প্রতিবার সুচ বিধাতেই নূরের শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিলো, তবে একটা মুহুর্তর জন্যও আয়াশ ওর হাত ছাড়েনি ৷ কিন্তু আয়াশের এতো ভালোবাসার এক অংশও নূর না দেখতে পেয়েছে আর না অনুভব করতে পেরেছে ৷ নূরের দিকে নিষ্পলক ভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আয়াশের বাম চোখ থেকেই আচমকা টপ করে জল গড়িয়ে পড়তেই আয়াশ চমকে গেল ৷ আয়াশের জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আয়াশ কেবল একবার ই কেঁদেছিলো, যখন ওর মা মারা গিয়েছিলো সেই খবর শুনে আর আজ নূরের এই অবস্থা দেখে ওর চোখ থেকে জল গড়ালো ৷ আয়াশ চটপট জলটা মুছে নিলো , মনে মনে বলল
” কুল ডাউন আয়াশ সি ইজ ইউরস , ওনলি ইউরস ৷”

পাশ থেকে ডক্টরের কন্ঠস্বর ভেসে এলো
” মিস্টার আয়াশ আপনার ওয়াইফ মাথায় আর কোমরে আঘাত পেয়েছে ৷ ঠিক হতে কয়েকদিন সময় লাগবে, ওনাকে বেশি হাটাচলা করতে দেবেন না, আর ওনাকে দিয়ে কোন কাজ করাবেন না, আর মেন্টালি কোন প্রেশার দেবেন না , এন্ড নাও ইটস আপ টু ইউ ৷”

আয়াশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো, আপাতত কিছু বলতে ইচ্ছা করছে না ওর , তবুও মনে জোর নিয়ে বলল
” ওর জ্ঞান ফিরবে কখন?”

” জ্বি, ওনার আর এক দুই ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান ফিরবে ৷”

” আমি কি তাহলে এখন বাসায় নিয়ে যেতে পারি ?”

” জ্বি অবশ্যই পারেন কিন্তু যা যা বললাম একটু খেয়াল রাখবেন ৷”

আয়াশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো, আজ আয়াশ নূরের এই অজ্ঞানতায় যেন নিজেকে সবচেয়ে বেশী দূর্বল অনুভব করছে, নিজেকে আগে কখনো এতোটা লো ফিল হয়নি ৷ নূরের সাথে ভালো ব্যাবহার করুক আর না করুক নূর ওর সাথে থাকলে অদ্ভুত ভাবে ওর মনোবল বাড়ে ৷ আয়াশ নূরকে বেড থেকে তুলে কোলে নিলো , মেয়েটা সজ্ঞানে থাকলে হয়তো এতখনে ব্যাথায় কুঁকড়ে যেতো কথাটা ভাবতেই আয়াশের বুকের ভিতর ধুকধুক করছে ৷ ইফাও আয়াশ আর নূরের পিছন পিছন আসলো , ইফা এতখন বহু কান্নাকাটি করেছে , যতই হোক নূরকে ও নিজের বোনের মতো ভাবে ৷

আয়াশ নূরকে গাড়িতে তুলে নিয়ে বসলো, ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে, ইফা সামনের সিটে বসেছে আর আয়াশ ব্যাক সিটে নূরকে ওর কোলের মাঝে নিয়ে বসে আছে ৷ লাল রঙের শাড়িটায় ধুলো লেগে আছে, কিছু কিছু জায়গায় রক্তের ছাপ ৷ আয়াশ নূরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে যেন কোন বাচ্চাকে আগলে আগলে রাখছে ও ৷ নূরের দিকে তাকালেই বুকের ভিতর চিনচিন অনুভব করছে আয়াশ ৷

