বিরহ শ্রাবণ ২ পর্ব – ২৭

#বিরহ_শ্রাবণ(দ্বিতীয় খণ্ড)
#পর্ব_২৭
#লেখিকা_সারা মেহেক

প্রতিবেশী মামির হেন কথা অভ্র ভাইয়ের রুমে যেনো ছোটখাটো একটা বো”মা’র বি’স্ফো’র’ণ ঘটালো। রুমে উপস্থিত সকলে স্বাভাবিক থাকলেও অভ্র ভাই আর স্বাভাবিক থাকতে পারলেন না। উনার সেই হাসি মুহূর্তেই ক’র্পূ’রে’র ন্যায় উবে গেলো। মুখশ্রীতে ক্ষণেই অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট হয়ে এলো। এ মুহূর্তে আকস্মিকভাবে খুব বা’জে এবং অবিশ্বাস্যকর একটি কৌতুক শুনেছেন এমন ভঙ্গিতে প্রতিবেশী সেই মামির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
” এসব কি বলছেন চাচী? ”

সেই মামি অভ্র ভাইয়ের প্রশ্নে পুরো ঘটনা বলার জন্য যেনো প্রচণ্ড উৎসাহী হয়ে পড়লেন। উনি রুমের দিকে কয়েক কদম এগিয়ে এসে রসিয়ে রসিয়ে বললেন,
” কি আর বলবো বাবা! সত্যিই প্রোজ্জ্বল আর চন্দ্রিমার বিয়ে হইছে। তারপর আবার ঐদিনই যেদিন তোমার আর চন্দ্রিমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। ”

অভ্র ভাই এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না। বিমূঢ় চাহনিতে একবার প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের দিকে, তো একবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আমি অভ্র ভাইয়ের দৃষ্টি বরাবর দৃষ্টি ধরে রাখার সাহস পেলাম না। লজ্জা ও আড়ষ্টতায় নত মস্তকে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। ওদিকে শুনলাম অভ্র ভাই প্রোজ্জ্বল ভাইকে জিজ্ঞেস করছেন,
” প্রোজ্জ্বল? চাচী কি সত্যি বলছে?”

প্রোজ্জ্বল ভাই তৎক্ষনাৎ জবাব দিলেন না। উনার অবস্থা তখন কেমন তা জানা নেই আমার। তবে ক্ষণিক বাদে উনি ভীরু গলায় জবাব দিলেন,
” হ্যাঁ, চাচী সত্যি বলছে। আসলে তখন পরিস্থিতিই এমন ছিলো……..”

প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের কথা সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে না দিয়েই অভ্র ভাই চেঁচিয়ে উঠলেন,
” কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি আমার প্রাণের বন্ধু আমার সাথে এতো বড় ধোঁকাবাজি করবে। তাহলে এই ছিলো তোর প্ল্যান? তুই কি আমার চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলি? ”

অভ্র ভাইয়ের এমন চেঁচিয়ে উঠায় কেঁপে উঠলাম আমি। দৃষ্টি তুলে দেখলাম অভ্র ভাই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। ওদিকে প্রোজ্জ্বল ভাইও চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়েছেন। উনি এগিয়ে গিয়ে অভ্র ভাইকে শান্ত করতে চাইলেন। কিন্তু অভ্র ভাই উনাকে এক ধাক্কায় নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। উল্টো উনি এগিয়ে গিয়ে এক হাত দিয়ে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের টিশার্টের কলার চেপে ধরে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন,
” তোকে আমি ভাইয়ের মতো ভাবতাম প্রোজ্জ্বল। তুই যে আমার সাথে এমন করবি ভাবতে পারিনি। আর যাই হোক, তোর থেকে এমনটা এক্সপেক্ট করিনি আমি। এমনটা কেনো করলি আমার সাথে?”

