বৈবাহিক চুক্তি পর্ব ৩৪

#রোদে_ভেজা_মেঘ
#লিখাঃ Liza Bhuiyan
#বৈবাহিক_চুক্তি (সিজন ২)
#পর্বঃ৩৪

মস্ত বড় আকাশে নীল মেঘেরা ডানা মেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে,বসন্তের সকালের চারপাশ খুবই স্নিগ্ধ লাগছে। ঝরে পড়ে যাওয়া পাতার স্থলে নতুন নতুন গুটিকয়েক পাতা গজিয়েছে, প্রকৃতি যেন শীতের বিশাল তাণ্ডবের পর তার পুর্বের রুপে ফিরে আসছে। মৃদু হাওয়ায় চারপাশের সবকিছু হাল্কা দুলছে সাথে সায়রার চুলগুলোও।আজ প্রায় এক সপ্তাহ পর ঘর থেকে বেরিয়েছে ও, ঘরকুনো হয়ে বসে থাকাটা আর যেনো ভালো লাগছে না। প্রাণ খুলে একটু শ্বাস নিতে ইচ্ছে হচ্ছে, নিজেকে খুব মুক্ত পাখির মতো ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে। আজ সকালেই সেই তার ততোকথিত বাগদত্তা তাদের এংগেজমেন্ট ভেংগে দিয়েছে, তার পর থেকেই কেমন খুশি খুশি লাগছে, কেনো লাগছে জানা নেই তবে কেউ একজনের নাম্বারে এই নিয়ে অনেকবার ডায়াল করে ফেলেছে কিন্তু অপরপাশ থেকে একটাই কথা আসছে “নাম্বারটা সুইচড অফ”।
তবে ও আশা ছাড়ছে না, একের পর এক লাগাতার ফোন দিয়েই যাচ্ছে এই আশায় হয়তো অপর পাশে থাকা মানুষটি ফোন তুলবে।

আকাশটা হঠাৎ করেই মেঘলা হয়ে গেলো সাথে হাওয়ার বেগ কিছুটা বেড়ে গেলো।হালকা শীত শীত লাগছে তাই শালটা ভালো করে জড়িয়ে নিলো।
এমনি এক সকালে কারো ঘুম ঘুম চোখে তাকানো ফেস দেখে প্রথমবারের মতো ক্রাশ খেয়েছিলো! সেদিনের আকাশটা হয়তো মেঘলা ছিলো না, শুভ্র ছিলো ঠিক ওর মনের মতো!

‘কর্লোনা’ ব্রিজের পাশেই খুব সুন্দর একটা লেক যা ওদের ভার্সিটি থেকে খুব কাছে ছিলো, এই স্থান সবসময় ওর প্রিয় স্থান ছিলো। এখানে আসলেই ওই মানুষটির কথা মনে পড়ে,ওদের পরিচয়ের প্রায় তিন থেকে চার মাস পর এখানে এসেছিলো। সারাদিন ঘুরাঘুরির পর এখানে নিশ্চুপ হয়ে পাশাপাশি অনেক্ষন বসে ছিলো। তখন ওদের বন্ধুত্বের বয়স ছিলো প্রায় সাড়ে তিনমাস, হ্যাঁ বন্ধুত্ব! আরাভ আর ও খুব ভালো বন্ধু এমন বন্ধু যার সাথে চোখ বন্ধ করে সকল কথা শেয়ার করা যায়। আর বাকি যা আছে তা নিহাতই ওর মনের অবাঞ্ছিত আবেগ যা কখনো পুর্ণতা পাবে না। ও জানে না কেনো ওই মানুষটিকে ও এতোটা চায় কিন্তু দিনদিন এই আবেগ অবসেশন হয়ে যাচ্ছে। এখন তো এমন মনে হয় যে তাকে ছাড়া শ্বাস নেয়াও কষ্টকর। ও জানে না কেনো বিয়ের কথা শুনে ও আরাভের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলো, ও এটাও জানেনা আজ কেনো এংগেজমেন্ট ভেংগে গিয়েছে শুনে সবার আগে ওকেই জানাতে ইচ্ছে হলো!নিজের বেস্টফ্রেন্ডকে ভালোবাসা হয়তো ঠিক নয় কিন্তু নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারেনি ও। দিনদিন তার প্রতি ভালোবাসা গভীর হচ্ছে, খুব গভীর!

হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়াতে সবাই ছুটাছুটি করতে লাগলো কিন্তু ওর কোন তাড়া নেই। আজ ও বৃষ্টিতে ভিজবে, প্রান খুলে ভিজবে। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই একজনকে লেকের পানিতে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখলো, ছাতা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরিচিত মুখকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সায়রা আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করলো না। আজ বদ্ধ থাকা অনুভুতিরা হঠাৎ বিদ্রোহ করে বসলো, মনে হলো নিজের হৃদয়ের অনুভুতির জানান আজ দিতেই হবে। ভালোবাসায় যদি একটু রিস্ক না নেয় তবে কি আর সেটা ডেস্পারেট লাভ হয়!
কিছু না ভেবেই দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো তাকে যাতে সামনের মানুষটি কিছুটা হেলে গেলো। তারপর তাকে কিছু বলতে না দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো

“আই লাইক ইউ আরাভ!আই লাইক ইউ সো মাচ”

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো সায়রা, মনের থেকে কতো বড় বোঝা নেমে গেলো ব্যাপারটা যতোটা কঠিন ভেবেছিলো ঠিক ততোটা নয়, কত্তো ইজি,,
অপরপাশ থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ভ্রু কুচকে তাকালো, কেনো যেনো মনে হলো যেহেতু অবাক হয়নি এর মানে রিজেক্ট হয়তো হবে না তাই কিছুটা শাশিয়ে বললো

“বলেছি আই লাইক ইউ”

অপরপাশ থেকে ছোট্ট করে আওয়াজ এলো “হুম”
এমন খাপছাড়া জবাবে সায়রা হতাশ হলো, কিছুটা অবাক হয়ে বললো

“যা বলেছি তার জবাব নেই?দিবে না জবাব?”

“তুমি জানোনা নিরবতা সম্মতির লক্ষণ!”

“হ্যা তা জানি তবে তাই বলে জবাব দিবেনা?আমি লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে প্রপোজ করেছি”

“সবকিছুর জবাব মুখে দিতে হয়না, কিছু কিছু জিনিস বুঝে নিতে হয় আর আমি চাই তুমি বুঝে নেও”

তারপর সায়রার হাতে ছাতা ধরিয়ে নিজের কোট খুলে ওকে পরিয়ে দিলো, তারপর কোমর ধরে কিছুটা কাছে এনে ছাতা নিজের হাতে নিয়ে হাটা শুরু করলো। সায়রা এহেন কাজে যেনো বোকা বনে গেলো, যে ছেলের দশটা বাক্যের নয়টাই জোক থাকে সে আজ এতো গম্ভীর আর এতো ম্যাচিউরড! সায়রার কেনো জানি মনে হলো আরাভ বদলে গেছে, বড্ড বদলে গেছে আর ও এভাবে ওকে দেখতে পারছেনা। ওর পুর্বের আরাভকে চাই!

রেস্টুরেন্টে বসে আরাভকে লক্ষ্য করছে সায়রা, কিছুক্ষণ পুর্বে পাশের শপিং মল থেকে ড্রেস কিনে ওকে চেঞ্জ করিয়েছে তারপর এই রেস্টুরেন্টে নিয়ে এসেছে। সবটা নিজে সামলাচ্ছে, ওর্ডার নিজে দিচ্ছে।এমন বয়ফ্রেন্ড হয়তো সবার কাম্য কিন্তু আরাভ হঠাৎ এই রকম আচরণ করছে কেনো?খুব কম কথা বলছে ধরতে গেলে বলছেই না আর এদিকে ও বকবক করেই যাচ্ছে!ও থাকতে না পেরে প্রশ্ন করেই বসলো

“কিছুকি হয়েছে আরাভ?তুমি কেমন জানি বদলে গেছো মনে হচ্ছে অচেনা কেউ!”

