তুমি_আমারই পর্ব ১১+১২

#তুমি_আমারই
#পর্ব_১১
#Sumaia_Jahan

সেই সকাল থেকে শপিং করতে করতে আমি পুরো ক্লান্ত হয়ে গেছি। রুহির এখনো শপিং শেষ হয়নি।তাই ও এখনো শপিং করতেছে।আর আমি শপিংমলের একটা রেস্টুরেন্টে বসে বসে জুস খাচ্ছি। আমি সামনেই বসে আছে রোদ্দুর। উনি বসে বসে ফোন টিপতেছে আর মাঝে মাঝেই আমার দিকে আরচোখে দেখছে।আমার কাছে ব্যপার টা ভিষণ বোরিং লাগছে।

বাপি আজ সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতে কিসের যেন একটা অনুষ্ঠান রেখেছিলো না! সেখানে আবার এ বাড়ির সাবাইকে একসাথে যেতে বলেছিলো।তার জন্যই সকাল সকাল আমাকে সহ রোদ্দুরের পুরো পরিবার এসেছে শপিং করতে। ওরা একটার পর একটা শপিং করেই যাচ্ছে। সবাই খুব আনন্দের সাথে সেই সকাল থেকেই শপিং করতেছে।কিন্তু আমার শপিং করতে একদমই বোরিং লাগে।আমি কিছুক্ষন ওদের সাথে শপিং করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি।তাই থেকেই আমি এই রেস্টুরেন্টে বসে এবাবে জুস খেয়ে যাচ্ছি। রোদ্দুর এবার বিরক্তি নিয়ে বললো,

—- এই যে বউ সাহেবা আপনার কি জুস খাওয়ার পর্ব শেষ হয়েছে? নাকি আরো ডজন খানেক খেতে চান?

আমিও বিরক্তি নিয়ে বললাম,

—- আমাকে এসব উল্টো পাল্টা নামে ডাকবেন না। আমার তো একটা সুন্দর নাম আছে ওই বলেই ডাকবেন হুম।আর আমাকে আপনি জুস খাওয়ার জন্য খোটা দিচ্ছেন। এতো কিপটে কেন আপনি?

রোদ্দুর বিরক্তি নিয়ে বললো,

—- হ্যাঁ হ্যাঁ মিসেস আশপিয়া খান এখনতো আমাকে কিপটেই বলবেন।তোমার খেয়াল আছে তুমি এই পর্যন্ত কয়টা জুস খেয়েছো?একবার গুনে দেখো তো কয়টা জুস খেয়েছো?

আমি মনে মনে গুনার চেষ্টা করলাম কয়টা জুস খেয়েছি।কিন্তু মনে পরছে আমি ঠিক কয়টা জুস খেয়েছি। কিছুক্ষন ভেবেও কোনো উত্তর পেলাম না।কিন্তু একথা তো আর মুখে বলা যাবে না।তাই একটু ভাব নিয়ে বললাম,

—- কয়টা আবার হবে দুটো কি তিনটে।

রোদ্দুর বললো,

—- আগগে না আপনি এই পর্যন্ত সাতটা জুস খেয়েছেন। এটা নিয়ে আটটা খাচ্ছেন।

আমার মুখ হা হয়ে গেলো আমি সাত আটটা জুস খেয়ে ফেলেছি।আমার মুখ থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে এলো,

—- এ্যাঁ!

রোদ্দুর বিরক্তি নিয়ে বললো,

—- এ্যাঁ না হ্যাঁ।আমি বুঝতে পারছি না তুমি এই টুকু শরীরে এতো জুস খেলে কি করে?বাড়ি থেকে সকালে কিছু খেয়ে আসোনি নাকি?