প্রোজ্জ্বল ভাই অভ্র ভাইয়ের এ প্রশ্নের জবাব দিতে আপাতত অপারগ হলেন। উনি চেষ্টা করলেন অভ্র ভাইকে শান্ত করতে। ওদিকে খোদেজা মামি ও অনামিকাও বললেন অভ্র ভাইকে শান্ত হতে। কিন্তু অভ্র ভাই শান্ত হলেন না। উনার চাহনি ও হাবভাব দেখে অনুমান করলাম অবস্থা বেগতিক হতে বেশি সময় লাগবে না। এ কারণে আমি এগিয়ে গেলাম উনাদের দিকে। এ মুহূর্তে অভ্র ভাইকে শান্ত করতে যা যা বলার প্রয়োজন তা সবটুকুই বলবো আমি। কিন্তু দু কদম এগুতেই প্রোজ্জ্বল ভাই হাতের ইশারায় আমার পথরোধ করলেন। উনি তখন অভ্র ভাইয়ের দিকে নিষ্পলক ও শান্ত চাহনিতে চেয়ে আছেন। এ মুহূর্তে একদিকে অভ্র ভাইয়ের দৃষ্টি যেখানে অনলের ন্যায় ভয়ংকর, সেখানে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের দৃষ্টি সাগরের মতো শান্ত ও স্থির।

প্রোজ্জ্বল ভাই অভ্র ভাইয়ের ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে ইশারা করে বললেন,
” দেখ অভ্র, শান্ত হো। তোর হাতের অবস্থা খুব একটা ভালো না। যেকোনো মুহূর্তে অঘটন ঘটতে পারে। আর তুই হাইপার হচ্ছিস কেনো? আমাদের পক্ষের কথা না শুনেই……. ”

অভ্র ভাই তখনও প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের কলার চেপে ধরে আছেন। পূর্বের মতোই ক্রুদ্ধ এবং শক্ত কণ্ঠে বললেন,
” তোদের পক্ষের কথা কি শুনবো আমি? আমার অগোচরে তোরা দুজন এভাবে বিয়ে করে ফেললি! নিশ্চয়ই তোদের দুজনের মধ্যে আগে থেকেই কিছু চলছিলো। না হলে এতো সহজেই দুজন বিয়ে করলি কি করে?”

” আমরা স্বেচ্ছায় কিছু করিনি অভ্র। আব্বা আর দাদির সিদ্ধান্তে আমরা বিয়ে করেছি। ”

” হাহ! হাসালি আমাকে। বিয়ের মতো বড় একটা সিদ্ধান্ত তোর আব্বার আর দাদির কথামতো নিলি! তারপর আবার কাকে বিয়ে করলি! যাকে আমি ভালোবাসি! যাকে আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম! ইচ্ছা করে করেছিস তুই এটা। প্রোজ্জ্বল, তুই এটা বুঝেশুনে করেছিস।”
এই বলে উনি কলার ছেড়েই ঐ হাত দিয়ে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের গালে ঘু’ষি মারলেন। উনার এ আকস্মিক এ আচরণে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বিস্মিত হলেন খোদ প্রোজ্জ্বল ভাই, খোদেজা মামি ও অনামিকাও। কেউ হয়তো ভাবতে পারেনি অভ্র ভাই মা’রা’মা’রির পর্যায়ে নেমে আসবেন। বুঝতে পারছি অভ্র ভাই এখন প্রচণ্ড রেগে আছেন, মাথা গরম হয়ে আছে। কিন্তু তাই বলে এভাবে মা’র’বেন প্রোজ্জ্বল ভাইকে তা ভাবনার বাইরে ছিলো। এসব দেখে আমি আর নিজেকে আটকিয়ে রাখতে পারলাম না। এগিয়ে গেলাম অভ্র ভাইকে থামাতে। কিন্তু সে মুহূর্তে আমাকে আরেকদফা বিস্মিত করে প্রোজ্জ্বল ভাইও উল্টো অভ্র ভাইকে ঘু’ষি মা’র’লেন। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,
” বললাম শান্ত হতে। আগে আমাদের কথা পুরোপুরি শুনবি তো! নাহ, নিজের মতো মত বানিয়ে মাথা গরম করে ফেলছিস। কেনো? একটু কি ঠাণ্ডা হওয়া যায় না?”

