সে এক মনগড়া প্রেমকাব্য পর্ব -০৬

#সে_এক_মনগড়া_প্রেমকাব্য
৬ষ্ঠ_পর্ব
~মিহি

ডায়েরির তৃতীয় পৃষ্ঠায় একটা শুকনো গোলাপ। এতক্ষণ সন্দেহ হচ্ছিল, তবে এখন নিশ্চিত হলাম যে ডায়েরিতে কারো প্রেমকাহিনীর সংক্ষেপ আলোচনা লেখা হয়েছে, কিছু টুকরো মুহূর্ত আর কী। ডায়েরির পরের পাতা উল্টাতে যাবো তার আগেই ফোনটা ভাইব্রেট হলো। হাতে নিয়ে দেখলাম অভির নম্বর। একটু পরেই খালামণি খেতে নিচে ডাকবে। এসময় ফোন ধরা কি ঠিক হবে?

আস্তে করে দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে ফোন রিসিভ করে বিছানার উপর বসলাম। অপরপাশ থেকে অভি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

– “যাক! মহারানির তবে দয়া হলো আমার উপর। আমি তো ভেবেছিলাম আমি বড়সড় কোনো অপরাধী, আমার ফোন ধরা পাপ।”

– “তা তো পাপই, কী বলবেন সেটা বলুন।”

– “তোমার শরীরের কী অবস্থা?”

– “ঠিক আছি।”

– “একটা সত্যি কথা বলি?”

– “বলেন।”

– “না থাক!”

– “আচ্ছা।”

অভি ফোন কেটে দিল। অদ্ভুত ছেলে! অন্তত বিদায় জানিয়েই রাখতো। খালামণি খেতে ডাকলো। ফোন রেখে উঠতে যাবো এমন সময় আবারো কল। ‘অভি?’ বেশ অবাক হলাম। এখনি তো কল কাটলো। রিসিভ করতেই অভি ওপাশ থেকে কথা বলতে শুরু করলো।

– “এই কিছু মনে করো না, আসলে কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না। অনেকটা নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম তাই কল রেখে দিয়েছি।”

– “নার্ভাস? কেন? আমি কি জ্বীন-পরী?”

– “হতেও তো পারো।”

– “আচ্ছা, আর কিছু বলবেন?”

– “ভাবতেছি কী বলবো।”

– “রাখেন।”

– “শোনো,”

– “বলেন।”

– “ঘুমোনোর আগে টেক্সট দিয়ো তো।”

– “কেন?”

– “ইচ্ছা হলে দিয়ো।”

কল কাটলাম আমি। কারো প্রতি মায়া বাড়াতে ইচ্ছে হয় না আমার আর তবুও কেন যেন এই লোকটার মায়ায় পড়ছি। যতক্ষণ তার সাথে কথা বলি, শ্রাবণের কথা আমার মনে পড়ে না কিন্তু একা হলে আবারো শ্রাবণের স্মৃতি কুঁড়ে খায় আমায়। কেন শ্রাবণ কেন? এতবড় বিশ্বাসঘাতকতা না করলে হত না আমার সাথে? মাথা ধরলো আবার। শ্রাবণের কথা মনে হলেই আমার দমবন্ধ হয়ে আসে, এমন একটা অস্থিরতা কাজ করে মনে যা কাউকে দেখানো সম্ভব না। বিয়ে ভাঙার দিন রাতে একবার মনে হয়েছিল আজই বুঝি মারা যাবো। বিয়ে ভাঙার রাতের গল্পটা শুনবেন আপনারা? চলুন, আপনাদের না হয় সত্যিটা বলে ফেলি।