🎀

নূরকে বিছানায় শুইয়ে দিলো আয়াশ ৷ আশেপাশে সবাই ওকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ৷ ইফার চোখ কেঁদে কেঁদে ফুলে গেছে, আয়াশের খালাম্মু মানে ইফার মা নূরের পাশে বসে নূরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, ওনার চোখেও জল , মেয়েটাকে কে এমন ভাবে ধক্কা মারলো কেউ বুঝতে পারছে না, ইফা দেখেছিলো একটা লোক দৌড়ে পালাচ্ছে যখন নূর মাটিতে পড়ে গেছে, তার মুখটা ঢাকা ছিলো তাই ইফা ওনার মুখটা দেখতে পাইনি ৷ আহান ও দূরে দাঁড়িয়ে আছে ৷অয়াশের বাবা তিনি আজ এতো বছর পর নূরের জন্য ঘর থেকে বার হয়ে এসেছেন ৷ উনি বসে আছেন সোফাতে, মেয়েটার প্রতি ওনার মনে মায়ার পাহাড় গড়ে উঠেছে, নূর প্রতিদিন সকাল বিকাল ওনার ঘরে গিয়ে ওনার খাবার দিয়ে আসত , খুব ব্যাস্ত না থাকলে মাঝেমাঝে ওনার সাথে গল্পও করতো ৷ উনিও কাঁদো কাঁদো চোখে তাকিয়ে আছেন নূরের দিকে ৷ আয়াশ এখনো নূরের হাত ধরে আছে ৷ হঠাৎ আয়াশ কিছু বলতে যাবে তখনই আহান বলল
” ওই তো নূরের জ্ঞান ফিরেছে ৷ ”
কথাটা শুনে আয়াশ নূরের দিকে তাকালো, নূরের চোখ দুটো পিটপিট করছে ৷ আহান ছুটে যেতে গেলেও আয়াশের আফু সোনা ডাক শুনে পিছিয়ে গেল ‌৷ আয়াশ উত্তেজিত হয়ে বলল
” এই আফু সোনা ঠিক আছো তুমি ? আফু সোনা !”
নুর কিছুখন সবকিছু ঝাপসা দেখলো তারপর আস্তে আস্তে সবার মুখ ওর কাছে স্পষ্ট হতে লাগলো, আয়াশের গলার আওয়াজ ওর কানের কাছে এসে বাজছে ৷ নূর কথা বলতে পারছে না চুপ করে আছে ৷ আয়াশ এবার নুরকে বিছানা থেকে তুলে নিজের বুকের মাঝে আগলে নিলো , নূরের শরীরের তীব্র ব্যাথার কথা ওর হয়তো মনে নেই ৷ নূর আয়াশের বুকে মাথা রাখতেই আয়াশের হৃদস্পন্দন শুনতে পেল, মানুষের হৃদগতি যতো থাকে তার তুলনায় অতি দ্রুত হারে হৃদস্পন্দন চলছে ৷ হঠাৎ নূর শরীরে তীব্র ব্যাথার অনুভব করায় জোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো ৷
নূরের কান্নার আওয়াজ শুনে আয়াশের মনে হলো যে নূরের সমগ্র শরীর জুড়ে ব্যাথা তাই দ্রুত নুরকে বিছানায় শুইয়ে দিলো , নূর গলা ছেলে কাঁদছে , আয়াশ হয়তো ওর শরীরের যন্ত্রনাটাকে আরো দ্বিগুন করে দিয়েছে ৷
নূরকে এমন কাঁদতে দেখে আহান বলে উঠলো
” কি করছিসটা কি ওর অবস্থা কি তুই ভুলে গেছিস ? এমনিই শরীরের অবস্থা খারাপ তার ওপর তুই !”

আহনের কথাটাএই মুহূর্তে যেন আয়াশের সহ্য হলো না, আয়াশ চিৎকার করে বললো
“ওর সাথে যা করার আমি করবো, ওর ক্ষতি করতে হলেও আমি করবো, ওর ভালো করতে হলেও আমি করবো, তোমরা আমাকে বোঝাতে এসো না, ও আমার বউ আমার দায়িত্ব ৷ যাও এখান থেকে, ওর অবস্থা আমাকে বুঝে নিতে দাও ৷”

