নোনাজলের শহর পর্ব ৩+৪

৩+৪
নোনাজলের শহর
লেখিকাঃ হৃদিতা আহমেদ

পর্ব-৩
দের বছরের বেশি হলো ঢাকার একটা নাম করা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছে মুমু। স্ট্যাডি শেষে পিএইচডি -র জন্য স্কলারশিপ পেলেও ছোট্ট প্রয়াকে নিয়ে বাইরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রয়ার বয়স দুই বছর এগারো মাস চলছে সামনের মাসে তিন এ পা দেবে। বয়সের তুলনায় অনেক আগেই হাটা ও কথা বলা শিখেছে। কিন্তু কিছু কথা স্পষ্ট বলতে পারে না,খুব মিষ্টি হয়েছে দেখতে। আর যখন দাঁত বের করে হাসে গালের একপাশে টোল পড়ে একদম কিউটের ডিব্বা।প্রয়াকে নিয়ে অফিসে যাওয়া সম্ভব হয়না, তাই মা এসে থাকেন। প্রয়াকে মায়ের কাছে রেখে
ভার্সিটির উদ্দেশ্য বের হয়ে যায় মুমু।

হঠাৎ করে বিয়ে হওয়াতে আদিবের যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না সত্যি সে মুমুকে পেয়েছে। রাত ১:৫৬ মিনিট এ আদিব মুমুর রুমে গিয়ে দেখে, মিমন মুমুকে জড়িয়ে ধরে নিরবে কাদছে আর মুমু তার ভাইয়ার বুকে মাঝে ঘুমিয়ে আছে। আদিবকে দেখে মিমন দ্রুত চোখের পানি মুছে, মুমুকে বালিশে শুয়ে দিয়ে একটা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে আদিবকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পাশ কাটিয়ে বের হয়ে যায়।মিমনের কলিজা হলো মুমু,সেই মুমুকে কষ্ট দিয়েছে আদিব। তাকে এত সহজে মাফ করেবে না মিমন তা জানে আদিব। কথাগুলো ভেবে দরজা বন্ধ করে এগিয়ে গেল বেডের দিকে।

মুমুর লম্বা চুল গুলো অগোছালো ভাবে বালিশের একপাশে পড়ে আছে, অনেক সময় ধরে কাদার ফলে হঠাৎ হঠাৎ তুলা হেচকি ও গাঢ় নিশ্বাস এর সাথে কেপে উঠা ঠোঁট আর ঠোঁটের নিচে বা পাশের কালো তিল আদিবকে আকুলভাবে মোহিত করছে। আদিব কিছুক্ষণ একভাবে তাকিয়ে থেকে মুমুর মুখের ওপর কিছুটা ঝুঁকে, ঠোঁটের নিচে তিলটা আলতো করে ছুয়ে দেয়,তারপর কপালে একটা ডিপ কিস করে লাইটটা নিবিয়ে মুমুর পাশে শুয়ে পড়লো।

সকালে আদিবের ঘুম ভাঙলো বুকের উপর কারো গরম নিশ্বাসে,মাথা তুলে দেখে মুমু গুটিশুটি হয়ে বা হাত দিয়ে আদিবের টি-শার্ট এর গলা ধরে বুকের মাঝে ঘুমিয়ে আছে। এটা দেখে মুচকি হেসে মুমুকে আরো কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে আদিব। “আমার বাচ্চা বউটা” বলে টুপ করে মুমুর মাথার বা দিকে একটা চুমু খায়।মুমুও উষ্ণতা পেয়ে আরো লেপ্টে গেল। মুমকে জড়িয়ে ধরে আদিব আবার ঘুমিয়ে যায়।

খানিকক্ষণ পরে মুমুর ঘুম ভেঙে যায় গরমে, চোখ মেলে দেখে সে আদিবকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। এ অবস্থা দেখেই মুমুর জানের পানি শুকিয়ে সাহারা মরুভূমি হয়ে গেল, ভয়ে একটা ফাকা ঢোক গিলল। ক্লাস শেষে প্রতিবেশি পার্থ দার সাইকেল এ করে বাড়ি ফিরে ছিল মুমু।নামার সময় হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় পার্থ দা হাত ধরে নামিয়ে দেয় মুমুকে সেই সময় আবিদ বাইরে বের হচ্ছিল। মুমু রুমে এসে স্কুলব্যাগ রাখতেই দরজা আটকানোর শব্দ পেয়ে পিছনে ঘুরে দেখে আদিব চোখ মুখ লাল করে ভয়ানক রেগে দাঁড়িয়ে আছে। মুমু কিছু বলার আগেই হিস হিসিয়ে দাতে দাঁত চেপে মুমুর হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলে উঠে ” ছেলেদের হাত ধরতে খুব ভালো লাগে তোর তাইনা”

মুমুঃ আআদিব ভাইয়া আ আমি ই ইচ্ছে ক………(কথা শেষ হওয়ার আগেই আদিব মুখ চেপে ধরে )

আদিবঃ তোকে আমি…… ( মুমুর ডান হাতে জোরে কামড় দেয়)