সেদিন রাতে রূপম ভাই এসেছিলেন আমার ঘরে তবে আমায় ধর্ষণ করতে নয়। তিনি এসেছিলেন আমায় বোঝাতে। আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম শ্রাবণ বিবাহিত কিন্তু আমি কিছুতেই শ্রাবণকে হারাতে চাইনি। তাই সব জানা সত্ত্বেও বিয়েটা করতে চেয়েছিলাম কিন্তু রূপম ভাই কোনোভাবে জেনে যায় যে শ্রাবণ বিবাহিত আর আমার প্রতি তার অতীব দরদ কিনা! যার দরুণ তিনি আমার বিয়ে ভাঙতে তটস্থ হয়ে পড়েন এবং ভেঙেও ফেলেন। ঐ সময় আমি কিছুই বলতে পারিনি। দাদামশাই যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমি রূপম ভাইকে বিয়ে করবো কিনা। তখন সরাসরি তাকে প্রত্যাখ্যান করে দিয়ে তার মধ্যকার রাগটাকে জাগ্রত করে তুলি যেন তিনি রেগে আমায় উল্টোপাল্টা বলেন আর আমি তাকে খারাপ প্রমাণ করতে পারি। তেমন কিছুই হলো না, তিনি রাগের বশে কেবল একটি কথা বলেই বেরিয়ে যান। রূপম ভাই যে রাগ পড়লে আমায় বোঝাতে আসবেন তা আমি আন্দাজও করিনি কিন্তু তিনি এলেন। আমায় বোঝাতে লাগলেন যে তিনি আমায় কতটা ভালোবাসেন। একটু আগেই বিয়ে ভেঙেছে আমার, যাকে আমি ভালোবাসতাম তাকে হারালাম আমি তাও শুধুমাত্র এই লোকের কারণে। ঐ মুহূর্তে জানিনা কোন শয়তান ভর করেছিল আমায়। রূপম ভাইয়ের কোনো কথাই আমার ভালো লাগছিল না। রাগের মাথায় হাতের কাছে থাকা ফুলদানিটা দিয়ে তার মাথায় সজোরে আঘাত করলাম। ঠিক দশ সেকেন্ড পর আমি বুঝতে পারলাম আমি ঠিক কী করে ফেলেছি। পরবর্তী এক মিনিটে মাথায় একটা গল্প সাজিয়ে নিলাম দাদামশাইকে শোনানোর জন্য। ব্যস! কাজ হয়ে গেল কিন্তু দাদামশাই যে আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিবেন তা আমি ধারণা করতে পারিনি। অদ্ভুত!

আমার আর খেতে ইচ্ছে করছে না। এই মুহূর্তে আমি কনফিউজড। শ্রাবণ আর অভি দুজনের প্রতি আমার অনুভূতি নিয়ে সন্দিহান। শ্রাবণকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসি তা আমি নিজেও বুঝি। কিন্তু অভির প্রতি আমার দুর্বলতাটা ঠিক কোথায়? শ্রাবণকে তো আমি কখনোই পাবো না, না পেলাম। ভালোবাসা তো অপূর্ণতাতেই মানায়, পূর্ণতা ভালোবাসার মান কমিয়ে দেয় কিছুক্ষেত্রে। আমার ভালোবাসা না-হয় অপূর্ণই থাক। এমন এক বিশ্বাসঘাতককে ভালোবেসেছিলাম যার প্রতি ভালোবাসা আমায় চরম নিকৃষ্ট করে তুলেছে। নিজের উপর ঘৃণা হয় মাঝেমাঝে। ঠিক কতটা খারাপ হলে একজন মানুষ নিজের জীবনের পদে পদে মিথ্যে দিয়ে একটা করে গন্তব্য গড়ে তোলে? আমিও কি বাবার মতন খারাপ মানুষ হয়ে গেছি?

___________________________________

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে অভি। মীরা এখনো টেক্সট করলো না। এই মেয়ে কি একটুও বোঝে না অভি তার জন্য ঠিক কতটা উৎকণ্ঠা? অবশ্য অভি নিজেও জানে না সে কেন মীরার জন্য এমন পাগলামি করে। মীরা কি আবার শ্রাবণের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে? ভাবতেই তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। কোনোভাবে শ্রাবণের সাথে যোগাযোগ করে সব সত্যিটা জানতে পারলে ভালো হত কিন্তু সেটা কোনোভাবেই সম্ভব না। মীরার বিয়ে ভেঙেছে মাত্রই। এর মধ্যে যদি অভি এসব নিয়ে কথা তোলে কোথাও, মীরার জন্য সমস্যা হতে পারে। ফোনের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ লেগে এলো অভির।