আহানের গলা ধরে এলো, ও খুব সাধারন ভাবে বলেছিলো আর তাতে আয়াশ এভাবে রিয়্যাক্ট করবে তা ও ভাবেনি ৷ ইফার মা আহানের অছে এসে বলল
” আহান বাবা থেমে যা তুই তো জানিস আয়াশ তোকে কতোটা ভালোবাসে, আসলে নূরের অবস্থা খারপ বলে ওর মাথার ঠিক নেই , তুই রাগ করিস না,চল এখান থেকে, আমরা ওকে বরং কিছুখনের জন্য একা থকতে দিই ৷”
আহান হ্যাঁ সম্মতি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল ৷ ইফা বেরিয়ে যেতেই ইফার মা আয়াশের মা কে ডাকলেন
” ভাইজান ৷”
আয়াশের বাবার কোন সাড়া শব্দ নেই, উনি কিছু একটা ভাবছেন ৷ ওনার ভাবনা ভঙাতে উনি আবার বললেন
” ভাইজান ৷ এই যে ভাইজান , চলেন আমরা না হয় পরে আসি ৷”

আয়াশের বাবা যেন একটু চমকে উঠলেন হঠাৎ ডাক শোনায়, উনি অবাক হয়ে বললেন
” কিছু বললে ?”

” জ্বী, আয়াশ আর নূর না হয় একটু একা থাকুক আমরা পরে আসি ৷”

উনি উঠে বললেন
” হ্যাঁ , ঠিক বলেছ, তুমি যাও আমি আসছি ৷”
উনি নূরের দিকে তাকালেন, নূর কাঁদছে , আয়াশ নূরের হাতটা মুঠিবদ্ধ করে মাথা নীচু করে বসে আছে, আয়াশের চোখের কোনে জল জমা হয়ে আছে শুধু গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষা ৷উনি ওনার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি দিয়ে আয়াশকে বললেন
” আমার নূর মায়ের খেয়াল রাখিস বাবা ৷”
আয়াশ কেবলমাত্র মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি জানালো, কথা বলতে গেলেও একটু শক্তির প্রয়োজন হয় যা আয়াশের মাঝে নেই ৷
উনি বেরিয়ে গেলেন ৷ নূর এখন জোর জোরে কাঁদছে, থামার নাম নেই, ওকে দেখে মনে হচ্ছে যেন ওর ওপর তীব্র অত্যাচার করা হয়েছে তাই এমন কান্না করছে ৷ আয়াশ মুখ উঠিয়ে নূরের দিকে তাকালো ,নূরের চোখের কোনা বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ে বালিশ ভিজছে ৷ আয়াশ হালকা কন্ঠ বলল
” এই আফু সোনা চুপ করো না প্লিজ , আমার বুকের মাঝে কেমন জানি হচ্ছে , তা তুমি কি বোঝোনা ৷”
নূরের কান্নার মাত্রা তীব্রতর হলো ৷ আয়াশ আর সহ্য না করতে পেরে জোরে ধমক দিয়ে বলল
” এই মেয়ে থামছো না কেন ! চুপ করতে বলেছি না ? আমার এই কান্না সহ্য হচ্ছে না তা কি বুঝতে পারছো না ? তখন থেকে বলছি না যে চুপ করো ! শুরূ করেছে তো থামার নাম নেই ৷”

নূর আয়াশের ধমক শুনে চুপ করে গেল ৷ অবাক চাহনিতে আয়াশের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ নূর থেকে যেতেই আয়াশ নূরের গলায় মুখ ডুবিয়ে অঝোর ধারায় কেঁদে দিলো যার কোন সীমা নেই ৷নূর কখনো ভবেনি যে আয়াশ কখনো ওর জন্য কাঁদবে ৷ আয়াশের শরীরের কিছুটা ভার নূরের শরীরের ওপর পড়ছে ,নূর ব্যাথা অনুভব করলেও মুখ বুজে সহ্য করে নিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে বলল,,,
” আপনি খুব খারাপ !”