আমার মেজাজ টা গরম হয়ে গেলো।না-হয় বেখেয়ালি ভাবে কয়েকটা জুস খেয়েই ফেলেছি তাই বলে এভাবে অপমান করবে।ডিরেক্ট খাওয়ার খোটা!আমি রেগে বললাম,

—- আমি কি করবো ওরা সেই কখন থেকে শপিং করছে আমি এখানে বসে বসে বোর হচ্ছিলাম।তাই বেখেয়ালি ভাবে কয়েকটা জুস খেয়ে ফেলেছি। তার জন্য আপনি আমাকে এভাবে খোটা দিচ্ছেন। যান আপনার টাকায় আর কিছু খাবো না আজ তো বাড়ি যাচ্ছি তো বাড়ি গিয়ে বাপির কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসবো।তখন আপনার টাকায় যা যা খেয়েছি সব টাকা ফেরত দিয়ে দেব হুম।

কথা গুলো বলে মুখ গোমড়া করে বসে থাকলাম। আর বাকি জুস টুকু খেলাম না।এতক্ষণে বাকি সবাই চলে এসেছে।শ্বাশুড়ি মা আমার গোমড়া মুখ দেখেই আমাকে জিজ্ঞেস করলো,

—- আশপিয়া কি হয়েছে তোর? মুখ গোমড়া করে কেন রেখেছিস?নিশ্চয়ই রোদ্দুর কিছু বলেছে তাই না?এই রোদ্দুর তুই ওকে কি বলেছিস?

শ্বাশুড়ি মায়ের কথা শুনে রোদ্দুর কিছু বলতে না দিয়ে আমি একটু ন্যাকা কান্না করে বললাম,

—- মা তোমার ছেলে আমাকে খাওয়ার খোটা দিয়েছে।আমি নাকি অনেক বেশি বেশি খাই।

শ্বাশুড়ি মা আমার কথা শুনে রেগে রোদ্দুর এর দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করে বললো,

—- রোদ্দুর তুই কোন সাহসে আমার মেয়ে কে খাওয়ার খোটা দিয়েছিস?ও বেশি খায় তাই না! দেখ ওকে কতো পাতলা একটা মেয়ে গায়ে হাড্ডি ছাড়া এক টুকরো মাংস নেই।আর তুই ওকে বলেছিস ও বেশি খায়!কেউ যদি বেশি খায় তাহলে সেটা তুই খাস আমার মেয়ে না হুম।

রোদ্দুর একনাগাড়ে কথা গুলো বলে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো শ্বাশুড়ি মা।বেশ হয়েছে এই লোকটার এভাবেই বকা খাওয়া উচিৎ হুম। আমার তো বেশ খুশি খুশি লাগছে রোদ্দুর কে এভাবে বকা খেতে দেখে।কিন্তু মুখে কিছু বললাম না মুখ টাকে একটু ইনোসেন্ট ফেইস করে রাখলাম।যাতে বোঝা যায় আমি খুব কষ্টে আছি।রোদ্দুরের মুখ টা এখন দেখার মতো হয়েছে। ও মুখ গোমড়া করে বললো,

—- মা একটু আশেপাশে তাকিয়ে দেখো সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর তুমি নিজের ছেলেকে সবার সামনে অপমান করতে পারলে?

রোদ্দুর কথায় শ্বাশুড়ি মা আবার কিছু বলতে যাবে তার আগেই রোদ্দুর উনাকে থামিয়ে আবার বললো,

—- থাক মা তোমাকে আর কিছু বলতে হবে না। তুমি যে পুরোপুরি ভাবে ওর দলে আমি বুঝে গেছি আর তোমাকে কষ্ট করে বোঝাতে হবে না।তোমাদের শপিং শেষ তো তাহলে এবার বাড়ি চলো।তোমরা যা শুরু করেছো এখানে আর কিছুক্ষন থাকলে লোকজন ভিডিও করে ভাইরাল করে দেবে।তাই প্লিজ এভার চুপচাপ বাড়ি চলো।

আমরাও আর কিছু বললাম না।সত্যি আশেপাশের সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিলো। যেন কোনো সিনেমার শুটিং চলতেছে।তাই সবাই আর কিছু না বলে বাড়ি চলে এলাম।