মুমুর মুখ চেপে ধরাই কোনো শব্দ করতে পারেনা,মুমুর চোখে পানি দেখতেই আদিবের হুঁশ ফিরে।এমনিতে ভদ্র- শান্ত হলেও রেগে গেলে তার কিছু মনে থাকে না।মুমু ততক্ষণে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না শুরু করে দিয়েছিল। সেদিন এর পর থেকেই মুমু আদিবকে জমের মতো ভয় পায়। মুমু ভয়ে দ্রুত উঠতে গেলেই আদিব জেগে যায়, দেখে মুমু তার দিকে ভীতু ভীতু চোখে তাকিয়ে আছে। আদিব কিছু বলার আগেই মুমু বলল,”আদিব ভাইয়া…. ”

আদিবঃ ” কে তোর ভাইয়া হ্যা? পৃথিবীর সবাই তোর ভাই হতে পারে আমি নই বুঝলি, এক লাখ দশ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়ে করে বউয়ের মুখ থেকে কি ভাইয়া ডাক শুনব আমি হ্যা? 😡😡

মুমু ভয়ে দ্রুত দু’দিকে মাথা নেড়ে না জানালো।

চলবে

নোনাজলের শহর
লেখিকাঃ হৃদিতা আহমেদ

পর্ব-৪

পরীক্ষার জন্য আজই ফিরতে হবে আদিবকে, সকালের পর থেকে মুমুর আর দেখা পাচ্ছে না। ৩:৩২ বাজে চারটায় বাস, মুম নিশ্চয় কোথাও লুকিয়েছে। বাধ্য হয়ে শাশুড়ীকে বলেছে মুমুকে ঘরে পাঠানোর জন্য।রাগে গজগজ করে ঘড়ি পড়ে পিছনে ঘুরে দেখে মুমু দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে।পরনে মিষ্টি কালারের টিশার্ট, কালো স্কার্ট,গলায় কালো ওরনা ঝুলে আছে।আর বাচ্চাদের মতো দু’কাধে লম্বা বেণি।মাথামোটা, অসভ্য মেয়েটা কি জানে ওর এই লম্বা বেণি, ভীতু ভীতু মুখ দেখলে আদিবের মাথা ঝিম ঝিম করে,বুক ধড়ফড় করে।মুমু এখনো মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। ওকে দেখেই আদিবের রাগ উধাও হয়ে গেল,কিন্তু মেজাজ খিটে গেল মুমুর পা দিয়ে ফ্লোর কুটানো দেখে।

আদিবঃ ফ্লোর খুড়ে নিচে যাওয়ার প্ল্যান করছিস নাকি, আর তোকে কি ইনভিটেশন কার্ড দিয়ে ঘরে নিয়ে আসতে হবে?

আদিবের কথা শুনে দ্রুত সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাড়ায় মুমু।

আদিবঃ মাথা উঁচু কর তাকা আমার দিকে।( মুমুর কাঁধ ধরে)

মুমু মাথা উঁচু করলেও নিচে তাকিয়ে থাকে।হঠাৎ করেই আদিব মুমুকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুয়ে দেয়, অন্যদিকে ভয়ে মুমু চোখ বন্ধ করে রেখেছে। আদিবের কোনো সাড়া না পেয়ে চোখ মেলে মুমু।আদিব তার উপর আধশোয়া হয়ে ঝুকে তাকিয়ে আছে। মুমু আদিব ভাইয়া বলার আগেই মুমুর ঠোঁটে ছোট্ট কামড় দিয়ে বলল, “সকালে ভাইয়া ডেকে উধাও হওয়ার শাস্তি “।

আদিবঃ একমাস তুই স্কার্ট-টিশার্ট গায়ে দিবি না ইভেন বাড়িতে আমি না থাকলে একদম এগুলো পরবি না শুধু থ্রিপিস পরবি। যদি ভুল হয় (মুমুর টিশার্ট এর নিচ দিয়ে কোমড় চেপে ধরে) তাহলে এখানে কামড়ে দেব। এখন ঝটপট চুমু দে।

কোমড় চেপে ধরায় মুম শক্ত করে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল আদিবের চুমু দে শুনে হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে বলে, “হা?”

আদিবঃ হা না হ্যা, চুমু দে। বিয়ে করে কি উপবাস থাকবো? ঝটপট চুমু দে। না দিলে দমবন্ধ চুমু দিব আমি। (আদিবের কথায় মুমু দ্রুত ঠোঁট মুখের মধ্যে চেপে ধরে)

মুমু ঠোঁট চেপে ধরা দেখে আদিব চট করে মুমুর নাকে কামড়ে দেয়। মুমু আহ করতেই আদিব ঠোঁট জোড়া বন্ধ করে নেয়।মুমু ধাক্কা দিলে ওর হাত দুটো নিজের হাতে বন্ধ করে নেয়।আদিবের সাথে না পেরে হাত পা ছোড়া বন্ধ করে দেয় মুমু। কিছুক্ষণ পরে ছেড়ে দিলে জোরে জোরে নিশ্বাস নেয়।আদিব মুমুর নাকে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে ওর চোখের জল দুই হাতের বৃদ্ধাগুল দিয়ে আলতো করে মুছে দেয়। নরম কন্ঠে বলে, “তুই এতো অবুঝ কেন মুমু, একটু বড় হয়ে যা না পাখি।”