” আমি তো জানি আমি খারপ, তোমাকে ভালো রাখতে পারি না, ভালোবাসতে পারি না, কেবল কষ্ট দিতে পারি , তাই তো আমি খারাপ আফু সোনা ৷”
আয়াশ কেঁদেই চলেছে যার থামার নাম নেই ৷
#তুমিই_আমার_প্রিয়_নেশা
#পর্ব:16
#Suraiya_Aayat

হঠাৎ ঘুমের ঘোরে নূর হুড়মুড় করে উঠতেই আয়াশের ঘুম ভেঙে গেল ৷ ঘুম যদিও চোখে ছিলোনা তবুও ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা করছিলো ৷ আয়াশের মাথায় অনেক চিন্তা ভাবনা ঘুরছে, আহানের জন্য কষ্টটা বেশি হচ্ছে ৷ নূর ওর বাহুডোরে ছিলো তাই নূরের ঘুম ভেঙে গেছে তা বুঝতে আয়াশের বেশি অসুবিধা হলো না ৷ ভোরের রেশটা কেটে গিয়ে সূর্য ধীরে ধীরে কিরন দিচ্ছে ৷আয়াশ উঠে নূরের দিকে তাকিয়ে বলল
” কি হলো আফু সোনা ব্যাথা পেয়েছো ?”

নূর ওর নিজের মধ্যে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে নামতে গেলেই আয়াশ ধমকে বলল
” কোথায় যাচ্ছো তুমি ? আমি যাওয়ার জন্য পারমিশন দিয়েছি ?”

নূর আয়াশের চাহনি উপেক্ষা করে নামতে গেলেই আয়াশ বলল
” এক পা ও যদি নামিয়েছো তাহলে আমি এমন কিছু করবো যা তুমি এই মুহূর্তে সহ্য করতে পারবে না, অযথা আমাকে রাগিয়ে দিও না,আর কোন কিছুর দরকার হলে আমাকে বলো ৷”

নূর এবার রাগী চোখে তাকিয়ে বলল
” আমার বদলে ওয়াশরুমে কি আপনিই যাবেন?”

নূরের কথায় আয়াশ ঘাবড়ে গেল ৷ একটু ইতস্তত বোধ করে বলল
” ওহহ,তাই বলো ৷ তা এটা এতো জটিল করে বলার কি ছিলো ? সোজাসাপটা বললেই হয় ওয়াশরুমে যাবে ৷”

আয়াশ বিছানা থেকে নেমে নূরকে কোলে নিতে গেলেই নূর বললো
” আমি হেটে যাবো ৷”

আয়াশ ভ্রু কুচকে বলল
” কেন আমি নিয়ে গেলে সমস্যা কি ?”

নূর নিজের কথায় অটুট থেকে বলল
” আমি পায়ে হেটে যাবো ৷ আমি আত্মনির্ভরশীল হতে চাই ৷”

আয়াশ নুরের কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেলল
” সত্যি আফুসোনা ! হাটবে বলে তার জন্যও আবার তোমার নিজের মাঝে এমন আত্মনির্ভরশীলতা জেগে উঠলো ৷ যাই হোক গুড ফর ইউ ৷”

কথাটা বলে আয়াশ নূরের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল
” হাতটা ধরে নামো ৷”
নূর জানে যে ও নিজে নামতে গেলে ধপ করে পড়ে কোমর ভাঙবে তাই এত কষ্ট আর নিজেকে দিতে চাইনা তাই আর কোনরকম তর্কাতর্কি না করে আয়াশের হাতটা ধরে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াতেই আয়াশ নূরের শরীরের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে নূরের কোমরে হাত রেখে নূরকে কাছে টেনে আনতেই নূর একটু থতমত খেয়ে গেল আর হালকা কেঁপে উঠলো ৷

নূর নিজের মধ্যে কঠোর ভাবটুকু আনতে চাইছে বারবার কিন্তু পারছেনা , বারবার যেন মনটা আইসক্রিম আর চকোলেটের মতো গলে যাচ্ছে ৷ একটু কম্পিত কন্ঠে বলল
” কি হচ্ছে কি , আমি ওয়াশরুম যাবো ৷”

আয়াশ নূরের কোমরে স্লাইড করতেই নূর আয়াশের টি শার্ট খামচি মেরে ধরে ফেলল, শরীর জুড়ে শিহরন বয়ে যাচ্ছে ওর ৷ আয়াশ ওর আর এক হাত নূরের কোমরে রাখতেই নূর মাথা নীচু করে নিলো , আয়াশ নূরের কানের কাছে গিয়ে কানে আলতো করে ঠোঁট ছুইয়ে বলল
” আমার পায়ের ওপর পা রাখো আফু সোনা ৷”

নূর আয়াশের কথা শুনে আয়াশের দিকে তাকালো , আয়াশের চাহনি স্থির আর খুব স্বাভাবিক কিন্তু নূরের দৃষ্টি চঞ্চল ৷ নূর ধীমে গলায় বলল
” কেন?”