বিকেল থেকে সবাই রেডি হয়ে নিলাম।আমি একটা ব্লু কালারের ভিতরে গোল্ডেনের কাজ করা একটা শাড়ী পরেছি।আর রোদ্দুর ব্লু কালারের পাঞ্জাবি পরেছে।রুহি একটা পিংক কালারের ড্রেস আর রাহাত গ্রিন কালারের পাঞ্জাবি পরেছে। শ্বশুর মশাই আর শ্বাশুড়ি মা অফ হোয়াইট কালারের মেসিং শাড়ী আর পাঞ্জাবি পরেছে। ব্যস খান বাড়ির পুরো পরিবার রেডি আমার চৌধুরী ভিলাতে যাওয়ার জন্য।

আমরা চৌধুরী ভিলা মানে আমার বাড়ি যেতে যেতে সন্ধ্যা ৬ টা বেজে গেলো। আমি বাড়ির সামনে গিয়ে পুরো অবাক।আমার চিরচেনা বাড়ি টাকে আজ আমি চিনতে পারছি না।বাড়িটাকে প্রচুর জাঁকজমক ভাবে সাজানো হয়েছে।আমাদের বাড়িতে অনুষ্ঠান হলে আগে কখনো এতোটা জাঁকজমক ভাবে সাজানো হয়নি।দেখে মনে হচ্ছে বিয়ে বাড়ি।আমি আস্তে আস্তে বাড়ির ভিতরে ডুকছি আর দেখছি।আজকে বাড়িতে প্রচুর গেস্টও এসেছে। কিছুদুর যেতেই দেখি বাপি আর মা কয়েকজন গেস্ট এর সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে।ওই দিনের ঘটনার পর থেকে আমার বাপির সাথে কথা বলতে ভিষণ ভয় করে।শতো ভয় থাকা সত্বেও আমি বাপি ডাকলাম,

—- বাপি বাপি…..

দুই বার ডাকতেই বাপি আমাদের দিকে তাকালো।আমার দিকে তাকিয়েই একটা হাসি দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলো।আমার তো ভয়ে হাত পা কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে। না জানি এসে আমাকে বকা বকি করে।তবে যদি আজকে আমাকে এই রোদ্দুর নামক মানুষটার থেকে নিয়ে নেয় তাহলে কিন্তু আমার জন্য ভালোই হয়। বাপি তো উনাকে মেনেই নেয়নি তাহলে মনে হয় এমন কিছু একটাই করবে।তাহলে তো এখানে এখন একটা বড়সড় ঝড় উঠবে।কিন্তু আমার ধারণা উল্টো করে দিয়ে আমাদের সবার উদ্দেশ্যে বললো,

—- আপনাদের আসতে অসুবিধা হয় নি তো?আর বেয়াই সাহেব আপনি ভালো আছেন তো?

শ্বশুর মশাই বললো,

—- আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছি আপনি ভালো আছেন তো বেয়াই সাহেব?

বাপি একটু মন খারাপ করে বললো,

—- কি করে ভালো থাকবো আমার ভালো থাকার প্রান ভোমরা টা তো আপনাদের বাড়ি তে ছিলো। কিন্তু এখন আমি খুব ভালো আসি আমার প্রান ভোমরা টা যে এখন আমার সামনে আছে।

শেষের কথা গুলো হাসি মুখে বললো।শ্বশুর মশাই বললো,

—- তা তো ঠিক আশপিয়া মা যেখানে থাকবে সেখানেই সবাই ভালো থাকবে।এ কয়দিনে আমরা কতোটা মায়ায় পরে গেছি ওর।যেদিন থেকে ও আমাদের বাড়িতে আসে সেইদিন থেকেই বাড়িটার প্রান ভোমরা হয়ে গেছে।যেন ওকে ছাড়া আমাদের বাড়িটা অসম্পূর্ণ।

তারপর দুজনের মধ্যে কুশল বিনিময় হলো আর খুব হাসিখুশি ভাবে কথা বলছে।দেখে মনে হচ্ছে শতো জনমের চেনা।কিছুক্ষন ওভাবে কথা বলার পর আমাকে আর রোদ্দুর কে নিয়ে সবার মাঝে গিয়ে দাড়ালো।তারপর বাপি যা বললো আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। বাপি সবার উদ্দেশ্যে বললো,