“Flight attendants, please prepare for landing.”
কেবিন ক্রুর কন্ঠে চোখ মেলে আদিব, উইন্ডো সিটে বসেছে সে।শূন্য চাহনিতে বাইরে অবলোকন করল।অতীতের স্মৃতিগুলো তার চোখে ভেসে উঠেছিল। পাওয়া না পাওয়ার অনেক হিসাব আছে। সব ছেড়ে বহু বছর আগে পাড়ি দিয়েছিল কানাডা।দীর্ঘ পাঁচ বছর পরে বাবার অসুস্থতার জন্য ফিরতে হচ্ছে তাকে।বাংলাদেশ ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (NSI) এর জব সুত্রে পাঁচ বছর আগে পাড়ি দিয়েছিল কানাডা।

Bangladesh Airport
Time:4pm.
আধাঘন্টা আগেই এসেছে তরুণ, কারণ NSI এর মোস্ট ফেমাস অফিসার ও তার বেস্ট ফ্রেন্ড দ্যা রুড আদিব মাহমুদ বহুবছর পরে দেশে ফিরছেন।তরুণ নিজেও এন এস আই -এর সিনিয়র অফিসার। আদিবের সাথে সেও কানাডা ছিল দুই বছর। আদিবের দুই বছর কানাডা থাকার কথা থাকলেও কাজের দক্ষতা ভালো হওয়ায় তাকে পারমানেন্টলি রেখে দেয় NSI. প্রচন্ড রাগী, জেদি,একরোখা আদিবকে দেখে অবাক হতো তরুণ, প্রতিটা ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন এ যেচে মৃত্যুর জন্য এগিয়ে যেতে দেখে হতবাক হতো।’মৃত্যু না হওয়া টাই পাপ’
এমন বাক্যে বিশ্বাসী যদি কেউ থাকে সেটা হলো আদিব।

রুড এটিটিউট এ ভর্তি হলেও প্রচন্ড রকমের ভালো মনের মানুষ দুই বছর একসাথে থেকে বুঝছিল তরুণ। ফেমেলি বা আপনজন সম্পর্কে কিছু বললে প্রচন্ড রেগে যেত।তিনদন আগে হঠাৎ করে ফোনে জানালো তার বাবা ICU তে দেশে ফিরছে। তার জন্য একটা ফ্ল্যাট কেনার জন্য তরুণকে ফোন করেছিল।আদিবকে দেখেই বোঝা যায় আভিজাত্য পরিবারের ছেলে।কিন্তু দেশে ফিরে বাড়িতে না যেয়ে ফ্ল্যাট যাবে কেন ব্যাপার টা ভাবছে তরুণ। কাঁধে কারো স্পর্শে ভাবনার বিচ্ছেদ হলো,পিছনে ঘুরে দেখলো আদিব দাড়িয়ে আছে এক হাত পকেটে দিয়ে।

তরুণঃ আরে আদিব……….. (জড়িয়ে ধরে)

আদিবঃ কানে কি বুলেট লেগেছে? (বিরক্তি নিয়ে তরুণকে ছাড়িয়ে)

তরুণঃ কিহ!! (অবাক হয়ে)

আদিবঃ কখন থেকে ডাকছি বাল, শুনতে পাশ না কেন? 😡

তরুণঃ ( শুরু হলো দ্যা রুড আদিব মাহমুদ, এতদিন পর দেখা হলো কোথায় কেমন আছি জিজ্ঞেস করবে তা না)

আদিবঃ ধুর বাল, কাকে কি বলি।(লাগেজ ধরে হাটা শুরু করে)

তরুণঃ এই শোন শোন,কোথায় যাচ্ছিস?

‘তোমার সবগুলো ফুল নিব আমি কতো নেবে’ জিজ্ঞেস করলে মেয়েটি উজ্জ্বল হেসে উত্তর দিলো”চল্লিশ টাকা” “এতো সুন্দর ফুল শুধু চল্লিশ টাকা কিন্তু আমার কাছে তো খুচরা নাই এই টাকাতে দিবে প্লিজ?” একশো টাকার একটি নোট এগিয়ে দিল মুমু। মেয়ে টি কিছু একটা ভেবে বলল “আচ্ছা নেন”। নেতিয়ে যাওয়া গোলাপ গুলো নিয়ে মেয়ে টা মাথার চুল গুলো ঠিক করে দিলো মুমু।

এয়ারপোর্ট থেকে সোজা হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে ছিলো আদিব ও তরুণ। অনেক্ক্ষণ হলো জ্যামে বসে আছে, বা সাইডে দুইটা গাড়ি পরের গাড়ি থেকে কোনো মেয়ে পথশিশুর থেকে নেতিয়ে যাওয়া গোলাপ নিয়ে আদর করছে।দৃশ্যটা দেখে মৃদু হাসলো আদিব।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here