” এই তুমি না বললে পায়ে হেটে ওয়াশরুম যাবে !”

নূর অবাক হয়ে বলল
” হমম বলেছি , তো ?”

আয়াশ বিচক্ষন ভঙ্গিতে বলল
” তো টো যাই হোক হোয়াটএভার ! তুমি কিন্তু একবার ও বলেনি যে নিজের পায়ে হেটে যেতে চাও তাই পা টা যে কারোর হতে পারে আর এক্ষেত্রে পা টা আমার ৷ তাই তুমি আমার পায়ে পা রেখে হেটে যাবে আর এটাই ফাইনাল, আর তুমি যদি ভেবে থাকো যে তোমার জেদ বজায় রেখে তুমি এখন অযথা আমার সাথে তর্ক করবে তাহলে ফাইন , ঝগড়া করো বাট আমার পায়ের ওপর পা রেখই তোমাকে হেটে যেতে হবে আর এটাই আমার শেষ আর ফাইনাল কথা ‌৷”

এক নাগাড়ে ফটাফট কথাগুলো বলে ফেলল আয়াশ , নূর অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ৷ আজকাল খুব অদ্ভুত রকম ব্যাবহার করছে ওর সাথে , আগের মতো আর জোর খাটাই না, কথায় কথায় আর রহস্য রেখে কথা বলে না, খুব সহজ ভঙ্গিতে কথা বলে কিন্তু নূর সে তো আয়াশের এই রুপের সাথে পরিচিত নয় ৷ আয়াশের এই রুপটাই ও চেয়েছিলো কিন্তু কোথাও না কোথাও আয়াশের সেই ডেভিল রুপটাকে নূর খুব বেশি মিস করছে ৷ যে আয়াশ কথায় কথায় ওকে ধমক দিতো, ওর ওপর জোর খাটাতো , নূরের সব সিদ্ধান্ত ও নিতো ‌৷ এটা যদি ক্ষনস্থায়ী বা তা কেবল নূরের অসুস্থতার জন্য হয় তাহলে নূর মেনে নেবে নতুবা নয় কারন ও সেই ডেভিল আয়াশকে ভালোবেসেছে আর তাকেই চাই ৷
নূর বেশ ভালোই বুঝলো যে আয়াশ যা বলেছে তার বাইরে আয়াশ একটা কাজ ও করবে না তাই এই মুহূর্তে আয়াশের সাথে তর্কাতর্কির যুদ্ধে নামা বৃথা ৷ বেশি কথা না ভেবে নূর ওর এক পা আয়াশের পায়ের ওপর রাখলো , আর এক পা রাখতেই নূর কোন একটা কিছুর ভয় পেয়ে ধড়ফড় করে আয়াশের পা থেকে পা নামিয়ে নিলো ৷ আয়াশ মুচকি হেসে বলল
” কি হলো আফু সোনা পা নামিয়ে নিলে যে ! চিন্তা নেই আমার পা ভাঙবে না, এখন আর আগের মতো জিম না করলেও এটুকু শক্তি আছে যে তোমার মতো আরো কয়েকটা বউকে কোলে তুলে নিয়ে পুরো ধানমন্ডি ঘুরতে পারবো , বুঝলে আফু সোনা ?”