“সময় আর বাস্তাবতা সবাইকে বদলে দেয় আর তাছাড়া মানুষ পরিবর্তনশীল প্রানী তাই তাদের বদলে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এনিওয়ে আমার মা বাবা পরশুদিন তোমাদের বাসায় যাবে আমাদের ব্যাপারে কথা বলতে”

“মানে এতো তাড়াতাড়ি?মাত্রই তো আমাদের সম্পর্কের শুরু হলো আর…”

“আমি প্রণয়ে নয় পরিনয়ে বিশ্বাসী সায়রা তাই তোমাকে একদম নিজের করে পেতে চাই তাও হালাল ভাবে, তোমার আপত্তি থাকলে বলতে পারো আমি কেন্সেল করে দিবো”

“না না আমি তা বলিনি, তোমার যেভাবে সুবিধা হয় সেভাবেই করো। যাইহোক আমি তোমাকে স্যরি বলতে চাই আসলে ওইদিন আমি ফোন ধরিনি কারণ আমা…”

সায়রাকে থামিয়ে আরাভ বলে উঠলো,
“যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে, ওইসব নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে নেই। পাস্ট ইজ পাস্ট। আমরা বরং আমাদের ফিউচারকে সুন্দর করার চেষ্টা করি”

সায়রা আর কিছুই বললো না কারণ অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করার ইচ্ছে ওর নিজেরও নেই।এর থেকে ভালো ওদের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা।

🌸🌸🌸

ইনায়া গুটিশুটি মেরে বসে আছে বেডে, মাথায় কালকের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। কালকে রুহান মাথানিচু করে বসে ছিলো ওর সামনে হয়তো নিজের কর্মে ভিষন লজ্জিত ছিলো। সত্যি বলতে ইনায়া রুহানের কাজে কষ্ট পেয়ে কান্না করেনি বরং ও এজন্য কান্না করেছে যে ও চাইলেও এর পরের মুহুর্ত গুলো আর রুহানের দেখা পাবে না। ও জানতো এমন কিছু ঘটতে পারে তাই ইচ্ছে করেই ওমন কথাগুলো বলেছিলো। কারণ রুহান বাধ্য হয়ে এমন কিছু করলে ও রুহানকে ঘৃণা করার আরেকটা কারণ পেয়ে যাবে আর রুহানকে কনভিন্স করতে পারবে যে ও রুহানকে ঘৃণা করে। যাতে রুহান সরে যেতে বাধ্য হয় আর রুহানকে দেখে মনে হচ্ছিলো ও খুব অনুতপ্ত। সারারাত ওর সাথে আর কথা বলেনি এমনকি বারান্দায় ছিলো পুরো রাত। সকাল বেলা কোন কিছু না বলেই ওকে বাসায় নিয়ে এসেছে আর যাওয়ার সময় শুধু এতটুকু বলেছে

“তুমি আমার থেকে সেদিন মুক্তি পাবে যেদিন আমার হৃদপিণ্ড স্পন্দন করা বন্ধ করে দিবে। তাই উইশ করো যাতে মরে যাই কারণ বেচে থাকতে তোমায় অন্যকারো হতে দিবো”

রুহান কথাগুলো খুব স্বাভাবিক ভাবে বললেও ইনায়ার হৃদয় অস্বাভাবিকভাবে কষ্ট পাচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো বুক চিরে যাচ্ছিলো কিন্তু নিজেকে দমিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বাসায় ঢুকলো।বাসায় ঢুকতেই বাবা মাকে ভয়ে জড়োশড় হয়ে বসে থাকতে দেখলো, বাবার কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে বুঝতে বাকি নেই বাসায় কে এসেছে। ইনায়াকে দেখে তারা চমকে গেছেন, ইনায়ার মা বলেই ফেললো

“ফিরে এসেছিস কেনো এখানে?রুহান তোকে ফিরতে দিলো কেন!বেরিয়ে যা এখান থেকে”

ইনায়া মায়ের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো, মায়ের ভয়ের কারণ ও বুঝতে পারছে কিন্তু ও চাইলেও এই বেড়াজাল থেকে বেরুতে পারবে না তাই এটার মোকাবিলা করাই উত্তম। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো

“ঘরে ফিরবো নাতো কোথায় ফিরবো মা?দিনশেষে এখানেই ফিরতে হবে আমায় তাই পালিয়ে বেড়িয়ে কি লাভ!”

তখনি পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো,ইনায়া জানে মানুষটি কে তাই ঘুরে দেখার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন বোধ করছে না

“এইতো তুমি কতো সহজে বুঝে গেলে, অথচ তোমার বাবা মা এই সামান্য বিষয় বুঝতে না পেরে আমার সাথে ট্রিক ইউজ করেছে”

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here