—- আজকে আপনাদের সাথে আমার একমাত্র মেয়ে আশপিয়া আর আমার জামাই রোদ্দুর খানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।ওদের বিয়েটা তারাহুরোর মধ্যে হওয়ায় আপনাদের সাথে ওদের পরিচয় করানো হয়নি। তাই আজকে ওদেরকে এক সাথে আপনাদের সাথে পরিচয় করালাম।আপনারা সবাই দোয়া করবেন ওদের নতুন জীবনের জন্য।

আমার পায়ের নিচের থেকে মাটি সরে গেলো।বাপি কেন বললো এগুলো।বাপি তো জানতো আমার আদির কথা।তবে বাপি কেন এই বিয়েটা মেনে নিলো।বাপি আমার শেষ ভরসা ছিলো।এখন আমি কি করবো।আমার কি আর কখনো আদির কাছে যাওয়া হবে না।আদি কে কি আর কখনো খুজে পাবো না। নাহ আমি হাল ছাড়বো না।বাপি আমাকে সাহায্য না করলে আমি একাই আদি কে খুজে আদির কাছে চলে যাবো।আজ আমার ভিষণ কান্না পাচ্ছে।বাপি কি করে আমার সাথে এমনটা করতে পারলো এর জবাব বাপি কে দিতে হবে।……
#তুমি_আমারই
#পর্ব_১২
#Sumaia_Jahan

পৃথিবীতে সবচাইতে কষ্টদায়ক যন্ত্রণা হচ্ছে আপন মানুষ গুলোর থেকে যখন বিশ্বাসঘাতকতা করে।এই যন্ত্রণা সহ্য করা সব থেকে কঠিন।আপন মানুষ গুলোকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে।আপন মানুষ গুলো থাকে পৃথিবীর সবথেকে বড়ো ভরসার জায়গা।আর যখন সেই আপন মানুষ সেই ভরসার জায়গা গুলো থেকেই বিশ্বাসঘাতকতা আসে তখন তার থেকে যন্ত্রনাদায়ক বোধহয় আর কিছু হতে পারে না।আজ আমি এমনই এক যন্ত্রণা ভোগ করছি।এ পৃথিবীতে আমার সবথেকে আপন মানুষ আমার বাপি।আর বাপিই আমার সবথেকে ভরসার জায়গা ছিলো।আমি বাপিকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারতাম।আজ সেই মানুষটাই আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো।আমার কাছে এ পৃথিবীতে এর থেকে যন্ত্রণার আর কিছুই নেই।আজ যখন আমি বাপিকে জিজ্ঞেস করলাম সব কিছু জানা সত্বেও কেন রোদ্দুর কে সবার সমনে জামাই হিসেবে পরিচয় করালো? তার উত্তরে বাপি কি বলেছে জানেন?বাপি গম্ভীর গলায় বললো,

—- আশপিয়া আদিকে ভুলে যাও ও তোমার আবেগ ছিলো।এখন তোমার রোদ্দুর এর সাথে বিয়ে হয়ে গেছে তাই এখন রোদ্দুরই তোমার সব।আমি ও দিনের পর থেকে অনেক ভেবেছি। রোদ্দুর খারাপ ছেলে না ও খুব ভালো ছেলে।ও তোমাকে সুখে রাখবে।তাছাড়া আদি তোমাকে সেই ছোটো বেলায় একটা কথা দিয়েছিলো ওর হয়তো এখন আর মনেই নেই তোমাকে।তুমি শুধু শুধু ওর জন্য নিজের জীবনটাকে নষ্ট করো না।ওর যদি আসার থাকতো তাহলে এতোদিনে ও এসে যেতো।আমি তোমাকে এতোদিন কিছু বলি নি কারন আমি ভেবেছি তুমি হয়তো সময়ের সাথে এই আবেগকে ভুলে যাবে তাই।কিন্তু তুমি তো এখনো সেই আবেগ নিয়ে পরে আছো।তুমি এখন এসব আবেগকে ভুলে রোদ্দুর কে মেনে নেও।এতেই তোমার ভালো হবে।