আরো কয়েকটা বউয়ের কথা শুনে নূরের রাগ উঠে গেল, তাই রাগটা আর কারোর ওপর না আয়াশের ওপরই ঝাড়া প্রয়োজন তাই রেগে গিয়ে বলল
” এমন দাঁত বার করে হাসছেন কেন? ওয়াশরুম যাবো বলেছিলাম আর আপনি হাজারটা বউ নিয়ে চলে এলেন আবার তাদেরকে ধানমন্ডি ও ঘোরাচ্ছেন ৷ হোয়াটএভার আপনি যাকে খুশি নিয়ে ঘুরুন আই ডোন্ট কেয়ার বাট আপাতত আমাকে ওয়াশরুম অবধি দিয়ে আসলে হবে ৷ যাবেন কি না ? ইয়েস অর নো ?”

আয়াশ নূরের এমন কথা শুনে মুচকি হেসে লম্বা সুরে ডেকে বলল,
” আফুউউউউ সোনাআআআআআ !”
নূর আয়াশের দিকে বাকা চোখে তাকিয়ে বলল
” কি ?”

” মনের ভিতর জ্বালাপোঁড়া হয় ?”

নূর বুঝতে পারলো আয়াশ ঠিক কি ইঙ্গিত করতে চাইছে তাই রেগে গিয়ে আয়াশের পায়ের ওপর পা রেখে , নিজের পা দুটো খানিকটা উঁচু করে আয়াশের গলা অবধি ওর মুখটা নিয়ে গিয়ে আয়াশের গলায় কামড়ে ধরে রইলো ৷

আয়াশ নূরকে ছেড়ে না দিয়ে নিজের আরো কাছে টেনে নিতেই নূর কিছু একটা ভেবে ছেড়ে দিলো ৷

আয়াশ নূরের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল
” ভ্যাম্পায়ারনী হয়ে গেলে নাকি ? আজকাল যেখানে সেখানে কামড়ে নিচ্ছো ৷”

নূর ওর ঠোঁটটা মুছে বলল
” আপনি ডেভিল হলে আমার ভ্যাম্পায়ার হতে সমস্যা কি ? আর এতো কথাই বা হচ্ছে কেন? আপনি কি আজে আমাকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাবেন নাকি না ?”

আয়াশ আর কোন কথা না বাড়িয়ে নূরের নাকে একটা চুমু দিয়ে এক পা বড়াতে গেলেই নূর পড়ে যেতে গেলেই আয়াশ শক্ত করে ধরে বলল
” জামাইকে অন্য মেয়ের সাথে দেখলে রাগের বেলায় ষোলো আনা এদিকে নিজের চিন্তা জিরো ৷ এভাবে টি শার্ট ধরলে এমনিই পড়ে যাবে, গলা জড়িয়ে ধরো ফিল্মি স্টাইলে আর মাঝে মাঝে একটু রোমান্টিক চোখে তাকাবে তাহলে আমি শরীরে এনার্জি পাবো বুঝেছো ?”

নূর আয়াশের দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে , এটা ও কোন আয়াশকে দেখছে ? ও কখনো ভাবেইনি যে আয়াশের শক্ত খোলসে ঢাকা ব্যাক্তিত্বের মাঝেও একটা নরম হৃদয়ের মানুষ আছে ৷ আয়াশের গলা জড়িয়ে ধরে আয়াশের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে নূর ৷ ”

আয়াশ নূরকে নিয়ে হাটছে, হাটতে হাটতে হঠাৎ আয়াশ বলল
” মাঝে মাঝে তাকাতে বলেছিলাম আফু সোনা , এখন তো দেখছি তুমি আমার ওপর রিতীমতো নজর দিচ্ছো যদিও আমি জানি আমি খুব সুন্দর ৷” নুরের দিকে চোখ টিপ মেরে ৷
নূর আয়াশের কথাতে খানিকটা লজ্জাবোধ করতেই মাথা নামিয়ে নিলো ৷
নূরকে ওয়াশরুমে দিয়ে এসে আয়াশ বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলো ৷ হঠাৎ ফোনে ফোন আসতেই আয়াশ ফোনটা ধরতে গেল ৷ ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো
নূরের ভাইয়া ফোন করেছে ৷ ওনার কলটা দেখে আয়াশ কিছু একটা ভাবলো তারপর কলটা ধরতেই ওপাশ থেকে নূরের ভাইয়া বলে উঠলো
” হ্যালো আয়াশ নূর কেমন আছে?”