” ঠাণ্ডা হবো? আমার জায়গায় তুই হলে বুঝতি এমন সিচুয়েশনে কিভাবে ঠাণ্ডা হওয়া যায়। প্রোজ্জ্বল! চন্দ্রিমা আমার চার বছরের অপেক্ষার ভালোবাসা। ওকে আমি সারাজীবনের জন্য নিজের করে পেতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তুই ওকে বিয়ে করলি কেনো? কেনো?”
বলেই অভ্র ভাই চোখের পলকে পুনরায় প্রোজ্জ্বল ভাইকে ঘু’ষি মা’র’লেন। ক্রোধে বিবেক হারিয়ে প্রোজ্জ্বল ভাইও পুনরায় মা’র’তে গেলেন। কিন্তু এর পূর্বেই অনামিকা এসে থামিয়ে দিলেন উনাকে। ততক্ষণে আমিও উনার কাছে চলে এসেছি। প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের পাশে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অভ্র ভাই আবারো মা’রা’র জন্য এগিয়ে এলেন। কিন্তু এর পূর্বেই আমি অভ্র ভাইকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। অকস্মাৎ এভাবে ধাক্কার সম্মুখীন হয়ে অভ্র ভাই তাল হারিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন। হতভম্ব চাহনিতে কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে চেয়ে মুহূর্তেই তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,
” বাহ চন্দ্রিমা! স্বামীর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলে দেখছি! তা, কতদিন ধরে তোমরা প্রেম চালিয়ে যাচ্ছিলে শুনি? ”

এতোক্ষণ যাবত দূর্বল চিত্তে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করার পরও অভ্র ভাইয়ের এমন মনোভাবে এখন আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারলাম না। ক্ষুব্ধ মেজাজে উচ্চ স্বরে বলে উঠলাম,
” হ্যাঁ স্বামীর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছি। আপনার এ আচরণ থেকে উনাকে বাঁচাতেই এমন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছি আমি। ”

” তোরা একটু শান্ত হো রে বাবা। আমারে মে’রে ফেলিস না তোরা। কি শুরু করছিস! ”
পিছনে খোদেজা মামির উৎকণ্ঠিত কণ্ঠস্বর। কিন্তু উনাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কাও করলেন না অভ্র ভাই। উল্টো বললেন,
” কি প্রেম রে! আহা, দরদ দেখি উথলে উথলে পড়ছে চন্দ্রিমা! কি পটানো পটিয়েছিস প্রোজ্জ্বল ওকে!”
অভ্র ভাইয়ের ঠেস মা’রা কথায় প্রোজ্জ্বল ভাই মুহূর্তেই বলে উঠলেন,
” তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস অভ্র! কথাবার্তার লিমিট ক্রস করে ফেলছিস তুই। ”

” আরে শা-লা! লিমিট আমি ক্রস করে ফেলছি! লিমিট তো ক্রস করেছিস তুই। চন্দ্রিমাকে বিয়ে করলি কোন সাহসে? কি ভেবে বিয়ে করলি ওকে?”
এই বলে উনি আবারো মা’র’তে এগিয়ে এলেন। উন্মাদের মতো অভ্র ভাইয়ের এ ব্যবহার দেখে আমি বারংবার বিস্মিত হলাম। কিন্তু এ মুহূর্তে আমার বিস্ময় ভাবের চেয়ে ক্রোধ প্রাধান্য পেলো বেশি। যা আমি এর পূর্বে কখনো করিনি, কখনো কল্পনাতেও আনিনি, ক্রোধের বশে সেই কাজটাই করে বসলাম আমি। সপাটে অভ্র ভাইয়ের গালে চড় মেরে বসলাম। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললাম,
” আপনার এই তিরিক্ষি মেজাজ আর গু’ণ্ডা’মিপনার জন্যই আজ এমন পরিস্থিতিতে এসে দাঁড় হয়েছেন আপনি। আপনার এমন আচরণের জন্যই আজ তিনটা জীবন নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এসবের জন্য দায়ী একমাত্র আপনি!”
গত পর্বের শেষের দিকে অনেকটা এডিট করেছি। যারা পড়েননি, পড়ে নিবেন
®সারা মেহেক

#চলবে
(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here