বাপির কথা গুলো শুনে আমি আমি আর একমুহূর্তের জন্যও ওখানে দাড়ালাম না সাথে সাথেই বেরিয়ে এসে একটা গাড়ি করে রোদ্দুরের বাড়ি চলে এসলাম। পিছন থেকে অনেক বার ডেকেছে অনেকে কিন্তু আমি একবারও পিছনে তাকাইনি। কেন তাকাবো আমি ওই মানুষ গুলোর দিকে যারা আমার এতোটা কাছের আপন মানুষ হয়েও আমার সাথে এতো বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা করলো।আমার বিশ্বাস নিয়ে এইভাবে খেলতে পাড়লো।কিভাবে বলতে পাড়লো আমার আদিকে আমাকে ভুলে যেতে।তারপর বাড়ি এসে শাওয়ার চালিয়ে শাওয়ারের নিচে বসে বসে অনবরত কেঁদেই চলেছি।

কিছুক্ষণ পর ওয়াস রুমের ওপাস থেকে রোদ্দুর বললো,

—- আশপিয়া তুমি ওভাবে ওই বাড়ি থেকে চলে এলে কেন?তোমাকে আমি পিছন থেকে কতোবার ডাকলাম তুমি শুনলে না কেন?এমন কেন করছো?

আমার খুব হাসি পাচ্ছে যার জন্য আমার পুরো পৃথিবী উল্টে পাল্টে গেল,যার জন্য আমার সব প্রিয় মানুষ গুলো আমার পর হয়ে গেলো সেই আমাকে জিজ্ঞেস করছে আমি এমন কেন করছি।উনার কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমি আরো কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে থেকে পরে বের হলাম। আমাকে বের হতে দেখে রোদ্দুর একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললো,

—- যাক বাবা তুমি অবশেষে বের হলে আমি তো ভেবে ছিলাম সারারাত ওয়াস রুমেই থাকবে!

উনার সাথে আজ আমার একবিন্দুও কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।উনাকে দেখলেই বারবার মনে পরে যায় এই লোকটার জন্যই আজ আমার এ অবস্থা।তাই একটা তাছছিল্যের একটা হাসি দিয়ে পাসকাটিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পরলাম। অন্য দিন হলে সোফায় শুয়া নিয়ে কতো ঝগড়া হতো। কিন্তু আজ আমি কিছু না করেই সোফায় গিয়ে শুয়ে পরলাম। রোদ্দুর আমার কান্ড দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর নিজেও খাটে শুয়ে পরলো।তারপর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলাম।

আজ ভার্সিটি এসে একটাও ক্লাস করিনি। আমি আর ইশা ক্লাস বাদ দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি।ইশা বললো,

—- আশপি বল না আমাকে কি হয়েছে? এভাবে আর কতক্ষণ চুপ করে থাকবি?প্লিজ বল তোর কি হয়েছে?

ওর কথা শুনে আমি ওকে জরিয়ে ধরে কেঁদে দিলাম।ইশা আমাকে এভাবে কাঁদতে দেখে ঘাবড়ে গেল।ও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

—- আশপি কষ্ট গুলো নিজের মধ্যে রাখিস না অন্যের সাথে কষ্ট গুলো শেয়ার করলে দেখবি একটু হালকা লাগবে।আর তোর কষ্ট কারণ গুলো জানলে যদি আমি কিছু করতেও তো পারি?

আমি চোখ মুছে ইশার দিকে তাকিয়ে বললাম,

—- সত্যি তুই আমার জন্য কিছু করবি?জানিস আমার সব আপন জনেরা আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে?

ইশা আমার হাতে হাত রেখে মুখে একটা হাসি এনে বললো,

—- একবার বলেই দেখ না!