আয়াশ বেশ স্বাভাবিক ভাবে বলল
” ভালোই আছে ভাইয়া ৷”

” নূর যে অসুস্থ তা তুমি একবার ও আমাদেরকে ফোনটা করে জানালে না পর্যন্ত ! ওকে তোমার কাছে তুলে দিয়েছি মানে কি এটা যে ও কেমন আছে তার নুন্যতম খবরটুকু তুমি আমাদেরকে জানাবেনা ৷”

পাশ থেকে নূরের বাবার কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, উনি তারস্বযে চিৎকার করে করে বলছেন
” এই ছেলেকে আমার কোন কালেই ভালো লাগেনি , আমার তো মনে হয় নূরের এমন অবস্থার জন্য ওই দায়ী ৷”

নূরের ভাইয়া নূরের বাবাকে থামিয়ে বলল
” আহ বাবা একটু চুপ করো আমি কথা বলছি তো ! ”
কথাটা বরে আয়াশকে বলল
“বলছিলাম কি আয়াশ নূর অসুস্থ কিন্তু তুমি আমাদেরকে জানাও নি তবে আমরা তো আর আমাদের কর্তব্য কে অস্বীকার করতে পারি না তাই আমারা আজকে নূরকে দেখতে যাবো বিকালে, দরকার হলে কয়েক দিনের জন্য নূরকে এখানে আমাদের কাছে রাখবো, তারপর ও সুস্থ হলে তোমার কাছে না হয় ‌৷”

কথাটা বলতে না বলতেই আয়াশ বলল
” ওকে ৷ আমি এখন রাখছি , তোমরা আসলে এ বিষয়ে কথা হবে !”

আয়াশ ফোনটা কেটে বিছানায় ছুড়ে মারলো, ওর কপালের চামড়ার সূক্ষ ভাঁজ আর রাগের আভা স্পষ্ট ৷ নূর ওয়াশরূমের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে , এতখন আয়াশের কথাগুলো শুনছিলো মনোযোগ দিয়ে, যদিও বুঝতে পারেনি আয়াশ কার সাথে কথা বলছিলো আর হঠাৎ ওর এই রাগের কারন কি ৷ আয়াশ নূরের কাছে গিয়ে নূরকে কোলে তুলে নিলো, নূর ভেবেছিলো আবারো হয়তো আয়াশের পায়ে ভর করে হেটে যাবে কিন্তু হঠাৎ আয়াশ কলে নেওয়াতে আয়াশের শার্ট শক্ত করে খামছি মেরে ধরলো ৷ হঠাৎ করে আয়াশ কেমন অদ্ভুত হয়ে গেল, আগের মতো মুখে সেই হাসিটা লেগে নেই ‌ ৷ আয়াশ নূরকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে নূরকে বলল
” তুমি বসো আমি এক্ষুনি আসছি ৷”

আয়াশ উঠতে গেলেই নূর একটু নরম সুরে জিজ্ঞাসা করলো
” কে ফোন করেছিলো ?”

আয়াশ একটু থেমে বলল
” তোমার ভাইয়া ৷”

নূর অবাক হয়ে বলল
” কেন?”

” তুমি অসুস্থ তোমাকে দেখতে আসছে আর তোমাকে ওরা কয়েক দিনের জন্য তাদের কাছে রাখতে চাই যতদিন তুমি সুস্থ না হও ৷”

নূর জিজ্ঞাসু সুরে বলল
” আপনি কি বললেন?”

আয়াশ নূরের দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
” বলার প্রয়োজন বোধ করিনি তাই বলিনি ৷”

” মানে কি বোঝাতে চাইলেন আপনি !”