_____________________

মাঝরাতের দিকে ঘুম ভাঙলো রূপমের। আশেপাশের সবকিছু ঝাপসা দেখছে সে। ঠিক কতক্ষণ পর তার জ্ঞান ফিরেছে সে নিজেও জানেনা। ধীরে ধীরে চোখ খোলার পর উপলব্ধি করলো সে হাসপাতালে। মাথায় ব্যান্ডেজ করা, প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে সেখানে। রূপম আশেপাশে নিজের ফোনটা খুঁজতে লাগলো কিন্তু পেল না। একবার ভাবলো চিৎকার করে ডাক্তারকে ডাকবে কিন্তু পরিস্থিতি ঠিক কোনদিকে মোড় নিয়েছে তা না জেনে কোন পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। সে মীরার ঘরে জ্ঞান হারিয়েছিল, স্বভাবতই মীরা এটা স্বীকার করবেনা যে সে ইচ্ছে করে রূপমকে আঘাত করেছে। অবশ্যই বিষয়টা একটু জটিল। রূপম হাত থেকে স্যালাইন খুলে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামলো। গভীর রাত তবে বাইরে থেকে মানুষের আনাগোনার শব্দ স্পষ্ট ভেসে আসছে। সরাসরি বাইরে গেলে ফেঁসে যেতে পারে ভেবে রূপম দেখলো জানালা দিয়ে যদি কোনোভাবে যাওয়া যায়। রুমটা নিচতলায় হওয়ায় খুব একটা অসুবিধে হলো না রূপমের তবুও সাবধান থাকতে হবে। ফোনটা পাওয়া গেলে কাজ সহজ হয়ে যেত। ধীরে ধীরে জানালা দিয়ে বের হয়ে হাসপাতালের পিছন দিকে চলে গেল সে। গ্রাম্য হাসপাতাল হওয়ায় তেমন নজরদারি নেই। রূপমের মাথায় এখন একটাই চিন্তা ঘুরছে, মীরা কোথায় আর কী অবস্থায় আছে। তার দলের লোকেরা কোনোভাবে জানতে পারেনি তো মীরা তাকে আঘাত করেছিল বা রূপমের অসুস্থতায় মীরার উপর কোনোরকম অত্যাচার করা হয়নি তো?

একটা মানুষ কাউকে ঠিক কতটা ভালোবাসতে পারলে মানুষ নিজের অসুস্থতা ফেলে তার সুস্থতার কথা ভাবে? রূপমের নিজের কথা ভাবার একটুও ইচ্ছে নেই, সে শুধু মীরার ভালো থাকা নিশ্চিত করতে চায়। মীরাকে বিয়ের দিন বলা কথাটার জন্য এখনো সে অনুতপ্ত। রাগের মাথাঢ় একরকম তাকে অভিশাপই দিয়ে ফেলেছিল সে কিন্তু তা কেবলই রূপমের রাগের বহিঃপ্রকাশ। মন থেকে সে কখনোই মীরাকে অভিশাপ দিতে পারে না। আসলে আমরা যাকে ভালোবাসি, সে যেমনই হোক না কেন তার জন্য মন থেকে কেবল দোয়াই আসে, অভিশাপ না।

হাসপাতাল এলাকা ছাড়িয়ে রূপম নিজের এক বন্ধুর বাড়ির দিকে এগোলো। এই মুহূর্তে ঐ জায়গা ছাড়া আর কোনো জায়গাই রূপমের জন্য নিরাপদ নয়।

“রূপম হাসপাতালে নেই।” কথাটা শোনামাত্র আজহার সাহেবের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। নিজের বাবাকে তিনি কী করে এই কথা বলবেন ভাবতে ভাবতেই চিন্তায় তার ঘাম ছুটে যাচ্ছে। বাবার শরীর খারাপ। আজহার সাহেব ক্রমাগত ঘামতে লাগলেন। একবার কি মীরার কাছে কল করে জানাবেন এসব? সমস্যা সমাধান না হয়ে উল্টো বেড়ে যাবে না তো?

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here