তারপর আমি ইশাকে বিয়ের দিন থেকে ঘটে যাওয়া সব কিছু বললাম
ইশা আমার সব কিছু শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললো,

—- সবই তো বুঝলাম! কিন্তু তুই আদিকে কি করে খুঁজবি তুই তো আদির এখনকার চেহারা টাই চিনিস না?

তারপর দুজনের মধ্যে আবার নিরবতা বিরাজ করলো।কিছুক্ষণ এভাবে বসে থাকার পর ইশা আবারও বলে ওঠলো,

—- আচ্ছা তুই আর দিয়ার কোনো খোঁজ পাসনি।রোদ্দুর ভাইয়া কে জিজ্ঞেস করিস নি দিয়া কোথায়?

আমি হতাশ কন্ঠে বললাম,

—- অনেকবার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি।কিন্তু ওর ফোন বন্ধ। আর উনাকে সে তো আমি প্রথম থেকেই জিজ্ঞেস করে যাচ্ছি দিয়া কোথায় কিন্তু উনার মুখ থেকে দিয়া সম্পর্কে একটা বের করতে পরিনি।

ইশা বললো,

—- তোর তো একবার দিয়ার বাড়ি গিয়ে খোজ নেওয়া উচিৎ ছিলো।

আমি আবারও হতাশ কন্ঠে বললাম,

—- সে উপায় আমার নেই আমাকে শুধু ভার্সিটি ছাড়া বাড়ির বাহিরে একা এক পাও বের হতে দেয় না ওই রোদ্দুর খান।তবে ভার্সিটিতেও কিন্তু আমাকে একদম একা ছাড়ে না ভার্সিটির বাহিরে কয়েকজন উনার কয়েকজন গার্ড আমাকে পাহারা দেওয়ার জন্য রেখেছে। আর যাওয়া আসার সময় তো রাহাত আসেই। ওকে আবার কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছে যেন আমাকে কোথাও না যেতে দেয় সোজা বাড়ি থেকে যাওয়া আর আসাতে সীমাবদ্ধ থাকে।আমি তো প্রথমে ভেবেছিলাম দিয়ার খোঁজ নিয়ে এখান থেকে পালাবো।কিন্তু আমি এখন এ বাড়ি থেকে পালানো অসম্ভব। পুরো বাড়ির বাহিরে গার্ড দিয়ে ঘিরে রাখা একটা মাছিও ওখান থেকে বের হতে পারবে না।

ইশাও হতাশ কন্ঠে বললো,

—- সত্যি রোদ্দুর ভাইয়া খুবই চালাক। তোর সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এই তুই কিছু করতে পারবি না কিন্তু আমি তো করতে পারবো?আমি তো দিয়ার খোজ নিতেই পারবো?

প্রথম কথা গুলো হতাশ হয়ে বললেও শেষের কথা গুলো খুব উত্তেজনা নিয়ে বললো।ওর কথা গুলো শুনে আমার চোখে মুখে খুশির জ্বলক ফুটে ওঠলো।সত্যি তো আমার হাত-পা বাঁধা কিন্তু ইশা তো চাইলেই খোঁজ নিতে পারে দিয়ার।আমি খুশিতে ওর হাত ধরে বললাম,

—- তুই পারবি দিয়ার খোঁজ নিতে?

ইশাও হাসি মুখে বললো,

—- কেন পারবো না অবশ্যই পারবো।তুই শুধু আমাকে দিয়ার বাড়ির ঠিকানা টা একবার দে দেখবি এক মিনিটেই দিয়ার খোঁজ এনে দিবো।

ওর কথায় আমার অশান্ত মনটা অনেকটাই শান্ত হয়ে গেলো।তারপর আমারা বাকি ক্লাস গুলো করে বাড়ি ফিরে এলাম।আর মাত্র একটা দিনের অপেক্ষা তারপর দিয়ার খোঁজ পাবো।ইশা বলেছে ও কালকের মধ্যেই দিয়ার খোঁজ এনে দিবে।আজ আমার এক একটা মিনিট যেন এক একটা দিনের মতো লাগছে।কিছুতেই সময় কাটছে না কখন যে দিয়ার খোঁজ পাবো সেই উত্তেজনায় আমার সময় কাটছেই না।এমন সময় রুহি আমাকে এতো অস্তির হতে দেখে বললো,

—- ভাবিমনি তুমি কোনো বিষয়ে খুব চিন্তিত?