আয়াশ নূরে কপালে ভালোবাসার পরশ একে বলল
” আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না তুমি , বুঝেছো ? না বুঝলে তাড়াতাড়ি বুঝে ফেলো আমি একটু পরই আসছি ৷”

কথাটা বলে আয়াশ বেরিয়ে গেল ৷ ঘড়ির দিকে নূর তাকিয়ে দেখলো, 6.15 বাজে ৷ এতো সকালে আয়াশ কোথায় গেল নূরের ভাবনাতেও আসছে না ৷ তবে নূর মনে মনে ঠিক করে নিলো ওর ভাইয়া বা বাবা তাদের সাথে ওর যাওয়ার জন্য জোর করলেও নূর যাবে না ,যতদিন না আয়াশের সাথে ওর সম্পর্কটা ঠিকঠাক একটা জায়গায় আসছে ততদিন কোথাও যাবে না ও , তাছাড়া ওর ভাইয়ার বলা কথাটা মনে পড়ছে বারবার
” তুই আসলে দেখছি আমাকে আর মায়াকে বাড়ি ছাড়তে হবে ৷”
কথাটা নূরকে অনেক বেশি আঘাত করেছিলো ৷ ধীরে ধীরে বসা অবস্থা থেকে শুয়ে পড়লো পাশ ফিরে , নূরের চোখের কোনা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে ৷ কখনো কখনো মানুষের কথাগুলো এমনভাবে আঘাত করে যে তার কষ্টটাকে কমানো মুশকিল ‌৷

🎀

ড্রাইভ করছে আয়াশ, পাশে বসে আছে আহান, আহানকে এয়ারপোর্টে পৌছে দিতে যাচ্ছে আয়াশ ৷ ড্রাইভ করার মাঝে আয়াশ বলে উঠলো
” কবে ফিরবে তুমি ?”

আহান মুচকি হেসে বলল
” যেদিন আমি জানবো যে আমি চাচু হতে চলেছি সেদিন ৷”

আয়াশ কথাটা শুনে একটা মুচকি হেসে বলল
” নূরকে চাও ?”

আহান আয়াশের দিকে তাকালো, অনেক বড়ো একটা কথা বলে ফেলেছে আয়াশ ৷ আহান জানে যে আয়াশ কি পরিমান ভালোবাসে নূরকে আর নূরকে পাওয়ার জন্য আয়াশের এতো অভিনয় করা আর সেই আয়াশ নূরকে আহানের কাছে তুলে দিতে চাইছে মানে আয়াশ তার নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা বিসর্জন দিতে চাইছে ৷ আহান কিছু বলল না চুপ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো ৷

আয়াশ আহানের দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে ড্রাইভে মন দিলো ৷ প্রায় 35 মিনিট পর এয়ারপোর্টের সামনে গাড়ি থামালো আয়াশ ৷ আহান গাড়ি থেকে নেমে আয়াশের দিকে তাকালো , আয়াশের কাধে হাত রেখে বলল
” সত্যি অনেক বড়ো হয়ে গেছিস তুই , নিজের প্রিয় জিনিসটাকে হারানোর ব্যাথার কতটা একবার ও ভাবলিনা ৷ লাগবেনা আমার তোর সেই মূল্যবান জিনিস ৷ কিছু কিছু জিনিস দূর থেকে ভালোবাসার জন্য তৌরি হয় ‌৷ তুই খুশি থাকলেই আমি খুশি ৷”

কথাটা বলে আয়াশকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল আহান ৷
” শোন আমি তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে চাই , আর ততদিন আমি দেশে ফিরবোনা যতদিন না আমি তোর আর নূরের থেকে গুডনিউজ শুনি ‌ ৷ তাড়াতাড়ি আমাকে চাচ্চু ডাক শোনা, আমি অপেক্ষা করবো ‌৷”

আয়াশ আহানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, অজান্তেই চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো ৷ প্রিয় মানুষকে সুখে থাকতে দেখার মতো অমূল্য জিনিস এই পৃথিবীতে আর দুটো নেই‌ ৷ তেমনি আহান আর আয়াশের ভালোবাসা একশো শতাংশ খাঁটি ৷

#চলবে,,,

কেমন লাগছে আয়াশ আর নূরের কাহিনী?অলওভার গল্পটা কেমন লাগলো জানাবেন ৷ আর লাইক যদি কমেছে তো গল্পের পর্ব সংখ্যাও করতে থাকবে বলে রাখলাম ৷১৪
#চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here