ওর কথায় আমার ধ্যান ভাঙ্গলো।ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসি হাসি মুখ করে বললাম,

—- না না তেমন কিছু না ওই কিছু পড়া নিয়ে ভাবছিলাম। তো তুমি এখানে কি করতেছো?

রুহি বললো,

—- আমার না আজ মনটা খুব খারাপ।

আমি বললাম,

—- কেন?

রুহি বললো,

—- আসলে আমি সাতার পারি না।কিন্তু আমার বন্ধুরা সবাই সাতার পারে।ওরা আজ কি বললো জানো?

—- কি বললো?

রুহি মুখটা গোমড়া করে বললো,

—- যারা সাতার পারে না তারা নাকি পানিতে ডুবে মারা যায়।আমি পানিতে ভিষণ ভয় পাই।আমি কিছুতেই পানিতে ডুবে মরতে চাই না।জানো আমি আজকে নামাজ পরে আল্লাহর কাছে অনেকবার বলেছি আমাকে যেন পানিতে ডুবিয়ে না মারে।তুমি বলো না আমি কি সত্যি পানিতে ডুবে মারা যাবো।এর থেকে কি কোনো ভাবেই রেহাই পাবো না।

আমি ওর কথা শুনে হাসবো না কাঁদব বুঝতে পারছি না। রুহির মাঝে মাঝে বাচ্চামো কথাবার্তা গুলো শুনলে ভিষন হাসি পায়।কিন্তু আজকে তো পুরো সীমানা পাড় করে গেছে একটা চারপাঁচ বছরের বাচ্চাদের মতো কথা বলছে।এতো বড়ো একটা মেয়ে এই ধরনের কথা বলতে পারবে আমার ধরনার বাহিরে।আমি আর না হেসে পারলাম না। শব্দ করে হেসে বললাম,

—- সিরিয়াসলি রুহি তুমি এই কথার জন্য মন খারাপ করে আছো।তোমাকে ওরা বললো আর তুমিও বাচ্চাদের মতো বিশ্বাস করে নিলে।

রুহির সাথে এরকম আরো কিছু কথা হলো।রুহির মনে হয় ম্যাজিক জানে কারো মন খারাপ থাকলে ওর কথা দিয়েই তার মুখে হাসি ফুটাতে পারবে।এ বাড়িতে আসার পর আমার মন খারাপ হলেই ও কোথা থেকে যেন এসে ওর এমন বাচ্চামো কথা দিয়ে আমাকে ঠিক হাসাবেই।আজকের দিনটা ওর সাথে হাসতে হাসতেই কেটে গেল।

আমার এতো অপেক্ষার করার পর ভার্সিটি এসে এমন একটা কথা শুনতে পাবো আমি জানতাম না। আমার মাথায় পুরো আকাশ ভেঙে পরলো।

চলবে,,,,,,

[ ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবার কাছে আগেই ক্ষমা চাইছি।রাতে গল্প লিখতে লিখতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই রাতে গল্প দিতে পারিনি।তার জন্য আমি খুবই দুঃখিত।ইনশাআল্লাহ এরপর পর থেকে আর এমন হবে না।]
চলবে,,,,,

[ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আর ভুল গুলো ধরিয়ে দিবেন। আজকে তেমন একটা গুছিয়ে লিখতে পারিনি তার জন্য সরি।কয়েকজন জিজ্ঞেস করেছেন “অনির” জায়গায় “আদি” কেন? তাদের সুবিধার্থে আবারও বলছি, অনেকে বলেছে অনি নামটা মেয়েদের তাই অনি নামটা পাল্টে আদি নাম রাখতে হয়েছে। আশা করি সবাই বুঝতে পেরেছেন অনির জায়গায় আদি কেন?]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here